শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

আলোর দূষণে নিভু নিভু জোনাকির প্রাণ

৬ ফেব্রুয়ারি, সিনহুয়া : বিশ্বের সব দেশেই তাদের দেখা যায়, রাতের আঁধারে তারা উড়ে বেড়ায় বিন্দু বিন্দু আলো হয়ে। সেই জোনাকিরা এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, নগরায়ন যেভাবে উন্মুক্ত প্রকৃতি কেড়ে নিচ্ছে, মানুষ যেভাবে নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহার করছে এবং দূষণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে জোনাকির দুই হাজার প্রজাতিই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

আর রাতের আঁধারে আলো জ্বালা এ পতঙ্গের জন্য একটি বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃত্রিম আলো। বিজ্ঞান সাময়িকী বায়োসায়েন্স প্রকাশিত এক গবেষণায় এমন তথ্যই তুলে ধরেছেন গবেষকরা।

ওই গবেষক দলের প্রধান টাফটস ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক সারা লুইস সিএনএনকে বলেন, নগরায়ণের প্রভাবে অনেক প্রাণী প্রজাতিই নিজেদের আবাসস্থল হারাচ্ছে। ফলে তাদের অস্তিত্ব ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

এর মধ্যে বেশ কিছু প্রজাতির জোনাকিও আছে, যাদের জীবনচক্র পুরো করার জন্য আশপাশের পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

যেমন মালয়েশিয়াতে এক প্রজাতির জোনাকি আছে, যারা প্রজনন ঘটনায় ম্যানগ্রোভ গাছগাছালির এলাকায়। কিন্তু পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির বাদাবনগুলো সব পাম তেলের কারখানা আর মাছের খামারে পরিণত হচ্ছে। ওই জোনাকি প্রজাতির টিকে থাকাই দায় হয়ে উঠেছে।

জোনাকির জন্য দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হুমকি হয়ে উঠেছে রাতের বেলায় কৃত্রিম আলো। গত একশ বছরে নগরায়নের সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম আলোর ব্যবহার বেড়েছে গুণাত্মক হারে। আর এত আলোর অত্যাচারে জোনাকির বংশ বিস্তার করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

সমস্যাটা কোথায়? জোনাকির পেটের নিচের অংশে যে আলো জ্বলতে নিভতে দেখা যায়, তার উৎস হল লুসিফারিন নামের এক ধরনের রাসায়নিক উপাদান। জোনাকির শরীরের এনজাইম লুসিফারেজের উপস্থিতিতে ওই লুসিফারিন অক্সিজেন, এটিপি আর ম্যাগনেশিয়াম আয়নের সঙ্গে মিশলেই জোনাকির দেহ থেকে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে।

এ রাসায়নিক প্রক্রিয়াকে বলা হয় বায়োলুমিনেন্স। কতটা আলো কতক্ষণ ধরে জ্বলবে,তা নির্ভর করে কী পরিমাণ অক্সিজেন জোনাকির শরীর সরবরাহ করবে তার ওপর।

এই আলোর সংকেতই হল জোনাকির প্রেমের ভাষা। প্রজাতির পুরুষেরা অপরপক্ষকে এই আলো জ্বেলেই সংকেত দেয়। মেয়রাও তাতে সাড়া দেয় ছন্দবদ্ধ আলোর সংকেতে। কিন্তু এই যোগাযোগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ঘরবাড়ি, সড়কবাতি, বিলবোর্ডের উজ্জ্বল আলো।

আর নগরের আলো আকাশে যে দ্যুতি তৈরি করে তার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত পড়ে। এই দ্যুতি পূর্ণিমার আলোর চেয়েও প্রখর হয়। জোনাকির আলোর সংকেত তাতে হারিয়ে যায়।

অধ্যাপক সারা লুইসের গবেষণা বলছে, রাতের বেলা পৃথিবীর ২৩ শতাংশ জায়গা এই কৃত্রিম আলোয় আলোকিত থাকছে।

টাফটস ইউনিভার্সিটিতে জীববিজ্ঞানে গবেষণায়রত আভালন ওয়েনস সিএনএনকে বলেন, “এই আলোকদূষণ জোনাক পোকার প্রজননে রীতিমত ছন্দপতন ঘটাচ্ছে।” 

সিএনএন লিখছে, আরও একভাবে জোনাকির স্বাভাবিক জীবনচক্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে মানুষ। জাপান, তাইওয়ান, মালয়েশিয়ার মত দেশে রাতের বেলা জোনাক পোকার মিটিমিটি আলোর খেলা দেখার বিষয়টি পর্যটকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। প্রতি বছর দুই লাখ পর্যটক এই জোনাক পর্যটনে অংশ নিচ্ছেন। তাতে জোনাকির জীবন আর স্বাভাবিক থাকছে না। সেসব এলাকায় জোনাকির সংখ্যাতেই এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ