মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মশা নিধনে চাই সঠিক কর্মপরিকল্পনা

আখতার হামিদ খান: বিগত কয়েক মাসে দেখলাম মশার কাছে আমরা কতটা অসহায়। মশা আমাদের জন্য এখন একটি আতঙ্কের নাম। মশা নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা এখন বেশ তিক্ত। বিগত প্রায় দুই দশক ধরে মশা আমাদের জন্য সমস্যা হলেও এ বছরের প্রাদুর্ভাব পেছনের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। মশা নিয়ে আমাদের সবার অভিজ্ঞতাই এখন বেশ তিক্ত।

মশার কাছে আমরা এক ধরনের পরাজিত হয়েছি বলা যায়। মশা থেকে পরিত্রাণ পেতে ব্যক্তিগত সচেতনতা ও প্রোটেকশন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল একটি সফল ও টেকসই মশা নিধন ব্যবস্থাপনা।

তাই মশা নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করে এর সঠিক দমন পদ্ধতি (কীটনাশক বা জৈবনাশক, কী মাত্রায়, কীভাবে, কখন ইত্যাদি) খুঁজে বের করা জরুরি। নইলে মশার সফল নিধন কঠিন হবে।

বর্তমানে আমাদের দেশে মশা নিধন কার্যক্রম সিটি কর্পোরেশনগুলোর ওপর ন্যস্ত। সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা এবং সাম্প্রতিক সোর্স রিডাকশন (লার্ভা ধ্বংসকরণ) কার্যক্রমকে সন্তোষজনক বলা যায়। সিটি কর্পোরেশনগুলো মশা নিধনের মূল কার্যক্রম হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় রুটিন করে সকাল-বিকাল কীটনাশক ( স্প্রেইং/ফগিং) প্রয়োগ করে থাকে এবং বর্ষা মৌসুমে (মশার সমস্যা যখন প্রকট হয়) এর অতি প্রয়োগ হতে দেখা যায়। তাই কীটনাশক ব্যবহারে করতে বেশকিছু বিষয়ে আমাদের মনোযোগী হওয়া দরকার।

কীটনাশক প্রতিরোধিতা যাচাই : ধারণা করা যায়, ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে মশা অনেকটা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। কীটনাশকে মশা এখন আর মরছে না। সাধারণ মানুষের অভিযোগ কীটনাশক প্রয়োগ করলেও এখন মশাকে আর মরে পড়ে থাকতে দেখা যায় না।

মনে রাখা প্রয়োজন, বছরের পর বছর একই কীটনাশকের ব্যবহারে (একই কার্যধরন হওয়ায়), মাত্রারিক্ত বা ভুল ডোজ প্রয়োগে মশা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। মশার নিজস্ব একটা ক্ষমতা আছে কীটনাশক প্রতিরোধী হওয়ার।

প্রতিকূল পরিবেশে মশা বাঁচার জন্য দেহের ফিজিওলজিক্যাল সিস্টেমের পরিবর্তন করতে প্রধানত সাইটোক্রোম পি-৪৫০ মনোঅক্সিজিনেজ এনজাইম তথা পি-৪৫০ জিন কে (কীটনাশক-প্রতিরোধী জিন) কাজে লাগায় এবং ধীরে ধীরে চরম প্রতিরোধী হয়ে ওঠে।

কীটনাশক দিয়ে এদের আর সহজে দমন করা যায় না। সুতরাং মাত্রাতিরিক্ত ডোজ ভয়ানক হতে পারে। তাই কীটনাশকের ভুল প্রয়োগ বা অতি প্রয়োগ করা যাবে না। এ ব্যাপারে আরও সচতেন হতে হবে।

মশা সত্যিই কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে কিনা কিংবা কোন প্রজাতির মশা কোথায় (বিভিন্ন টার্গেট এরিয়ায়) কী পরিমাণ কীটনাশক-প্রতিরোধী হয়েছে এবং এ প্রতিরোধের মাত্রা (রেজিস্টেন্স রেশিও) কেমন তা গবেষণা করে বের করতে হবে।

এটা অতীব জরুরি একটা বিষয়। এ গবেষণালব্ধ ফলাফলকে কাজে লাগিয়ে সঠিক কীটনাশক বাছাই করতে হবে এবং কীটনাশকের রিকমেন্ডেড ডোজ ঠিক করতে হবে। এ ধরনের গবেষণা প্রয়োজনমাফিক পরিচালনা করতে হবে।

সঠিক কীটনাশক বাছাই : কীটনাশক বাছাইয়ে আমাদের খুবই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। লক্ষ করা গেছে, মশা দমনে আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে (বছরের পর বছর) একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহার হয়ে আসছে। যার ফলে মশা কীটনাশক-প্রতিরোধী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তাই প্রয়োগ তালিকায় নতুন ও কার্যকর কীটনাশক (লার্ভিসাইড ও এডাল্টিসাইড) যোগ করতে হবে। একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহার পরিহার করতে হবে। বিভিন্ন গ্রুপের কীটনাশকের মধ্য থেকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও কার্যকর কীটনাশকগুলো বাছাই করতে হবে।

কীটনাশক (এডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড) নির্বাচন করার আগে তা প্রথমে ল্যাব টেস্ট (টক্সিসিটি বায়োঅ্যাসে) করতে হবে। কোন কীটনাশক (এডাল্টিসাইড/লার্ভিসাইড) কোন পরিণত মশা বা লার্ভাকে সফলভাবে দমন করতে পারে তা-ও ল্যাবে টেস্ট করে (টক্সিসিটি বায়োঅ্যাসে) জেনে নিতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে প্রয়োগ করতে হবে।

মনে রাখা প্রয়োজন, লার্ভা দমন (লার্ভিসাইডিং) হচ্ছে মশা দমনের মূল কার্যক্রম। একে মশা দমনের প্রধান হাতিয়ার বলা হয়ে থাকে। তাই আমাদের বেশি পরিমাণে লার্ভিসাইডিং করতে হবে এবং সঠিক, নিরাপদ ও কার্যকর লার্ভিসাইড ব্যবহার করতে হবে। আশ্চর্যের বিষয় হল, আমাদের প্রয়োগ তালিকায় কোনো বিশেষ লার্ভিসাইড নেই (যতদূর জানি!)।

অনেক দেশেই লার্ভিসাইড হিসেবে বিটিআই (বেসিলাস থুরেনজিনেসিস প্রোডাক্ট : তরল/পাউডার) ব্যবহার হচ্ছে। এটা খুবই কার্যকর, হয়তো দাম একটু বেশি। তাছাড়া কিছু নিরাপদ কীটনাশক যেমন- স্পাইনোসাদ, বিভিন্ন গ্রোথ রেগুলেটরস ইত্যাদি লার্ভিসাইড হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

কীটনাশক ক্রয় : বর্তমানে মশা দমনে প্রয়োজনীয় কীটনাশক ক্রয়ের দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনগুলোর। যতদূর জানি, মাত্র ২-৩টি কোম্পানির মাধ্যমে তারা বিশাল পরিমাণ কীটনাশক ক্রয় করে থাকে। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার কীটনাশক ক্রয় করা হচ্ছে। এখানেও শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত থাকার কথা শোনা যায়! সত্যিই এটি দুখঃজনক।

ইতিমধ্যে এগুলো নিয়ে কথা উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, লেখা হয়েছে জাতীয় দৈনিকে। যেভাবেই ক্রয় করা হোক না কেন, আমরা চাই কীটনাশক যাতে ভেজাল না হয়। মশা দমন একটি পাবলিক হেলথ ইস্যু, তাই এ ক্ষেত্রে কোনো আপস করা ঠিক হবে না। কীটনাশক ক্রয়ের ক্ষেত্রে তথাকথিত সিন্ডিকেট থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। আসল কীটনাশক ক্রয় নিশ্চিত করতে হবে।

কীটনাশক প্রয়োগ : মাঠ পর্যায়ে কীটনাশক প্রয়োগের জন্য যারা কাজ করবে অর্থাৎ স্প্রে-ম্যানদের বিভিন্ন গ্রুপের কীটনাশক সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকতে হবে। মশার জীবন সম্পর্কেও তাদের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। স্প্রে-ম্যানদের যথাযথ ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ টেকনেশিয়ানে রূপান্তর করতে হবে। স্প্রে-ম্যানরা যেন শুধু শ্রমিক শ্রেণির না হয়।

শ্রমিক দিয়ে মশার কীটনাশক প্রয়োগ করা ঠিক হবে না। উল্লেখ্য, এ বছর ঢাকায় সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন কর্মীদের সাধারণ মানুষের মুখের ওপর ফগিং করতে দেখা গেছে (আশকোনায় হাজীদের মুখে)। এতে আমাদের স্প্রে-ম্যানদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তাছাড়া স্প্রে-ম্যানদের এডিসসহ অন্যান্য মশা (কিউলেক্স, এনোফিলিস ইত্যাদি) শনাক্তকরণের পাশাপাশি, টার্গেট ও নন-টার্গেটস প্রজাতির প্রাণী চিনতে হবে এবং এদের রক্ষারও ব্যবস্থা নিতে হবে। মশার লার্ভার বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে তাদের ধারণা থাকতে হবে।

কীটনাশকের (এডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড) সঠিক ব্যবহারবিধি তাদের জানতে হবে। কীটনাশক প্রয়োগের জন্য নতুন নতুন মেশিন যোগ করতে হবে। এক্ষেত্রে থারমাল ফগার মেশিন ছাড়াও উন্নতমানের মেশিন যা খুবই কার্যকর; যেমন- আল্ট্রা লো ভলিউম স্প্রেয়ার (ইউএলবি স্প্রেয়ার) ব্যবহার করা যেতে পারে।

তাছাড়া কখন কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরিণত মশা মারতে গভীর রাতে বা ভোর সকালে (রাত ১১টা থেকে ভোর ৬টার মধ্যে) এডাল্টিসাইড প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। এ সময় মশা যেমন রেস্টিং পর্যায়ে থাকে আবার মানুষের আনাগোনাও কম থাকে।

কীটনাশকের কার্যকারিতা মনিটরিং : কীটনাশক (এডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড) প্রয়োগের পর এটি ঠিকমতো কাজ করছে কিনা অর্থাৎ পরিণত মশা বা লার্ভা মরছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

মোট কথা, কীটনাশকের কার্যকারিতা মনিটরিং করতে হবে। মাঠ পর্যায়ে কোনো কীটনাশক ঠিকমতো কাজ না করলে তা পরিবর্তন করে নতুন কার্যকর কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ