মঙ্গলবার ২৯ নবেম্বর ২০২২
Online Edition

ভালোর ভালো এবং কালোর কালো

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : অনেকেই বলেন, ‘ভালো হওয়া কঠিন। কিন্তু খারাপ হওয়া খুব সহজ।’ কেউ কেউ এটাকেই প্রবাদবাক্য মনে করেন। গুরুবাক্য ভাবেন। অর্থাৎ অনিবার্য ভেবে বসে থাকেন। খারাপ হওয়া যায় খুব সহজে। বিনা চেষ্টায়। এমন ধারণা কারা এবং কেন ছড়িয়েছেন জানি না। তবে এমন উদ্দেশ্যমূলক, হীন ও সমাজবিধ্বংসকারী কথা গুরুবাণী হিসেবে যারা সমাজে বপন করেছেন তাঁরা ভালো মানুষ নন। এ কথা ভালো মানুষের হতে পারে না। অসৎ বা খারাপ মানুষই এমন কথা ছড়িয়ে পৃথিবীকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে চান।
এ কথা মনে রাখা জরুরি যে, পৃথিবীতে খারাপ মানুষের সংখ্যা কম। ভালো মানুষই বেশি। ভালো মানুষের সংখ্যা বেশি না হলে খারাপ মানুষরা এতোদিন সমাজ তথা পৃথিবীকে গিলে ফেলতেন। ভালো মানুষ বা সজ্জনরা সংখ্যায় বেশি বলে সমাজটা এখনও টিকে আছে। খারাপ লোকেরা ভয়ে থাকেন। বিচার হয় তাঁদের কৃত অপরাধের। এমনকি খারাপ লোকদের বিচারে প্রাণদ-ও হয়ে থাকে। তবে মাঝেমধ্যে নেহায়েত ভালো মানুষও ফেঁসে যান দুর্ভাগ্যবশত। আবার আইনের ফাঁকফোকড় গলিয়ে খারাপ মানুষও রেহাই পেয়ে যান। এগুলো অবশ্য ব্যতিক্রম।
যারা বলেন, ‘খারাপ হওয়া সহজ এবং ভালো হওয়া খুব কঠিন।’ তাঁরা ভুল বলেন। না বুঝে বলেন। সবাই বলেন, তাই তাঁরাও বলেন। আসলে এমন কাজকে ‘গড্ডলিকাপ্রবাহ’ বলাই ভালো। গড্ডলিকাপ্রবাহ মানে ভেড়ার পালের একমুখো যাত্রা। পালের সামনের ভেড়াটি যেদিকে যায়, সব ভেড়া সেদিকে ছোটে প্রায় চোখ বন্ধ করে। সেরকম আর কী! ‘ভালো হওয়া কঠিন, খারাপ হওয়া সহজ।’ এটিও একটি গড্ডলিকাপ্রবাহের মতো পুরনো কথা। এর তেমন কোনও মূল্য নেই। বরং ভালো হওয়া সহজ। শুধু সহজ কেন? অনেক সহজ। খারাপ হওয়া কঠিন। যথেষ্ট কঠিন।
একজন সাধারণ মানুষ সহজেই সত্য বলতে পারেন। ভালো কাজ করতে পারেন। ন্যায়ের পথে চলতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে ধরুন: একজন লোক অন্ধকে সহজেই রাস্তা পার করিয়ে দিতে পারেন। দুটো টাকা দিয়ে পারেন সহায়তা করতে। কিন্তু কেউ কি সহজে কাউকে ডাকাত বানাতে পারেন? হঠাৎ করেই কি কেউ কাউকে মেরে দিয়ে তার সর্বস্ব কেড়ে নিতে সক্ষম হন? ইচ্ছে করলেই কি কেউ অন্যের বউ-বেটি নিয়ে ভেগে যেতে পারেন? নিশ্চয়ই না। এমন কাজগুলো নিশ্চয়ই অনেক কঠিন। এসব করতে অনেক পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়। একা একা সম্ভব নাও হতে পারে। অন্যের সহায়তার দরকার হয়। কাজেই দেখা যাচ্ছে, খারাপ কাজ অনেক কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
পক্ষান্তরে ভালো কাজ করা বা ভালো হওয়া অনেক সহজ। ধরুন: যেমন একজন লোক খুব অসুস্থ। অর্থের অভাবে তার চিকিৎসা করা যাচ্ছে না। আপনার কাছে অতিরিক্ত অর্থ থাকলে আপনি সহজেই তা থেকে কিছু দিয়ে লোকটার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেন। অতিরিক্ত না থাকলেও প্রয়োজনীয় অর্থ থেকেও কিছু হলেও দান করতে পারেন রোগগ্রস্ত লোকটার জন্য সহজেই। আবার অর্থাভাবে এক গরিব মেয়ের বিয়ে দেয়া যাচ্ছে না, সেখানেও সাহায্য করতে পারেন। নিজের কাছে যথেষ্ট অর্থ না থাকলে অন্যের কাছ থেকে নিয়েও মেয়েটির বাবার হাতে কিছু টাকা তুলে দিতে পারেন। এগুলো যেমন সহজ, তেমন পুণ্যেরও। তাই না? এগুলোতে আপনাকে কেউ বাধা দেবে না। সমাজ অথবা রাষ্ট্র থেকেও বাধা আসবে না। বরং প্রয়োজনে সহায়তা করবে।
খারাপ কাজে কেউ সহায়তা প্রকাশ্যে করেন না। করতে পারেন না। মতলব হাসিলের উদ্দেশ্য থাকলে গোপনে গোপনে যোগাযোগ করতে পারেন। খারাপ মানুষ সবসময় আতঙ্কিত থাকেন। ভীত-সন্ত্রস্ত থাকেন। কখন কোনদিক থেকে পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন এসে খারাপ মানুষকে পাকড়াও করে এমন দুর্ভাবনা তাড়া করে বেড়ায়। চোর-ডাকাত,  ছিনতাইকারী, অপহরণকারী, ঠকবাজ, হন্তারক সবসময় লুকিয়ে বেড়ান। এদের কেউ কেউ সাময়িক দাপুটে হলেও আইনকে ভয় পান। ভেতরে ভেতরে দুর্বলতা ঘাড়ে চেপে থাকে।
আমার প্রিয়বন্ধু সহপাঠী এবং ঠাকুরগাঁও জেলার চন্দরিয়া হাইস্কুলের সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত হেডমাস্টার মকবুল হোসেনের বড়মেয়ে নিশাত ফারজানা মণি নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে সম্প্রতি লেখেছেন “ভালো হওয়া কঠিন এবং খারাপ হওয়া খুব সহজ।”
আমি স্নেহের মামণির এমন স্ট্যাটাস সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করছি। সোজা কথায়, তাঁর এ স্ট্যাটাসের বিরুদ্ধে আমার মতামত ব্যক্ত করছি। তবে স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার সবার আছে। মণিরও রয়েছে। তাই তাঁর আমি কোনও দোষ দিচ্ছি না। বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর মতামত প্রকাশের শুভ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছি।
হ্যাঁ, যে-কথা বলছিলাম। ভালো হওয়া কঠিন বিষয় নয়। ইচ্ছে করলেই মানুষ ভালো, সৎ এবং চরিত্রবান হতে পারেন। অন্য মানুষের উপকার করতে পারেন। সমাজ ও দেশের ক্ষতি না করে উপকার করতে পারেন, যদিও তা সামান্য হয়।
খারাপ মানুষের মধ্যে পড়ে চোর, ডাকাত, লুটেরা, অপহরণকারী, ছিনতাইকারী, হন্তারক, ধর্ষক, মিথ্যুক, চোগলখোর, ফাঁকিবাজ, ধোঁকাবাজ, ধান্দাবাজ, হারামখোর প্রভৃতি। এদের প্রত্যেকটি কাজ অপরাধমূলক। ধরা পড়লে আইনের আওতায় চলে যেতে হয়। জেল, জরিমানা, এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি পর্যন্ত থাকে। জেনেশুনে সামান্য বিবেকবান কেউ এমন অপরাধ  করেন না। করতে পারেন না। কাজেই যারা বলেন, খারাপ  কাজ করা বা খারাপ হওয়া সহজ তাঁরা আসলে ভুল বলেন। বরং ভালো কাজ প্রকাশ্যে এবং বুক ফুলিয়ে করা যায়। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ভালো কাজে কেউ কোনও বাধা দেন না। উল্টো ভালো কাজে অনেক মানুষের সমর্থন পাওয়া যায়। কেউ কেউ ভালো কাজে স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণও করেন। কিন্তু খারাপ কাজে অন্তত প্রকাশ্যে কেউ অংশগ্রহণ করেন না। করতে পারেন না। লোকলজ্জার ভয় থাকে।
ভালো কাজ মানুষকে যেমন উদ্যমী ও সাহসী করে, তেমনি ভালো কাজ করে মানুষ প্রাণিত ও শাণিত হয়। সর্বোপরি সমাজ,  দেশ ও জাতি সমৃদ্ধ হয় ভালো কাজের মাধ্যমে। তাই ভালো মানুষ সমাজ, দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনেন। পৃথিবীকে সুন্দর করতে অবদান রাখেন। আর যারা খারাপ মানুষ তাঁরা এর বিপরীত ঘৃণ্য কর্মকা-ের মাধ্যমে সমাজ, দেশ ও জাতির অবর্ণনীয় ক্ষতি করেন। মানুষকে বিপদাপন্ন করে তোলেন। এমন দুষ্টুদের প্রতিহত করতেই জগতের সার্বিক কল্যাণে সৎ মানুষদের সংঘবদ্ধ হওয়া জরুরি।
খারাপ মানুষের অসৎকর্ম সমাজ, জাতি ও দেশের ক্ষতি করে। চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, অপহরণ, ছিনতাই, মারামারি, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি দিয়ে যেমন কারুর উপকার হয় না, তেমনি এমন কাজের কোনও সমর্থনও থাকে না। জনহিতকর নয় এমন কোনও কাজ করতে কেউ কাউকে সহায়তাও করেন না। বরং দেশের আইন, সমাজ সবই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ খারাপ কিছুকে সবাই রুখে দেন। প্রয়োজনে আইনের হাতে সোপর্দ করে খারাপ কাজ সম্পন্নকারীকে যথোপযুক্ত শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। কাজেই খারাপ কাজ যারা করেন তাঁরা নানা জটিলতায় আক্রান্ত হন। বিপাকে পড়েন। মৃত্যুর ঝুঁকিও থাকে। পক্ষান্তরে ভালো মানুষ সাধারণত উল্লেখিত ঝুঁকিতে পড়েন না। আর হ্যাঁ, ছিটেফোঁটা সমস্যা ভালো কাজেও সৃষ্টি হতে পারে। তবে তা যোগ্যতা ও নেতৃত্ব দিয়ে উতরে যেতে হয়। অতএব ভালো কাজ করা বা ভালো মানুষ হওয়া সহজ। কিন্তু খারাপ হওয়া বা খারাপ কাজ করা যথেষ্ট কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ এবং খতরনাক। কথায় বলে, “সৎসঙ্গে স্বর্গবাস আর অসৎসঙ্গে সর্বনাশ।” ভালোর জন্য দুনিয়া ভালো। কালো বা খারাপের জন্য সবই কালো। অর্থাৎ ভালোর ভালো এবং কালোর কালো। ইংরেজিতে বলা যায়, “গুড ফর গুড এন্ড এভিল ফর এভিল।” এটাই সত্য। শাশ্বত। চিরন্তন।
আমার প্রয়াত এক বন্ধু কাজী রফিউদ্দিনের মেয়ে লিখি কাজী জানান, ভালো হতে পয়সা লাগে না। সিয়াম, সালাত আদায় করতেও তেমন অর্থ ব্যয় হয় না। মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করতেও টাকা লাগে না। কিন্তু খারাপ হতে অর্থ লাগে। যেমন: বিড়ি, সিগারেট, চুরুট, হেরোইন, গাঁজা, ভাং, মারিজুয়ানা ইত্যাদি মাদকদ্রব্য সেবন করতে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। এসব মাদক সেবন করে যারা নিজেদের ধ্বংস করেন তাঁরা সন্দেহাতীতভাবে খারাপ মানুষ। এসব লোক পরিবার, সমাজ এবং দেশের জন্য বোঝা বা জঞ্জালে পরিণত হন। মাদকাসক্তদের কেউ কেউ পঙ্গু হয়ে পড়েন। কেউ কেউ আত্মহত্যা পর্যন্ত করেন। এদের জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রের কত ক্ষতি হয় তা লেখে শেষ করা মুশকিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ