শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

রেলের দুর্ঘটনার ৮০ শতাংশের বেশি ঘটে ভুলে কিংবা অবহেলায়

আল আমিন : নিরাপদ বাহন হিসেবে যাত্রীদের পছন্দের শীর্ষে ট্রেন। কিন্তু একের পর এক দুর্ঘটনায় সেই বাহনই এখন যাত্রীদের কাছে হয়ে উঠছে আতংক। ঘন ঘন দুর্ঘটনার ফলে রেলপথে যাত্রায় মানুষের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। ফলে সরকারি এই সেবাখাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।  বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত বিশ্ব রেল দুর্ঘটনা রোধে নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও বাংলাদেশের রেলে এখনও সেই প্রযুক্তি ব্যবহার সংযোজিত হয়নি। ফলে রেল দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। এছাড়াও কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারি না থাকা, রেলপথে পর্যাপ্ত পাথর না থাকা, স্লিপার, নাট-বল্টু চুরি হওয়া, আধুনিক প্রযুক্তির কন্ট্রোল ব্যবস্থা না থাকা ও দক্ষ প্রশিক্ষিত চালকের অভাবেই রেল দুর্ঘটনা ঘটছে।
 রেল দুর্ঘটনার ৮০ শতাংশের বেশি ঘটছে কর্মীদের ভুলে কিংবা অবহেলায়। চালকের দোষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ট্রেন দুর্ঘটনায় ১৬ জনের প্রাণহানি হয়। আর সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার দুর্ঘটনার পেছনে প্রাথমিকভাবে স্টেশনমাস্টার অথবা লাইন মেরামতে যুক্ত কর্মীদের ভুল দেখছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। এভাবে একের পর এক ট্রেন দুর্ঘটনায় রেল ব্যবস্থাপনা দিন দিন ভেঙে পড়ছে কি না, সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, দুর্ঘটনা রোধে রেলের অনেক বিধিবিধান রয়েছে, সেগুলো মেনে চলতে পারলে বর্তমান পদ্ধতিতেই দুর্ঘটনা অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।
একটি বেসরকারি গবেষণা বলছে, মূলত ২০১০ সাল থেকেই বাংলাদেশে রেল দুর্ঘটনা বাড়তে থাকে। পরিসংখ্যান বলছে, গত ১০ বছরেই বাংলাদেশের রেলপথে প্রায় দুই হাজার ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় আড়াই শতাধিক যাত্রী। আহত হয়েছেন হাজারো।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থায় রেলওয়েকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। উন্নয়ন বাজেটেও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর পরেও তেমন কোনো সুফল মিলছে না। রেলকে ঢেলে সাজানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা।
রেলের হিসাব মতে, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত মোট এক হাজার ৯৩টি রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। আর ২০১৪ সালের জুন থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দুর্ঘটনা ঘটেছে ৮৬৮টি। সব মিলিয়ে গত ১০ বছরে মোট এক হাজার ৯৬১টি রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে রেলের ক্ষতি হয়েছে হাজার কোটি টাকারও বেশি। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৬৩ জন। গত ১২ নভেম্বর দিনগত রাত ৩টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দবাগে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী তূর্ণা-নিশীথা ও সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেন দু’টির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ১৬ জন ট্রেনযাত্রী নিহত হন। এর আগে গত ২৩ জুন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় উপবন এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হয়ে আরও চারজন নিহত হন।
ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৩ সাল থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত রেলওয়েতে এক হাজার ৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। সেসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১১৫ জন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, ২০১৮ সালে সড়ক-রেল-নৌপথ ও আকাশপথে ৬ হাজার ৪৮টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭ হাজার ৭৯৬ জন। একই সঙ্গে এ দুর্ঘটনায় আরও ১৫ হাজার ৯৮০ জন আহত হয়েছেন।
ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্টের গবেষণায় উঠে এসেছে, ট্রেন দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে লাইনচ্যুতির ৭৫ শতাংশই ঘটছে রেললাইনের কারণে। এর অন্যতম কারণ যন্ত্রাংশের সংকট ও রেলপথের যন্ত্রপাতি চুরি। রেলপথে পর্যাপ্ত পাথরের অভাব এবং ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর কারণেও ঘটছে দুর্ঘটনা।
গবেষণা বলছে, সারাদেশে দুই হাজার ৯২৯ কিলোমিটার রেললাইনের মধ্যে মানসম্পন্ন রেললাইন মাত্র ৭৩৯ কিলোমিটার। যা মোট রেললাইনের ২৫ দশমিক ২৩ শতাংশ।
রেলওয়ে সূত্র বলছে, গত পাঁচ বছরের দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করে দুর্ঘটনার দুটি কারণ পাওয়া যায়। প্রথমত, মানবিক ভুল (হিউম্যান এরর); দ্বিতীয়ত, কারিগরি ত্রুটি। গড়ে ৮০ শতাংশের বেশি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী মানুষের ভুল। অর্থাৎ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভুলে বা অবহেলায় দুর্ঘটনা ঘটছে। মানুষের ভুলের মধ্যে রয়েছে লাইন পরিবর্তনের জোড়া (পয়েন্টস) ভুলভাবে স্থাপন করা ও ভুল সংকেত দেওয়া। এ কাজগুলো সাধারণত স্টেশনমাস্টার ও তাঁর অধীন ব্যক্তিদের কাজ। সংকেত ও যথাযথ গতিনির্দেশিকা না মেনে ট্রেন চালান চালক ও সহকারী চালকেরা। অন্যদিকে কারিগরি ত্রুটির মধ্যে লাইনের ত্রুটি, ইঞ্জিন-কোচের ত্রুটি বড়।
 রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে সূত্র বলছে, মানুষের ভুল এড়ানো সম্ভব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। কড়া শাস্তি দিয়েও দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যায়। কিন্তু রেলে মানুষের করা ভুল শোধরানোর জন্য তেমন কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। আর শাস্তি কেবল নিচের দিকের কর্মীদের হয়। তদন্তে বড় কর্মকর্তাদের নাম আসে না, শাস্তিও হয় না। তবে কারিগরি ত্রুটি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও লোকবল আছে। গত ১১ বছরে রেলের উন্নয়নে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে সরকার। লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সাড়ে ১৩ হাজারের বেশি।
রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, তিন দিনের ব্যবধানে দুটি বড় দুর্ঘটনা ঘটল কর্মীদের ভুলে। এর আগে কুলাউড়ার দুর্ঘটনা ঘটেছে লাইনে ত্রুটির কারণে। অর্থাৎ রেলের কর্মীরা যেমন ভুল করছেন। আবার কারিগরি ত্রুটিও আছে। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে রেলের ব্যবস্থাপনায়ও গলদ আছে। তাঁরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই রেল লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে চলছে। দৈনন্দিন রেল পরিচালনাতেই বছরে লোকসান প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। সারা বিশ্বেই রেলকে নিরাপদ বাহন মনে করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে লোকসানের পাশাপাশি এর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রেলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ কারিগরি নিরাপত্তার বিধান করা আছে। এটা নির্ভর করে রেলের কর্মীদের ওপর। কর্মীরা সেই কাজটিই ঠিকভাবে করছেন না। যেমন, রেলের ইঞ্জিনে এমন কারিগরি ব্যবস্থা আছে যে, চালক ও সহকারী চালক অলস বসে থাকলে ট্রেন চলবেই না। চালক বা সহকারী চালক যদি একটানা ৫০ সেকেন্ড স্পিড বাড়ানো, কমানো, ব্রেক করা, হর্ন দেওয়ার কাজ না করেন, তাহলে এক মিনিটের মধ্যে ট্রেন থেমে যাবে। এর বাইরে ‘ডেডম্যান প্যাডেল’ বলে একটা ব্যবস্থা আছে। অর্থাৎ ব্রেক কিংবা গতি বাড়ানোসহ চালকের যদি কিছুই না করার থাকে, তাহলে চালককে একটি নির্দিষ্ট বাটন চাপতে হয়। মূলত চালকেরা ঘুমিয়ে গিয়ে যাতে দুর্ঘটনায় না পড়েন, সে জন্যেই এই ব্যবস্থা। কিন্তু রেলের প্রায় সব ইঞ্জিনেই এই ব্যবস্থা বিকল করা আছে।
একটি সূত্র জানায়, উল্লাপাড়ায় রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ওই স্টেশনে না থেমে সরাসরি চলে যাওয়ার কথা। এখানে স্টেশনমাস্টারের কাজ হচ্ছে সোজা মূল যে লাইনে ট্রেনটি চলার কথা, সেই অনুসারে জোড়া (পয়েন্টস) ঠিক করে সংকেত দেওয়া। সেটা তিনি ঠিকভাবে করেছেন কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। স্টেশনমাস্টারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা নিজেরা দায়িত্ব পালন না করে পয়েন্টসম্যানদের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দেন।
পুরকৌশল বিভাগের দায়িত্ব হচ্ছে লাইনে ত্রুটি হলে সেটা যথাযথভাবে মেরামত করা। পাশাপাশি তা স্টেশনমাস্টার, এমনকি চালককেও সেটা জানানোর কথা। তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, স্টেশনমাস্টার বা প্রকৌশলী নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেননি। লাইন মেরামতের চেয়ে বড় বড় প্রকল্পের পেছনে বেশি ছোটার অভিযোগ আছে প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে।
একের পর এক ভুল হতে থাকলেও কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে রেলের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কয়েক বছর ধরে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি করছে সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। রেলের সঙ্গে করা চুক্তি অনুসারে, প্রতিটি কর্মীকে বছরে অন্তত ৬০ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথা। কিন্তু গত সেপ্টেম্বরের বৈঠক অনুসারে এ ধরনের প্রশিক্ষণের সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বর্তমানে রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ২৫ হাজার। এর মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের ভেতরে মাত্র ৫৭৯ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাও সভা-সেমিনার ধরনের প্রশিক্ষণই বেশি। এ সময় প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে গেছেন ১৫৮ জন।
রেল পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ‘রানিং স্টাফ’ বলা হয়। এর মধ্যে চালক, সহকারী চালক, পরিচালক (গার্ড), স্টেশনমাস্টার রয়েছেন। এদের প্রত্যেককে বাধ্যতামূলক ডোপ টেস্ট (মাদক পরীক্ষা) করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু তা হয় না বলে রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে।
রেলের পরিচালনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, আগের সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, তা পর্যালোচনা, ত্রুটি চিহ্নিত করা এবং তা সমাধানের লক্ষ্যে কয়েক মাস পরপর সর্বোচ্চ পর্যায়ে বৈঠক হয়। এটাকে অপারেশনাল রিভিউ মিটিং বলা হয়। গত ৭ অক্টোবরের সর্বশেষ বৈঠকে ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত সব কর্মীর মাদক পরীক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। তবে তা করা হয়নি। ওই বৈঠকে ট্রেন দুর্ঘটনার জন্য শুধু নিচের স্তরের কর্মীদের দায়ী না করে কর্মকর্তাদেরও দায়ী করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। ট্রেন দুর্ঘটনায় বড় কোনো কর্মকর্তার শাস্তির নজির খুব একটা নেই বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞ যা বলেন: পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, রেলে অব্যবস্থাপনার দুটি কারণ তাঁর চোখে পড়েছে। রেলের জনবলের ওপরের দিকের অর্থাৎ বড় কর্তাদের একটা বড় অংশের মনোযোগ এখন উন্নয়ন প্রকল্পে। কারণ, সেখানে প্রচুর পয়সা আছে। ফলে দৈনন্দিন ট্রেন পরিচালনায় তাঁদের মনোযোগ কম। অন্যদিকে গত এক দশকে নিচের দিকে বিপুল সংখ্যায় লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাদের একটা বড় অংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। এদের একটা বড় অংশ পয়সা দিয়ে চাকরি পেয়েছে। ফলে নিজের দায়িত্বটা ঠিকভাবে পালন করছেন না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ