শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

মারিয়ার ভালোবাসা

আনিসুর রহমান : মারিয়া তার আব্বু রহমান সাহেবের সাথে রিক্সায় বসা। আজ খুব খুশি খুশি লাগছে মারিয়াকে। তার মনে আনন্দের ঢেউ খেলা করছে। রিক্সায় বসে এদিক ওদিক তাকিয়ে তার আব্বুকে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে। রাহমান সাহেবও তার কলিজার টুকরা মা-মণির প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। মারিয়া এর আগের তার আব্বুর সাথে ঘুরে ঘুরে শহর দেখেছে। কিন্তু তার আনন্দ খুশি দেখে যে কেউ ভাববে যে এই প্রথম সে শহর দেখছে। অবশ্য আজকের অনন্দের মাত্রাটা একটু বেশিই মারিয়ার। কারণ রহমান সাহেব তাকে নিয়ে মার্কেটে যাচ্ছে। মারিয়ার জন্য শীতের নতুন জ্যাকেট কেনার জন্য।

আর তাই মারিয়ার মনটা ভীষণ খুশি খুশি লাগছে।

ধীরে ধীরে রিক্সার চাকা ঘুরছে। অবশ্য এতে রিক্সাওয়ার কোন দোষ নেই। ঢাকা শহরের জ্যাম সবার জানা। বিশেষ করে বিকেলবেলা রাস্তায় গাড়ির জ্যাম অনেকটাই বেড়ে যায়। কারণ এ সময় অফিস আদালত ছুটি হয়। সবাই বাসায় ফিরতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

মারিয়া তার আব্বুর সাথে রিক্সায় বসা। এখনো তার প্রশ্ন করা চলছেই। আব্বু এটা কি? ওটা কি? রাস্তায় গাড়ির এতো ভিড় কেন? মার্কেটে যেতে আর কতক্ষণ সময় লাগবে ইত্যাদি ইত্যাদি...?

এরই মধ্যে রিক্সা জ্যামে পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক এমন সময় ছোট্ট একটি মেয়ে রিক্সার পাশে এসে দাঁড়াল। হাতে অনেকগুলি ফুলের মালা। এলোমেলো মাথার চুল। গায়ে ছেড়া জামা। চেহারায় কষ্টের ছাপ লেগে আছে। মেয়েটি বলল সাহেব ফুলের মালা কিনবেন? আইজকা আমার মালাগুলো এহনো বেচে করে শেষ করতে হারিনি। হেই দুপর থাইকা দুই তিনডা মালা বেচতে করেছি। মালাগুলো বেচে শেষ করতে না হারলে আমি এবং আমার মা দুইজনেই না খায়া থাকতে অইব।

এতোটুকুন ছোট্ট একটা মেয়ে ফুলের মালা বিক্রি করছে দেখে মারিয়া অবাক হল। আর মেয়ের কথাগুলো শুনে তার মনে দয়ার উদয় হল। মারিয়া বলল আব্বু এই মেয়েটি তো আমার বয়সি। অথচ গরীব বলে প্রচন্ড এই শীতের দিনে পথে হেঁটে হেঁটে কষ্ট করে ফুলের মালা বিক্রি করছে। হয়ত সারাদিন না খেয়েই এভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চেয়ে দেখ আব্বু মেয়েটা শীতে কেমন টকটক করে কাঁপছে। গায়ে মাত্র একটা ছেড়া জামা। অথচ আমার গায়ে একটা শীতের জ্যাকেট আছে, তবুও এটা পুরান হয়ে গেছে বলে আর একটা নতুন জ্যাকেট কিনতে যাচ্ছি।

রাহমান সাহেব মারিয়ার জ্ঞানগর্ভ কথা শুনে কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, ঠিক বলেছ মা-মণি। ওরা বড়ই অসহায়। ওরা পথশিশু। পথেই ওদের বসবাস। খেয়ে না খেয়ে ওদের জীবন বাঁচে। ওদের দেখার মতো আমাদের সমাজে কেউ নেই। মা-মণি আমার তুমি ছোট্ট হয়েও ওর কষ্টটা বুঝতে পেরেছ দেখে আমার মনটা খুশিতে ভরে গেল। সত্যিই মা-মণি তুমি আমার গর্ব অহংকার। তোমার ছোট্ট মনের বুদ্ধিদীপ্ত কথাগুলো শুনে আমি গর্বিত। আল্লাহ্ তোমাকে আরো বুঝ দান করুন। আমিন।

মারিয়া বলল আব্বু ওকে রিক্সায় উঠতে বল। রহমান সাহেব বললেন, কেন মা-মণি।

মারিয়া বলল সে ও আমাদের সাথে মার্কেটে যাবে।

আমি তোমার কোলে বসব। আর সে আমার জায়গায় বসবে।

মেয়ের কথামত পথশিশু মেয়েটিকে রিক্সায় উঠতে বললে,প্রথমে সে রাজি হয়নি। রহমান সাহেব তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে রিক্সায় তাদের পাশে বসাল। এরিমধ্যে জ্যাম হালকা হলে রিক্সাওয়ালা আবার প্যাডেল মারতে শুরু করল।

মার্কেটের সামনে গিয়ে তারা নেমে পড়ল। রহমান সাহেব রিক্সাওলাকে ভাড়াটা দিয়ে তারা তিনজন মার্কেটের ভিতরে ঢুকল।

কয়েকটা দোকান ঘুরেও জ্যাকেট পছন্দ হচ্ছিল না মারিয়ার। তারপর অন্য আর একটা দোকানে গিয়ে জ্যাকেট পছন্দ হল। মারিয়া বলল আব্বু একি রঙের দুটি জ্যাকেট কিনে নাও। রহমান সহেব মা-মণির কথার অর্থ বুঝতে বাকী রইল না। তাই কোন কথা না বলে দরদাম করে দুটো জ্যাকেট-ই কিনে নিল। তারপর তারা মার্কেট থেকে বের হয়ে রাস্তায় আসল। মারিয়া বলল আব্বু এবার চল একটা খাবার হোটেলে যাই।

রহমান সাহেব বললেন চল তাহলে রাস্তার ওপাড়েই দেখা যায় খাবার হোটেল আছে। তারপর সেখান থেকে দুইজনের জন্য খাবার কিনে প্যাকেট করে নিয়ে আসল। হোটেল থেকে বের হয়ে আবার একটা রিক্সায় ডেকে উঠে বসল।

এবার মরিয়া মেয়েটিকে বলল ওহ্, কি বোকা মেয়ে আমি এতোক্ষণ তোমাকে নিয়ে মার্কেট করলাম এখনো তোমার নামটাই জানা হল না।

পথশিশু মেয়েটি বলল, আমার নাম ময়না।

মারিয়া বলল তোমারা কোথায় থাক?

ময়না বলল যেহান থাইক্যা আমারে রিক্সা তুলছ এর পশেই আমাদের বস্তি। মারিয়া বলল ঠিক আছে।

কিছুক্ষণ রাস্তা চলার পর হঠাৎ ময়না বলল আমারে এহানে নামায়া দিলেই অইব। এবার মারিয়া তার একটা জ্যাকেট দিয়ে বলল এটা তুমি পড়বে বোন। সাথে সাথে খাবারের প্যাকেটটা দিয়ে বলল তুমি আর তোমার দু'জনে খাবে।

তারপর মারিয়া তার আব্বুকে বলল, আব্বু ময়নার হাতে পাঁচশত টাকা দিয়ে দাও। রহমান সাহেব পকেট থেকে পাঁচশত টাকার নোট বের করে ময়নার হাতে দিয়ে বললেন এবার যাও মা-মণি। বাসায় তোমার মা অপেক্ষায় আছেন। ময়না খুশিতে আত্মহারা হয়ে দ্রুত তার বস্তির দিকে পা বাড়াল। কুয়াশাভেজা এই প্রচন্ড শীতের দিনে পথশিশু ময়নাকে খুশি করতে পেরে মারিয়া ও তার আব্বু রাহমান সাহেব ভীষণ পুলকিত। রহমান সাহেব মারিয়ার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মারিয়ার কপোলে মিষ্টি করে একটা চুমো এঁকে দিল। মারিয়াও তার আব্বু উদারাতায় মুগ্ধ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ