মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

অকেজো যন্ত্রপাতির কারণে খুলনার সরকারি হাসপাতালের রোগীরা সেবা বঞ্চিত

 

খুলনা অফিস : ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দু’টি এক্স-রে মেশিন বিকল থাকলেও একটি সম্প্রতি চালু হয়েছে। এক্স-রে টেকনিশিয়ান না থাকলেও স্থানীয়ভাবে এক কর্মচারীকে শিখিয়ে নিয়ে এক্স-রে করা হচ্ছে বলে জানালেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন। জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে অন্য সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক্স-রে মেশিনও বিকল। কোন কোন হাসপাতালে নেই এক্স-রে টেকনিশিয়ানও। এক্স-রে’র পাশাপাশি অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতিও বিকল রয়েছে অধিকাংশ হাসপাতালে। এতে সরকারি হাসপাতালের সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তৃণমূলের রোগীরা। 

সারাদেশে সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি মেরামতকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইলেকট্রো ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ এন্ড ট্রেনিং সেন্টারের (নিমিউ এন্ড টিসি) প্রতিনিধি মীর ইমান উদ্দিন স্বাক্ষরিত ২০১৭ সালের ২৪ মে’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ফুলতলা উপজেলা হাসপাতালের এক্স-রে মেশিনটি ২০০৪ সালে স্থাপনা করা হয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকবার মেরামত করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৭/৮ বছর যাবৎ বন্ধ থাকায় অনেক বোর্ড ত্রুটিপূর্ণ। তাছাড়া এর খুচরা যন্ত্রাংশ বর্তমানে বাজারে সরবরাহকারী কোম্পানীর কাছে নেই। তাই মেশিনটি মেরামত করা অলাভজনক বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

কিন্তু দু’বছর পর এসে সম্প্রতি মেশিনটি সচল করেছেন বর্তমান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা। এমনকি হাসপাতালে কোন এক্স-রে টেকনিশিয়ান না থাকলেও আউটসোর্সিং কর্মচারীদের কাজ শিখিয়ে রোগীদের সেবা দেয়া হচ্ছে। ওই হাসপাতালের একটি এ্যাম্বুলেন্স, একটি ইসিজি মেশিন, একটি এনেসথেসিয়া মেশিন, তিনটি মাইক্রোস্কোপ মেশিন, দু’টি ডেন্টাল চেয়ার, একটি ওটি লাইট, দু’টি জেনারেটর এবং একটি লেবার টেবিল অচল রয়েছে বলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও প:প: কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত এক পত্রে দেখা যায়। তবে অন্যান্য যেসব যন্ত্রপাতি চালু রয়েছে সেগুলো দিয়ে সেখানে দৈনন্দিন রুটিন পরীক্ষাগুলো করা গেলেও হাসপাতালের একজন আলোচিত চিকিৎসক ফুলতলার নির্দিষ্ট একটি প্রাইভেট ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের নাম উল্লেখ করে সেখান থেকেই পরীক্ষাগুলো করিয়ে আনতে বলায় রোগীরা বাধ্য হয়ে সেখানে যান। এর ফলে সরকারি সেবা বঞ্চিত হচ্ছে রোগীরা।

সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য ও প:প: কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ফুলতলা ছাড়া জেলার বাকী আটটি উপজেলায় হাসপাতালের এক্স-মেশিন বিকল। ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও প:প: কর্মকর্তা ডা. শেখ সুফিয়ান রুস্তুম বলেন, ওই হাসপাতালের এক্স-রে টেকনিশিয়ান যেমন নেই তেমনি এক্স-রে মেশিনটিও বিকল হয়ে আছে বিগত পাঁচ বছর ধরে।

বটিয়াঘাটা উপজেলা হাসপাতালের ডেন্টাল এক্সরে, এ্যানেসথিয়া মেশিন, অটোক্লাভ মেশিনসহ ২২টি বিভিন্ন প্রকার মেশিন অকেজো হয়ে পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। এর মধ্যে ২০১২ সাল থেকে অচল হয়ে আছে সাকার মেশিন আর ২০১৪ সাল থেকে অকেজো ইলেকট্রিক এষ্ট্রলাইজার মেশিন। এক্স-রে টেকনিশিয়ান থাকলেও সেখানকার এক্স-রে মেশিনটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এ ব্যাপারে হাসপাতালের স্টোর কীপার টিএম আসাদ্দুজ্জামান বলেন, মেশিনটি সংস্কারের জন্য ঢাকা থেকে আগামী মাসের প্রথম দিকে একটি টিম আসবে বলে কথা হয়েছে।

এমনিভাবে দাকোপের এক্স-রে মেশিন বিকল উল্লেখ করে সেখানকার স্বাস্থ্য ও প: প: কর্মকর্তা ডা. মো. মোজাম্মেল হক নিজামী বলেন, এছাড়াও এ্যানেসথেসিয়া মেশিন, অটোক্লেভ মেশিন, আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, ইসিজি মেশিন, ও.টি লাইট, মাইক্রোস্কোপসহ অন্তত ১৩ প্রকার যন্ত্রপাতি অকেজো। যেগুলো ২০১২ সাল থেকে গত বছর(২০১৯) পর্যন্ত বিভিন্ন সময় বিকল হয়। মাত্র আড়াই লাখ টাকা বরাদ্দ করা হলেই মেশিনগুলো সচল করা সম্ভব বলেও তার এক প্রতিবেদনে দেখা যায়। কিন্তু টাকা বরাদ্দ না হওয়ার ফলে যেমন মেশিনগুলো চালু করা যাচ্ছে না তেমনি সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ বঞ্চিত হয়ে রোগীরা বাধ্য হয়ে স্থানীয় নাম সর্বস্ব প্রাইভেট ডায়াগনষ্টিক সেন্টার থেকে এক্স-রেসহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছে।

এভাবে এক্স-রে মেশিন ও টেকনিশিয়ান নেই তেরখাদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও। এ্যাম্বুলেন্স থাকলেও নেই চালক। তবে বর্তমানে আউটসোর্সিংয়ের এক কর্মচারীকে দিয়ে এ্যাম্বুলেন্স চালানো হচ্ছে।

এক্স মেশিন নেই তেরখাদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও। নেই ল্যাব টেকনিশিয়ানও। ফলে ওই হাসপাতালে ইসিজি ছাড়া অন্য কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষাই হয় না।

প্রায় ২০ বছর ধরে বিকল কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক্স-রে মেশিন। এক্স-রে টেকনিশিয়ান থাকলেও বর্তমানে খুলনা জেনারেল হাসপাতালে প্রেষণে রয়েছেন। সেখানে নেই ল্যাব টেকনিশিয়ানও। ফলে সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষাই বাইরের নাম সর্বস্ব ডায়াগনষ্টিক সেন্টার থেকে করতে বাধ্য হচ্ছে রোগীরা। ডেন্টাল সার্জন থাকলেও যন্ত্রপাতি সংকট বলে জানালেন সদ্য যোগদানকারী ৩৯তম বিশেষ বিসিএস’র চিকিৎসক ডা. জ্যোজিতর্ময় মন্ডল। একই চিত্র পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেরও। প্রায় ১০ বছর ধরে সেখানকার এক্স-রে মেশিনটি বিকল। নেই রেডিওলজিও(এক্স-রে টেকনিশিয়ান)। গত ১৪ জানুয়ারি থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রুটিন পরীক্ষাগুলো হচ্ছে বলে জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য ও প: প: কর্মকর্তা ডা: নীতিশ চন্দ্র গোলদার।

এভাবে প্রতিটি হাসপাতালেরই যন্ত্রপাতির করুণ দশা সম্পর্কে খুলনার সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, তিনি সবে যোগদান করেছেন। উপজেলাগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করে চাহিদা পাঠানো হবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। তারপর সেখান থেকে অনুমোদন হয়ে আসলেই যন্ত্রপাতিগুলো সংস্কার করা যাবে। আর যেগুলো সংস্কার সম্ভব নয় সেসব যন্ত্রপাতি কিনতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ