শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

রেল দুর্ঘটনা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে

আখতার হামিদ খান : ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় লাইনচ্যুত হয়েছে। এতে ট্রেনের কটি বগিতে আগুন লেগে যায়। কিছু যাত্রী আহত হলেও, আশার কথা কেউ নিহত হননি। রেলপথের সিগন্যাল ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে করছেন রেলসচিব। সিগন্যালের যে অংশটি দিয়ে ট্রেনকে এক লাইন থেকে অন্য লাইনে যেতে সাহায্য করে, সেখানে ত্রুটি থাকতে পারে বলে ধারণা তার। যদিও তিনি তদন্তের অজুহাত দিয়ে এ দায় কার সেটি উল্লেখ করেননি। এ ঘটনার মাত্র দুদিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নারী, শিশুসহ ১৬ জন প্রাণ হারান এবং বহু লোক আহত হন। মানুষের মনে সেই বেদনাবহ ঘটনার রেশ কাটেনি এখনো। এ নিয়ে সংসদে রেলমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দেন দুর্ঘটনা এড়াতে তারা ভবিষ্যতে সতর্ক থাকবেন। তার মাত্র এক দিন পরই ঘটল উল্লাপাড়ার ট্রেন দুর্ঘটনা। যদি সতর্কতার নমুনাটি এমনই হয়, তবে সরকার রেল নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়বে। রেল মন্ত্রণালয়ের উচিত রেলের উন্নয়নে তাদের চিন্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে আরও ঢেলে সাজানো।
সম্প্রতি রেল দুর্ঘটনা যেন বেড়েই চলেছে। কিছুদিন আগে সান্তাহার থেকে ছেড়ে আসা পঞ্চগড়গামী উত্তরবঙ্গ মেইল ট্রেনটি রংপুরের কাউনিয়া স্টেশনে পৌঁছানোর পর বিকেল সোয়া ৪টার দিকে চালক ইঞ্জিন পরিবর্তন করছিলেন। ট্রেনের ইঞ্জিন ঘোরাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলে একজন নিহত এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৫০-৬০ যাত্রী। এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের কেওয়াটখালীতে দেওয়ানগঞ্জগামী তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে দেড় ঘণ্টা ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। ২৩ জুন রাতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় উপবন ট্রেনের ছয়টি বগি লাইনচ্যুত হলে চারজনের প্রাণহানি ঘটে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে, এভাবে গত ১০ বছরে ৪ হাজার ৭৯৮টি ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪০৮ জন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় ট্রেনের চালকসহ কয়েকজনকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তাদের ব্যর্থতাকেই দায়ী করছে সবাই। কিন্তু সোজা চোখে এই দায় শুধু চালকদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে প্রশান্তি পেলেই চলবে না। একজন চালক কেন সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলেন? কেন তাদের অসতর্কতায় রেল দুর্ঘটনার মতো পরিস্থিতি ঘটছে? অন্তরালের সেই কারণগুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে খুঁজে বের করে সমাধানের পথে এগোতে হবে। ট্রেনের চালকদের দুই বছরের প্রশিক্ষণ দিয়ে তবেই রেলপথে নামানো হয়। ফলে তারা অদক্ষ- এমনটা বলার সুযোগ নেই। বরং রেল মন্ত্রণালয়ে বর্তমানে ট্রেনের চালক সংকট প্রবল। এর ফলে তাদের রোস্টার ঠিক থাকছে না এবং প্রায় চব্বিশ ঘণ্টাই ডিউটিতে থাকতে হচ্ছে। ১৯৭৩ সালে রেলে জনবল ছিল ৬৮ হাজার। তখন মানুষ ছিল সাত কোটি। ১৯৮৬ সাল থেকে জনবল নিয়োগ বন্ধই ছিল। এর মধ্যে বিএনপি সরকার এসে একসঙ্গে ১০ হাজার লোককে রেল থেকে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায় করে দেয়। মূলত এরপর থেকেই সংকটে পর এই রেল খাত। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পৃথক রেল মন্ত্রণালয় গঠন করা হলেও সংকট কাটিয়ে ওঠা যায়নি। ফলে এখন ১৬-১৭ কোটি মানুষের দেশে রেলের জনবল ২৭ হাজার। পরিস্থিতি সামাল দিতে বহু চালককে অবসরে না পাঠিয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে রেখেছে রেল র্কর্তৃপক্ষ।
সম্প্রতি একজন নারী রেলচালক দুর্ঘটনা নিয়ে দুঃখের সঙ্গে গণমাধ্যমে তার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন ঠিক এভাবে- “ট্রেনে রয়েছে দুই ধরনের ব্যবস্থা। অটোমেটিক ও ম্যানুয়াল। দুটিই একসঙ্গে কাজ না করলে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে যায়। এতে চালকের কিছুই করার থাকে না। কোনো চালকই চান না দুর্ঘটনা ঘটাতে। কিন্তু তারপরও ঘটে যাচ্ছে। আমরা যারা ট্রেন চালাই, তারা তো কম্পিউটার না, মানুষ। নানা কারণে যে পথ যেতে ১৪ ঘণ্টা লাগার কথা, সেখানে ২৪ ঘণ্টাও লেগে যায়। কাজের ক্ষেত্রে আমাদের রোস্টার বলে কিছু নেই। কোথাও দুর্ঘটনা ঘটলে তখন সবাইকে ডেকে আনা হয় ডিউটির জন্য। আমরা সামনে যদি একটি গরুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি তা-ও চোখ বন্ধ করে আল্লাহর নাম নিই আর বলি আল্লাহ আমি এই গরুটিকে বাঁচাতে পারলাম না। কারণ, এখানে আমাদের কোনো হাত থাকে না। কিছু করতেও পারি না। আমাদেরও তো পরিবার আছে। আমার দুটো মেয়ে আছে। তাদেরও সময় দিতে পারি না। এবার ঈদের সময় আমার শাশুড়ি বলছিলেন, ‘এটা কেমন চাকরি, ঈদের দিনও ডিউটি করতে হয়।’ আসলে আমাদের চাকরিটাই এমন। মানুষকে তার গন্তব্যে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া।”
একজন ট্রেনচালকের এমন অনুভূতি এ দেশের রেল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকেই স্পষ্ট করে। দায়িত্বে অবহেলার কারণে রেলচালক বা সংশ্লিষ্টদের শাস্তি হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দিনের পর দিন তারা বিশ্রামহীন হয়েই কাজ করবে। বিশ্রাম বলে কিছু থাকবে না। অথচ আমরা তাদের ওই মানসিক ও শারীরিক অবস্থাতেই সঠিক সিদ্ধান্ত পুরোপুরি আশা করবÑ এমনটাও ঠিক নয়। চালকের সংকট কর্তৃপক্ষকেই পূরণ করতে হবে। তা না হলে পরিশ্রান্ত রেলচালকের ভুলে রেল দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায় রেল মন্ত্রণালয় তথা রাষ্ট্রও এড়াতে পারে না।
একসময় মানুষের ট্রেনে চড়ার প্রবণতা কমে গিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সড়কপথে দুর্ঘটনা ও যানজট এড়াতে, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের খরচ কম হওয়াতে, অন্য পরিবহনের তুলনায় নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব হওয়ায় ট্রেনে যাত্রীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের ২৭৮টি লোকোমোটিভ, ১ হাজার ৬৫৬টি মিটারগেজ ও ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ এবং ৮ হাজার ৬৮০টি পণ্যবাহী ওয়াগন আছে। সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় এদের অধিকাংশের অবস্থাই জরাজীর্ণ। ট্রেনে যাত্রীর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাপ বেড়েছে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত সারা দেশের রেল লাইনগুলোতেও, যা পুরোপুরি সংস্কার বা মেরামত করা হয়নি অদ্যাবধি। আবার এ দেশের প্রায় ৬৮ শতাংশ রেল ইঞ্জিন মেয়াদোত্তীর্ণ। ফলে চলার পথে প্রায়ই ট্রেন লাইনচ্যুত হচ্ছে। সাধারণত ইঞ্জিন বিকল হয়ে বা রেলপথে ত্রুটির ফলে ট্রেনের চাকা পড়ে যায়। এভাবে অধিকাংশ ট্রেন দুর্ঘটনার কারণ লাইন থেকে চাকা পড়ে যাওয়া। তাই রেললাইন সংস্কার ও ইঞ্জিনের আধুনিকায়ন প্রয়োজন। তা না করে কর্তৃপক্ষ যতই কথার ফুলঝুড়ি ছড়াক, রেল দুর্ঘটনার হার কমানো সম্ভব হবে না।
আবার সরকার দেশের সব রেলপথ ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন করার নীতি গ্রহণ করলেও এখনো অনেক জায়গায় সিঙ্গেল লাইনেই ট্রেন চলে। এতে কোথাও দুর্ঘটনা ঘটলে পুরো এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এ থেকে রক্ষা পেতে ডাবল লাইনের কাজও পুরোপুরি সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়াও কঠিন হবে। সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় এবং সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনার পেছনে অন্য কোনো দুরভিসন্ধি বা চক্রান্ত রয়েছে কি না- তাও তদন্ত করে দেখা হবে। সেটি হোক। তবে চক্রান্তকারী থাকলে যেসব কারণে তারা চক্রান্ত ঘটানোর সুযোগ পায়, সেগুলোও রহিত করতে হবে। পাশাপাশি এখনই রেলের জনবল সংকট নিরসন, ইঞ্জিনের আধুনিকায়ন ও রেললাইন পুরোপুরি সংস্কারে সরকারের মাস্টারপ্ল্যান হাতে নেওয়া উচিত।
শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে, রাজধানীতে চলছে মেট্রোরেলের কাজ। এই উদ্যোগগুলো সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়িয়েছে কয়েক গুণ। রেলের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বর্তমান সরকার আন্তরিক থাকবে, রেলপথ হবে সবার জন্য নিরাপদ এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ