শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ঢাকার দূষিত বাতাস

বায়ুদূষণসহ রাজধানী ঢাকার পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিস্তর আলোচনা চলছে। প্রতিটি আলোচনার মূল কথায় একদিকে ঢাকাকে একটি প্রধান দূষিত নগরী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে। মাত্র মাস দেড়েক আগেও গত নভেম্বরের শেষ সপ্তাহের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বায়ুদূষণের দিক থেকে রাজধানী ঢাকা বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছে গেছে। গত ২৪ নভেম্বরের রিপোর্টটিতে বলা হয়েছিল, সেদিন ঢাকা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর। কোনো শহরের বায়ু দূষণের মাত্রা ৫০ পর্যন্ত হলেই শহরটিকে যেখানে অস্বাস্থ্যকর ও বিপদজনক হিসেবে গণ্য করা হয়, সেখানে ২৪ নভেম্বর ঢাকার দূষণের মাত্রা ছিল ১৯৪। কোনো কোনো গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, সেদিন দূষণের সূচক এমনকি ২০০-ও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এ ধরনের একটি আশংকাজনক রিপোর্টের পর আশা ও ধারণা করা হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকার নিশ্চয়ই পরিবেশ স্বাভাবিক করার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে উঠবে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি। ফলাফল যা হওয়ার ঠিক তা-ই হয়েছে। রাজধানীর বায়ুদূষণের মাত্রা বরং অনেক বেড়ে গেছে। গতকাল দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, দূষিত বাতাসের দিক থেকে ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় নগরীর অবস্থানে উঠে এসেছে। মঙ্গলবার, ১৭ ডিসেম্বর সকাল ১০টা ১৭ মিনিটে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে ঢাকার স্কোর ২১০-এ পৌঁছেছিল। এর অর্থ হলো, রাজধানীর বাতাসের মান অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। উল্লেখ্য, এ সময় ৩০০ স্কোর নিয়ে পাকিস্তানের লাহোর প্রথম স্থানে এবং ২০৮ স্কোর নিয়ে আফগানিস্তানের কাবুল ছিল তৃতীয় স্থানে। 

বলা দরকার, এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের মাধ্যমে প্রতিদিন বিভিন্ন শহরের বাতাসের মান তৈরি করে বাতাস কতটা স্বাস্থ্যসম্মত এবং দূষিত বাতাসের কারণে ওই শহরের মানুষেরা কি পরিমাণ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেÑ এসব বিষয়ে জানিয়ে দেয়া হয়। এটা একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং সব দেশই এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে থাকে। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেয় সব দেশ। ইনডেক্সের মান ২০১ থেকে ৩০০ পর্যন্ত হলে তার অশুভ প্রভাব পড়ে জনস্বাস্থ্যের ওপর। তেমন অবস্থায় বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ মানুষদের বাড়ির ভেতরে থাকার এবং বাইরে কোনো কার্যক্রম না চালানোর পরামর্শ দেয়া হয়। 

অন্যদিকে ইনডেক্সের স্কোর ৫০ হলে তাকে স্বাস্থ্যের জন্য মানসম্মত এবং স্কোর  ৫১ থেকে ১০০-র মধ্যে থাকলে তাকে গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়। আর স্কোর যদি ১০১ ছাড়িয়ে ১৫০ পর্যন্ত হয় তাহলেই তাকে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বিপদজনক মনে করা হয়। সেদিক থেকে ২১০-এ উঠে যাওয়ায় রাজধানী ঢাকার বাতাসের মান যে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও বিপদজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে সে কথা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না।

ভীতি ও উদ্বেগের কারণ হলো, বর্ষাকালে কিছুটা উন্নতি ঘটলেও শীতের শুকনো মৌসুমে বায়ুদূষণের মাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকবে বলে সতর্ক করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে দূষণ প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা তো নেয়া হচ্ছেই না, উল্টো মেট্রোরেল ধরনের নির্মাণ কাজের মাধ্যমে পরিবেশকে আরো বিপদজনক করে তোলা হচ্ছে। ফলে দূষণের সূচকও ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ভীতি ও উদ্বেগের অন্য এক প্রধান কারণ হলো, বায়ুদূষণের পরিণতিতে জটিল ও দুরারোগ্য নানা অসুখ-বিসুখই কেবল ছড়িয়ে পড়ছে না, দেশে মৃত্যুর হারও বেড়ে চলেছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে বায়ুদূষণের কারণে এক লাখ ২৩ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। এ সংক্রান্ত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বিশ্বের যে পাঁচটি দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। সে কারণে দুরারোগ্য নানা অসুখ-বিসুখ তো বাড়ছেই, মানুষের আয়ুও অনেক কমে যাচ্ছে। দেশের ও বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, উন্নয়নের নামে চলমান নির্মাণ কাজের পাশাপাশি ইটের ভাটাগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ কালো ধোয়া ঢাকার বাতাসে মিশতে থাকে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যানবাহনের কালো ধোয়া। এ দুটির সঙ্গে বিগত কয়েক বছরে যুক্ত হয়েছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ছড়িয়ে পড়া ধুলোবালি। ফ্লাইওভার এবং বিশেষ করে মেট্রোরেল লাইনের নির্মাণ উপলক্ষে বছরের পর বছর ধরে খোঁড়াখুঁড়ি চলতে থাকায় বাতাসে ধূলোবালির পরিমাণও আশংকাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। ফলে রাজধানীতে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে হৃদরোগ, ক্যান্সারসহ ফুসফুসের সংক্রমণ, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, চোখের সমস্যা, ডায়াবেটিস এবং নিউমোনিয়ার মতো বিভিন্ন রোগবালাই বেড়ে চলেছে। 

সব মিলিয়েই রাজধানী ঢাকার দূষিত বায়ু ও পরিবেশ যে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে সেকথা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতো আমরাও মনে করি, সরকারের উচিত বায়ুদূষণ প্রতিরোধের জন্য জরুরিভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া। মেট্রোরেল লাইনসহ সকল চলমান নির্মাণ কাজ দ্রুত সমাপ্ত করতে হবে এবং কাজ চলাকালীন সময়ে পানি ছেটানোর মতো এমন কিছু ব্যবস্থাকে বাধ্যতামূলক রাখতে হবে, যার ফলে বাতাসে ধূলোবালি ছড়িয়ে পড়তে না পারে। দ্বিতীয় একটি পদক্ষেপ হিসেবে রাজধানীর ভেতরে ও আশপাশ থেকে সকল ইটের ভাটা সরিয়ে দিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে বায়ুদূষণ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় অন্য সকল ব্যবস্থাও নিতে হবে কাল বিলম্ব না করে। আমরা চাই, রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশ বায়ুদূষণের কবলমুক্ত হোক এবং নিরাপদ হোক মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ