শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বেসামাল খুলনার চালের বাজার

খুলনা অফিস : খুলনা মহানগরী ও জেলায় চালের বাজার এখন ঊর্ধ্বমুখী। দাম বাড়ছে দফায় দফায়। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের চালের মূল্য প্রকারভেদে কেজিপ্রতি ২ টাকা থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাজারে এক ধরনের অরাজকতা বিরাজ করছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ‘চালের বাজারে যেনো আগুন লেগেছে’।
এদিকে, চাল ব্যবসায়ীরা চালের দাম বৃদ্ধির জন্য চালকল মালিকদের দায়ী করেছেন। তারা বলছেন, নতুন ধান বাজারে আসার মুহূর্তেই তারা দাম বৃদ্ধি করে এক ধরনের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে মিল মালিকদের দাবি, সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড়ে খুলনাঞ্চলের বহু জমির ধান ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে কারণে আপাতত কিছুটা সঙ্কট দেখা দিয়েছে। তবে, বাজারে নতুন চালের সরবরাহ বাড়লে দাম স্বাভাবিক হবে।
অন্যদিকে বাজারে আলু, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে এখন শীতকালে শাক-সবজির উৎপাদন মৌসুম হলেও সিম, পালং শাক, ফুলকপি, ওলকপি ও বাঁধাকপিসহ সব ধরনের সবজির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ধীরে ধীরে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।
খুলনার বিভিন্ন পাইকারী ও খুচরা চালের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে বাজারে সব ধরনের চালের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে মিনিকেট কেজিপ্রতি ৮-১০ টাকা বেড়ে ৪৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এভাবে বাশমতি ৭-৮ টাকা বেড়ে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, ২৮ বালাম ৪-৫ টাকা বেড়ে ৩৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, মোটা ও স্বর্ণা ২ টাকা বেড়ে ৩২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, বিশ্বাস মিনিকেট ৮-১০ টাকা বেড়ে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আঙ্গুর বাশমতি ৮ টাকা বেড়ে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, এরফান মিনিকেট ৬ টাকা বেড়ে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, মুকুট মিনিকেট ৬ টাকা বেড়ে ৪৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, ২৮ পরশ বালাম ৬ টাকা বেড়ে ৩৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, ময়ূর-২৮ ৪ টাকা বেড়ে ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে,, মজুমদার-২৮ ৪ টাকা বেড়ে ৩৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, ইরি আতপ ৩ টাকা বেড়ে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, ১৮ আতপ আতপ ২ টাকা বেড়ে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে ও ভাইটাল আতপ ২ টাকা বেড়ে ৪২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বড় বাজারের মেসার্স এসএম ট্রেডার্সের বিক্রেতা মো. রুবেল জমাদ্দার বলেন, বর্তমানে বাজারে সব ধরনের চালের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, বাজারে নতুন চাল আসলে দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
পাইকারী বিক্রেতা মেসার্স আশরাফ ভা-ারের আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মিল মালিকরা চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বেশি দামে কেনার কারণে আমাদেরও বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। তবে, চালকল মালিকরা দাম কমালে পাইকারী ও খুচরা দোকানেও চালের দাম কমে আসবে বলেও জানান তিনি। অপর বিক্রেতা মো. জাকির হোসেন বলেন, এখন পাইকারী ও খুচরা বাজারে সব ধরনের চালের দাম বাড়তি। আবার নতুন চাল বাজারে আসার পর মিল মালিকরা যদি দাম না কমায় তাহলে তো আমাদের কমানোর কোনো সুযোগ নেই।
বড় বাজারের খুচরা তেল ব্যবসায়ী শেখ ফরিদ জানান, বর্তমানে সয়াবিন তেল প্রতি কেজিতে ৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, বিক্রি হচ্ছে ৮৭-৮৮ টাকা, ভালো মানের সরিষার তেল কেজিপ্রতি ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা, পাম সুপার প্রতি কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ৭৪-৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, শীতকালে খুচরা ও খোলা তেলের উৎপাদন কম হওয়ার ফলে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া সয়াবিন তেলের কাঁচামাল মালয়েশিয়া ও আমেরিকা থেকে আসে। কিন্তু শীতকালে চাহিদা অনুযায়ী তেলের আমদানি কম। গরম হলে উৎপাদন বেশি হয়।
অপর ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসেন বাবু বলেন, প্যাকেটজাত ও খোলা তেলের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে রূপচাঁদা, ফ্রেশ, মোস্তফা ও বসুন্ধরা পাঁচ লিটারের বোতলজাত তেল ১০ টাকা করে বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে আলু বিক্রেতা আবুল কালাম বলেন, আগের তুলনায় পুরাতন আলু কেজিপ্রতি ৫-৬ টাকা বেড়েছে।
তাজ এন্টারপ্রাইজের শহীদুল ইসলাম বলেন, চাহিদা অনুযায়ী পেঁয়াজের মজুদ এবং বিক্রিও কম। তবে, তুরস্কের পেঁয়াজের মান ভালো হলেও বিক্রি কম। বর্তমান বাজারে বার্মার পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ১৮০-১৯৫ টাকা। তবে, তুরস্কের পেঁয়াজ ২০০-২২০ এবং দেশি পেঁয়াজের মূল্যও প্রায় একই।
মেসার্স নিশাত বাণিজ্য ভা-ারের প্রোপ্রাইটর মো. সুজন হাওলাদার বলেন, চাহিদা অনুযায়ী পেঁয়াজের মজুদ চার ভাগের এক ভাগ, তবে আমদানি খুবই কম। পাকিস্তানী পেঁয়াজ (বড়) ১৫০ টাকা এবং ছোট ১৬৫ টাকা পাইকারী দরে বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে দেশি পেঁয়াজের উৎপাদন এবং তা বাজারে সরবরাহ বাড়লে দাম আরও কমে আসবে বলেও ধারণা দেন তিনি।
কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) খুলনার সভাপতি এডভোকেট এনায়েত আলী বলেন, বিদেশ থেকে কার্গোবিমানে পেঁয়াজ আমদানি করা হচ্ছে, তার প্রভাব বাজারে পড়ছে না কেন? চালের সংকট নেই, উঠছে আমন ধান; এ মুহূর্তে কেন চালের মূল্য বৃদ্ধি? শীতকালীন শাক-সবজির মূল্য অনেক বেশি। নিয়মিত বাজার মনিটরিং কার্যক্রম চালু থাকলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য রুখে দেয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
জনউদ্যোগ খুলনার আহ্বায়ক এডভোকেট কুদরত-ই খুদা বলেন, একবার একটি পণ্যের দাম বাড়লে, সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও সেই পন্যর আর দাম পূর্বের স্থানে আসে না। এভাবে প্রত্যেকটি পন্যের দাম বাড়ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকলে অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ এ জেলার ২৫ হাজার হেক্টর জমির আমন ধানের ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার ক্ষতির পরিমাণ ২৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। একই ভাবে ৮৬৪ হেক্টর জমির শাক-সবজি নষ্ট হয়ে কৃষকের ক্ষতি হয়েছে ১২ কোটি ৩ লাখ টাকা এবং ১৫২ হেক্টর জমির কলা ও পেঁপে গাছ মাটির সঙ্গে মিশে কৃষকের ৩ কোটি ১৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ