বুধবার ২৫ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

রংপুরে সরিষা ক্ষেতে মওচাষে কোটি টাকার মধু উৎপন্নের উজ্জল সম্ভাবনা

মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, রংপুর অফিস : রংপুর বিভাগের ৫ জেলায় সরিষা ক্ষেতে পরিকল্পিত ভাবে মৌমাছির চাষ করে মধু উৎপন্নের মাধ্যমে বছরে কোটি কোটি টাকা অয়ের উজ্জল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এর ফলে একদিকে বিপুল সংখ্যক বেকার পুরুষ ও নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি চাষির বাড়তি আয়ের সাথি ফসল ও সম্ভাবনাময় পণ্য হিসাবে তাঁদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে বিশাল এক সহায়ক শক্তির সৃষ্টি হবে। 
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, রংপুর অঞ্চলের রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট এবং নীলফামারী জেলায় বিপুল পরিমান বিস্তীর্ন সরিষা ক্ষেতে মওমাছির চাষ করে প্রতি বছর শত কোটি টাকা মূল্যের মধু উৎপন্ন করার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইতোমধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কারিগরী সহযোগিতায় গত কয়েক বছর ধরে এসব জেলায় বিভিন্ন সরিষা ক্ষেতে মওমাছির চাষ করার পাশাপাশি চাষীরা সাথি ফসল হিসেবে বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ক্রমান্বয়ে এই কর্মসূচী বাস্তবায়নে ঝুকে পড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মওমাছি চাষ সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ জনান, প্রতিটি মওবক্সে প্রতি মওসুমে নুন্যতম ৪ থেকে ৫ কেজি করে মধু পাওয়া যায়। এছাড়া মওচাষের প্রকল্প ভুক্ত সরিষা ক্ষেতে অধিক পরাগায়ণের ফলে এর ফলনও অন্ততঃ ২০/২৫ ভাগ বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি ঐ এলাকায় বিভিন্ন ফলের গাছের মুকুল এবং ফসলের ক্ষেতে মৌমাছির ব্যাপক সমাগমের মাধ্যমে প্রচুর পরাগায়নের সৃষ্টি হয়। একারনে ঐসব ফলের বাগান এবং  ক্ষেতের ফলনও কয়েক গুন বৃদ্ধি পায় বলে বিশেষজ্ঞ গনের অভিমত।
এই কর্মসূচির আওতায় চলতি মওসুমে এসব জেলার বিভিন্ন সরিষা ক্ষেতে ৫ হাজার মও বক্স স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা ধরে এ পর্যন্ত এই অঞ্চলে ৩ হাজার ৮ শো ২৪ টি মওমাছির বক্স স্থাপন কারা হয়েছে । এর মাধ্যমে চাষিরা সাথি ফসল হিসেবে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরী করতে পেরে অর্থনৈতিক ভাবে প্রচুর লাভবান হয়েছে। এই কর্মসূচরি আওতায় কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা জেলায় সবচেয়ে বেশী সাফল্য অর্জন হয়েছে বলে জনা গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে- রংপুর বিভাগের রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট এবং নীলফামারী এই ৫  জেলায় চলতি রবি মওসুমে প্রায় ৩৯ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরে এ পর্যন্ত ৩৩ হাজার ৩৪০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়েছে। এসব সরিষা ক্ষেতের মধ্যে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমিতে মধু উৎপন্নের লক্ষমাত্রা  নিয়ে ৫ হাজার  ৭২৯ টি মওমাছির বক্স স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
চলতি মওসুমে এসব সরিষা ক্ষেতে ৩ হাজার ৮২৪ টি মও বক্স স্থাপন করে এ পর্যন্ত ২০ হাজার কেজি  মধু পাওয়া গেছে। গত মওসুমে  এই অঞ্চলে ৫৫ হাজার ২০০ কেজির বেশি পরিমাণ মধু উৎপন্ন হয়েছে বলে  সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে চাষকৃত সকল সরিষা ক্ষে মৌচাষ প্রকল্পের অর্ন্তভুক্ত করা সম্ভব হলে কেবল এই অঞ্চলের  সরিষা ক্ষেত থেকেই প্রতি মওসুমে অন্তঃত ৪ লাখ কেজির বেশী মধু উৎপন্নের মাধ্যমে প্রায় ২০ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব হতো।
এর মাধ্যমে প্রায় শত কোটি টাকা মূল্যের মধু উৎপন্নের অপার সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এসব উৎপাদিত মধু দেশের স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরন করে বিদেশে রপ্তানীর মাধ্যমে একদিকে যেমন বৈদেশীক মূদ্রা অর্জন করা সম্ভব। অপর দিকে পশ্চাদ পদ এবং  অবহেলিত এই অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত সৃষ্টি সম্ভব হবে। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তির এক অপার ভান্ডারও  গড়ে উঠবে।
  প্রাপ্ত সূত্রে জানা গেছে, চলতি মওসুমে রংপুর জেলায় সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৮০ হেক্টরে সরিষা চাষ করে ১২০ হেক্টর জমির সরিষা ক্ষেতে ৪৩ টি মও বক্স স্থাপন করে এ পর্যন্ত ২২ কেজি মধু উৎপন্ন হয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলায় ১৩ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৪৭৫ হেক্টরে সরিষা চাষ করে ৪ হাজার ২৪৯ হেক্টর জমির সরিষা ক্ষেতে ২ হাজার ৯৭৩ টি মও বক্স স্থাপন করে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার কেজি মধু উৎপন্ন হয়েছে। গাইবান্ধা জেলায় ১০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ৪৫০ হেক্টরে সরিষা চাষ করে ৭৬০ হেক্টর জমির সরিষা ক্ষেতে ১ হাজার টি মও বক্স স্থাপন করে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১ হাজার কেজি মধু উৎপন্ন হয়েছে। নীলফামারী জেলায় ৫ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৫৮০ হেক্টরে সরিষা চাষ করে ৯৬০ হেক্টর জমির সরিষা ক্ষেতে ২০টি মও বক্স স্থাপন করে এ পর্যন্ত প্রায় ২৫ কেজি মধু উৎপন্ন হয়েছে। লালমনিরহাট জেলায় ২ হাজার ১৪১ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৩০ হেক্টরে সরিষা চাষ করে ১২০ হেক্টর জমির সরিষা ক্ষেতে ২৮  টি মৌ বক্স স্থাপন করে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১০ কেজি মধু উৎপন্ন হয়েছে।
মৌমাছি চাষে কৃষকদের সহায়তার জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় কারিগরী সহায়তা প্রদান করছে। মৌমাছি চাষের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার চাষীরা সাথি ফসল হিসেবে বাড়তি আয়ের সুযোগ পেয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থানের। সীমিত পর্যায়ে মওমাছি চাষে সাফল্য অর্জিত হওয়ায় রংপুর বিভাগের ৫ জেলায় গত রবি মওসুমে প্রায় পৌনে ৩ কোটির বেশি  টাকা মূল্যের ৫৫ হাজার  কেজিরও বেশী মধু উৎপন্ন হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের উপ পরিচালক ডক্টর মোহাম্মদ সরওয়ারুল হক জানান, রংপুর অঞ্চলে লিচু এবং সরিষা ক্ষেতে মওচাষ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অঞ্চলের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে মৌচাষ ইতি বাচক প্রভাব হিসেবে ব্যাপক সাফল্যের কাজ করছে। ফলে চাষীরাও এতে ক্রমান্বয়ে উৎসাহিত হচ্ছে। বিশেষ করে নদী তীরবর্তী চড় এলাকা সহ বির্স্তীন সরিষার ফসলের মাঠে মওচাষে চাষিরা উৎসাহিত হয়ে তা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে দক্ষ মওয়ালের অভাবে অনেকেই কাংখিত লক্ষ্যে মৌচাষে এগিয়ে আসতে পারছেনা বলে তিনি জানান। দেশের উত্তরাঞ্চলের সিরাজগঞ্জ এবং বগুড়ার কিছু এলাকায় দক্ষ মৌয়াল আছে তারাই প্রত্যেক মওসুমে এসে সীমিত পর্যায়ে এই এলাকায় মওয়ালের দায়িত্ব পালন করে থাকে। সিরাজগজ্ঞের মওসুমী মৌয়াল গফুর মিয়া জানান, প্রত্যেক  মওসুমে তারা এই অঞ্চলে মধু সংগ্রহের জন্য আসেন। সাধারণতঃ এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ব্যাপক হারে মধু সংগ্রহ শুরু হয়। মৌয়ালরা অভিযোগ করে জানান, আমাদের দেশে মৌচাষ বা মধু সংগ্রহের জন্য কোন নিয়ম সৃংখলা নেই। বাজারজাত করার ব্যাপারেও কোন পরিকল্পিত উদ্যোগ নেই। এব্যাপারে সুষ্ঠু বাজার ব্যাবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে কেবল মওচাষ করেই রংপুর অঞ্চলের চাষীরা আর্থ সামাজিক উন্নয়ন সহ স্বাবলম্বি হ’তে পারবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ