মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ শতাংশ খরচ করেও উপযুক্ত সেবা পাচ্ছে না মানুষ

মুহাম্মদ নূরে আলম: মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত দেশের ৫০ ভাগ মানুষ, বেসরকারি খাতে উচ্চমাত্রায় অর্থব্যয় করেও স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না গ্রামের সাধারণ মানুষ। সরকারি পর্যায়ে নীতিনির্ধারণেই কেটে গেছে পাঁচ বছর, দেশের সার্বিকভাবে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বাড়লেও সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সেবার মান বাড়েনি। বর্তমানে স্বাস্থ্য সেবা পেতে দেশের মানুষের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭০ ভাগ পকেট থেকেই করতে হয়। কয়েক বছর আগেও যা ছিল ৬৩ ভাগ। দেশের উন্নয়ন স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজন জনগণের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। কিন্তু সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বাস্তবায়নে দেশ অনেক পিছিয়ে। এজন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি (ইউএইচসি) বাস্তবায়নের বিকল্প নেই বলে মনে করেন দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি কেমন হবে, এর আওতায় সেবার পরিধি কতটা থাকবে, জনঅংশগ্রহণ কিভাবে নিশ্চিত করা যাবে, আর্থিক নিশ্চয়তা ইত্যাদি নীতি-নির্ধারণেই কেটে গেছে পাঁচ বছর। এতে এটি বাস্তবায়ন নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। আর এসব দুর্বলতায় মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়ে গেছে। নির্ধারিত সময়ে ইউএইচসি বাস্তবায়ন করতে না পারলে এ খাতে ব্যক্তিগত ব্যয় বাড়তে থাকবে। আর তাই স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে দেশের মানুষের একটি বড় অংশ সর্বশান্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে, গবেষণায় দেখা গেছে- দেশে ৪০ ভাগ মানুষের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা হলেও ৫০ ভাগ মানুষ গুণগত সেবা পাচ্ছে না। অথচ আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। 

অথচ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল কথা হচ্ছে, সব মানুষ প্রয়োজনের সময় মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা পাবে। চিকিৎসাসেবা কিনতে গিয়ে কেউ দরিদ্র হয়ে পড়বে না। উদ্দেশ্য অর্জনে কৌশল হিসেবে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি অপচয় ও দুর্নীতি কমাতে হবে। স্বাস্থ্য বীমা মানুষকে সেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দেবে। ২০০০ সালের পর থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ধারণা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করার চেষ্টা করছে। 

বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ একাউন্টের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় ৩৭ ডলার। এর মধ্যে সরকার ৯ ডলার এবং দাতা সংস্থা ৩ ডলার বহন করছে। বাকি ২৫ ডলার ব্যক্তি নিজে বহন করে। প্রতি ডলার ৮৬ টাকা ধরা হলে এটি ৩ হাজার ১৮২ টাকা হয়। এ হিসাবে সরকার ৭৭৪ টাকা এবং দাতা সংস্থা ২৫৮ টাকা বহন করে। আর ২ হাজার ১৫০ টাকা বহন করতে হয় ব্যক্তির নিজেকে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের মাথাপিছু ব্যয় সর্বনিম্ন ৩৬ ডলার। অপর দিকে ভারত ৭৫ ডলার, শ্রীলংকা ১৫১ ডলার, মালদ্বীপ ৭৮ ডলার ও নেপাল ৪০ ডলার ব্যয় করে।

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, দেশের সব জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার লক্ষ্যে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ কর্মসূচি চালু করা হয় ২০১২ সালে। ২০৩২ সালের মধ্যে সব জনগোষ্ঠীকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। গত পাঁচ বছর ধরে এ কর্মসূচি চলছে। কর্মসূচির অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় সব মানুষকে নিয়ে আসতে হলে কী কী কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে, কোন পদ্ধতিতে এটি বাস্তবায়ন করা হবে, এসব নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে সর্বজননীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সব মানুষকে নিয়ে আসার বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট গাইডলাইন নির্ধারণ করা হয়েছে। এ কাভারেজের আওতায় অ্যাডভোকেসি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সব মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় আনা সম্ভব।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ডা. শাহাদৎ হোসেন মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয়ে বাংলাদেশ কেবল পাকিস্তানের ওপরে রয়েছে। অন্যান্য দেশের অবস্থা অনেক ওপরে। আমাদের সম্পদ সীমিত। এই সীমিত সম্পদের সদ্ব্যবহার করে জনগণের জন্য সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যখাতে ২০১৭ সালে ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যায়ের মাথাপিছু ৩৭ ডলার খরচ হচ্ছে বলে সরকারিভাবে বলা হচ্ছে। সে ব্যয়েরও সঠিক ব্যবহার নেই। অথচ প্রয়োজন ৬০ দশমিক ৫ ডলার। তাই বাধ্য হয়েই মানুষ ব্যক্তিগতভাবে সেবা নিচ্ছে। আবার এ ব্যায় বেশি হওয়ার কারণে ৪ শতাংশ মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ গণমাধ্যমকে বলেন, স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে ব্যক্তি যেন মানসম্পন্ন সেবা সঠিকভাবে পায় এবং প্রয়োজনীয় সেবা নিতে গিয়ে মানুষকে যেন নিঃস্ব হতে না হয় সে জন্যই সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, ঢাকার ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা পাচ্ছেনা। তাই গত ৫ বছর ধরে ইউএইচসি শহর, নগর, গ্রাম থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সবার মাঝে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে কাজ করছে। তিনি আরো বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে- যতটুকু সেবা দরকার ততটুকু দিতে হবে। এমনকি এ জন্য যতটুকু খরচ তার বেশি যেন না হয়, সেটিই কোয়ালিটি হেলথ কেয়ার।

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ আরও বলেন, টাকার অংকে বড় হলেও প্রতি বছর বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ হ্রাস পাচ্ছে। চলতি বছর মোট বাজেটের মাত্র ৫ দশমিক ২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে জনপ্রতি স্বাস্থ্যসেবার জন্য সরকারিভাবে ৩৭ ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজন ৮৫ থেকে ১১২ ডলার। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় এটি অনেক বেশি। এ বিষয়ে সরকারকে চিন্তাভাবনা করতে হবে। অন্যথায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সব মানুষকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হবে না।

জানা গেছে, ২০১১ সালে ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্ব^লির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা’র উদ্যোগ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ টাঙ্গাইল জেলার ৩টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প শুরু করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হেলথ ইকোনমিক্স ইউনিট। তিন বছরের জন্য এ প্রকল্প পরিচালিত হওয়ার কথা। এ পাইলট প্রকল্পের সফলতা বা ব্যর্থতার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। সেক্ষেত্রে ওই কর্মসূচি শেষ হতে এখনো দু’বছর বাকী। অর্থাৎ ইউএইচসি কর্মসূচি বাস্তবায়নে আরও দু’বছর পিছিয়ে যাবে বাংলাদেশ। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা। 

কমিউনিটি ক্লিনিক মডেল অনুসরণ করতে অন্যান্য দেশকে আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। স্বাস্থ্য খাতে এত উন্নয়নের পরও সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়নি। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ সুরক্ষার বাইরে রয়েছে এখনও। এমনকি মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান কেবল পাকিস্তানের ওপরে। জনগণের মাথাপিছু যে স্বাস্থ্য ব্যয় ধরা হয়েছে, তা দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ নিজেই বহন করছে। এ অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- অঙ্গীকার রক্ষা করুন। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় একশ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে এবং তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে এবং প্রতি বছর অসুস্থতার কারণে ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের শিকার হচ্ছে।

এদিকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবস-২০১৯ উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সেমিনারের আয়োজন করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ