রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

ঐতিহাসিক শিক্ষাদিবস শিক্ষানীতি ও বাস্তবতা

অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান : আজ থেকে ৫৭ বছর পূর্বে অর্থাৎ ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর তল্পি বাহক সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের চাপিয়ে দেয়া গণবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল “শিক্ষানীতি” বাতিল করে সকলের জন্য শিক্ষার অধিকার ও সুযোগ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি একটি গণমুখী বিজ্ঞানমনস্ক গণতান্ত্রিক আধুনিক এবং অসাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থার দাবীতে তৎকালীন জাগ্রত ছাত্র সমাজ তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলে। সে সময় ফেব্রুয়ারীতে শুরু হয় সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন। এক পর্যায়ে আইয়ুব খানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আগষ্ট মাস থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট সহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এদেশের ছাত্র সমাজ ১৭ সেপ্টেম্বরের প্রস্তুতি নেয়। এ দাবির সমর্থনে সাধারন জনগণ ও ব্যাপক সমর্থন ও সহযোগীতার হাত বাড়ায়। শুধু তাই নয় এই আন্দোলনের ধাক্কা সম্প্রসারিত হয় খোদ পশ্চিম পাকিস্তানের প্রগতিশীল ছাত্র সমাজ ও জাগ্রত জনতার মধ্যে।
১৯৫৯ সালে প্রেসিডেন্ট ও সামরিক শাসক আইয়ুব খান পাকিস্তানের তৎকালীন শিক্ষা সচিব এস এম শরিফকে চেয়ারম্যান করে ১১ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করে। যে কমিশনটি মূলত: পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিলের কমিশন। এ গণবিরোধী শিক্ষা কমিশন ১৯৬২ সালের মাঝামাঝিতে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এই রিপোর্টের আলোকে সুপারিশ সহ তা বাস্তবায়নের জোড়ালো উদ্যোগ গ্রহণ করে আইয়ুব খানের সামরিক সরকার।
তথাকথিত এ শিক্ষানীতিতে যে সব সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছিল তার মধ্যে শিক্ষাকে ব্যয়বহুল পণ্যের মতো বৈষম্য সৃষ্টি করে শুধুই উচ্চ বিত্তবানদের সন্তানদের স্বার্থে উচ্চ শিক্ষাকে সীমিত পরিসরে আবদ্ধ রাখা। ফলে সাধারণ নিম্নশ্রেণীর অর্থাৎ গরীব মেহনতি মানুষের সন্তানদের জন্য উচ্চ শিক্ষায় সুযোগ সুকৌশলে সংকোচিত করে ফেলার ষড়যন্ত্র শুরু করে। অবৈতনিক শিক্ষার ধারাকে অবাস্তব কল্পনা বলে উল্লেখ করা হয়। সেই সাথে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত ইংরেজী শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে উর্দুকে জনগণের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ডিগ্রী কোর্সকে দু’বছরের স্থলে তিন বছর মেয়াদি করা। মূলত: এসব চাপানো নীতি সাম্প্রদায়িকতার কুটকৌশল দীর্ঘস্থায়ী করণের অপচেষ্টা মাত্র। যে কারণে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দানা বাঁধতে থাকে পূর্ব পাকিস্তানী জনতার অন্তরে অন্তরে। বিশেষ করে ডিগ্রী কোর্সকে তিন বছর মেয়াদী করার পর এদেশের ছাত্র-সমাজ সচেতন বুদ্ধিজীবী মহল এবং মিডিয়ার সাথে কিংবা সংস্কৃতিক ব্যক্তিদের মহলে এর প্রতিক্রিয়া দারুণভাবে দানা বাঁধতে থাকে। তারা সরকারের এ আচরণে এর অপশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ছাত্র-জনতা সমন্বিতভাবে সর্বজনীন গণমুখী শিক্ষার দাবিতে আন্দোলনে মোড় নেয়। এ অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৭ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত গণআন্দোলনে রূপ নিলে সামরিক সরকারের গৃহীত শিক্ষানীতি স্থগিত করতে বাধ্য হয় আইয়ুব সরকার। অবশ্য এর আগের বছর অর্থাৎ ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-সংগঠন ও সকল রাজনৈতিক দলের কর্মকান্ড নিষিদ্ধ করার কারণে এবং এ অঞ্চলের সব ধরনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের তৎপরতা বেআইনী ঘোষণা করে সকল ধরণের মৌলিক মানবাধিকারের উৎসগুলো থেকে বঞ্চিত করা হয় পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের।
নানা রকমের বৈষম্য ও চরম দমননীতি এবং অত:পর বিমাতাসূলভ আচরণ দিনে দিনে তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। এরই মাঝে ষাটের দশকে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ গোপন সমঝোতা ও যোগাযোগ রাখার মাধ্যমে তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা জোড়দার করতে থাকে। এক পর্যায়ে এই দু’সংগঠন সংগঠিত হয়ে সাধারণ ছাত্রদের সমন্বয়ে তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে তোলে। তারা জনগণের চেতনা বাড়ানোর জন্য এবং শাসক গোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক কর্মকান্ডকে প্রতিহত করার জন্য ব্যাপক হারে গনসচেতনতা বাড়াতে থাকে। অপরদিকে শাসকগোষ্ঠী ও তাদের শাসন-শোষণের মাত্রা বাড়িয়ে বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা সাহিত্য-সংস্কৃতি কৃষ্টি সভ্যতাকে ধ্বংস করার সুদুর প্রসারী পরিকল্পনা চালানোর অপচেষ্টা অব্যাহত রাখে।
অপরদিকে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সংগঠন ও বুদ্ধিজীবি মহল ১৯৬১ সালে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী উৎযাপন উপলক্ষ্যে কৌশলে সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র সমাজকে এক প্লাটফর্মে আনার চেষ্টা করে। এতে বাংলাভাষা, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চাকে বেগবান করন সহ রবীন্দ্রনাথের চিন্তা চেতনাকে তরান্বিত করনে এবং জাতীয় পর্যায়ে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য এক অদ্ভুত কৌশল অবলম্বন করা হয়। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ -এর জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে যে সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ হয়েছিল তারই ফলপ্রসু গণআন্দোলনের বহি:প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৬২ সালে সামরিক শাসন বিরোধী ও শিক্ষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
তৎকালীন সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন, জাসদ, বিভিন্ন হল ও কলেজ ছাত্র সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ছাত্র সমাজের মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়ে ছাত্র আন্দোলনে বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ ও সেগুলো বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে ওঠে। এর ফলে পাকিস্তানী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে নানা কর্মসূচীর সমর্থনে সাধারণ ছাত্রদের সমর্থন ও অংশগ্রহণ স্বত:স্ফূর্তভাবে বাড়তে থাকে। গণতান্ত্রিক অধিকার, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সহ গণবিরোধী শিক্ষানীতি বাতিল এবং গণমুখী শিক্ষানীতি প্রতিষ্ঠার দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভে পূর্ব পাকিস্তান উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে ১৭ সেপ্টেম্বর সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ সারাদেশে হরতাল ঘোষণা করে। সামরিক শাসন গণবিরোধী শিক্ষানীতি এবং নানা ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক নীতি ও কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণসচেতনতা বৃদ্ধিই এ হরতালের মূল উদ্দেশ্য ছিল। ছাত্র-জনতার এই হরতালে অভূতপূর্ব সমর্থন এবং গণজোয়ারের কারণে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের ভিত কেঁপে ওঠে। গণবিরোধী শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে এবং একটি গণমুখী সর্বজনীন আধুনিক প্রগতিশীল শিক্ষানীতির দাবিতে সংগঠিত হওয়ার এই হরতাল দিবস কে ছাত্র-জনতার অবদানকে চির স্মরণীয় করে রাখার জন্য ১৭ সেপ্টেম্বরকে শিক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। যেহেতু এই দিবসেই ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষিত হয়। যা প্রতিহত করার জন্য তৎকালীন সামরিক সরকার চরম নির্যাতনের পথ অবলম্বন করে। বাধা যত বেশী আসতে থাকে ততই ঢাকা সহ দেশের সকল শহর নগরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজপথে চলতে থাকে ব্যাপক বিক্ষোভ মিছিল। লাঠিচার্জ, টিয়ারসেলসহ নানা কৌশল অবলম্বন করে আন্দোলন দমন করতে ব্যর্থ হয় আইনশৃংখলা বাহিনী। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কার্জন হল থেকে ছাত্রদের একটি বিক্ষোভ মিছিল আব্দুল গণি সড়কে অগ্রসর হলে পুলিশ পেছন দিক থেকে অতর্কিতভাবে মিছিলে গুলীবর্ষণ করতে থাকে। সেদিন পুলিশের ছোড়া গুলীতে বাবুল, মোস্তফা ও ওয়ালিউল্লাহ শহীদ হন। পুলিশ ও ইপিআরের নির্যাতনে এবং গুলিতে সারাদেশ রণক্ষেত্রে পরিণত হয় এবং বহু ছাত্র-জনতা আহত হন। দেশব্যাপী চলে নির্যাতন, গ্রেফতার। কিন্তু আন্দোলন আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এদেশের ছাত্র ও যুব সমাজ, সেই সাথে সাধারণ সচেতন মানুষ ছাত্র সমাজের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করে তাদের শক্তিকে বৃদ্ধি করতে থাকে।
সারা দেশে এই অপতৎপরতা নির্যাতন ও দমন নীতির প্রতিবাদে তিনদিনব্যাপী শোকের কর্মসূচী ঘোষণা করা হয় এবং আন্দোলনের ধারা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন দমন করতে ব্যর্থ হয়ে আইয়ুব খানের সামরিক সরকার তথাকথিত “শিক্ষানীতি” স্থগিত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
শিক্ষার জন্য সংগ্রাম, ত্যাগ জীবনদান, বিজয়ের গৌরবের মূর্ত প্রতীক এ ঐতিহাসিক শিক্ষা দিবসের এবার ৫৭তম বার্ষিকী। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের প্রতীক ১৭ সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক “শিক্ষা দিবস” হিসেবে অর্ধশত বছরের বেশী সময় ধরে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রতিপালিত হয়ে আসছে। এরপর আইয়ুব খান সরকার ও তার শাসকগোষ্ঠী ১৯৬৪ সালে বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে আরেকটি কমিশন গঠন করে নতুন মোড়কে তাদের পরিকল্পিত শিক্ষানীতি ও ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। তারা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে বিভ্রান্তি করার উদ্দেশ্যে এই কমিশনের নাম দেয় ‘Commission on students problem and welface’ বা “ছাত্র-সমস্যা ও কল্যাণ কমিশন”। এ বছরের মাঝামাঝি কমিশন দ্রুত রিপোর্ট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের চেষ্টা শুরু করে তা অবশেষে পুনরায় ব্যর্থতায় রুপ নেয়। এরপরও পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তাদের এ বিষয়ে তৎপরতা অব্যাহত রাখে। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে আইয়ুব খানের পতনের পর রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। তিনিও একইভাবে সামরিক শাসন জারি রাখেন। ক্ষমতায় গিয়েই সীমিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা দিয়ে আবারো সেই শিক্ষানীতি প্রনয়নে তৎপর হন। ক্ষমতা গ্রহণের চার মাসের মধ্যে এয়ার মার্শাল নূর খানের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠনে দ্রুত একটি শিক্ষানীতি প্রনয়ন করে সেটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তারা মনে করেছিল এই শিক্ষানীতি বাস্তাবায়ন হলে তাদের স্বার্থ রক্ষা হবে এবং নতুন প্রজন্মের ওপর তাদের চিন্তা চেতনা চাপিয়ে দিয়ে তাদের উদ্দেশ্য ও স্বার্থ হাসিল করা সহজ হবে।
কিন্তু এবারো পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ও যুব সমাজ এ শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে। তৎকালীন ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদ ঘোষিত ১১ দফার ভিত্তিতেই উনসত্তরের গণ-অভুত্থ্যন এবং অত:পর ১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ ভূমিকা এবং অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের কালজয়ী ইতিহাসের রচনা করে খন্ডিত চাঁদ তারকার পরিবর্তে লাল সবুজের পতাকা সহ বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আবির্ভাব ঘটে। স্বাধীনতার ৩১ বছর পর ২০১০ সালে প্রণীত হয় “জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০”। জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে এ শিক্ষানীতি অনুমোদিত হয়। ২০১৬ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন- এই শিক্ষানীতিতে ছাত্র-সমাজ ও জাতির ৫৪ বছরের নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রামের প্রতিফলন ঘটেছে। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় ১৯৭১। সুতরাং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার একটি মৌলিক দলিল। তিনি আরও বলেন- বর্তমান, নতুন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রস্তুত করে গড়ে তুলতে লক্ষ্য ও সুনির্দিষ্ট করণীয় ইতোমধ্যে নির্ধারিত হয়েছে। সুদুর প্রসারী লক্ষ্য সামনে রেখে অনেক করণীয় সম্পন্ন হয়েছে, এখন জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন- বর্তমান যুগে সারা বিশ্ব একাকার, সুতরাং আমাদের নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে আমাদের নির্ধারিত লক্ষ্যে। ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য নাগরিক হিসেবে ও গড়ে  তুলতে হবে। আর একথাও মনে রাখতে হবে- আমাদের নতুন প্রজন্মকে জগতের সকল দেশের নতুন প্রজন্মের সাথে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজের স্থান করে নিতে হবে, দেশ গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ব সমাজে নিজের দেশের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনের রাখতে হবে, আমাদের নতুন প্রজন্মকে শুধু জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি দিয়ে মাথা ভর্তি করে দিলেই হবেনা। নিষ্ঠা, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা, শ্রদ্ধাশীল এবং নৈতিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত পরিপূর্ণ মানুষ হতে হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে শিক্ষানীতি ২০১০ এর বিষয়গুলো কতটুকু গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা জানি দেহ মন ও আত্মার উন্নতি সাধন করাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি বিষয় ভিত্তিক শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, চিকিৎসা বিষয়ক শিক্ষা, প্রকৌশলী শিক্ষা, প্রযুক্তি শিক্ষা, কৃষি শিক্ষা, ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য সাংস্কৃতি, পারমাণবিক শিক্ষাসহ সমরাস্ত্র শিক্ষা, চারু ও কারুশিল্প শিক্ষা, জীবন ও প্রকৃতি বিষয়ক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা একটি চলমান শিক্ষা প্রক্রিয়া। যা নতুন করে ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে  হয়না। সরকার এসব শিক্ষানীতির সম্প্রসারণে বদ্ধ পরিকর। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে এই সব শিক্ষালাভকারী ব্যক্তির সংখ্যাও কম নয় তদুপরি কেন এত অমানবিকতা? কেন এত অবক্ষয়? কেন এত অস্থিরতা? কেন এত অশান্তি ও নিরাপত্তাহীনতা? কেন এত দুর্নীতি, কেন এত অসভ্যতা ও কেন এত বেহায়াপনা? এসব কি অশিক্ষিতরা করে না শিক্ষিত গোষ্ঠীর দ্বারাই সংঘটিত হয়। এত নীতি, এত শাসন, এত কিছুর পরও কেন এত অশান্তি? পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কেন এত মানসিক-মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়? নৈতিকতার পদস্খলন? কেন এত বেকারত্ম? কেন এত দারিদ্রতা? দুর্যোগ দুর্ভোগ? এসব প্রশ্নের উত্তরে আপনি কি বলবেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে দৈনন্দিন যত লোমহর্ষক, হৃদয় বিদারক, অনাকাংখিত ঘটনা ঘটছে এর জন্য দায়ী কারা শিক্ষিতরা না অশিক্ষিতরা? কাজে কাজেই- সত্যিকারের আলোকিত মানুষের মতো মানুষ হতে হলে যে শিক্ষানীতি প্রয়োজন তা পাশ কাটিয়ে যতই শিক্ষানীতি প্রনীত হোকনা কেন তা হবে বুমেরাং। আর জনসংখ্যা, মানচিত্রের ব্যাসার্ধ, অর্থনৈতিক অচলবস্থা বিবেচনা করে বিশে^র বিভিন্ন দেশের চাহিদা মোতাবেক ভাষাজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ, আদর্শ নৈতিকতা সম্পন্ন এবং ধর্মীয় অনুভতি তথা স্রষ্টার নিকট পৃথিবীর জীবনের কর্মযজ্ঞের ভালোমন্দের জবাবদিহিতামূলক চিন্তা চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন সৎ ও যোগ্য মানব সম্পদ তৈরিকরণে রাষ্ট্রযন্ত্রের যথাযথ ভূমিকা অনস্বীকার্য। এ ধরনের আলোকিত মানুষের মধ্যে কর্মক্ষম ও পেশাগত দক্ষতাসম্পন্ন জনসম্পদ রপ্তানী ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় ব্যতীত কাগুজে কলমে শিক্ষানীতির কোন সুফল আসবে বলে মনে হয়না। কারণ কথায় আছে গর্জনের চেয়ে অর্জন বড়। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় শিক্ষানীতির বিষয়ে উপরোক্ত বিষয়গুলো যথাযথভাবে গুরুত্ব দিয়ে এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যে বাস্তবতার নিরিখে বিচার বিশ্লেষণ করে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন অতীব জরুরী বিষয়।
লেখক : জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ