সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

ভেজাল ওষুধ বাড়াচ্ছে জীবনের ঝুঁকি

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : এমনিতেই মানুষের নানা অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে। কখন কাকে প্রাণঘাতী রোগ পেয়ে বসে বলা মুশকিল। এরপর ওষুধের নামে পকেটের অর্থ ব্যয় করে ভেজাল বা নকল ওষুধ অর্থাৎ বিষ কিনে খেয়ে অবলীলায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে বাধ্য হচ্ছে হতভাগ্য মানুষ। তাই অচিরেই ওষুধের ভেজালকারক হারামখোর বণিকদের পাকড়াও করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।
গত ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ প্রতিদিনের রিপোর্টে প্রকাশ, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের ব্যাপক সুনাম ও সুখ্যাতি সত্ত্বেও বাজারজুড়ে ভেজাল ওষুধের ছড়াছড়ি। বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। দামি দামি ওষুধ সেবন করে রোগমুক্ত হওয়া দূরে থাক, উল্টো  দুরারোগ্য অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে দেশের অগণিত মানুষ।
দেশের মোট চাহিদার ৯৭ শতাংশ পূরণ করে বিশ্বের ১৪৫টির বেশি দেশে রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ। গত পাঁচ বছরে ওষুধ রফতানি বেড়ে হয়েছে প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ সাফল্যের বিপরীতে দেশজুড়ে ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নি¤œমানের ওষুধের বিপণনে এ খাতের সব সম্ভাবনা পড়েছে প্রশ্নের মুখে।
কার্যকর সুপারভিশনের অভাবে দেশের হাজার হাজার ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ, ভেজাল ও মানহীন ওষুধ অবাধে বিক্রি হচ্ছে। বিশেষত মফস্বলের ফার্মেসিগুলোকে টার্গেট করে সংঘবদ্ধ চক্র মেয়াদোত্তীর্ণ, ভেজাল ও মানহীন ওষুধ ছড়িয়ে দিচ্ছে। বেশি মুনাফার লোভে একশ্রেণির বিক্রেতা সচেতনভাবেই এ চক্রে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ব্যবহার করে সুস্থতার বদলে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে লাখ লাখ মানুষ। উল্লেখ্য, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ উৎপাদক কোম্পানিগুলোর তত্ত্বাবধানে ধ্বংস করে ফেলবার নিয়ম থাকলেও সেই ওষুধ সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে লেভেল পাল্টে আবার ক্রেতার হাতে চলে যায়। জানা যায়, সম্প্রতি মাত্র দুই মাসে ৩৪ কোটি ৭ লাখ ৬৯ হাজার টাকার মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ধ্বংস করেছে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর। একই সময়ে মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল, ভেজাল ওষুধ সংরক্ষণের দায়ে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১ কোটি ৭৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা জরিমানাও আদায় করা হয়েছে। এ নিয়ে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ পরবর্তী আদেশের জন্য গত ১২ ডিসেম্বর দিন ধার্য করে দিয়েছিল। এর আগে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরকে বাজারে থাকা ভেজাল ওষুধের বিষয়ে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট। গত ১ আগস্ট থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল, ভেজাল ওষুধ বিক্রয়ে গৃহীত কার্যক্রম শীর্ষক ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের একটি রিপোর্ট গত ১৯ নভেম্বর আদালতে উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়, এ সময়ে ১৩ হাজার ৫৯৩টি ফার্মেসি পরিদর্শন করে মোবাইল কোর্টে ৫৭২টি মামলা করা হয়। এতে ১ কোটি ৭৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। একই সঙ্গে মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল, ভেজাল ওষুধ সংরক্ষণের দায়ে দুটো ফার্মেসি সিলগালা করা হয়। এ ছাড়া একই সময়ে ৩৪ কোটি ৭ লাখ ৬৯ হাজার  টাকার মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ধ্বংস করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, অসুস্থতায় ওষুধের ওপর নির্ভর করতে হয় মানুষকে। অসুখ থেকে মুক্তি পাবার প্রধান উপায় হচ্ছে কার্যকর ওষুধের ব্যবহার। কিন্তু অসাধু মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের কারণে জীবনরক্ষাকারী ওষুধও মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ওষুধ যদি মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল বা ভেজাল হয় তবে সুস্থ হবার পরিবর্তে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়ে যায়। মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।
সত্যি বলতে কী, দেশের ফার্মেসিগুলোয় ব্যাপকহারে নকল, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের ছড়াছড়িতে মানুষ ওষুধ সেবনের ব্যাপারেও এখন আতঙ্কিত। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর সারাদেশে পাঁচ শতাধিক মডেল ফার্মেসি ও মডেল মেডিসিন শপ নির্ধারণ করেছে। যেগুলোতে মানসম্পন্ন ওষুধ বিক্রির কথা। তবে এসব মডেল ফার্মেসি ও মডেল মেডিসিন শপের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর-সূত্র জানায়, সাধারণত ফার্মেসিগুলোয় মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ফার্মেসির সেলফ, ড্রয়ার কিংবা রেফ্রিজারেটর অথবা ফার্মেসির অন্য কোথাও পাওয়া গেলে সেগুলো জব্দ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবার কথা। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ আলাদা কনটেইনারে লাল কালি দিয়ে ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, বিক্রির জন্য নয়’ এমন কথা লেখে পৃথকভাবে সংরক্ষণ করবার নিয়ম রয়েছে। পাশাপাশি দ্রুতই সেগুলো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করতে হয়। এ বিষয়ে যথাযথ রেকর্ডও রাখতে বলা হয়েছে। ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া গেলে ফার্মেসিটি সিলগালা করে বন্ধ করাসহ মালিকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা পর্যন্ত নেবার বিধান রয়েছে। কিন্তু উল্টো মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের লেভেল টেম্পারিং করে সেগুলো বিক্রি করবার ঘটনা ঘটছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে মফস্বলের ফার্মেসি পর্যন্ত সর্বত্রই এসব মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, খোদ রাজধানীর ৯৩ শতাংশ ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি হয়। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর এ নগরীর ফার্মেসিগুলোর এমন অবস্থায় এটা নিশ্চিত যে, দেশের প্রায় সব ফার্মেসিতেই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। কোনও কোনও ওষুধের মোড়কসহ যেসব জায়গায় মেয়াদের উল্লেখ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই তা থাকে অস্পষ্ট। আবার এমনও অভিযোগ রয়েছে, মেয়াদ আছে এমন প্যাকেটে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রেখে বিক্রি করা হয়। ক্রেতারা সরল বিশ্বাসে ওষুধ কিনে প্রতারিত হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী অশিক্ষিত দরিদ্র শ্রেণির মানুষ।
অভিযোগ রয়েছে, নকল, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ প্রতিরোধে যাদের দায়িত্ব পালনের কথা, তাদের কার্যকর ভূমিকা দেখা যায় না। মূলত নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির গাফিলতির কারণে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে বাজার। অন্যদিকে নকল, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের চক্রটিও অত্যন্ত বেপরোয়া। এর আগে অভিযান চালিয়ে নকল-ভেজাল ওষুধের কারখানা বন্ধ করা হলেও ভিন্ন নামে তারা আবারও অবৈধ ব্যবসায় ফিরে আসে। গত ২৬ নভেম্বর মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল ও নিষিদ্ধ ওষুধ বিক্রি করায় রাজধানীর মিটফোর্ডের আলী মেডিসিন মার্কেটে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর ও র‌্যাব। এ সময় ১৩টি ওষুধের দোকানকে ২৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। দোকান থেকে বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল ওষুধ জব্দ করা হয়। ১৮ নভেম্বর মিটফোর্ডে ছয়টি ফার্মেসি থেকে ১ কোটি টাকা মূল্যের নকল সার্জিক্যাল সুতা, ডায়াবেটিস টেস্ট কিট ও ওষুধ জব্দ করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। নকল সামগ্রী বিক্রি করায় এসব প্রতিষ্ঠানকে ২৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ৭ নভেম্বর নকল কন্ট্যাক্ট লেন্স বিক্রি করায় রাজধানীর বিজয়নগরে একটি প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। জব্দ করা হয় ৬৪৮টি নকল কন্ট্যাক্ট লেন্স। এসব ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী র‌্যাব সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ‘ফার্মেসিগুলোয় মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ফার্মেসিতে পাওয়া যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ সরকারি ওষুধ। লেভেল পাল্টে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ আবার দেয়া হচ্ছে ভোক্তার হাতে। ফার্মেসি মালিকদের অসততায় জীবনরক্ষাকারী ওষুধ মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।’ ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ জব্দ করা চলমান প্রক্রিয়া। এজন্য আমরা মডেল ফার্মেসি তৈরি করছি। ফার্মেসিগুলোয় সচেতনতা তৈরির জন্য ফ্রি কনটেইনার দেয়া হচ্ছে। নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি বন্ধ করতে ফার্মেসি ম্যানেজমেন্ট নামে আমরা একটি সফটওয়্যার চালু করেছি। তামান্না ফার্মেসিতে এর পরীক্ষামূলক কাজ চলছে। এর খুঁটিনাটি সমস্যা সমাধান করে আগামী মাস থেকে সব ফার্মেসিতে আমরা এ অ্যাপস সংযুক্ত করবো। তাহলে কোন ওষুধের মেয়াদ কখন শেষ হবে তা জানা যাবে।’
সাধারণ খাদ্যপণ্য, প্রসাধনী, এমনকি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ পর্যন্ত নকল ও ভেজাল করছে ব্যবসায়ীরা। বিবেক, বিবেচনাবোধ, ন্যায়নীতি সবকিছু লোভের কাছে বিক্রি করে শুধু অর্থোপার্জন মূখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের কাছে। এমন ভ্রষ্টতা সব সেক্টরকে গ্রাস করে ফেললে সমাজ কীভাবে টিকবে জানেন কেউ?
সব রকম ভেজাল বা নকলই মানবজীবনের জন্য কমবেশ ক্ষতিকর হতে পারে। আবার নাও হতে পারে। যেমন: মিনিকেট চালের ভেজাল। এ চাল বাংলাদেশে উৎপন্ন হয় না। কিন্তু কমদামের ইরি চাল মেশিনে ছেঁটে চিকন করে মিনিকেট বলে চালিয়ে দেয়া হয়। গ্রাহকদের কাছ থেকে বেশি দামও নেয়া হয়। এটাও অন্যায় এবং অপরাধ। প্রতারণা। কিন্তু জীবনঘাতী নয়। এ চালের ভাত খেয়ে মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রাণে মারা যায় না। তবে ঠকে। প্রসাধনীর নকল বা ভেজাল ব্যবহার করে মানুষ সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। ধীরে ধীরে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে শরীরে বা চামড়ায়। হ্যাঁ, নকল বা ভেজাল প্রসাধনী দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে প্রাণঘাতী ক্যান্সারও হতে পারে। এ ছাড়া প্রসাধনীও এক রকমের মেডিসিন। কাজেই চালের ভেজালের চাইতে প্রসাধনীর ভেজাল বা নকল মারাত্মক।
উদ্বেগজনক খবর হচ্ছে, অবিকল ধানের চালের মতো প্লাস্টিকের নকল চাল বেরিয়েছে। চিনারা নাকি এ অপকর্মটি করেছে। কিন্তু এর বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে কেউ যদি সত্যি সত্যি প্লাস্টিকের চাল বানায় এবং এর ভাত কেউ খায় তাহলে তা মানবজীবন তথা সভ্যতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ওষুধের ব্যবহার মানুষের জীবনরক্ষার জন্য। রোগযন্ত্রণা থেকে বাঁচতে এবং বাঁচাতেই ওষুধ নামক পণ্য আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। এ তাঁদের অনন্য অবদান বটে। এর চাইতে মহৎ কাজ আর কী হতে পারে আমি জানি না। কিন্তু জীবনরক্ষাকারী এ ওষুধ যারা নকল বা ভেজাল করবার মাধ্যমে  মানুষের জীবন বিপন্ন করে তোলে বা মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় তারা মানুষ নামের কলঙ্ক। এ নরাধমদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা খুব জরুরি।
বিভিন্ন হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনার নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। এমন অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত আছেন এক শ্রেণির চিকিৎসকও। নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বাজারজাতকরণ এবং কমিশনের বিনিময়ে প্রেসক্রিপশনে লেখবার অভিযোগও রয়েছে অনেক ডাক্তারের বিরুদ্ধে। এ হচ্ছে আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ