শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

শাহাবুদ্দীন আহমদ : এক অনন্য সাহিত্য গবেষক

 

সোলায়মান আহসান : শাহাবুদ্দীন আহমদ (১৯৩৬-২০০৭) নজরুল গবেষক হিসেবে পরিচিতি পেলেও তিনি বহুপ্রজ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। নজরুল সাহিত্য গবেষণায় নিবিষ্ট থেকেও তিনি ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪), জীবনানন্দ দাস (১৮৯৯-১৯৫৪), গোলাম মোস্তফা (১৮৯৫-১৯৬৪), জসীম উদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬), সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৫-১৯৪৭), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকদের ওপর গবেষণা করে একজন শক্তিমান দায়িত্বশীল প্রাজ্ঞ সাহিত্য গবেষক হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন। এছাড়া সাহিত্য পত্রিকা, দৈনিক পত্রিকা সম্পাদনা, শিশু-কিশোর সাহিত্য রচনা ও ক্রীড়াবিষয়ক লেখক হিসেবেও তিনি জননন্দিত হন। কবিতা আবৃত্তিতে তার সময়ে তিনি ছিলেন অনন্য।

জীবনের নানা প্রতিকূলতা, চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে পথ অতিক্রম করেছেন। আজীবন তিনি ছিলেন নিবিষ্ট সাহিত্য গবেষক, সত্যানুসন্ধানী, নিজ জাতি এবং ঐতিহ্যের প্রতি দায়িত্বশীল। তিনি চাইতেন চিরসত্যকে উদঘাটন করতে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে। তিনি নিজ সম্প্রদায়কে ভালোবাসতেন প্রাণ দিয়ে। চাইতেন পিছিয়ে পড়া নিজ সম্প্রদায়ের তরুণ প্রজন্ম যোগ্যতা বিকাশের মাধ্যমে সাহিত্য চর্চার দিগন্তকে এত প্রসারিত করতে, যার ভেতর আমাদের সঠিক চলার পথ নির্ডুত হয়। এ কারণেই তিনি কাজী নজরুল ইসলামকে (১৮৯৯-১৯৭৬) সাহিত্য গবেষণার প্রধান বিষয় নির্ধারণ করেছিলেন। তার সাহিত্য গবেষণা কর্মকে কেউ উপেক্ষা করতে পারেনি। এ কারণে নজরুল গবেষক হিসেবে অনেক নামই উচ্চারণ করা যাবে, কিন্তু শাহাবুদ্দীন আহমদের নামের সাথে যেভাবে ‘নজরুল গবেষক’ শব্দদ্বয় যুক্ত হয়ে গেছে এবং প্রকৃত অর্থে এর বিশেষত্বকে কেউ অস্বীকার করতে পারেনি। নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও গভীর অন্বেষণার সাথে তার নজরুল গবেষণায় আরো একটি বিষয় প্রযুক্ত হয়েছে, তা আর অসাধারণ ধীশক্তি ও মেধা। কাজী নজরুলের শত শত কবিতা পঙক্তি তার ছিল মুখস্থ। আর এ কারণেই নজরুলের মতো বিশাল প্রতিভা সৃষ্টিরাজিকে আত্মস্থ করা, রসাস্বাদন এবং বিশ্লেষণ করা শাহাবুদ্দীন আহমদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে। তিনি নজরুলকে গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন। এতটা ভালোবেসেছিলেন, নিজে নজরুলের গান স্বকণ্ঠে গাইতেন এবং আপন এক কন্যাকে নজরুল সঙ্গীতে পারদর্শী করে তোলেন।

শাহাবুদ্দীন আহমদকে কেউ কটু কথা বললে হজম করতেন। তেমন মারমুখো ভূমিকায় লিপ্ত হতেন না। কিন্তু নজরুল সম্পর্কে কেউ কটু মন্তব্য করলে, ভুল ব্যাখ্যা দিলে এবং নজরুলকে হেয়প্রতিপন্ন করলে তিনি সহ্য করতে পারতেন না-প্রচন্ড ক্ষেপে যেতেন। তবে তা তিনি যুক্তিসঙ্গত, তথ্য-উপাত্ত এবং বিশ্লেষণী লেখার মাধ্যমে তার প্রতিবাদ করতেন।

একবার কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘চতুরঙ্গ’ সাহিত্য পত্রিকায় (আগস্ট ১৯৮৬ সংখ্যায়) ‘নজরুল ইসলামের কবি স্বভাব : শক্তি পূজা’ শীর্ষক নজরুল ইসলামকে সমালোচনা করে আহমদ শরীফের একটি প্রবন্ধের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি ‘লক্ষ বছর ঝর্ণায় ডুবে রস পায় নাক নুড়ি’ শীর্ষক এক দীর্ঘ প্রবন্ধ ফেঁদে বসেন, যা প্রথমে ‘অগ্রপথিক’ এর ১ বর্ষ ১৮ সংখ্যা ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৮৬ হতে ছাপা হয় ধারাবাহিকভাবে। পরে তা গ্রন্থরূপে প্রকাশ পায়। এ দীর্ঘ প্রবন্ধটি পাঠ করলে অনুধাবন করা যাবে কী অসাধারণ পান্ডিত্য, যুক্তিগ্রাহ্য এবং তথ্য-উপাত্তসমৃদ্ধ তার লেখনী।

শাহাবুদ্দীন আহমদ নজরুলের ওপরই ১০টি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। এগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি নজরুল মূল্যায়নের নিরিখে অনন্য সাহিত্য গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। গ্রন্থগুলো : ১. শব্দ ধানুকী নজরুল ইসলাম (১৯৭০), ২. নজরুল সাহিত্য বিচার (১৯৭৬), ৩. ইসলাম ও নজরুল ইসলাম (১৯৮১), ৪. নজরুল সাহিত্য দর্শন (১৯৮৩), ৫. ‘লক্ষ বছর ঝর্ণায় ডুবে রস পায় নাক নুড়ি’ (১৯৯৯), ৬. বহুরূপে নজরুল (১৯৯৯), ৭. নজরুলের গদ্যে উপমা (২০০০), ৮. ওমর খৈয়ামের অনুবাদক নজরুল ইসলাম (২০০১), ৯. নজরুল জীবন ও কবিতায় (২০০৩) ও ছোটদের নজরুল (১৯৭৬)।

এছাড়া ফররুখ আহমদ, ব্যক্তি ও কবি (১৯৮৩), নজরুল প্রতিভার স্বরূপ (১৯৮৯) ও নজরুলের রচনাবলী (১৯৯৫) নামের বিশাল বিশাল গ্রন্থসমূহ সম্পাদনা করেন। তিনি ‘দ্রষ্টার চোখে স্রষ্টা’ (১৯৮৯) গ্রন্থে ‘রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলাম’ শীর্ষক বাংলা সাহিত্যের দুই বিশাল প্রতিভাকে নিয়ে অসাধারণ তুলনামূলক দীর্ঘ সাহসী বিশ্লেষণী প্রবন্ধ রচনা করেন, যা সুধী মহলে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। এমন স্পর্শকাতর দুই সম্প্রদায়ের কবিকে বিচারের পাল্লায় মাপামাপি করার সৎ সাহস শাহাবুদ্দীন প্রতিভার পক্ষেই সম্ভব। শাহাবুদ্দীন আহমদ এক পর্যায়ে ইসলামী ঐতিহ্যের কবি ফররুখ আহমদের ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহী হয়ে ওঠেন। তিনি চল্লিশের দশকের অনন্য প্রতিভা ফররুখ আহমদকে নিয়ে তিনটি গ্রন্থ রচনা করেন, যা সুধী মহলে প্রশংসা অর্জন করে। গ্রন্থগুলো : ১. কবি ফররুখ : তার মানস ও মনীষা (১৯৯৪), ২. উপমাশোভিত ফররুখ (২০০১) এবং ৩. মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ (২০০২)।

ফররুখ সম্পর্কে তার মন্তব্য হচ্ছে :

‘ফররুখ সেই কবি নন যাকে নিমিষে আত্মস্থ করা যায়। তিনি খুব সহজপ্রাচ্য কবিদের একজন নন। তার কবিতার ভক্তদের মধ্যে সবাই তার কবিতা খুব সহজে বোঝেন, এটি আমার মনে হয় না। মুসলমানদের জন্য লিখেছেন বলে, তার কবিতায় ইসলামের দর্শনের প্রতিফলন হয়েছে বলে যারা ধর্মীয় প্রেমে অনুপ্রাণিত হয়ে তার কবিতা পড়েন, তার কাব্যের সাহিত্য উৎকর্ষ সম্বন্ধে কতটা অবহিত তা আমার জানা নেই।’

(কবি ফররুখ আহমদ : তার মানস ও মনীষার ভূমিকা)

শাহাবুদ্দীন আহমদ ‘সাহিত্য উকর্ষ’ বা উৎকর্ষ সাহিত্যের ব্যাপারে ছিলেন বিশেষ আগ্রহী। সে সাথে ঐতিহ্য এবং নিজ সম্প্রদায়ের আদর্শ চেতনাকে লালন পালন করার এক দায়িত্বশীল দরদি মনের অধিকারী ছিলেন। সেই কেন্দ্রীয় চিন্তা থেকেই বোধহয় তিনি গোলাম মোস্তফার ওপর ‘বাংলা সাহিত্যে গোলাম মোস্তফা (২০০০) শীর্ষক ২৭১ পৃষ্ঠার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ গ্রন্থ রচনা করেন।

গোলাম মোস্তফা সম্পর্কে তার মূল্যায়ন :

‘গোলাম মোস্তফা রাজনৈতিক চেতনায় নজরুলের সমধর্মী নন। (নজরুলের মতো সমাজ ও রাজনীতি সচেতন কবি অবশ্য বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি নেই)। অবশ্য ত্রিশ দশকে ও তার পরের কবিদের কবিতায় নজরুলকে অনুসরণ করে ক্রমেই রাজনীতি সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে।..... যেহেতু সমাজ চিন্তায় গোলাম মোস্তফা সমর্পিত ছিলেন যেজন্য তিনি রাজনীতি চিন্তা থেকে দূরে থাকতে পারেননি।’

(বাংলা সাহিত্যে গোলাম মোস্তফা, প্রারম্ভিকা)

সম্ভবত এ কারণেই শাহাবুদ্দীন আহমদ একটি অসাধারণ গ্রন্থ আমাদের জন্য রচনা করে গোটা জাতিকে অধমন করে গেছেন। ১০০ বছরের কবিতার মূল্যায়ন ‘চতুদর্শ শতাব্দীর বাঙলা কবিতা’ (২০০১) এমন শ্রমনির্ভর, তথ্য-উপাত্তপূর্ণ গ্রন্থ রচনা শাহাবুদ্দীনের মতো নিষ্ঠাবান কমিটেড সাহিত্য গবেষকের পক্ষেই কেবল সম্ভব।

এ গ্রন্থটি লেখার পটভূমি সম্পর্কে ‘আরম্ভিকা’য় বলেন, ‘কয়েকজন সম্পাদকের কাছ থেকে আমার কাছে তাগিদ এলো বাংলা চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ বছর শুরু হয়েছেÑ এই বাংলা শতাব্দীর বাংলা কবিতার ওপর প্রবন্ধ লেখার।.... ব্যাপারটা বলা খুবই সহজ, কিন্তু কবিতাও কম নয়, ১০০ বছরের কবিতার কথা, যা তা ব্যাপার নয়।

সেই কঠিন শ্রমসাধ্য অসাধারণ কাজটি প্রথমে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ সম্পন্ন করে পরে ২৬৯ পৃষ্ঠার একক প্রবন্ধ রচনা করেন। শাহাবুদ্দীন আহমদ একজন পরিশ্রমী নিষ্ঠাবান সাহিত্য গবেষক ছিলেন। সবসময় তার প্রচেষ্টা ছিল যখন যার মূল্যায়ন করেছেন মেধা, প্রজ্ঞা ও জ্ঞান সমন্বয়ে যথাসম্ভব গভীরে প্রবেশ করে মূল বিষয়কে ধারণ করেছেন। তিনি প্রায়শ একটি শব্দকে সাহিত্য গবেষণার প্রতিরূপ হিসেবে ব্যবহার করতেনÑ স্ক্যানিং। সাহিত্য বুঝতে হলে এ দক্ষতা গবেষকের থাকতে হবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা চলে শাহাবুদ্দীন আহমদ এই স্ক্যানিং করার প্রচেষ্টা এবং প্রয়াসের মধ্য দিয়ে তার দক্ষতাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

শাহাবুদ্দীন আহমদ ছিলেন স্বজাতির প্রতি কমিটেড। এই দায়বদ্ধতা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে সারাটি জীবন, কী পেলেন বিনিময়ে, কিংবা কীসে লাভালাভ এ বিবেচনা থেকে তিনি সাহিত্য চর্চা করেননি। তাই তিনি যখনই যে বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন, সে বিষয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন। তার ভাষায়-

‘মনে পড়ে কবি গোলাম মোস্তফার সাথে একদিন বড় কবি কাকে বলে তাই নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। তিনি বলেছিলেন, সব বড় কবির কাব্যের একটি দার্শনিক ভিত্তি থাকে। সেই দার্শনিক ভিত্তি ছাড়া কোনো কবি শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা পায় না। উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, ধরো- এই জসীম উদ্দীন, সে সুন্দর সুন্দর কবিতা লিখেছেন তাতে চমৎকার চমৎকার গ্রামের ছবি আছে, কিন্তু এগুলোকে বড়জোর গ্যাসটোরাল পোয়েট্টি, ভিলেজ প্যাথোজ বলা যেতে পারে, শ্রেষ্ঠ কবিতা বলা যায় না।’

(দ্রষ্টার চোখে ¯্রষ্টা-শাহাবুদ্দীন আহমদ)

শাহাবুদ্দীন আহমদ গোলাম মোস্তফা, কবি জসীম উদ্দীন সম্পর্কে মন্তব্যটি পছন্দ করেননি। কিন্তু এর জবাব তিনি মুখে মুখে তৎক্ষণাৎ না দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ লিখে দেন। শাহাবুদ্দীন আহমদের প্রথম প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘সাহিত্য চিন্তা’ (১৯৭৫) একটি অনন্য সাহিত্য সমালোচনামূলক গ্রন্থ। এ গ্রন্থে তিনি সাহিত্যের কিছু মৌলিক বিষয়কে উপজীব্য করে প্রবন্ধ রচনা করেন। যে প্রবন্ধগুলো একদিকে সাহিত্যের বিতর্কিত বিষয় নিয়ে একটি মীমাংসার তোরণ দেখায়, তেমনি তথ্য-উপাত্ত, যুক্তিনির্ভর সমৃদ্ধ ও প্রবন্ধগুলো সাহিত্যপ্রেমীদের চিন্তার দিগন্ত প্রসারে সহায়ক।

আগেই বলেছি, শাহাবুদ্দীন আহমদ সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনায় এক সমৃদ্ধ ইতিহাস রচনা করেছেন। এটি যেভাবে তার জীবন-জীবিকার অবলম্বন হিসেবে, তেমনি সাহিত্যকে প্রল্লবিত করতে বিন্যস্ত ও উৎকর্ষ দিতে প্রভুর অবদান রেখেছেন। এই অনন্য সাহিত্য গবেষক ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ২৪ পরগনা (উত্তর) জেলার বশিরহাট মহকুমা অন্তর্গত আব্দুল্লাহ গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৩৬ সালের ২১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। মনে অদম্য সাহস ছিল- নিজ সম্প্রদায়ের জন্য এমন সাহিত্য রচনা করা, যা পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখাতে সহায়ক হবে। তিনি সফলও হয়েছেন খানিকটা। এই গুণী সাহিত্য গবেষক ২০০৭ সালের ২৬ মে মৃত্যুবরণ করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ