শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

মায়ের ভাষার মর্যাদা

মাহমুদুল হক আনসারী : ভাষা সংস্কৃতি সৃষ্টিকর্তার উপরন্ত দান। পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টির জন্য ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা। সব জাতি গোত্র গোষ্ঠীর জন্য পৃথিবীতে ভাষা রয়েছে। তাদের নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি পাওয়া যাবে। লিখিত অলিখিত অনেক ভাষা প্রচলিত আছে পৃথিবীতে। সবগুলো গোত্র মানুষের জন্য তাদের নিজস্ব ভাষায় দেখা যায়। একগোত্র অপরগোত্রের ভাষা সংস্কৃতি বুঝতে কষ্ট হলেও কিন্তু ওদের নিজস্ব ভাষা দিয়ে তারা জীবন যাপন করছে। পৃথিবীর বুকে নানা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা থাকলেও সংস্কৃতি কৃষ্টি কালচারের মধ্যেও ভিন্নতা দেখা যায়। পৃথিবীর এ প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত নানা শ্রেণী পেশার মানুষের ভাষা সংস্কৃতি প্রচলিত আছে। কিছু কিছু ভাষা জাতীয় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কতিপয় ভাষা এক অঞ্চল টপকিয়ে আরেক অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারেনি। আবার কিছু ভাষা পৃথিবীর অনেক মানুষ ও সমাজের নিকট পৌঁছতে পেরেছে। ভাষা সৃষ্টিকর্তার মহান দান। ভাষা ছাড়া মানুষ মনের কথা ভাব একে অপরের নিকট প্রকাশ করতে পারেনা। ভাষাগত জ্ঞান সেটা আরেকটি মহান যোগ্যতা। পৃথিবীতে প্রচলিত ভাষার ওপর দক্ষতা ক্ষমতা অর্জন করতে পারলে তার জন্য পৃথিবীর অনেক কিছু সহজ হয়ে থাকে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে প্রবেশ করলে সেক্ষেত্রে সেদেশের ভাষার ওপর দক্ষতা অর্জন করতে পারলে তখন ভ্রমণকারীর জন্য সেদেশে পদার্পণ যাতায়াত কর্ম সবকিছু সহজ হয়ে যায়। পৃথিবীর নানা ভাষা যার যত বেশি আয়ত্বে থাকবে সে তত বেশি পৃথিবীতে তার যোগ্যতা দক্ষতা ক্ষমতা অর্জন করতে পারবে। ভাষার যোগ্যতা দক্ষতার কথা বলে শেষ করা যাবেনা। কথা বলা লিখা উপস্থাপন করা সবকিছু একজন মানুষ ও সমাজের জন্য বিশাল যোগ্যতা। মায়ের ভাষার মর্যাদার কথা বলতে গিয়ে এসব কথা অনেক কিছু পরিস্কারভাবে বলতে হচ্ছে। ভাষার কথা বলে শেষ করা যাবেনা। মায়ের ভাষায় বাংলা ভাষার ওপর বাঙালি সাহিত্যিক কবি সাংবাদিক লেখক ও গবেষকগণ অসংখ্য প্রবন্ধ নিবন্ধ বই গল্প প্রকাশ করেছে। তাদের গল্প মায়ের ভাষায় লিখনি সাহিত্য, উপন্যাস, কবিতা,ছড়া ভাষাকে ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ করেছে। মায়ের ভাষায় সাহিত্য কবিতা গল্প এবং রচনা কলেজ ইউনিভার্সিটিতে ডক্টরেট ডিগ্রি পর্যন্ত চর্চা হচ্ছে। ৫২’র বাংলা ভাষা আন্দোলনে যারা মিছিল মিটিং আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে আজকের এ পর্যায়ে আনতে অনেক ত্যাগ ও জীবন দিয়েছেন তাদের প্রতি হাজার সালাম ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তাদের সেদিনের আন্দোলন সংগ্রাম আর ত্যাগ জীবন বাজি না হলে বাংলা ভাষা আজকের এ সময়ে ঘরে ঘরে পৌঁছতনা। বাংলা যেভাবে এখন বাংলাদেশ ছাড়িয়ে পৃথিবীর অসংখ্য দেশে স্থান করে নিতে পেরেছে এটা তাদেরই অবদান। সালাম, রফিক, জাব্বার, বরকতসহ নাম না জানা যাদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠিত তাদের প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম এবং কৃতজ্ঞ। জাতি তাদের নিকট চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকবে। মানচিত্র ভূমি এ জাতি যতদিন থাকবে তাদের কথা অবশ্যই বলতে ও লিখতে হবে। মায়ের ভাষা এখন পৃথিবীর অনেক দেশে উচ্চারিত হচ্ছে। বাংলা ভাষা দিবস শুধু মাত্র বাংলাদেশেই এখন আর সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাাতিক ফেব্রুয়ারী বাংলা ভাষার মাস ও দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। ২১শে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এদিবস পৃথিবীর অসংখ্য দেশের লাখ লাখ মানুষ উদযাপন করছে। বাংলাদেশে প্রতিটি স্কুল কলেজ সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে এ দিবস অত্যন্ত জাকজমকপূর্ণ পরিবেশে পালিত হয়। মায়ের ভাষার প্রতি কৃতজ্ঞতা আর আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ ভাষা দিবস উদযাপন। দিবসকে সামনে রেখে দেশের হাজার হাজার ইলেক্ট্রনিক্স প্রিন্ট ও অনলাইন পোর্টাল নিবন্ধ প্রবন্ধ প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। পত্রিকায় নিয়মিতভাবে ভাষার ওপর প্রবন্ধ নিবন্ধ কবিতা ছড়া প্রকাশিত হচ্ছে। মাস ব্যাপী বই মেলা বাংলা ভাষার প্রতি নিবীড় শ্রদ্ধা প্রকাশ করে শুরু হয়েছে। সারা দেশের প্রতিটি জেলায় বই মেলা চলছে। প্রশাসনের গভীর পর্যবেক্ষণ এসব বইমেলা চলবে। নবীণ প্রবীণ বুদ্ধিজীবী গবেষক লেখকদের মায়ের ভাষার উপর নতুন নতুন বই প্রকাশ পাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী সামনে রেখে অনেক লেখক ইতিমধ্যে বই বের করছে। সবকিছু মায়ের ভাষার প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার নিদর্শন। পৃথিবীতে মা এবং মায়ের ভাষার ওপর আর কিছু নেই। মাকে ভালোবাসা সব ধর্মের অন্যতম বাণী। মায়ের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা আনুগত্য অনুশীলন সেটাও ধর্ম ও রাষ্ট্রের জন্য অন্যতম পালনীয় একটি কাজ। ভাষা এবং মায়ের ভাষা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো একটি গোষ্ঠী আছে যারা মায়ের ভাষাকে অন্য ভাষা থেকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেনা। পৃথিবীর অন্য ভাষার তুলনা মায়ের ভাষায় ওদের নিকট এখনো মর্যাদাহীন। তারা ভীনদেশী ভাষা তাদের পড়ালেখায় চর্চা অনুশীলন করলেও মায়ের ভাষা বাংলা ভাষাকে এখনো সে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার স্থান দিতে পারেনি। অথচ তারাও এদেশের ১৭ কোটি জনগণের অন্তর্ভূক্ত। তারাও এদেশের নির্বাচনে ভোট ও রায় প্রদান করে থাকে। তাদের ভোটে আর মতামতে প্রশাসন সরকার পরিবর্তন হয়। বিশাল একটি গোষ্ঠী মায়ের ভাষা বাংলাকে এখনো গুরুত্ব দিয়ে অনুশীলন করছে। তাদের শিক্ষা ও এডুকেশনে ভিনদেশী ভাষার প্রতি মনোযোগী বেশি দেখছি। সে তুলনায় বাংলা ভাষা মায়ের ভাষাকে তাদের নিকট সমাজ ও রাষ্ট্র গুরুত্ব বহন করে বোঝাতে সক্ষম হয়নি। এটা সমাজ ও রাষ্ট্রের একটি ব্যর্থতা বলা যায়। এখনো অসংখ্য বিদ্যালয় কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার চাইতে ভিনদেশী ভাষাকে গুরুত্ব বেশি দেয়া হচ্ছে। উপরেই আমি বলেছি পৃথিবীর যত ভাষা রয়েছে তা জানা অর্জন করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু আমার ভাষা জাতীয় ভাষা মায়ের ভাষাকে অবশ্যই সব ভাষার ওপর গুরুত্ব বেশি দেয়া উচিত। মাতৃভাষা আর মায়ের ভাষার বাংলা ভাষার ফেব্রুয়ারী মাসে আমার ভাষাকে আরো গতিশীল করতে হবে। অধিকভাবে সব স্তরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মায়ের ভাষার প্রচলন সম্মান বাড়াতে হবে। ভাষার চর্চায় যারা নিবেদিত কৌশলী রয়েছে তাদের প্রতি রাষ্ট্রকে আরো অধিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। ভাষার চর্চা মায়ের ভাষার অনুশীলনে সাহিত্যিক লেখকদের রাষ্ট্রীয়ভাবে আরো অধিক উৎসাহিত করা চায়। ভাষাবিদ লেখক গবেষকদের সম্মানির কৌটা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। বাংলা ভাষাকে যারা নানাভাবে সমৃদ্ধ জাতীয় আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তখন ও এখন শ্রম দিচ্ছেন তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানিয়ে ভাষার মর্যাদা রক্ষায় এগিয়ে আসার প্রত্যয় ও প্রত্যাশা করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ