শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বইয়ের সাথে প্রেম হোক

জুবায়ের আহমেদ : প্রথিতযশা সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী তার “বই পড়া” প্রবন্ধে লিখেছিলেন “বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয়নি, বই কেনার বাজেট যদি আপনি তিনগুণও বাড়িয়ে দেন, তবুও তো আপনার দেউলে হওয়ার সম্ভাবনা নেই”। আসলেই তাই, বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয়েছে এমন কোন খবর পাওয়া যায়নি কখনো কিন্তু বই পড়ে জ্ঞান ভান্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে, দেশ ও জাতি এবং মানবতার কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করতে পেরেছে, এমন মানুষের সংখ্যা অধিক। একটি বই জীবনের কথা বলে, বই মানুষের কথা বলে, বই বিপথগামী মানুষ ও সমাজকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার রসদ যুগায়, বই মানুষকে ন্যায়নীতি ও আদর্শিক জীবন গঠনে অনুপ্রাণিত করে।  

জগৎবিখ্যাত কবি ওমর খৈয়াম বলেছিলেন, “রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু একখানা বই সব সময় অনন্ত-যৌবনা, যদি তেমন বই হয়”। পবিত্র কোরআনেও উল্লেখ আছে “পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন”। রাসুল (স:)  এক হাদিসে বলেছেন, ঘন্টাখানেকের জ্ঞান সাধনা সমগ্র রজনীর ইবাদত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। আর জ্ঞান সাধনার অন্যতম মাধ্যমই হলো বই। আল্লামা শেখ সা’দী বলেন জ্ঞানের জন্য তুমি মোমের মতো গলে যাও। কারণ জ্ঞান ছাড়া তুমি খোদাকে চিনতে পারবে না”। সনাতন, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতেও বই পড়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেল শব্দের অর্থই হলো বই। বৃটিশ দার্শনিক ও যুক্তিবিদ বারট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন, “সংসারে জ্বালা-যন্ত্রণা এড়ানোর প্রধান উপায় হচ্ছে, মনের ভেতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদকালে তার ভেতর ডুব দেওয়া। যে যত বেশি ভুবন সৃষ্টি করতে পারে, ভবযন্ত্রণা এড়ানোর ক্ষমতা তার ততই বেশি হয়। 

আমরা যে যতটুকু লেখা পড়াই করি না কেনো, পাঠ্য বইয়ের বাহিরে বিভিন্ন বিষয়ে বিখ্যাত-অখ্যাত লেখকদের বই পড়ার মানসিকতা তৈরী দরকার, একটি ভালো বই মানুষকে আদর্শ জীবন গঠন করতে সহায়তা করে, ধর্মীয় বই ছাড়াও পৃথিবীতে অসংখ্য বই আছে, যা থেকে জ্ঞান অর্জন করে মানব জীবন আলোকিত করা সম্ভব। মানুষের ভেতরের হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা ভুলে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা তৈরী হওয়ার মতো উদার মানসিকতা তৈরী সম্ভব। সুন্দর ও আদর্শ সমাজ এবং দেশ গঠনে বইয়ের কোন বিকল্প নেই। 

উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতি এবং ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ার ফলে বই প্রড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়া দৃশ্যমান। বিগত এক দশক আগেও পাঠ্য বইয়ের বাইরেও দেশী বিদেশী সাহিত্য, ইতিহাস, গোয়েন্দা কাহিনী, শিশুতোষ গল্প, বৈজ্ঞানিক, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান বিষয়ক, ধর্মীয় বইসহ নানা বিষয়ে লেখা বইগুলোর প্রতি সকলের আগ্রহ ছিলো, বর্তমানেও মানুষ পড়ছে, তবে তা বইয়ের মাধ্যমে নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ভালো মন্দ যে যাই লেখছে, তা পড়ছে মানুষ, যার মধ্যে ইতিবাচকের লেখার বিপরীতে নেতিবাচকের সংখ্যাও কম নয়, যার মাধ্যমে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরী হচ্ছে, ভুল বার্তায় আকৃষ্ট হয়ে হানাহানি, মারামারি ও মানুষে মানুষে বেদাভেদ তৈরী হচ্ছে। বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণে জ্ঞানশূন্য প্রজন্মের দিকে ধাবিত হচ্ছে দেশ ও জাতি, প্রকাশকরা এখন আগের মতো বেশি সংখ্যক বই প্রকাশ করে না, কবি-সাহিত্যিক-লেখকরা বই লেখতে আগ্রহী হয় না এখন তেমন, পূর্বে সারা বছর জুড়েই দেশের আনাচে কানাচে থাকা লাইব্রেরীগুলোতেও পাঠ্য বইয়ের বাইরে বহু গল্প, কবিতাসহ বিভিন্ন বই বিক্রির হিড়িক লেগে থাকলেও এখন আর সে দৃশ্য দেখা যায় না লাইব্রেরীতে, বই প্রকাশের খরচ তুলে ন্যূনতম লাভের মুখ না দেখায় প্রকাশক-লেখকরা এখন পর্যাপ্ত বই প্রকাশ করতে পারছেন না।

আশার কথা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ৮ ফেব্রুয়ারীতে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের একজন পৃথিকৃৎ চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বর্ধমান হাউজ প্রাঙ্গণে বটতলায় এক টুকরো চটের উপর কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই সাজিয়ে যে বইমেলার শুরু করেছিলেন, সে বইমেলা আজ পর্যন্ত নিয়মিত আয়োজন হচ্ছে। শুধুমাত্র ঢাকাতেই নয় অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতেও বইমেলার আয়োজন হয়, যেখানে দেশী-বিদেশী কবি সাহিত্যিক ছাড়াও তরুণ প্রজন্মের লেখকদের প্রকাশিত বইয়ের মিলনমেলা হয়, যেখানে দেশী বিদেশী সাহিত্য, গোয়েন্দা কাহিনী, শিশুতোষ গল্প, ইতিহাস, রাজনীতি, বৈজ্ঞানিক, সমাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান বিষয়ক, ধর্মীয় বই, সহ নানা বিষয়ে লেখা পাওয়া যায়। জ্ঞানার্জন ব্যতীত কোন জাতিই কাঙ্খিত উন্নতি সাধন করতে পারেন না। তাই আসুন, শত কর্মব্যস্ততার মাঝেও বই কিনি, বই পড়ি, প্রিয়জনকে বই উপহার দেই, পৃথিবী বইয়ের হোক, বইয়ের সাথেই আমাদের প্রেম হোক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ