সোমবার ০৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

পর্যাপ্ত ভবন ও হোস্টেল নেই : শিক্ষক ও যানবাহন সংকট

খুলনার আযম খান সরকারি কমার্স কলেজ

আব্দুর রাজ্জাক রানা: খুলনার আযম খান সরকারি কমার্স কলেজে নেই পর্যাপ্ত ভবন আর প্রতিষ্ঠার পর থেকে ছাত্রীদের জন্য নির্মিত হয়নি কোন হোস্টেল, যার ক্ষোভ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। পাশাপাশি শিক্ষক ও যানবাহন সংকট তো রয়েছে। তবে কলেজটির উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য রয়েছে বায়োমেট্রিক এ্যাটেন্ডেন্টস সিস্টেম। পাশাপাশি স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন সকালেই অনুষ্ঠিত হয় ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলি। 

দেশের অন্যতম সরকারি কলেজ হওয়ার কারণ হল গত ৬৬ বছর ধরে এখান থেকে শুধুমাত্র ব্যবসায়ী শিক্ষার শিক্ষার্থীরাই উত্তীর্ণ হয়েছে। বর্তমানে কলেজটিতে উচ্চ মাধ্যমিক ব্যবসায়িক শিক্ষা, বিবিএ (পাস), বিবিএ (অনার্স) যথাক্রমে হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং ও মার্কেটিং, এমবিএ ১ম পর্ব ও শেষ পর্ব এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিবিএ ও এমবিএস কোর্সে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। খুলনা সদরের বাবু খান রোডের পাশে ৩.৮৭ একর জমির ওপর বর্তমানে কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। 

কলেজের ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, খুলনা শহরের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও সমাজসেবীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কর্মজীবী যুবকদের উচ্চ শিক্ষা লাভের সুযোগ দানের উদ্দেশ্যে একটি নৈশ কমার্স কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৫৩ সালের ১৪ আগস্ট খুলনা কমার্স কলেজ নামে এই কলেজটির যাত্রা শুরু হয় খুলনা মডেল হাইস্কুল ভবনে। 

তৎকালীন সময়ে নৈশকালীন পাঠদান ব্যবস্থায় ১৯৫৩-৫৪ শিক্ষাবর্ষে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর প্রথমবর্ষে বাণিজ্য শাখায় ছাত্র ভর্তি হয়, যা তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। ১৯৬০ সালের শুরুর দিকে মডেল স্কুলের দক্ষিণ দিকে পুরনো বাড়িসহ ফাঁকা জায়গা গ্রহণ করা হয়। সেই বছরই কলেজটি বর্তমান জায়গায় স্থানান্তরিত হয়। এরপর ১৯৬০-৬১ সেশনে কলেজে বি.কম কোর্স খোলা হয়। ১৯৬১ সালে একাদশ শ্রেণীতে দিবা বিভাগ খোলা হয়। যা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হতে শুরু করে। 

এদিকে একই বছরের শুরুর দিকে তৎকালীন গভর্নর খুলনা কমার্স কলেজে পরিদর্শনে আসলে উত্তর-পূর্ব কোণের বর্তমান ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে ১ লাখ টাকা অনুদান ঘোষণা করেন। ঐ সময়ই কলেজটির নামকরণ করা হয় আযম খান কমার্স কলেজ। ১৯৬৩ সালে সর্বপ্রথম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কমার্সে অনার্স কোর্স চালু হয়। ১৯৭২ সালে এ অঞ্চলের প্রথম হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু হয়। ১৯৭৯ সালের ৭ মে কলেজটি জাতীয়করণ হয়। ২০০৪ সালে মার্কেটিং ও ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু হয়। সর্বশেষ ২০১৩ সালে এই দু’টি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্সও চালু করা হয়। 

কলেজটির প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে ১৯৫৩ সালের ১৪ আগস্ট দায়িত্বভার গ্রহণ করে এম এ হান্নান এবং প্রথম উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন যামিনী কান্ত দাস ১৯৫৬ সালের ১৫ আগস্টে। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৩৫ জন অধ্যক্ষ এবং ১৮ জন উপাধ্যক্ষ কলেজটিকে আলোকিত করতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমানে কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন প্রফেসর কালিপদ মজুমদার এবং উপাধ্যক্ষ প্রফেসর সেলিনা বুলবুল।

একাধিক সূত্রে জানা যায়, কলেজে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত হলেও সেই তুলনায় ভবন, শিক্ষক, হলসহ রয়েছে নানা সমস্যা। বর্তমানে মাত্র ৪৩ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। নিয়মিত কর্মচারী ১০ জন এবং অনিয়মিত আছে ২৭ জন। ১টি প্রশাসনিক ভবন, ৪টি একাডেমিক ভবন, ১টি কেন্দ্রীয় কারাগার, ৪টি বিভাগীয় গ্রন্থাগার, ১টি কম্পিউটার ল্যাব, ১টি বাস, ১টি মাইক্রোবাস, ২টি মসজিদ, ১টি শহিদ মিনার এবং ১টি মাত্র ছাত্র হোস্টেল (৯৬ আসন) রয়েছে। সহ-শিক্ষামূলক কার্যক্রম রয়েছে বিএনসিসি, রেড ক্রিসেন্ট, রোভার স্কাউট, রেঞ্জার ইউনিট, ডিবেটিং ক্লাব এবং সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ। কলেজটিতে ১৯৬৪-৬৫ সালে ছাত্র সংসদের কার্যক্রম শুরু হলেও ২০০৩-০৪ সালের পর কলেজটিতে আর ছাত্র সংসদের আর কোন কার্যক্রম দেখা যায়নি। দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে সুনামের সাথে কাজ করছে কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীরা। জায়গা করে নিয়েছেন মন্ত্রী, সচিব, শিক্ষক, পুলিশ, রাজনীতিবিদসহ অনেক প্রতিভাবান স্থানে।

কলেজের এমবি-এর শিক্ষার্থী মানজারুল ইসলাম বলেন, কলেজটিতে শিক্ষক, ভবন ও পরিবহন সংকট রয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। কলেজেন ১০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য যানবাহন রয়েছে মাত্র একটি। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসা উচিত। 

অপর ছাত্রী নুসরাত জাহান বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কলেজটিতে শুধুমাত্র ব্যবসায়িক শিক্ষার ওপর উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করতে আসে। কারণ কলেজটি শুধুমাত্র ব্যবসায়িক শিক্ষার ফলাফলে জন্য সারাদেশেই পরিচিত। তবে কলেজটিতে কোন ছাত্রী হোস্টেল নেই। যা খুবই কষ্টের। কারণ খুলনা শহরের মেসের ভাড়া খুবই বেশি। একারণে ছাত্রীদের জন্য একটি হোস্টেল খুবই দরকার।

কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর কালিপদ মজুমদার বলেন, কলেজটি ব্যবসায়ীক শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রী লাভের জন্য সারা দেশের মধ্যে স্বনামধন্য। কলেজে ভবন ও শিক্ষক সংকট থাকলে এটি কর্তৃপক্ষ অবগত আছে। খুব দ্রুত সমাধান হবে। কলেজে সব থেকে বেশি প্রয়োজন একটি ছাত্রী হোস্টেল। কারণ মেয়েদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় তারা খুবই সমস্যায় পড়ে। পাশাপাশি কয়েকটি বাসও দরকার। 

তিনি বলেন, কলেজে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিয়মিত করতে প্রতিদিন ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলী ও ক্লাসরুমে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। যা সচরাচর অন্যান্য কলেজগুলোতে থাকে না। ছাত্র রাজনীতির বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে। তবে পরিস্থিতি ভাল হলে এটা পুনরায় ভেবে দেখা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ