শুক্রবার ২৭ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

মাড়ি থেকে রক্ত পড়া

দাঁত ব্রাশ করার সময় বা শক্ত কিছু খেতে গেলে যদি লক্ষ করা যায় যে মাড়ি থেকে রক্ত বের হচ্ছে তবে বুঝে নিতে হবে মাড়ির রোগ আছে, যাকে বলা হয় জিনজিভাইটিস। অনেক ক্ষেত্রে আবার বিভিন্ন রোগের লক্ষণও হতে পারে। মানুষের মুখের ভেতরে যেসব ব্যাক্টেরিয়া থাকে সেগুলো খাবারের সঙ্গে মিশে এক ধরনের আঠালো প্রলেপ তৈরি করে থাকে, যাকে বলা হয় ডেন্টাল প্লাক।

যদি দাঁত ব্রাশ করার সময় ডেন্টাল প্লাক নিয়মিতভাবে পরিষ্কার করা না হয় তবে তা দীর্ঘদিন জমে থেকে মাড়িতে প্রদাহ তৈরি করে, এ অবস্থায় মাড়ি ফুলে যায় ও লাল হয়ে রক্ত বের হয়।

১. দাঁত ব্রাশ এবং ফ্লসিং মাড়ির প্রদাহ বা মাড়ি থেকে রক্ত পড়া রোধ করতে প্রতিদিন মুখ পরিষ্কার রাখতে হবে। এ ব্যাপারে ডেন্টিস্টের পরামর্শ মতো ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে প্রতিবার খাবারের পর দাঁতব্রাশ এবং রাতে ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাশের আগে ডেন্টাল ফ্লস (এক ধরনের সিল্ক সুতা) দিয়ে দুই দাঁতের ফাঁক থেকে খাদ্যকণা বের করে আনা প্রয়োজন। সেই সাথে এক ধরনের জীবাণুনাশক তরল মাউথ ওয়াস (অ্যান্টিসেপটিক) ব্যবহার করা প্রয়োজন। প্রতি বছর অন্তত দুইবার একজন ডেন্টাল সার্জনের কাছে গিয়ে দাঁত ও মুখ পরীক্ষা করালে মাড়ির প্রদাহ বা রক্ত পড়া বন্ধ করা যাবে সেই সঙ্গে একটি মূল্যবান দাঁতকেও বাঁচানো সম্ভব হবে।

২. দীর্ঘদিন বিরতির পর ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার শুরু করে থাকলে অথবা নতুন ধরনের ফ্লস ব্যবহার করলে মাড়ি থেকে রক্ত পড়া বিচিত্র কিছু নয়। মাড়ির সঙ্গে ডেন্টাল ফ্লস এর ব্যবহারটা অভ্যাসে পরিণত হতে একটু সময় লাগবে। ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহারের ফলে দাঁতের গায়ে বা ফাঁকে লেগে থাকা ডেন্টাল প্লাক বা খাদ্যকণা আরো সুন্দরভাবে পরিষ্কার হয়।

৩. টুথব্রাশ বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত বা আঁকাবাঁকা থাকলে কিংবা দীর্ঘদিনের ক্ষয়ে যাওয়া টুথব্রাশ দিয়ে ব্রাশ করলে আঘাতের কারণে মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়তে পড়ে। সুতারাং টুথব্রাশটি সঠিক আছে কি না বা শলাকাগুলো সোজা ভাবে দাঁড় করানো আছে কি না, সেটাও খেয়াল রাথতে হবে। একটি টুথব্রাশ ছয় মাসের বেশি ব্যবহার করা ভালো নয়।

৪. যারা ধূমপান করেন বা জর্দা, গুল ব্যবহার করেন তাদের মাড়ির প্রদাহ অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণে লক্ষ্য করা যায়। তামাকের রাসায়নিক পদার্থগুলো (প্রায় ৭০০০) দেহের রোগ প্রতিরোধ শক্তি কমিয়ে ফেলে, ফলে মুখের জীবাণুসমূহ আরো বেশি বিস্তার লাভ করে এবং মাড়িতে প্রদাহ বা ইনফেকশন বেশি দেখা দেয়। ধূমপান ও তামাকের ব্যবহারের কারণে ঘা বা প্রদাহ শুকাতেও দেরি হয়। তামাক যতদিন ব্যবহার করা হয় ততদিনই মাড়ির এই রোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়, শত ওষুধ বা চিকিত্সায়ও ভালো করা যায় না।

৬. যারা অনান্য রোগের জন্য (ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ক্যানসার, লিভার ও কিডনি রোগ) ওষুধ ব্যবহার করেন তাদের মাড়ি থেকে রক্ত পড়া আরো বেশিভাবে লক্ষ্য করা যায়। এই সমস্ত রোগ দেহের প্রতিরোধ শক্তিকে কমিয়ে ফেলে, ফলে প্রদাহ দ্রুত বৃদ্ধি করে। সুতরাং তাদের প্রয়োজন মুখের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে আরো বেশি যতœবান হওয়া ও মুখের জন্য নিয়মিত জীবাণুনাশক ওষুধ ব্যবহার করা। দুই বেলা দাঁত ব্রাশ ছাড়াও ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করা। ছয় মাস অন্তর ডেন্টিস দিয়ে দাঁতের স্কেলিং ও পরীক্ষা করা ভালো। অনেক ক্ষেত্রে মানসিক রোগের ওষুধ, অ্যালার্জি ও উচ্চ রক্ত চাপের ওষুধ মুখের শুষ্কতা তৈরি করে ফলে এসব ক্ষেত্রেও মাড়ির প্রদাহ লক্ষ্য করা যায়। সুতরাং মুখের আর্দ্রতা বজায় রাখতে নিয়মিত কিছু টক জাতীয় ফল (আমলকী, কমলা, জাম্বুরা, আমড়া, লেবুর রস, কামরাঙ্গা, জলপাই, বরই ইত্যাদি) এবং প্রচুর পানি পান করা ভালো।

৬. গর্ভাবস্থায় মাড়ি থেকে রক্ত পড়া খুব বেশি লক্ষণীয়। কারণ এই সময় মায়েদের শরীরের হরমোন পরিবর্তন হয় ফলে মাড়ি সংবেদনশীল হয়ে যায়। এই সময় সামান্য আঘাতে বা খোঁচাতেই মাড়ি থেকে রক্ত বের হয়। সুতরাং গর্ভবতী মায়েদের গর্ভাবস্থায় মুখের যতœ বেশি পরিমাণ নিতে হবে। যেমন তিন বেলা (প্রতিবার আহার) আহারের পর দাঁত ব্রাশ ও জীবাণুনাশক মাউথওয়াশ ব্যবহার করা ও ডেন্টাল চেকআপ নিয়মিত করা। এবং গর্ভধারণের আগেই ডেন্টাল স্কেলিং করানো প্রয়োজন।

৭. যাদের দেহের মধ্যে রক্ত জমাট হওয়ার অস্বাভাবিক প্রক্রিয়া থাকে তাদের মাড়ি থেকেও রক্ত পড়তে পারে। যেমন হিমোফেলিয়া, ওয়াইলব্রেন্ড রোগ আছে কিংবা যারা রক্ত তরলীকরণ ওষুধ (এসপিরিন, ক্লোপিড ) খেয়ে থাকেন, তাদের স্বাভাবিকভাবে রক্ত জামাট হতে পারে না। সুতরাং অনেক ক্ষেত্রে মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার কারণ অন্য কোনো রোগের লক্ষণ অথবা ওষুধ এর কারণে হতে পারে। সুতরাং সেক্ষেত্রে তাদের বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়াটাও জরুরি।

৮. যাদের লিউকোমিয়া রোগ আছে তাদের ক্ষেত্রেও রক্ত সহজে জমাট বাঁধে না ,শরীরে তাদের টেলেট এবং রেডব্লাড সেল অধিক পরিমাণ না থাকলে রক্তক্ষরণ হতে পারে।

অতএব, মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার বিভিন্ন কারণ অনুসন্ধান, রোগীর ইতিহাস ও রক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

 অধ্যাপক ডা. অরূপরতন চৌধুরী

১৫/এ, গ্রিন স্কয়ার, গ্রিনরোড

ঢাকা-১২০৫

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ