সোমবার ১৩ জুলাই ২০২০
Online Edition

বছরে একাধিকবার জ্বালানির দাম পরিবর্তনে দুর্ভোগ বাড়বে জনগণের

স্টাফ রিপোর্টার : বছরে একাধিকবার বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম পরিবর্তনের সুযোগ রেখে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন সংশোধনের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ফলে বছরে একাধিকবার বিদ্যুৎ- গ্যাস- জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে পারবে বিইআরসি।
সম্প্রতি মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) আইন ২০১৯’ এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “আগের আইনটি ছিল ২০০৩ সালের। তাতে একটা প্রভিশন ছিল- কমিশনের নির্ধারিত ট্যারিফ কোনো অর্থবছরে একবারের বেশি পরিবর্তন করা যাইবে না, যদি না জ্বালানি মূল্যের পরিবর্তনসহ অন্য কোনোরূপ পরিবর্তন ঘটে।
“এটাকে পরিবর্তন করে করা হয়েছে। কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ট্যারিফ কোনো অর্থ বছরে কমিশনের একক বা পৃথক পৃথক আদেশ দ্বারা, প্রয়োজন অনুসারে এক বা একাধিকবার পরিবর্তন করতে পারবে।”
সংশোধিত আইনে শুধু এইটুকুই পরিবর্তন আনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যান্য যে বিধান আছে সেগুলো ঠিক আছে।
একাধিকবার ট্যারিফ পরিবর্তন করার সুযোগ করার ব্যাখ্যায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, “উনারা দেখেছেন অনেক সময়ই পরিবর্তন করা প্রয়োজন হতে পারে। রিজিট (অনমনীয়) না থেকে অপশন রইল, সেজন্যই।
“যদি ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে, অনেক সিনারিও আসতে পারে, হঠাৎ করে চেইঞ্জ করা লাগতে পারে। কিন্তু আগের আইনে রিজিট ছিল, এখন ফ্লেক্সিবল করা হল।”
নতুন আইন কার্যকর হলে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বছরে এক বা একাধিকবার বিদ্যুৎ, গ্যাস, ডিজেল, পেট্রোলসহ জ্বালানির দাম পরিবর্তন করতে পারবে কি না- সেই প্রশ্নে আনোয়ারুল বলেন, “বাড়াতেও পারবে, কমাতেও পারবে।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অলস বসে থাকলেও কেন্দ্র ভাড়া ঠিকই দিতে হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকসানের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এই লোকসান সামাল দিতে গিয়ে সরকার গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোকেই বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছে।
গত বছর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে শুধু কেন্দ্রের ভাড়া হিসেবেই সরকার দিয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। এ বছর এর পরিমাণ হবে ২০ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে বছরে সরকারের খরচ হয় ১৯ হাজার কোটি টাকা।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি শেষ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা আসতে পারে শিগগিরই।
বিইআরসির বিদ্যমান আইনে এক অর্থবছরে একবারের বেশি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের দাম বাড়ানো যায় না। আইনটি সংশোধিত হলে বছরে একাধিকবার দাম বাড়াতে পারবে বিইআরসি।
২০০৩ সালে পাস হওয়া বিইআরসি আইন ২০০৫ ও ২০১০ সালেও সংশোধন করা হয়েছিল। তবে সেই সংশোধনে বড় পরিবর্তন হয়নি। বিইআরসি আইনের মূল্যবৃদ্ধির ধারায় রয়েছে, ‘কমিশনের নির্ধারিত ট্যারিফ কোনো অর্থবছরে একবারের বেশি পরিবর্তন করা যাইবে না, যদি না জ্বালানি মূল্যের পরিবর্তনসহ অন্য কোনো রূপ পরিবর্তন ঘটে।’ এবার এটি সংশোধন এনে বলা হয়েছে, ‘কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ট্যারিফ কোনো অর্থবছরে কমিশনের একক বা পৃথক পৃথক আদেশ দ্বারা, প্রয়োজন অনুসারে এক বা একাধিকবার পরিবর্তন করতে পারবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, সরকার বিদেশ থেকে এলএনজি ও কয়লা আমদানি শুরু করেছে। আগে থেকে তেল আমদানি তো করতই। আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ার কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ব্যয় বেড়েছে। সেই ব্যয় মেটাতে গিয়ে দফায় দফায় বাড়াতে হবে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম। সে কারণেই আইনে সংশোধন আনা হচ্ছে। আইন সংশোধনের উদ্যোগ। বছরে একাধিকবার দাম বাড়াতে চায় সরকার। অর্ধেক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকে লোকসানের কারণ।
তবে এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অভিযোগ করেন, বিদেশি কোম্পানি ও এলএনজি ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে সরকার স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব দিচ্ছে না। নিজেদের গ্যাস পেলে তো দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না। তিনি বলেন, ‘স্থলভাগে এখনো যে গ্যাস রয়েছে, তার একটি অংশ আমরা আবিষ্কার করে উত্তোলন করছি। বড় অংশের সন্ধান এখনো আমরা করিনি। প্রয়োজন গোটা বাংলাদেশে কূপ খনন করে গ্যাসের অনুসন্ধান করতে হবে।’
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। পরিস্থিতি এক বছরের মধ্যেও পরিবর্তন হয়। সে কারণে আইনটি যুগোপযোগী করার জন্যই সংশোধনী আনা হচ্ছে। তবে এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সরকার যা কিছু করুক, মানুষের স্বার্থ বিবেচনা করেই করবে।
গত ১০ বছরে খুচরা বা গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ছয়বার। আর পাইকারি পর্যায়ে বেড়েছে চারবার। এর মধ্যে ২০১৭ সালে এক বছরের মধ্যে দুবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) উচ্চ আদালতে একটি রিট করে। আদালত বিইআরসির কাছে জানতে চান, বছরে দুবার দাম বাড়ানোর কথা আইনের কোথায় আছে। বিইআরসি তখন এর ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, বিইআরসি আইনের পরিবর্তন জনগণের সঙ্গে তামাশার মতো। সরকার অব্যবস্থাপনা রোধ করতে পারলে গ্যাস খাতে ১২ হাজার কোটি টাকা ও বিদ্যুৎ খাতে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় কমাতে পারে। তাহলে আর গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর দরকার পড়ে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ