বুধবার ৩০ নবেম্বর ২০২২
Online Edition

দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানতে পারা যাচ্ছে না ॥ অসহায় মানুষ

# চালের বাজারে অস্থিরতা
# আটা-ময়দা, তেল, ডালসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছেই
মিয়া হোসেন : নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যের লাগাম টানতে পারছে না সরকার। পেঁয়াজের মূল্য আকাশ থেকে নামছে না। এখনো পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকাঝ। দ্রব্যমূল্যের কষাঘাতে অসহায় মানুষ। পেটভরে দু’মুঠো ভাত খাওয়াই কষ্টকর হয়ে গেছে অল্প আয়ের মানুষদের। হু হু করে বাড়ছে চালের দাম। অপরদিকে ডাল, তেল, আটা-ময়দাসহ অধিকাংশ সবজির দাম আকাশচুম্বী। সরকার শুধু আশ্বাসই দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাতে কোন কাজ হচ্ছে না। অসাধু ব্যবসায়ী সিডিন্ডকেট দিনের পর দিন বাজার অস্থির করে তুলছে। একেক সময় একেকটি পণ্যের দাম আকাশচুম্বী বাড়িয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। অবিলম্বে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছে ভোক্তারা।
নিত্যদিনের অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যটির নাম পেয়াঁজ। কিন্তু গত প্রায় মাস দুই ধরে দেশের পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল। এ সময়ের মধ্যে কয়েক দফায় দাম বেড়েছে পেয়াঁজের। সর্বশেষ ২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। তবে দেশের কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি দাম বিক্রি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় পেঁয়াজ সংকট কাটাতে সরকারি-বেসরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়। তুরস্ক, মিশর, মিয়ানমার, চীন, পাকিস্তান থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু হয়। দ্রুত সময়ে সরকারি উদ্যোগ নেওয়ায় কমতে থাকে দাম। ২৭০ টাকা থেকে মাত্র চারদিনের ব্যবধানে ১৬০ টাকা কেজিতে নেমে আসে পেঁয়াজের দর। কিন্তু সপ্তাহ যেতে না যেতে ফের তা বেড়ে ২৫০ টাকা হয়। তবে বেশকিছু দিন ধরে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকার ঘরে ঘুরপাক খাচ্ছে পেঁয়াজ বাজার। এতে করে সরকারের পেঁয়াজ আমদানি, ব্যবসায়ীদের উদ্যোগ, বাজার নিয়ন্ত্রণে নানা ঘোষণায় কোনো সুফলই দেখছেন না সাধারণ ক্রেতারা। বরং ক্রেতারা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাজারদর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের শতভাগ ব্যর্থতায়।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মগবাজার, সেগুন বাগিচাসহ বিভিন্ন বাজারে দেশি পেঁয়াজ ২৪০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে, আমদানি করা বিভিন্ন বার্মা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি দরে, মিশর ২০০ টাকা, চীনা পেঁয়াজ ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে। দেশি নতুন পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা, গাছসহ পেঁয়াজ (পেঁয়াজের কালি) বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়।
দাম নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজারে দাম বেশি হওয়ায় খুচরাতে প্রভাব পড়েছে। ক্রেতারা বলছেন, বাজারে পেঁয়াজ থাকলেও অতি মুনাফার আশায় দাম কমাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা।
হাসান নামে এক ক্রেতা বলেন, এখন কোনো কিছুর দাম একবার বাড়লে আর কমে না। দেশে এখন ব্যবসায়ীরাই সবচেয়ে শক্তিশালী, তারা সব কিছুর মূল্য ঠিক করে দেয়।
অন্যদিকে পেঁয়াজ বাজার স্থিতিশীল না হওয়ায় অব্যাহত রয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) খোলা বাজারে ট্রাকসেলে পেঁয়াজ বিক্রি। দীর্ঘ সময় ধরে সারিবদ্ধ লাইনে দাঁড়িয়ে পেঁয়াজ কিনতে দেখা গেছে অনেককে। ভিড় থাকায় বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে বিক্রেতাদের। সরকারি ছুটির দিন ব্যতিত প্রতিদিন একেকটি ট্রাকযোগে এক হাজার কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করছে টিসিবি। বাজার স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত আমাদের বিক্রি অব্যাহত থাকবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে গত রোববার (২৪ নভেম্বর) ব্যবসায়ীদের এক অনুষ্ঠানে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছিলেন, বর্তমানে দেশে চালের মওজুদ রয়েছে। আমরা চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাজারও নিয়ন্ত্রণে। এক কথায় বলতে পারি চালের দাম স্বাভাবিক রয়েছে।
তবে, বাজারে পরিস্থিতি এর বিপরীত। দাম বেড়েছে সব ধরনের চালের। ক্রেতাকে বাড়তি দামেই কিনতে হচ্ছে চাল। দেশে ধান ও চালের মজুদ থাকার পরও দাম বাড়ার কোনো কারণ দেখছেন না সাধারণ মানুষ।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারি চালের বাজারে প্রতিবস্তা মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ২২৫০ টাকায়, আটাশ চাল ১৭৫০ টাকা, নাজিরশাইল ২৩৫০ থেকে ৩১০০ টাকায়। অথচ মাত্র দশদিন আগে এ বাজারে প্রতিবস্তা মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছিলো ২০৫০ টাকায়, আটাশ চাল ১৪৫০ টাকা, নাজিরশাইল ১৯৫০ থেকে ২৭০০ টাকায়।
অন্যদিকে, খুচরা বাজারে প্রতিকেজি মিনিকেট চাল ৫০ থেকে ৫২ টাকা, নাজিরশাইল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, আটাশ ৪০ টাকা, ঊনত্রিশ ৩৮ থেকে ৪০ টাকা, স্বর্ণা চাল ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা, চিনিগুড়া ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ দশদিন আগে বাজারভেদে প্রতিকেজি মিনিকেট চাল ৪৪ থেকে ৪৫ টাকা, নাজির ৫০ থেকে ৫২ টাকা, আটাশ ৩৪ টাকা থেকে ৩৫ টাকা, ঊনত্রিশ ৩২ থেকে ৩৫ টাকা, স্বর্ণা চাল ২৮ থেকে ৩০ টাকা, চিনিগুড়া ৯০ থেকে ৯২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল।
পেঁয়াজের পর চালের বাজার দাম বাড়ায় মিশ্রপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে। ক্রেতারা বলছেন, পেঁয়াজ সিন্ডিকেটের মতোই চালের বাজারেও সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানো হয়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সাধারণ ব্যবসায়ীরা দায়ি না। মিলকল মালিকরা চালের দাম বাড়িয়েছেন, যার প্রভাব পড়ছে বাজারে।
এদিকে রাজধানীতে নানা অযুহাতে বেড়েই চলেছে সবিজর দাম। কোনো সবজির দাম একবার বাড়লে কমার সম্ভাবনা যেনো একেবারেই কম। গত সপ্তাহে পরিবহন ধর্মঘটের কারণে সবজির দাম বাড়লেও তা আর কমেনি। সপ্তাহের ব্যবধানে আবারও চড়া সবজির বাজার। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাড়তি দামে বিক্রি হলেও গত সপ্তাহের চেয়ে বেশি দামে  বিক্রি হচ্ছে আলু, লাউ, জালিকুমড়া ও সব ধরনের শাক।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে দেখা যায়, বর্তমানে প্রতিকেজি শিম (কালো) বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকা, শিম (সাদা) ৮০ টাকা, গাজর (ফ্রেশ) ৯০ থেকে ১০০ টাকা, গাজর রেগুলার ৭০ টাকা, পটল ৫০ থেকে ৬০ টাকা, ঝিঙা-ধুন্দল ৭০ থেকে ৮০ টাকা, করলা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, উস্তা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কাঁকরোল ৭০ থেকে ৮০ টাকা, বেগুন আকারভেদে ৫০ থেকে ৯০ টাকা, ঢেঁড়স ৫০ থেকে ৬০ টাকা, পেঁপে ২৫ থেকে ৪০ টাকা, শসা (প্রকারভেদে) ১০০ থেকে ১২০ টাকা, শসা (ক্ষীরা) ৭০ টাকা, কচুর ছড়া ৫০ থেকে ৬০ টাকা, কচুর লতি ৬০ থেকে ৮০ টাকা, কাঁচামরিচ প্রতিকেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকাতে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া আকারভেদে প্রতি পিস বাঁধাকপি বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা, ফুলকপি ৪০ থেকে ৬০ টাকা, লাউ ৬০ থেকে ৮০ টাকা, জালিকুমড়া ৪০ থেকে ৫০ টাকায়।
বাজারে নতুন আলু এলেও সব ধরনের আলু চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। পুরাতন আলু ১০ টাকা বেড়ে বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, নতুন আলু (আকারভেদে) ৫০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে এসব বাজারে।
এদিকে মাছের দাম অনেকটাই স্বাভাবিক রয়েছে। রাজধানীর মাছের বাজারে প্রতিকেজি (এক কেজি সাইজ) ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকায়, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকা কেজি দরে। এছাড়া কাচকি বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা, মলা ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, ছোট পুঁটি (তাজা) ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, শিং ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা, পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, চিংড়ি (গলদা) ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা, বাগদা ৫০০ থেকে ৭৫০ টাকা, দেশি চিংড়ি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, রুই (আকারভেদে) ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, মৃগেল ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, পাঙাস ১৩০ থেকে ১৭০ টাকা, তেলাপিয়া ১৩০ থেকে ১৬০ টাকা, কই মাছ ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, কাতল ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
বাজারে ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা বাড়লেও ও গোশতের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এসব বাজারে প্রতিকেজি বয়লার ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা, লেয়ার ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, সাদা লেয়ার ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। লাল ডিম প্রতি ডজন ১০০-১১০ টাকা, সাদা ৯৫ টাকা, হাঁসের ডিম ১৪৫ টাকা, দেশি মুরগির ডিম ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে।
এছাড়া বাজারে প্রতিকেজি গরুর গোশত বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ টাকা, খাসি ৭৮০ টাকা, ছাগলের গোশত ৭২০ টাকা কেজি দরে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ