শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

কী ঘটতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে?

৪ জানুয়ারি, গার্ডিয়ান, বিবিসি : মার্কিন বিমান হামলায় দেশের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হারিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে ইরান। ‘উপযুক্ত সময়ে, যথাস্থানে’ এই হত্যাকা-ের প্রতিশোধ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা। এরইমধ্যে ওই অঞ্চলে অতিরিক্ত তিন হাজার সেনা পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন। সোলাইমানিকে হত্যার একদিনের মামলায় ইরাকে নতুন করে ইরানি-সমর্থনপুষ্ট বাহিনীর ওপর আবারও হামলা চালিয়েছে তারা। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য বলছে, উত্তেজনা নিরসন করতে চাইছে তারা। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানি সেনাবাহিনীর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হত্যার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ উসকে দিয়েছে ওয়াশিংটন। তাদের মতে, সোলাইমানিকে হারানোর পর ইরানি বাহিনীর সক্ষমতায় ভাটা পড়লেও যেকোনও উপায়ে বদলা নেয়ার চেষ্টা করবে তেহরান।

শুক্রবার ইরাকের বাগদাদ বিমানবন্দরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে রকেট হামলা চালিয়ে সামরিক কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করা হয়। বাগদাদে বিমান হামলার পর ফ্লোরিডার মার-এ লাগো অবকাশ কেন্দ্রে শুক্রবার সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ৬২ বছর বয়সী জেনারেল সোলাইমানি মার্কিন কূটনীতিক ও নাগরিকদের ওপর শিগগিরই মারাত্মক হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছিলেন। তবে ইরানের শাসক পরিবর্তন চেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন যুদ্ধ শুরু করতে কোনও পদক্ষেপ নেননি।

সোলাইমানি হত্যাকাণ্ডে উদ্বিগ্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদুল মাহাদী বলেছেন, এ আক্রমণের ফলে মধ্যপ্রাচ্য এবং তার বাইরেও যুদ্ধ বিস্মৃত হতে পারে। একই আশঙ্কারই প্রতিফলন ঘটেছে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের প্রতিক্রিয়ায়। তিনি বলেছেন, উপসাগরে আরেকটি যুদ্ধের ধকল নেয়ার মতো অবস্থা বিশ্বের নেই। রাষ্ট্রনেতাদের সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও'র দাবি, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চায় না তবে আমেরিকানদের জীবন বিপন্ন হলে চুপ করে থাকবে না। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকের ইরানি মিত্রদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। শনিবার ভোরে বাগদাদে ইরানি সমর্থনপুষ্ট ইরাকের আধাসামরিক বাহিনী পপুলার মোবিলাইজেশন ইউনিট (পিএমইউ) গাড়ি বহরে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ওই হামলায় ছয় জন নিহত ও আরও তিনজন মারাত্মক আহত হয়েছে।

জেনারেল সোলাইমানির মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। সোলাইমানির স্থলাভিষিক্ত হয়ে ইরানের প্রভাবশালী কুদস ফোর্সের নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন জেনারেল ইসমাইল ঘানি। দায়িত্ব নিয়েই তিনি বলেছেন, ‘আমরা সবাইকে বলছি ধৈর্য্য ধরুন আর মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে আমেরিকানদের মৃতদেহ দেখতে থাকুন’।

ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর কমান্ডার থাকার সময়ে সোলাইমানির সমর্থনপুষ্ট বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন সাবেক মার্কিন জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস। তিনি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, ‘আমার মতে তিনি (জেনারেল সোলাইমানি) ছিলেন ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং ইরানের আঞ্চলিক শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। এখন নিশ্চিতভাবেই যে প্রশ্নটি সামনে আসছে সেটি হলো ইরানি বাহিনী ও তাদের প্রক্সিগুলো ওই অঞ্চলে এই হামলার প্রতিক্রিয়া কীভাবে দেখাবে?'

তেহরানের লেবাননভিত্তিক মিত্র হিজবুল্লাহও সোলাইমানি হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইরাকের আধাসামরিক বাহিনী বদর অর্গানাইজেশনের প্রধান হাদি আল আমেরি ইরাকের সব বাহিনীকে বিদেশি সেনা বহিষ্কার করার আহ্বান জানিয়েছেন। সোলাইমানির ভূমিকার প্রভাব ছড়িয়ে পড়া গাজা ও ইয়েমেনেও তার হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধের ডাক শোনা গেছে। বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল ও হিজবুল্লাহর শক্ত অবস্থান দাহিয়েহ-তে রাজপথে বিক্ষোভ হয়েছে।

অনেকেই সোলাইমানিকে ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতেন। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনির পর প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির থেকেও ক্ষমতাধর বলে মনে করা হতো। নিরাপত্তা অভিযান ও কূটনৈতিক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ওই অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন তিনি। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় ইরানের সামরিক অবস্থান স্থায়ী করার পর ইরাকেও একই ভূমিকা নিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অবস্থান নিশ্চিত করে ইরানের সীমান্তকে নিয়ে গেছেন ইসরায়েলের কাছে।

এক সিনিয়র মার্কিন কর্মকর্তা মনে করেন সোলাইমানির জায়গা পূরণ করা ইরানের জন্য কঠিন হবে। তাকে হত্যা করায় হামলা ঠেকানো সহজ হবে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি শুধু বলতে চাই সোলাইমানি বহু কারণেই অপরিহার্য মানুষ ছিলেন আর তার মৃত্যুর পর প্রক্সিগুলোর ব্যাপকভাবে সংগঠিত, প্রাণঘাতী ও কার্যকর হওয়া কঠিন হবে। আরেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘তিনি এমন কিছু করতে পারতেন যা অন্য কেউ পারবে না। তিনি কেবল বিকেন্দ্রীকৃত একজন ব্যবস্থাপক ছিলেন না, ছিলেন এর থেকেও বেশি কিছু। আর ইরান যতোদিন এই অঞ্চলে তাদের স্বাভাবিক কৌশল চালাবে ততোদিন আমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ নই কিন্তু তিনি থাকতে যতটা অনিরাপদ ছিলাম এখন তার অনুপস্থিতিতে আমরা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। তবে এসব দাবি মানছেন না বিশ্লেষকরা।

বিবিসির প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লিজ ডুসেট মনে করছেন, সোলাইমানি এবং ইরাকি শিয়া মিলিশিয়া ইউনিট পিএমইউ এর ডেপুটি কমান্ডার আবু মাহদি আল মুহান্দিসকে হত্যার পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এড়ানোর প্রচেষ্টা ধসে পড়বে।

ইরানের হাতে আধুনিক রকেট ও মিসাইল আছে। বিবিসির বিশ্লেষক জেরেমি বোওয়েন অবশ্য বলছেন, এসব অস্ত্র যদি তারা মার্কিন বাহিনীর ওপর প্রতিশোধমূলক হামলার জন্য ব্যবহার করে তাহলে পরিস্থিতি বরং খারাপ হতে পারে। তারা যদি উপসাগরে মার্কিন জাহাজে আক্রমণ চালায় সেটাও প্রচ- পাল্টা হামলা ডেকে আনতে পারে। ইরানের তেল শোধনাগারগুলো পারস্য উপসাগরে উপকুলের পাশেই, এবং যুক্তরাষ্ট্রের যে বিপুল সামরিক ক্ষমতা- তাতে এগুলো খুব সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। বোওয়েন তাই মনে করছেন, ইরান ‘সামনের দরজা দিয়ে নয়, বরং পাশের জানালা দিয়ে’ প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করবে। তার মতে এক্ষেত্রে তেহরান ‘পরোক্ষ কৌশল’ ব্যবহার করবে - যা জেনারেল সোলাইমানি নিজে ব্যবহার করতেন।

যুদ্ধ সত্যি বাধবে কিনা - তা একটা বড় প্রশ্ন বিবিসির বিশ্লেষক জোনাথন মার্কাসের কাছেও। তিনি বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো মনে করতে পারেন যে একটি নাটকীয় পদক্ষেপ দিয়ে তিনি ইরানকে ভয় পাইয়ে দিতে পারেন। হয়তো তিনি আশা করবেন যে তার মিত্র ইসরায়েল এবং সৌদি আরবও এখন বুঝবে যে যুক্তরাষ্ট্রের এখনও দাঁত-নখ আছে। তবে ইরান যে একটা কড়া জবাব দেবে না এটা অচিন্ত্যনীয়।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি নীতির অন্যতম বিশ্লেষক চার্লস লিস্টার সিএনএনকে বলেছেন, এই হামলা কৌশলগত তাৎপর্য ও প্রায়োগিক দিক থেকে আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন বা আইএস প্রতিষ্ঠাতা আল বাগদাদির হত্যার চেয়েও আলাদা। তিনি বলেন, কয়েক মাস ধরেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি পরিস্থিতি বিরাজ করছে আর এই হত্যাকাণ্ড সেই উত্তেজনাকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেবে। ওয়াশিংটনের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ডিফেন্স প্রায়োটিজ এর পলিসি ডিরেক্টর বেন ফ্রাইডম্যান ওই হামলাকে ‘উল্লেখযোগ্য বেপরোয়া কর্মকাণ্ড’ আখ্যা দিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন বাহিনীর সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি একবার সোলাইমানিকে ইসলামি ‘বিপ্লবের জীবন্ত শহীদ’ আখ্যা দিয়েছিলেন। তার হত্যাকাণ্ডকে ‘যুদ্ধের শামিল’ বলে মনে করেন ফ্রাইডম্যান। ইরানিরা এর প্রতিশোধ নিতে বাধ্য বলেও মনে করেন তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ