শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

রেলপথ এখন জনগণের মরণ ফাঁদ

ডাঃ মোঃ মুহিব্বুল্লাহ : রেল দুর্ঘটনা মানুষের কল্পনার জগতে এক হতবাক করা ঘটনার কথা। কেননা এপথে হাজার মালিকের হাজার গাড়ি বিশৃঙ্খলভাবে ঢুকে পড়ার কোনো সুযোগ নেই। সুনিয়ন্ত্রিত ও সুপরিকল্পিত সময়সূচী মাফিক পরিচালিত হয়ে আসা এক যাতায়াত ব্যবস্থার নাম রেলপথ। ব্রিটিশ আমল থেকেই আমাদের দেশে নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থার গৌরবোজ্জল নামই ছিলো এ রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার দখলে। কিন্তু কালের আবর্তনে চলমান সময়ে বাংলাদেশ যখন দুর্নীতির কুষ্ঠোরোগে সর্ব অঙ্গ পঁচা এক কলঙ্কিত জনপদে পরিনত হয়েছে। ঠিক তখনি এদেশের সেই গৌরবোজ্জল রেলপথও জনগনের মরণফাঁদে পরিনত হয়েছে। এদেশে এমনও দিন গেছে যখন মানুষ পাঁচ বছরেও একটি ট্রেন দুর্ঘটনার কথা শুনতে পেতো না। সাম্প্রতিক সময়ে সপ্তাহেও জাতিকে দুই তিন বার রেল দুর্ঘটনার খবর শুনা লাগছে।
১২ নভেম্বর ব্রাহ্মনবাড়িয়ার কসবায় ট্রেন দুর্ঘটনার দুদিন যেতেনা যেতেই আবারো সিরাজগঞ্জে রেল দুর্ঘটনা জাতি দেখেছে। কি আর বলবো! এমন অনাকাঙ্খিত রেল দুর্ঘটনা আমরা দেখবই বা না কেনো? সারা দেশের সর্ব অঙ্গে দৃষ্টি দিলে যেমন যথেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির তমসা দেখা যায়। আজ রেল লাইনেও সেরকম চোখ ধাঁধাঁনো দৃশ্য চোখের আড়ালে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। টাঙ্গাইলসহ সারাদেশের রেল লাইনের হাজার হাজার কিলোমিটারব্যাপি থেকে থেকেই লোহার নাট ব্যবহার না করে বাশের চটার গোজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যে দৃশ্য এদেশের শুধু আমি দেখেছি তা নয়। দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ এর চাক্ষুস সাক্ষী। তাছাড়া দেশের রেল পথের বেশিরভাগ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের ব্রিজ গুলো ঝুকিপূর্ণ। দেশ উন্নয়নের বক্তব্যে মাইক ফাটানো বক্তারা কতো বড়ো বিথ্যাবাদি তা এহেন লাইন গুলোর প্রত্যক্ষ সাক্ষীরাই বোঝে। যাদের বহনকারী ট্রেনটিকে সেসব যায়গা দিয়ে চলতে দেখে অটোমেটিক গা শিউরে উঠা যাত্রী সাধারনের মুখ দিয়ে বের হতে শুনা যায় দোয়ায়ে ইউনুস "লা-ইলাহা ইল্লা আংতা সুবহানাকা ইন্নি কুংতু মিনাজজলিমিন।"
নদ-নদী পারাপারের সময় তুফান উঠলে যেমন সকল নৌযাত্রীর ঠোট শুকিয়ে যায়। রেল পথের এসকল ঝুকিপূর্ণ ব্রিজ কালবার্টগুলো পার হতে সময়ও ঠিক তদ্রূপ তাদের কলিজা পর্যন্ত শুকিয়ে যায়। প্রচন্ড জার্নির আনন্দটা নিমিষেই নিরানন্দের নীল দরিয়ায় নাকানিচোবানি খেতে আরম্ভ করে। হাতের উপরে প্রাণটা নিয়ে তখন তাদের চলা লাগে। কখন যেন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি এমন চিন্তায় শরীরটা ছমছম করতে থাকে। রেল লাইনের এমন অবস্থার প্রেশানিতে তিক্ত মুহুর্তে আবার যাত্রী সাধারনেরা বাড়তি টেনশনে থাকে তূর্ণা নিশিথা ট্রেনের চালকদের মতো কোনো খামখেয়ালী চালকদের পাল্লায় আবার পড়া লাগবেনাতো? যারা কোনো সিগনালের তোয়াক্কা না করে মন মতো চালিয়ে তাদেরকে জীবন বিপন্নের কবলে ফেলেদেবে? যাদের নেই কোনো দায়িত্ব বোধ জ্ঞান। আমানতদারীতার বালাই তো নাই-ই। তার দায়িত্বে এখন কতগুলো মানব জীবন সে চেতনায় জাগ্রত না থেকে কঠিনতম দায়িত্ব পালন কালেই নিশ্চিন্তে ঘুম যেতেও দিধা বোধী হয়না?আর সে কারনে এমন সকল যানবাহনে চলতে যেয়ে আজ সকল যাত্রীর শংকা হয় কখন যেন সাঙ্গ হয়ে যাবে তাদের জীবনযৌবন। এমনি সব মাথা বিষকারী দুর্ভাবনায় আজ প্রতিদিন প্রতি মুহুর্তের সকল যাত্রী।বিজ্ঞানের উৎকর্ষের এই যুগে সারা বিশ্বে যখন মেট্রো রেল বা ডেমু ট্রেনের উন্নত থেকে উন্নততর রেল যোগাযোগব্যবস্থায় উত্তরোত্তর অগ্রগামীর পথে। আমাদের দেশে আমরা তখন নানান রকম দুর্নীতি ও যথেচ্ছাচারীতার কারনে সাধারন রেল যাত্রাকেও মরণফাঁদে পরিনত করে তুলছি। জনজীবনের সর্বস্থানের অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার এমন নজিরবিহীন উন্নয়নে দেশ এখন সারশূন্য এক খলস মাত্র। সীমাহীন দুর্নীতির আঘাতের ক্ষত চিহ্নের সাক্ষবাহি ক্ষতবিক্ষত রেল পথ আজ আস্থাহারা ব্যবস্থাপনায় পরিনত হয়েছে। জীবনকে আর কতো অনিশ্চতার মধ্যে নিমজ্জিত রাখবো? আর কতো গলাবাজদের গলাবাজিতে তুষ্ট হয়ে নিজেদের সর্বনাশের পথকে বেগবান হতেদেব? ভেঙ্গেপড়তে দেবো দেশ ও জাতীয় উন্নয়নের মেরুদ-কে? ১২ নবেম্বর কসবায় তূর্ণা নিশিথা এক্সপ্রেসের সিগনাল অমান্য করে উদয়ন এক্সপ্রেস কে পিছন থেকে আঘাত করে ১৬ জন নিহত করার ২দিন পর ১৪ নবেম্বর সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ইঞ্জিন বগিসহ আটটি লাইনচুত ও আগুন ধরে যাওয়া সমগ্র দেশবাসীকে দারুন উদ্বেগময় অবস্থার মধ্যে নিপতিত করেছে। একদিকে রেলের সংস্লিষ্টরা এভাবে যথেচ্ছাচারি মনোভাবাপন্য হয়ে মনমতো গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনার কবলে নিক্ষেপ করে এবং অন্যদিকে দুর্নীতিবাজ সরকার রাষ্ট্রের টাকা পকেটে গুঁজতে দেশের অন্য সকল কিছুর মতো রেল লাইনকে বেহাল দসার সদৃশ ঝুকিপূর্ণ পরিবেশে নিপতিত রেখে জনজীবন খোক্কো রাক্ষসে পরিনত হয়েছে। আর এহেন অবস্থায় সাধারন জনতার কি উপায়? পথেঘাটে চলাচলের যানবাহনটাও যদি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে তাহলে কোন ভরসায় ঘর থেকে বের হবে? ব্রাহ্মনবাড়িয়ার কসবায় ঘটা ট্রেন দুর্ঘটনাকে নাহয় চালকের ঘুমের দোহাই দিয়ে পারপাওয়ার পন্থার সন্ধান করবে। কিন্তু ত্রুটিযুক্ত মানহীন রেল লাইনের কারনে ঘটা দুর্ঘটনায় আমরা কর্তৃপক্ষের কোন কাতারের দায়িত্বশীলদেরকে দায়ী করতে পারি। প্রকৃতপক্ষে লাইন ডিভাইডার ও রোড ক্লিয়ারিং সিগনাল ম্যান অথবা রেল ক্রসিং এর গার্ডম্যানসহ রেলের সকল প্রকার কর্মচারী ও কর্মকর্তার অজুহাত কিংবা লাইনের বেহাল দসা যাই বলিনা কেনো দুর্ঘটনার কোনো অযুহাতে সরকার দায় এড়াতে পারেনা। কেননা এসেক্টরে জনশক্তি নিয়োগ থেকে শুরু করে সকল কাজটাই সরকারের নিয়ন্ত্রনাধীন। সেকারনে দেশ ও বিদেশের অন্যান্য সরকারের মতো বর্তমান সরকারকেও দুর্ঘটনার সকল দরজা বন্ধ করে জনজীবনকে বিপন্নের হাত থেকে রক্ষা করার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহন করা লাগবে। তবে কোনো দুর্নীতিবাজ সরকার যদি বারবার তাদের পেটের চিন্তায় দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের দিকে না তাকায় তাহলে তখন জনগনের দায়িত্ব এসে দাড়ায় ঐ দেশ ও জাতীয় স্বার্থে গনতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রষ্ট্র সংস্কারের কাজ করা।
তাই আসুন আমরা আমাদের দেশকে একটা দুর্নীতিবাজ ও দেশ বিধ্বংশী অযোগ্য এক রাক্ষুসে সরকারের হাত থেকে রক্ষা করে রেল পথকে জনগনের মরনফাঁদে পরিনত হওয়া থেকে ফিরিয়ে আন্তে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হাতে তুলে নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ