বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

সভ্যতার সঙ্কট বিমোচনে প্রয়োজন বান্দা

বিশ্বে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এর আর এক অর্থ সম্পদ কুক্ষিগত হওয়ার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশে^ ধনকুবেরের সংখ্যা গত এক দশকে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বিশে^র ৪৬০ কোটি দরিদ্র মানুষের কাছে যে সম্পদ রয়েছে, তার থেকে বেশি সম্পদ রয়েছে মাত্র ২ হাজার ১৫৩ জন ধনকুবেরের কাছে। আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফাম ২০ জানুয়ারি সোমবার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে। উল্লেখ্য যে, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ২১ জানুয়ারি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম-এর সম্মেলন শুরু হয়েছে। ওই সম্মেলনকে সামনে রেখেই অক্সফাম প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। বৈশ্বিক অসমতা নিয়ে প্রতিবছর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে প্রতিবেদন তুলে ধরে অক্সফাম। এদিকে অক্সফাম ইন্ডিয়ার প্রধান অমিতাভ বিহার বলেন, আমাদের ভঙ্গুর অর্থনীতির সঙ্গে ধনকুবেরদের পকেট জড়িত। এই ধনকুবেরদের বড় ব্যবসার কারণে সাধারণ নারী ও পুরুষরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, অসমতার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে ধনী ও গরিবের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা কমবে না।
এদিকে এডলম্যান ট্রাস্ট ব্যারোমিটারের বার্ষিক জরিপে বলা হয়েছে, বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বিশ্বাস করে পুঁজিবাদের বর্তমান অবস্থা উপকারের চাইতে ক্ষতি বেশি করছে। এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বব্যাপী ব্যবসা, সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের বিশ্বাস কতটুকু, তা নিয়ে জরিপ চালিয়ে থাকে। তবে এবার প্রথম পুঁজিবাদের মতো বিষয় নিয়ে জরিপ চালালো তারা। মানুষ কীভাবে পুঁজিবাদকে দেখে, সেটা জানতে বিশ্বের ২৮টি দেশের ৩৪ হাজার মানুষের মধ্যে জরিপ চালিয়েছে এডেলম্যান ট্রাস্ট ব্যারোমিটার। পশ্চিমের গণতান্ত্রিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স থেকে শুরু করে চীন, রাশিয়ার মতো দেশের জনগণও এই জরিপে অংশ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ বলেছেন, বর্তমান পুঁজিবাদ উপকারের চাইতে ক্ষতি করছে বেশি।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় জরিপ, গবেষণা, প্রতিবেদন, সম্মেলন বেশ ভালোই হচ্ছে। আশ্বাস ও আশাবাদের উচ্চারণও শোনা যায়। এরপরও বৈষম্যের মাত্রা কি কমছে? বরং ধনকুবেরের সংখা বাড়ছে। কিছু মানুষের হাতে সম্পদ ক্রমাগত কুক্ষিগত হচ্ছে, আর বিশ্বের সিংহভাগ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য থেকে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান নেই। অথচ অক্সফামের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বের মোট ধনকুবেরের মধ্যে ১ শতাংশ ধনকুবেরও যদি ১০ বছর ধরে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কর বেশি দিতেন, তবে শিশু ও প্রবীণ সুরক্ষা, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে ১১ কোটি ৭০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা যেত। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, তেমন ন্যূনতম দায়িত্বটুকুও পালন করা হয়নি। এইতো আমাদের পৃথিবী, এই তো আমাদের সভ্যতা! এখানে মানুষের সম্পদ বাড়ে কিন্তু মান  বাড়ে না। এখানে মানুষ মানুষের প্রভু হয়, আবার এই মানুষই হয়ে যায় সম্পদের গোলাম।
সমাজবাদে মানুষের মুক্তি হলো না, আর পুঁজিবাদেও মানুষের মুক্তি নেই, তাহলে মানুষের মুক্তি এখন কোন পথে? মানব ইতিহাসে মুক্তির কি কোনো উদাহরণ নেই? বর্তমান সময়েও কেউ কেউ বলে থাকেন, ইসলামে মুক্তির বার্তা আছে। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর রাষ্ট্র-দর্শন ও বিশ্ব-দর্শনে আছে মানব মুক্তির উদাহরণও। এমন আলোচনায় প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে আসে বর্তমান সময়ের মুসলমানদের কথা।
নানা ঘটনা প্রবাহে মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে, ‘মুসলমান’ বিষয়টা আসলে কী? এটা কী কোনো সংকীর্ণ সম্প্রদায়ের নাম, জাতীয়তাবাদী কোনো অন্ধ চেতনার নাম, শুধু পুরানো বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরার নাম, প্রতিশোধস্পৃহা কিংবা উগ্রতার নাম? এতসব প্রশ্ন জাগার পেছনে শুধু যে মিডিয়া-প্রপাগাণ্ডার অবদান রয়েছে তা নয়, বিভ্রান্ত ও স্ববিরোধী আচরণে অভ্যস্ত মুসলমানদের নানা কর্মকাণ্ডের কথাও এখানে উল্লেখ করতে হয়। এমন বাস্তবতায় ইসলামপ্রিয় যে কোনো সচেতন মানুষ, একথা বলতে চাইবেন যে, ‘মুসলমান বিষয়টা বুঝতে হলে ইসলামকে বুঝতে হবে। হয়তো আরো বলতে চাইবেন, প্রকৃত মুসলমানের উদাহরণ তো মহান সাহাবীরা এবং অনুসরণযোগ্য শ্রেষ্ঠ মডেল হলেন নবী মুহাম্মদ (সা.)। যিনি শুধু মানবজাতির জন্য নয়, সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতস্বরূপ। আত্মরক্ষামূলক এমন বক্তব্য শুনে যে কোনো সচেতন মানুষ বলতে পারেন, সাহাবীরা এবং নবী মুহাম্মদ (সা.) তো অতীতের বিষয়, বর্তমান সময়ে তাদের প্রতিনিধিত্বকারী তেমন কোনো উজ্জ্বল উদাহরণ আছে কী? এমন প্রশ্নের জবাব বোধ হয় খুব একটা সহজ নয়। তবে পাল্টা প্রশ্নও করা যেতে পারে যে, ইসলামকে জানার এবং প্রকৃত মুসলমানদের খোঁজার উৎসাহ বর্তমান সভ্যতায় কতটা আছে? এমন বিতর্কের একটা জবাব রোজি গাব্রিয়েল-এর বক্তব্যে পাওয়া যেতে পারে।
সম্প্রতি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন, কানাডার জনপ্রিয় মডেল রোজি গাব্রিয়েল। গত ১০ জানুয়ারি শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইস্টাগ্রামে ধর্ম পরিবর্তনের এ ঘোষণা দেন তিনি। বিভিন্ন মিডিয়ায় সে খবরটি প্রচারিত হয়েছে। ইসলাম গ্রহণের পর মাথায় ওড়না ও সেলোয়ার-কামিজ পরিহিত একটি ছবি ইস্ট্রাগামে পোস্ট করেছেন রোজি গাব্রিয়েল। আর তার হাতে রয়েছে ‘দ্য ম্যাসেজ অব কুরআন’ নামে একটি গ্রন্থ। কেন মুসলিম হয়েছেন তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন কানাডিয়ান এই মডেল। ইস্ট্রাগ্রামে তিনি লিখেছেন, ‘ইসলামের ছায়াতলে আসার মতো এত বড় সিদ্ধান্ত আমি কেন নিলাম? ২০১৯ সালটি ছিল আমার জীবনের কঠিনতম সময়। আমি ছোটবেলা থেকেই সৃষ্টিকর্তা আর তার সৃষ্টি নিয়ে ভাবতাম। সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক অনুভব করতাম। কিন্তু আমার পথ কঠিন ছিল। কষ্ট পেলে ক্ষোভ থেকে সৃষ্টিকর্তাকে প্রশ্ন করতাম, কেন আমাকে তিনি কষ্ট দিচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত আমি বুঝতে পেরেছি, সবকিছুই নির্ধারিত, এমনকি আমার কষ্টগুলো আসলে তাঁর দেয়া উহার। তিনি আরও লিখেন, গত ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মুসলিম দেশগুলো ভ্রমণ করে ইসলামকেই একমাত্র শান্তির ধর্ম বলে মনে হয়েছে আমার। তবে দুর্ভাগ্যবশত ইসলামকে বিশ্বব্যাপী ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। ইসলামের আসল অর্থ শান্তি, ভালোবাসা ও একত্ববাদ। এটা শুধু ধর্ম নয়, একটি জীবনবিধান। তিনি আরো বলেন, ‘আমি এখন একজন ‘মুসলমান’। কালেমা শাহাদাতের মাধ্যমে আমি আল্লাহর পথে নিজেকে উৎসর্গ করে মূলত একতা, সংযোগ ও শান্তির পথে জীবন কাটানোর শপথ নিয়েছি।’
‘ইসলাম’ ও ‘মুসলমান’ নিয়ে বর্তমান সভ্যতায় যে বিতর্ক চলছে, তার একটা জবাব হয়তো রোজি গ্যাব্রিয়েলের বক্তব্যে পাওয়া যাবে। তবে আরও গভীর ও পূর্ণাঙ্গ জবাব বিধৃত রয়েছে পবিত্র কুরআনের পাতায় এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে। রোজি হয়তো তা জানা ও মানার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন, কিন্তু ম্রিয়মান মুসলিম উম্মাহ অর্পিত সেই দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসবে কী? শুধু আবেগ দিয়ে সেই দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। ‘মুসলিম’ তো সংকীর্ণ কোনো সম্প্রদায়ের নাম নয়। সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদেরও সমর্থক হতে পারে না কোনো মুসলিম। আর বিত্তবান সব মুসলমানের ঈমান হলো, তার সম্পদে রয়েছে দরিদ্রের অধিকার, বর্তমান সভ্যতায় যা লক্ষ্য করা যায় না। অক্সফামের প্রতিবেদনেও তা উঠে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বর্তমান সময়ে কাংখিত উদাহরণগুলো মুসলিম সমাজে কতটা লক্ষ্য করা যায়? মুসলমানরা তো এখন নিজেদের দায়িত্ব ও মর্যাদা ভুলে বসে আছে। জন্ম সূত্রে ও আদম শুমারিতে তো কোটি কোটি মুসলমানের সংখ্যা জানা যায়। কিন্তু তাদের কতজন ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধে এগিয়ে আসছেন? সমাজ, রাষ্ট্র ও পৃথিবীকে সব মানুষের বসবাসযোগ্য রাখার প্রচেষ্টায় কতজন নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন? পবিত্র কুরআন এবং রাসূল (সা.) তো তাদের ওপর এ দায়িত্ব অর্পণ করে রেখেছেন। এমন দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা অর্জনও যে দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত, সেই চেতনা কতজনের মধ্যে বিরাজ করছে? মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ জীবন-যাপন ও কর্তব্য পালনের যে বিধান নাজিল করেছেন, তা বাস্তবায়নে অন্যদের মত মুসলমানরাও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। আসলে মানুষ ‘বান্দা’ হতে না পারাটাই বর্তমান সভ্যতার মূল সঙ্কট।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ