মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

খাদ্য নিরাপত্তা কৃষি বিশ্বায়ন ও সিটি নির্বাচন

ড. মো. নূরুল আমিন : কয়েক বছর আগে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে Forum on Food Securities and Agriculture নামক একটি সংস্থার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানের সুযোগ হয়েছিল। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৬টি দেশের ৬৪টি সংস্থার ১৩০ জন প্রতিনিধি এতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই সম্মেলনে গিয়ে আমি প্রথম জানতে পারি যে, বাংলাদেশের কৃষকরা অভুক্ত থেকে অস্ট্রেলিয়ান পোলট্রি ফিড মার্কেটের জন্য ভুট্টা উৎপাদন করেন। বলাবাহুল্য, এর কয়েক বছর আগে কয়েকটি মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানীর প্রতিনিধিরা কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে ভুট্টার চাষ শুরু করেছিলেন। তৎকালীন কর্র্তৃৃপক্ষের দৃষ্টিতে আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি প্রক্রিয়াকরণ ও প্যাকেজিং শিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে এই কাজটি শুরু করা হয়েছিল। আমার যতদূর মনে পড়ে কৃষির গ্লোবালাইজেশান বা বিশ্বায়নের উপর ফোরামের বেশ কিছু সুপারিশ ছিল যা বাংলাদেশ থেকে যোগদানকারী প্রতিনিধিরা সকলেই সরকারকে অবহিত করেছিলেন। কিন্তু তার আলোকে সরকারীভাবে কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে মনে হয় না। গত দু’বছরে দেশে কৃষক পর্যায়ে ধানের অস্বাভাবিক মূল্য হ্রাস, উৎপাদন উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি এবং চলতি বছরের পিঁয়াজ সংকট ও উভয় ক্ষেত্রে কৃষক ও সাধারণ ভোক্তাদের সংকট নিরসনে সরকারি ব্যর্থতা এরই প্রমাণ বহন করে। কৃষি, কৃষক এবং দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোর স্বার্থকে সামনে রেখে বিশ^ায়নের আলোকে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা ফোরাম যে কয়টি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য এই সম্মেলনে পেশ করেছিল তার কয়েকটি আমি নিচে উল্লেখ করছি :
ক) খাদ্য উৎপাদন ও কৃষির বিশ্বায়নের ফলে বহুজাতিক কর্পোরেশন, বৃহৎ ভূস্বামী এবং বড় বড় আড়তদার, আমদানি-রফতানিকারক, ব্যবসায়ীরাই লাভবান হয়, উৎপাদনকারী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এক্ষেত্রে সম্পৃক্ততা খুবই কম। এই প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপি কোটি কোটি ক্ষুদ্র কৃষকের উপর বিশ্বায়নের প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। কিন্তু তথাপিও তা সম্প্রসারিত হচ্ছে, ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানিগুলো সরকারি, বেসরকারি সকল পর্যায়ে তাদের জাল বিস্তার করে নিচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং তার বৃহত্তম সুহৃদ এপেক এমন একটা উদারনৈতিক একচেটিয়া বাণিজ্য ব্যবস্থা চাপিয়ে দিচ্ছে যা সারা দুনিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের দরজা খুলে দিচ্ছে।
খ) গত শতাব্দির শেষ দশকে এশীয় অঞ্চলের উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সংকট এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো কর্তৃক অনুসৃত রফতানিমুখী কৃষি নীতি অদূরদর্শী ছিল এবং এর ফলে খাদ্য শস্যের জন্য তারা আমদানি নির্ভর হয়ে পড়েছিল। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা উদারীকরণ ও বিশ্বায়নের দোহাই দিয়ে কৃষি খাতে ভর্তুকী হ্রাস ও প্রত্যাহারে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বাধ্য করেছে। এর ফলে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়, আমদানিকৃত উৎপাদন উপকরণ তাদের ক্রয়সীমার বাইরে চলে যায়। ব্যাংক ঋণ ও ধার-কর্জ করে যারা পেশাকে আঁকড়ে ধরে রয়েছেন তারাও আভ্যন্তরীণ বাজারে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহারে ব্যর্থ হওয়ায় উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। ফলাফল খাদ্য সংকট। পক্ষান্তরে উত্তর গোলার্ধের উন্নত দেশগুলো কৃষি খাতে ভর্তুকী দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভ’মিকা পালন করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো সর্বক্ষেত্রে লোকসানের শিকার হচ্ছে।
গ) খাদ্য উৎপাদন স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক না হয়ে ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানী সমূহের ব্যবসায়িক চাহিদা পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে দেশের শস্য বিদেশে যাচ্ছে, অভুক্ত দেশবাসষী তার নাগাল পাচ্ছে না। উৎপাদনকারী কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কৃষি খাতের যাবতীয় মুনাফা বেপারী-ফড়িয়া ও দেশি বিদেশি ব্যবসায়ীদের পকেটে যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ান খামারের জন্য কৃষির বিশ্বায়নের নামে ভুট্টা উৎপাদনের ন্যায় পদক্ষেপ এবং সাম্প্রতিককালে চাল রফতানিকারকদের জন্য সরকারের নগদ ভর্তুকী প্রদানের ঘোষণা কৃষক নয়, ব্যবসায়ীবান্ধব বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। বলাবাহুল্য, বিগত মওসুমের ন্যায় এই মওসুমেও কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য পায়নি। প্রতি মণ ধান তারা ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। এই হিসাবে বাজারে প্রতি মণ চালের মূল্য (মিহি জাতের) সর্বোচ্চ ৭৫০.০০ টাকা হওয়ার কথা হলেও তা বিক্রি হয়েছে এবং হচ্ছে ১৫০০ টাকা থেকে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত। উৎপাদনকারী কৃষক এবং ভোক্তা কেউই এই মুনাফার অংশ পায়নি, ব্যবসায়ীরা তা ভোগ করছে। একই মওসুমে সরকার পণ্য বাজারজাতকরণ বাবত কৃষকদের উপযুক্ত সুবিধা না দিয়ে বর্তমানে চাল রফতানির বিপরীতে ব্যবসায়ীদের যে সুবিধা দেয়ার কথা ঘোষণা করেছেন তাও কৃষকদের স্বার্থের পরিপন্থী। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশের শিল্পায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য কৃষকদের অবস্থা ও অবস্থানকে মজবুত করা অপরিহার্য। এ প্রেক্ষিতে Forum on Food Security and Agriculture কতিপয় সুপারিশ করেছে। সুপারিশগুলো হচ্ছে নিম্নরূপ :
১) উন্নয়নের জন্য শিল্পভিত্তি তৈরির লক্ষ্যে উন্নয়নশীল এশীয় দেশগুলোর উচিত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাদ্য উৎপাদন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই উদ্দেশ্যে তাদের নীতিগত সংস্কারের পথেও অগ্রসর হওয়া দরকার।
২) এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের ভূমি ব্যবস্থার নীতি প্রণয়ন কিংবা পুনর্গঠন করা উচিত। কৃষি, শিল্প ও শহরায়নের জন্য ভূমি চিহ্নিত করে না দিলে সংশ্লিষ্ট দেশসমূহ অদূরভবিষ্যতে উর্বর কৃষি জমির সংকটে পড়বে এবং এর ফলে খাদ্য সংকট তীব্রতর হবে। ফোরাম মনে করে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের নিরাপত্তার জন্য বাস্তবমুখী ভূমি ব্যবহার নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
৩। কৃষিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক পেশায় রূপান্তর করতে হবে যাতে জীবিকার উৎস হিসেবে নতুন প্রজন্ম তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা এবং কৃষি বিপণন পদ্ধতির বিকাশের মাধমে জোতজমা সমূহকে বাণিজ্যিক স্রোতধারার সাথে একত্রিভূত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এজন্য সমাজভিত্তিক উন্নয়নের মডেল অনুসরণ অপরিহার্য যে মডেল জনগণের মেধা, সামর্থ, সম্পদ ব্যবস্থাপনার যোগ্যতা, পরিবেশ ও টেসকই উন্নয়নের নিশ্চয়তা দেয় এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিকাশ ঘটায়।
৪। জিডিপি বা মোট জাতীয় উৎপাদনের ভিত্তিতে নয় বরং জীবনমানের ইনডেক্সের ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিমাপের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ভিত্তিক উন্নয়ন জনকল্যাণের নিশ্চয়তা দেয় না। পক্ষান্তরে জীবনমান ইনডেক্স সমাজকল্যাণ, মৌলিক চাহিদা পূরণ, মানবাধিকার রক্ষা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সামাজিক দায়িত্ব পালন এবং পরিবেশ রক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারে।
এখন অন্য প্রসঙ্গে আসি, গত নবেম্বর থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আমি দক্ষিণ বঙ্গের কয়েকটি জেলাসহ উত্তর বঙ্গের কিছু এলাকা সফর করেছি। সফরকালীন সময়ে প্রায় সব জেলাতেই শীতকালীন ফসলের চাষ ও আমন কাটার ধুম চলছিল। আমন চাষীদের বেশীরভাগই স্বীকার করেছেন যে, তাদের প্রাপ্ত ফলন রেকর্ড পরিমাণ। কিন্তু তারা দাম পাচ্ছেন না। মওসুমের শুরুতে মফস্বল এলাকায় প্রতি ৪০ কেজি ধান ৩৭০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে। কোন কোন এলাকায় পরে এই দাম ৫০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে বলে পত্র-পত্রিকায় রিপোর্ট বেরিয়েছে যা আমি আগে উল্লেখ করেছি। তিন কেজি ধানে দুই কেজি চাল হয় এবং এই রিকভারী রেট অনুযায়ী প্রতি কেজি চালের বাজার মূল্য হওয়া উচিত ১৪ থেকে ১৫ টাকা অথচ বাজারে চাল বিক্রি হচ্ছে ৩২ টাকা থেকে ৫০ টাকার বেশী দরে। ক্রেতারা যে বেশী মূল্য দিচ্ছে তার ফলে উৎপাদনকারীরা কিন্তু লাভবান হচ্ছে না, লাভবান হচ্ছে ব্যবসায়ী ফড়িয়ারা। দেখলাম আমনের ভরা মওসুমে ধান কলের মালিক ও মওজুতদাররাই ৮০ ভাগ ধান কিনে নিচ্ছেন এবং প্রক্রিয়াকরণ করে নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী বাজারে ছাড়ছেন। একই অবস্থা তরিতরকারীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এখন বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে কৃষকদের তরিতরকারী নিয়ে বাজারে আসতে হয় না। বেপারী ফড়িয়ারাই গাড়ী নিয়ে তাদের জমির ধারে চলে যায় এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে তা নিয়ে আসে। পরে পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে চড়া দামে তা বিক্রি করে। এ ক্ষেত্রেও উৎপাদনকারী কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পায় না, বেপারী ফড়িয়ারাই মুনাফা লুটে। কৃষি পণ্যের পঁচনশীলতা, মওসুমে সরবরাহের আধিক্য, দরকষাকষির ব্যাপারে উৎপাদনকারীদের সামর্থের অভাব ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তির পথে বিরাট প্রতিবন্ধক হিসাবে কাজ করে। কৃষকরা যখন উৎপাদন উপকরণ কিনতে যান তখন বেশী মূল্যে তাদের তা ক্রয় করতে হয়। আবার যখন উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে যান তখন তারা দাম পান কম, এটি একটি Vicious Circle বা দুষ্ট চক্র। কৃষকরা এই চক্র থেকে বের হতে পারছেন না। এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে শক্তিশালী কৃষক সংগঠন যা কৃষকদের স্বার্থ আদায়ে শুধু Collective Bargaining Agent হিসাবেই কাজ করবে না বরং প্রাতিষ্ঠানিক সাপোর্ট প্রদান, প্রযুক্তির প্রসার, পুঁজি সরবরাহ ও পণ্য বাজারজাতকরণেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশের গ্রামভিত্তিক কৃষক সমবায় সমিতিসমূহ ও উপজেলা পর্যায়ে  তাদের ফেডারেশন  উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায়সমূহ এই উদ্দেশ্যেই গঠিত হয়েছিল। কিন্তু যোগ্য নেতৃত্ব, দক্ষ জনশক্তি এবং বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন  সরকারসমূহের পরস্পর বিরোধী নীতি এবং প্রয়োজনীয় Patronization-এর অভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সামগ্রিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে এবং নিছক ঋণ দাদনকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বিশেষ করে কৃষির আধুনিকায়নে সমবায়ের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার প্রেক্ষাপটে বিশ্বায়নের কুফল মোকাবেলায় সমবায় সমিতিসমূহকে শক্তিশালীকরণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
কৃষকদের দ্বিতীয় প্রয়োজন হচ্ছে ভাল দামের জন্য তাদের ফসল ধরে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি। এটা করতে গেলে ফসলের মওসুমে গুদামে ফসল রাখার বিপরীতে তাদের বাজার দরের ৮০/৯০ ভাগ অগ্রীম দেয়া অপিরহার্য। বর্তমানে দেশের কিছু কিছু কৃষি পণ্য সংরক্ষণের জন্য হিমাগার রয়েছে। এই হিমাগারগুলোতে ৯০ শতাংশই গোল আলু সংরক্ষণ করা হয়। তরি-তরকারি সংরক্ষণের উপযোগী হিমাগার তৈরি ও সম্প্রসারণ করা হলে সবজি চাষিরা উপকৃত হতে পারেন এবং বাজার চাহিদার ভিত্তিতে বন্টন ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা যেতে পারে। এর ফলে সবজী চাষি এবং সাধারণ ভোক্তা উভয়েই লাভবান হতে পারেন। এতে বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে, পচনশীল হবার কারণ দেখিয়ে কৃষকদের ঠকানো যাবে না, প্রসেসিং ও প্যাকেজিং শিল্প গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষির ওপর বিশ্বায়নের যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে উপরোক্ত ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা হলে তার যৌক্তিক নিরসন ঘটবে বলে আমার বিশ্বাস।
দুই.
ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন শেষ হয়েছে এবং এর ফলাফল অনুযায়ী আওয়ামী লীগ প্রার্থী ব্যারিস্টার তাপস ৪,২৪,৫৯৫ ভোট এবং উত্তরের একই দলের প্রার্থী আতিক ৪,৪৭,২১১ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। দক্ষিণে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী পেয়েছেন ২,৩৬,৫১২ ভোট এবং উত্তরের বিএনপি প্রার্থী পেয়েছেন ২৪,২,৯৪১ ভোট। এই নির্বাচনে কতিপয় অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়েছে। ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে এটাই ছিল বাংলাদেশে প্রথম সামগ্রিক নির্বাচন। এ ধরনের নির্বাচনের সঙ্গে ভোটাররা পরিচিত ছিলেন না। অতীতের নির্বাচন সমূহে ক্ষমতাসীন দলের সীমাহীন কারচুপির আলোকে নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা উঠে যাওয়ায় এই নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল অনেক কম এবং কোথাও কোথাও মসজিদের মাইকে আহ্বান জানিয়েও ভোটারদের কেন্দ্রে আনা যায়নি। সামগ্রিক ভোটার উপস্থিতি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন। আবার কেউ ৫ শতাংশেরও কম বলে উল্লেখ করেছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার স্বয়ং বলেছেন যে এ ধরনের নির্বাচন তিনি দেখতে চাননি। নির্বাচন কেন্দ্রসমূহে ছিল ভেতরে বাইরে আওয়ামী লীগের নৌকার আধিপত্য। বেশির ভাগ কেন্দ্র থেকেই বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার স্বয়ং বলেছেন যে তিনি ভোট কেন্দ্রে বিরোধী দলের এজেন্টদের দেখতে পাননি। ভোট কেন্দ্রের গোপন কক্ষেও নৌকার এজেন্টদের তৎপর থাকতে দেখা গেছে। এমন কী তারাই ভোটারদের হয়ে ভোট দিয়েছেন বলে জানা গেছে। প্রিসাইডিং অফিসার থাকা সত্ত্বেও তারা কীভাবে গোপন কক্ষে ঢুকলেন তা বিস্ময়ের ব্যাপার। এ জন্য তাদের কারুরই বিরুদ্ধে প্রিসাইডিং অফিসাররা কোনো পদক্ষেপ নেননি বা নিয়েছেন বলে জানা যায়নি। আবার নির্বাচন কমিশনকে গোচরিভূত করার পরও তারা কোনো পদক্ষেপ নেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। ভোট কেন্দ্রে সশস্ত্র মহড়ার ছবি তোলায় সাংবাদিকদের রক্তাক্ত করার ঘটনাও এতে ঘটেছে। মোদ্দা কথা ভোটার টার্ন আউটের অস্বাভাবিক নিম্ন হার, বিরোধী দলের প্রার্থীদের ভোট কেন্দ্র থেকে অনানুষ্ঠানিক বহিষ্কার, প্রিসাইডিং অফিসারদের নির্লিপ্ততার সুযোগে প্রভাবশালী প্রার্থীদের এজেন্ট ও সমর্থকদের কেন্দ্র দখল ও ভোটারদের পক্ষে ভোট প্রদান নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রীয়তা প্রভৃতি এই নির্বাচনকে একটি তামাশায় পরিণত করেছে বলে মনে হয়। ইভিএমএে ভোট দিতে গিয়ে অনেক ভোটার ভোট না দিয়ে ফিরে গেছেন। স্বয়ং প্রধান কমিশনার ও ড. কামাল হোসেন বিড়ম্বনায় পড়েছেন। যাদের ভোট দেয়া হয়েছে তাদের পক্ষে এজেন্ট দিয়েছেন। এটা প্রমাণ করে যে এই ব্যবস্থা এ দেশের জন্য অনুকূল নয়। বিএনপি এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে হরতালের ডাক দিয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এই নির্বাচন বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ