শুক্রবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

বইয়ের ভাঁজে

আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন : সিফাত পঞ্চম শ্রেণীর পরীক্ষার্থী। মোটামুটি ভালো ছাত্র, ক্লাসের রোল নাম্বারও এক। কিন্তু আর কয়দিন পরই তার ফাইনাল পরীক্ষা অথচ এখন সে প্রতিদিন এক ঘন্টাও বাসায় পড়ে না। এ নিয়ে তার মা বাবার চিন্তার শেষ নেই। সকাল আটটায়ও ঘুম থেকে ওঠে না, কোনো কোনো বেলার খাওয়াও ঠিক মতো খায় না।

 ওর আম্মু জেলা শহরে চাকুরী করেন। তিনি সকাল আটটার পরেই চাকুরীতে চলে যান আর আড়াইটা তিনটার দিকে বাসায় আসেন। সিফাতের বাবা ঢাকা থাকেন। সিফাত আর তার ছোট বোন ফারিয়া মায়ের সাথে মফস্বলেই থাকে।  দিনের পুরা সময় এখন সিফাত বাসায় একা একা থাকতে হয়। কিভাবে কি করে সময় কাটে সেটা কেউ জানে না। সে দশ ঘন্টার বেশি টিভি দেখতো। কখনো কখনো তার বাবা বাড়ি এলে দেখতো রাতের দু'টায়ও টিভি দেখছে সাউন্ড অফ করে। তা দেখে সিফাতের আব্বু বুঝলো সিফাতের মা তো সারাদিন চাকুরী করে টায়ার্ড, সে জানবেও না সিফাত রাতে কি করে, তাই কৌশলে টিভিটা সরিয়ে নেন। টিভির পরিবর্তে কিছু মাসিক শিশু কিশোর পত্রিকা তার রুমে রেখে দেন। 

তাঁর যুক্তি হলো ছবি, কার্টুন দেখার চেয়ে বই পড়া অনেক ভালো। কারণ বই পড়া মানে তার বন্ধু তৈরী হওয়া, বই পাঠকের সর্বোত্তম বন্ধু। শিশুদের পত্র-পত্রিকা বেশ মজার। বিশেষ করে ঈদসংখ্যা হলেতো কথা নেই, কারণ- ঈদসংখাগুলোতে বেশ রুচিশীল লেখা থাকে। আর টিভি একটা বয়স্ক মানুষকেও অকেজো করে দেয়। সব সময় অলস ব্যক্তিরাই টিভি দেখে। এখন চিন্তা হলো তার মনটাকে বিনোদন দেয়ার মতো একটু ব্যবস্থা করা আরকি।

ঘরে পড়তে বসা নিয়ে বেশ বকাবকি চলে। কখনো সে বাবাকে দেখলে লুকাতে চায়। বাবাকে বিরক্তিকর মানুষ মনে হয়। অথচ বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টির জন্য সুদূর দুশো কিলোমিটার নোয়াখালী থেকে ঢাকা বইমেলায় এনে ঘুরিয়ে নেন, চিড়িয়াখানা, যাদুঘর, আহসান মঞ্জিল, সোনারগাঁ সব তিনিই তাকে দেখতে সহায়তা করেন। বইমেলায় যা চাইলো তাই কিনে দিলো। যেখানে যে আবদার করে সেটিও পূরণ করেন তিনি। অথচ এখন পড়ার জন্য বকাবকি করলে তিনি খারাপ। 

এখন পরীক্ষার সময় সে কোন বই-ই ধরছে না। সপ্তাহে একদিন বাসায় এসব নিয়ে কথা বলতে বলতে দেখা গেল ছোট বড় সবাই মনে করছে সিফাতের বাবা শুধু  বকাবকি করে। এতে নিজে এক ধরণের বিপাকে পড়ে। এক দিকে সপ্তাহে একদিন ছোট ফারিয়াসহ সবার আদর আর সুন্দর ব্যবহার পাওয়ার কথা তার বদলে এখন তারা শুধু বকাবকি শোনে। কিন্তু তার মাকে খুব কিছু বলতে গিয়েও বলে না। কারণ তার মাকে বলা আর না বলা একই। চাকুরী করার ফলে সে সময় দিতে অপারগ। আর চাকুরী ছাড়তে বললে এমন এমন কথা বলে সবাই একেবারে নাস্তানাবুদ। 

একদিন সন্ধ্যা লগ্নে বাসায় পৌছলেন সিফাতের বাবা। তিনি সব ঠিক ঠাকই দেখলেন শুধু সিফাতের টেবিলটা ব্যতিক্রম দেখলেন। তিনি দেখলেন, সব বইর পাতা একেবারে ভাঁজ করা। যেন সব বই পড়ে পড়ে শেষ করে ফেলেছে।

সিফাতের বাবা রাতে এসে কি খুশি আজ আমার ছেলেটা সব বই পড়েছে। কিন্তু বইগুলো এক সপ্তাহে সব পড়া শেষ! ব্যাপারটা ব্যতিক্রম না? বুঝলেন ছেলের বুঝ হয়েছে। তিনি কাউকে কিছু না বলে গদগদ বাজারে গিয়ে একটা ভাজা মুরগী আর আর কয়েকটা বড় পরোটা নিয়ে বাসায় হাসি মুখে ফিরলেন। এবং সবাইকে নিয়ে খেলেন। সবাই অবাক! আজ  তিনি একটু খোশ মেজাজে আবার হঠাৎ মোরগের গ্রীল খাওয়া? সিফাতের মা ফারিয়াকে চোখ টিপে দিলেন, খাওয়া শেষে ছোট ফারিয়া জানতে চাইলো বাবা আজ কি উদ্দেশ্যে আমাদের জন্য এতো ভালো খাবার? তিনি হেসেই উত্তর দিলেন আজ তোমরা সিফাতের টেবিল দেখোনি? বইগুলো এতদিন যেমন নতুনের ঘ্রাণ ছিলো এখন দেখোনি সব বইয়ের পাতাগুলো মোড়ানো। মানে পড়ার চিহ্ন দেখোনি? 

এটি শুনে সিফাতের মা মুচকি হেসে উঠে গেলেন। বাবা সুন্দর করে সিফাতের কাছে এসে বললেন- বাবা এসপ্তাহে হঠাৎ সব বই পড়ার আগ্রহটা কি জানতে পারি? সিফাত উত্তর দিলো- পড়লাম কই বাবা, আরে আন্টি যে টাকাগুলো দিয়েছিলো সেগুলো কোন বইয়ের ভাঁজে রেখেছি খুঁজেই পাচ্ছি না তাই,,,,।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ