রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

মতিঝিল আইডিয়ালের ওড়না প্রসঙ্গ

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল একটি ঐতিহ্যবাহী ও ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলে আমরা জানি। দেশবাসীও জানেন। এখানে লেখাপড়া ভালো হয় এবং এর ঐতিহ্য ও সুনামের জন্য এ প্রতিষ্ঠানে অভিভাবকরা তাঁদের প্রিয় সন্তানদের ভর্তি করান।
সম্প্রতি অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন, স্কুলটির পরিচালনা কমিটি ছাত্রীদের ওড়না পরা নিষিদ্ধ করেছে। এর পেছনে নাকি কমিটিতে থাকা নাস্তিক সদস্যদের অবদান রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া অভিভাবকদের নালিশটি হুবহু তুলে ধরা হলো :
“আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ মতিঝিলের বনশ্রী ও মুগদা শাখায় মেয়েদের ওড়না পরিধান নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আদর্শ পরিবেশ ও ভালো ফলাফলের কারণে ঢাকার শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি স্কুলের মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠে মতিঝিল এবং বনশ্রী আইডিয়াল স্কুল। সম্প্রতি গভর্নিংবডির কতিপয় নাস্তিক সদস্য ও চাটুকার শিক্ষকের ষড়যন্ত্রে ঐতিহ্য হারাচ্ছে স্কুলটি। এতোদিন স্কুলে মেয়েদের বড় ফ্রকের মতো গোল ঘের দেয়া জামা, সালোয়ার ও হিজাব বা ওড়না এবং ছেলেদের শার্ট-প্যান্টের সঙ্গে সাদা টুপি ছিল ঐতিহ্যবাহী ইউনিফর্ম।
কিন্তু ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ছেলেদের টুপি না পরলেও চলবে। আর মেয়েদের দুপাশে ফাঁড়া কামিজ ও সাদা ক্রসবেল্ট পরতে হবে। কোনও মেয়ে ওড়না পরতে পারবে না। অথচ নোটিশে লেখা ছিল, ওড়না ঐচ্ছিক। কিন্ত এখন মেয়েদের ওড়না পরে স্কুলে ঢুকতে দিচ্ছে না গার্ডরা। এমনকি মেয়েরা স্কুলগেট থেকে ব্যাগে করে ওড়না নিয়ে স্কুলে ঢোকার পর ক্লাশে আবার ওড়না পরলে শারীরিক শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক প্রতি ক্লাশে গিয়ে মেয়েদের ওড়না পরার কারণে ধমক দিচ্ছেন।
গত ৭ জানুয়ারি মেয়েদের ওড়না ছাড়া মাঠে নিয়ে প্যারেড করানো হয়েছে এবং শিক্ষকরা সেই ছবি ফেসবুকে আপলোডও করেছেন। শুধু তাই নয়, নতুন নিয়মে আইডি কার্ডের জন্য ওড়না ছাড়া ছবি তুলতে বাধ্য করা হয়েছে।”
অভিযোগকারী অভিভাবক তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন, “একজন ছেলে টুপি না পরলে কোনও সমস্যা হয় না। কিন্তু একটি সাবালিকা মুসলিম মেয়েকে ওড়না পরতে বাধা দেয়া কতই না বড় ধরনের অসভ্যতা। ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণির ছাত্রীরা তাদের পুরুষ শিক্ষকের সামনে ওড়না ছাড়া কীভাবে ক্লাশ করবে? এটা কোনও মুসলিমদেশের সভ্য সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। আমরা বনশ্রী শাখার প্রধানশিক্ষকসহ অন্য শিক্ষকদের কাছে প্রতিবাদ করেছি। তাঁরা বলেছেন, ‘এটা গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত। আমাদের কিছু করবার নেই।’
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য ধ্বংস ও ইসলামের নীতিবিরোধী কার্যকলাপের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমি সকল গার্ডিয়ানসহ স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। মুসলমানদের অনুরোধ করছি, যার যার অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করবার জন্য। নয়তো এভাবে চলতে থাকলে, একদিন আমরাও মুসলমানিত্ব হারাবো এবং আমাদের সন্তানরা নাস্তিকের অনুসারী হয়ে বড় হবে।”
 অভিযোগকারী তাঁর স্ট্যাটাসটি শেয়ার করে সবাইকে জানিয়ে দেবার অনুরোধ করেছেন। অনেকে তা করেছেনও। ফলে দেশের অনেক স্থানেই আইডিয়াল স্কুলের ছাত্রীদের নতুন ড্রেসকোডের প্রতিবাদ করে সভাসমাবেশ হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ শাহান আরা বলেছেন, মেয়েদের ওড়না বা হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়নি। ফেসবুকে মিথ্যা গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে তিনি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন।
এদেশের ৯০ শতাংশ নাগরিক মুসলিম। এদের সবাই পরিপূর্ণভাবে ইসলামের অনুসারী নন। কেউ কেউ নামেমাত্র মুসলিম। বাপ-দাদা মুসলিম বলে তাঁরাও তাই। ইসলাম সম্পর্কে যেমন তাঁদের স্পষ্ট ধারণা নেই, তেমনই ইসলামের ফরজ-ওয়াজিব কি তাও তাঁরা ওয়াকিবহাল নন। এদের বলে ‘শোনাউল্লাহ মুসলমান’। দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের মধ্যে এমন মুসলিমই বেশি। এছাড়া অনেকের বাপ-দাদার দেয়া নামটা আরবি ভাষায় হলেও কাজেকর্মে পুরো বিপরীত। এমনকি অনেকে অমুসলিমের চাইতেও ইসলামের দুশমন। এরাই ইসলামের জন্য ভয়াবহ। এদের জন্যই মুসলিমদের বিপদে পড়তে হয় বেশি। ইসলামী তাহজিব-তামুদ্দুন কীভাবে এদেশ থেকে নিশ্চিহ্ন করা যায় তা নিয়ে এরা খুব ব্যতিব্যস্ত।
এদেশে মুসলিম নাগরিকদের সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ হলেও তাঁরা নানাভাবে চাপের মুখে। বিশেষত তাঁরা যাতে মুসলিমপরিচিতি ধীরে ধীরে বিস্মৃত হয়ে যান এবং বিশেষ একটি জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতির ধারক-বাহকে পরিবর্তিত হন সেচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, এদেশের নাগরিকরা সবাই মিলেমিশে থাকতে পছন্দ করলেও মুসলিমদের আচরণ-অভ্যাসে স্বাতন্ত্র্য বিদ্যমান। বিশেষত প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারীদের পর্দাপুশিদার ভিন্নতা থাকতেই হয়। অন্যধর্মের অনুসারী নারীরা যেমন খোলামেলা চলাফেরা করেন, তেমন মুসলিম নারীদের সুযোগ নেই। তাঁদের পোশাকআশাকে ইসলামের বিধিবিধান মেনে চলতে হয়। তবে যারা মুসলিম হয়েও ইসলাম পছন্দ করেন না, তাঁদের কথা ভিন্ন।
আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের মেয়েদের ওড়না বা হিজাব নিষিদ্ধ প্রসঙ্গ নিয়ে এক অভিভাবকের পোস্টটি ভাইরাল হওয়ায় যেমন অন্য অভিভাবকরাসহ অনেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, তেমনই প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ শাহান আরা এ অভিযোগকে মিথ্যে প্রচারণা বলে দাবি করেছেন।
তবে অভিযোগকারীর স্ট্যাটাসের প্রতিষ্ঠানটির ছাত্রীদের যেসব ছবি দেখা গেছে, সেগুলোতে মেয়েদের মাথায় ওড়না বা হিজাব দেখা যায়নি। আমরা মনে করি, অধ্যক্ষের কথাই ঠিক। তবে মেয়েদের হিজাব বা ওড়না প্রসঙ্গে পরিচালনা পরিষদে কিছু একটা সিদ্ধান্ত হয়েছিল,  যা প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্যের পরিপন্থি। বিধায় অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
শুধু আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজেই নয়। ঢাকাসহ সারাদেশের আরও কয়েকটি স্কুলে ছাত্রীদের ওড়না বা হিজাব পরা নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদের কেউ কেউ এবং কোনও কোনও শিক্ষক মেয়েদের ওড়না বা হিজাব নিয়ে নানারকম ব্যঙ্গবিদ্রুপসহ  প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। বিশেষত প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ছাত্রীদের শরিয়া মোতাবেক হিজাব দেখলে তাঁদের মাথা নষ্ট হবার উপক্রম হয়। তাই তাঁরা মুসলিম ছাত্রীদের জন্য ফরজ হিজাব নিয়ে নানারকম টানাহেঁচড়া করেন। কোথাও কোথাও হিজাব পরুয়া মেয়েদের হেনস্তা ও নির্যাতন করবার দুঃসাহস পর্যন্ত করে থাকেন। ফলে কোনও কোনও নারী শিক্ষার্থীর পড়ালেখা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। তাই এব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক হবার জন্য আমরা আহ্বান জানাই।
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের মুসলিম ছাত্রীদের ঐতিহ্যবাহী ড্রেসকোড পরিবর্তনের জন্য কেউ যদি সত্যি সত্যি উদ্দেশ্যমূলক তৎপরতায় লিপ্ত হোন এবং এজন্য প্রতিষ্ঠানটিতে শৃঙ্খলা বিঘ্নিত এবং শিক্ষার পরিবেশ ও সোনালী ঐতিহ্য বিনষ্ট হয় তাহলে অভিভাবকরা কাউকে ছেড়ে দেবেন বলে মনে হয় না।
আমরা মনে করি মেয়েদের শালীন পোশাক থাকাই প্রত্যাশিত। আর এমন পোশাক পড়ালেখারও অনুকূল। আলোচ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পরিষদ ও শিক্ষকদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং এর ঐতিহ্য বহাল থাকবে। আর যারা এনিয়ে অযথা বাড়াবাড়ি করেছেন বা এখনও হঠকারিতা করতে চান তাঁদের সংযত হওয়া উচিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ