মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ক্রেতা-দর্শনার্থী খরায় লোকসানের কবলে এবারের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা

স্টাফ রিপোর্টার: একপ্রকার ক্রেতা-দর্শনার্থী খরার মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে এবার ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। এ মেলায় অংশ নেয়া বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানকে লোকসানের কবলে পড়তে হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। মেলার গেট ইজারা নিয়ে মোটা অংকের লোকসানে পড়েছেন ইজারাদার। বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বসলেও মাসব্যাপী ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা রাজধানীবাসীদের কাছে মিলন মেলায় পরিণত হয়। কারো কারো কাছে বিনোদনের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠে বাণিজ্য মেলা। আবার কারো কারো আয়ের বা চাকরির উৎস হয়ে দাঁড়ায়। তবে এবার সব বাঁধন ছিঁড়ে বিদায়ের ঘন্টা বেজেছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার। প্রত্যেকটি স্টল-প্যাভিলিয়নের মালিক ও বিক্রয়কর্মীদের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছে বিদায়ের বাণি। একে ওপরের সাথে বিদায়ী সাক্ষাতে কেটেছে মেলার শেষ দিন। 

জানা গেছে, গতকাল বৃহস্পতিবার রাতেই শেষ হয়েছে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বসা মাসব্যাপী এ মেলা। ক্রেতা-দর্শনার্থী খরার এই বাণিজ্য মেলায় কী পরিমাণ পণ্য বিক্রি হয়েছে এবং কত রফতানি আদেশ পাওয়া গেছে তার কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। আয়োজক সংস্থা রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রতি বছর এ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করলেও এবার তা করেনি।

মেলার ইজারাদার ও অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গত এক দশকের মধ্যে এবার বাণিজ্য মেলায় সব থেকে কম ক্রেতা-দর্শনার্থী এসেছেন। মেট্রোরেলের কাজ এবং মেলা চলার মাঝে তিনদিন বন্ধ থাকায় ক্রেতা-দর্শনার্থীর সংখ্যা কম হয়েছে।

অপরদিকে মেলার আয়োজক ইপিবি বলছে, বৈরি আবহাওয়ার কারণে এবার ক্রেতা-দর্শনার্থীর সংখ্যা কিছুটা কম হয়। তবে মেলার সময় বাড়ানোর কারণে শেষ দিকে আশানুরূপ ক্রেতা-দর্শনার্থী এসেছেন। আর মেলার ক্রয় ও রফতানি আদেশের সঠিক তথ্য পাওয়া না যাওয়ায়, এবার এ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়নি।

এবারের বাণিজ্য মেলার বিক্রি ও রফতানি আদেশের বিষয়ে জানতে চাইলে ইপিবির উপ-পরিচালক ও মেলার সদস্য সচিব আব্দুর রউফ বলেন, মেলার বিক্রি ও রফতানি আদেশের সঠিক তথ্য তুলে আনা খুব কষ্টকর। অনেক সময় বিভ্রান্তিকর তথ্য থাকে। এ কারণে এবার আমরা মেলার বিক্রি ও রফতানি আদেশের ডাটা তৈরি করিনি।

আগের প্রথা অনুযায়ী এবারও রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা বছরের প্রথম দিন তথা ১ জানুয়ারি শুরু হয়। তবে বাড়ানো হয় টিকিটের মূল্য। মেলায় প্রবেশের জন্য প্রাপ্ত বয়স্কদের টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৪০ টাকা, যা গত বছর ছিল ৩০ টাকা। ক্রেতা-দর্শনার্থী কম থাকায় অংশগ্রহকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দু’দফা মেলার সময় বাড়ানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাতে এবারের মেলার পর্দা নেমেছে।

আয়োজনেই ২৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হওয়া এ বাণিজ্য মেলায় বাংলাদেশের পাশাপাশি থাইল্যান্ড, ইরান, তুরস্ক, নেপাল, চীন, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ভুটান, ব্রুনাই, দুবাই, ইতালি ও তাইওয়ানের প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।

মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে অংশগ্রহণ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেলার প্রথম থেকেই ক্রেতা-দর্শনার্থীর খরা দেখা দেয়। প্রথম দুই সপ্তাহ ক্রেতা-দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। প্রথমার্ধ্ব যাওয়ার পর ক্রেতা-দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ে। তবে আগের বছরগুলোর তুলনায় তা বেশ কম।

মেলার ইজারা পাওয়া প্রতিষ্ঠান মীর ব্রাদার্সের মালিক মীর শহিদুল বলেন, এবার দর্শনার্থীর সংখ্যা খুব কম। সাড়ে ৭ কোটি টাকা দিয়ে মেলা ইজারা নিয়েছি। গত বুধবার (৫ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত টিকিট বিক্রি হয় ৯ লাখের মতো। এত কম দর্শনার্থী এর আগে কখনো হয়নি। এর আগে ২০১৪ সালে নির্বাচনের কারণে দর্শনার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। তবে এবারের মতো এতো কম ছিল না।

তিনি বলেন, ৯ লাখ দর্শনার্থীর সবাইকে প্রাপ্ত বয়স্ক ধরা হলেও টিকিটির মূল্য দাঁড়ায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এ হিসাবে এবার আমাদের প্রায় ৪ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। মেট্রোরেলের কাজ চলা এবং মাঝে মেলা বন্ধ থাকার কারণে দর্শনার্থী এতো কম এসেছেন। এবার তিনটি ছুটির দিন মেলা বন্ধ ছিল। অথচ মেলায় মূল দর্শনার্থী আসে ছুটির দিনে। এক ছুটির দিনেই মেলায় ৫ দিনের দর্শনার্থী আসে। তাহলে তিনটি ছুটির দিন বন্ধ থাকলে কী অবস্থা হবে? আপনিই চিন্তা করেন।

মেলায় অংশ নেয়া রং বেরং টেক্সটাইলের বিক্রয়কর্মী মিলন বলেন, আমি পাঁচ বছর ধরে বাণিজ্য মেলায় দায়িত্ব পালন করছি। মেলায় এত কম ক্রেতা-দর্শনার্থী আগে দেখিনি। এবার আমাদের বিক্রি খুব কম হয়েছে। মেলায় অংশ নিয়ে মালিক লোকসানে আছেন। বেতনের টাকা ঠিকমতো পাব কি না, বলতে পারছি না।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যায়ের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী সামিরা মেলায় একটি আইসক্রিম প্রতিষ্ঠানে বিক্রয়কর্মীর দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, আমি তিন বছর ধরে মেলায় এ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, এবারই মেলায় সব থেকে কম ক্রেতা-দর্শনার্থী এসেছেন।

গত বছর মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে ইপিবির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, রফতানি আদেশ পাওয়া গিয়েছিল ২০০ কোটি টাকা। আর দর্শনার্থী হয়েছিল ৫০ লাখ। এবার দর্শনার্থীদের বিষয়ে মেলার ইজারাদারের তথ্য সঠিক ধরলে গত বছরের তুলনায় পাঁচ ভাগের একভাগ দর্শনার্থী এসেছে।

এ বিষয়ে মেলার সদস্য সচিব আব্দুর রউফ বলেন, বৈরি আবহাওয়ার কারণে এবার ক্রেতা-দর্শনার্থী কিছুটা কম হয়েছে। তবে মেলার সময় বাড়ানোর কারণে শেষ দিকে অনেক দর্শনার্থী হয়েছে। শুক্রবার ও শনিবারগুলোতে তো ক্রেতা-দর্শনার্থীদের ব্যাপক ভিড় ছিল। ইজারাদার ৯ লাখ দর্শনার্থীর যে কথা বলেছেন, সেটা তার হিসাব। ঠিক কত দর্শনার্থী হয়েছে, সেই হিসাব আমাদের কাছে নেই, তবে আমাদের আশানুরূপ ক্রেতা-দর্শনার্থী হয়েছে।

এদিকে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বসলেও মাসব্যাপী ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা রাজধানীবাসীদের কাছে মিলন মেলায় পরিণত হয়। কারো কারো কাছে বিনোদনের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠে বাণিজ্য মেলা। আবার কারো কারো আয়ের বা চাকরির উৎস হয়ে দাঁড়ায়। তবে এবার সব বাঁধন ছিড়ে বিদায়ের ঘন্টা বেজে গেছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার। 

মেলা প্রাঙ্গণে একটি প্যাভিলিয়নে খন্ডকালীন চাকরি করা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আকবর বলেন, এক মাসের বেশি সময় ধরে মেলায় আছি। মেলার প্রতি অন্যরকম ভালোবাসা জন্মে গেছে। আজ (বৃহস্পতিবার) মেলার শেষ দিন মনে হতেই মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। মেলা থেকে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। আশা করি ভবিষ্যতে এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি কিছু অর্থও উপার্জন হয়েছে। এ জন্য ভালো লাগছে। তবে মেলার প্রতি যে ভালোবাসা জন্ম নিয়েছে তা কয়েকদিন ভোগাবে মনে হচ্ছে।

আকবরের মতো আরেক বিক্রয়কর্মী তামান্না বলেন, এক মাস ধরে এক জায়গায় থাকলে তার প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা জন্ম নেবে, এটাই স্বাভাবিক। বাণিজ্য মেলার প্রতি আমার মধ্যেও এক ধরনের ভালোবাসা জন্মেছে। কিন্তু কী করার? জীবন গতিশীল, এক জায়গায় থেমে থাকতে পারে না। সব কিছুই মেনে নিতে হবে। এরপরও বলতে হচ্ছে মেলা শেষ কিছুদিন একটু খারাপ লাগবে। অন্যরাও একই সুরে কথা বলেন। 

মেলায় পরিবার নিয়ে আসা কবির আহমেদ বলেন, অনেক দিন ধরে মেলায় আসার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু মেলায় আসার সুযোগ হয়নি। আজ (বৃহস্পতিবার) অফিস থেকে ছুটি নিয়ে মেলায় চলে আসলাম। বাসার জন্য কিছু কেনাকাটা করার ইচ্ছা আছে। তবে মেলায় আসার মূল উদ্দেশ ঘোরাঘুরি।

গতকাল পর্দা নেমেছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার ২৫তম আসরের। শেষদিন অর্থাৎ গতকাল বৃহস্পতিবার (৬ ফেব্রুয়ারি) মেলায় প্রবেশের জন্য রাত পৌনে ৯টা পর্যন্ত টিকিট বিক্রি করেছে গেটের ইজারাদাররা। আর ৯টার সময় প্রবেশ গেট বন্ধ করে দেয়া হয়। মেলার ইজারা পাওয়া প্রতিষ্ঠান মীর ব্রাদার্সের মালিক মীর শহিদুল বলেন, দু’দফা সময় বাড়ানোর পর গতকাল মেলা শেষ হয়েছে। আমার সঙ্গে ডিসি সাহেবের কথা হয়েছে। সেই মোতাবেক রাত পৌনে ৯টা পর্যন্ত আমরা টিকিট বিক্রি করেছি। আর ৯টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা মেলায় প্রবেশ করেছে। ৯টার পর আর কেউ মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে না পারলেও বের হওয়ার সুযোগ ছিল। 

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, মেলা থেকে ক্রেতারা যে সব পণ্য কিনতে পেরেছেন তার মধ্যে অন্যতম দেশীয় বস্ত্র, মেশিনারিজ, কার্পেট, কসমেটিকস অ্যান্ড বিউটি এইডস, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস, পাট ও পাট জাত পণ্য সামগ্রী, চামড়া/আর্টিফিসিয়াল চামড়া ও জুতাসহ চামড়া জাত পণ্য, স্পোর্টস গুডস, স্যানিটারিওয়্যার, খেলনা, স্টেশনারি, ক্রোকারিজ, প্লাস্টিক সামগ্রী, মেলামাইন সামগ্রী, হারবাল ও টয়লেট্রিজ, ঘড়ি, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, ইমিটেশন জুয়েলারি, সিরামিকস, টেবলওয়্যার, ক্যাবল, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ফাস্টফুড, আসবাবপত্র ও হস্তশিল্পজাত পণ্য, উপহার সামগ্রী, কনস্ট্রাকশন সামগ্রী, হোম ডেকর, বেকারি পণ্য, বিদেশি বস্ত্র ইত্যাদি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ