সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

দুধেলা ভোরের কবি মঞ্জিলা শরীফ

মাহফুজুর রহমান আখন্দ : কবিতার সাথে সখ্য গড়ে অনেকেই কিন্তু কবিতার সাথে ঘর-সংসার সকলের হয় না। ‘ভালোবাসলেই সবার সাথে ঘর বাধা যায় না, হাজার বছর পাশে থাকলেও কেউ কেউ আপন হয় না’ এমনই অদৃশ্যের লিখন। তবুও লিখে চলে অনেকেই। অনেকেই জোর করে প্রেমের বাঁধনে আগলে রাখতে চায় কবিতাকে। এ যেন সেই বখাটে ছেলেটির মতোÑ ‘আই লাভ ইউ, পারলে ঠেকাও।’ তাইতো আমাদের দেশে কবির সংখ্যা নিরূপণ করা কঠিন। কেউ কেউ তিরস্কারের সুরে বলেই ফেলেনÑ বাংলাদেশে কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি। ঠিক শাহ্ ওয়ালিউল্লাহর সেই বিখ্যাত বাণীর মতোÑ ‘শস্যের চেয়ে টুপি বেশি, ধর্মের আগাছা বেশি।’ তবুও বলতেই হবেÑ সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি। চেষ্টা অব্যাহত রাখলে ‘কেউ কেউ’ এর দলে মঞ্জিলা শরীফকে পাওয়া যাবে এমন আশা করাই যায়।

পাবনার উত্তরণ সাহিত্য আসরের সাহিত্য সম্মেলনে মঞ্জিলা শরীফের সাথে আমার পরিচয়। ২০১৮ সালের ২৭ জুলাই পাবনা জেলা পরিষদের রশিদ হলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সম্মেলনটি। বাংলাদেশের লেখকদের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছিলো চৌদ্দজন সাহিত্যিক-শিল্পী। স্বাগতিক জেলার লেখক হলেও বগুড়া জেলার নন্দিগ্রামের মানুষ মঞ্জিলা শরীফ। নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন একজন সেবিকা হিসেবে। এখন তিনি সেবিকা তৈরিতে পাবনা নার্সিং ইনস্টিটিউটে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। বগুড়ার মানুষ হবার কারণে আমার সাথে পরিচয়টা দ্রুতই হয়ে গেল বৈকি। সেইসাথে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে তিনি একটি বই এগিয়ে দিয়ে বললেন, পড়বেন প্লিজ। বইটির নাম ‘দুধেলা ভোর’। নামটা দেখেই ভালো লাগলো। পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখলাম, ভেতরে লিখে দিয়েছেনÑ ‘শ্রদ্ধেয়, আমার সামান্য লেখা আপনার ভালো লাগলে আমি ধন্য হব।’ রাজশাহীতে ফিরেই পড়ে ফেললাম বইটি। একটানা সবগুলো কবিতা পড়ে ফেলতে বাধ্য করার যে কৌশল তাতে লেখকের পারঙ্গমতার প্রশংসা করতেই হয়।

চার ফর্মার দুধেলা ভোরে ৫৭টি কবিতার বসবাস। প্রকৃতিপ্রেমের ছাপ থাকলেও অধিকাংশ কবিতাতেই মানবপ্রেমের সুবাস মাখানো আছে। দশটি কবিতার প্রথম চরণেই ‘অনিরুদ্ধ’ নামের কাল্পনিক চরিত্রের সন্ধান মিলেছে। প্রকৃতিপ্রেম এবং দ্রোহের গন্ধও লেপ্টে আছে বেশ কিছু কবিতায়। তবে প্রেমের অগ্নিদগ্ধ চিত্র পাওয়া যায় অধিকাংশ কবিতাতেই। ভালোবাসার মায়াবী পরশ ছড়িয়ে তিনি উচ্চারণ করেনÑ ‘মায়ার সাধনে মনের গহীনে তোমায় জড়িয়ে রাখবো/ যতদিন হৃদয় স্পন্দন শূন্য না হয় ততদিন।’ কিন্তু প্রিয় মানুষের কাছে কাঙ্খিত আচরণ না পেয়ে ব্যথায় নীলকণ্ঠ হয়েছেন কবি। তবুও কোন অভিযোগ নেই, নেই কোন অনুযোগ। তিনি ভালোবাসার পরশ মেখেই উচ্চারণ করেনÑ 

চিলেকোঠার আলনায় মায়াবতী অন্ধকারের ভাঁজে ভাঁজে 

আটপৌরে সময়ের অসীমে রংধনু স্বপ্নগুলো অনুভূতিহীন প্রতিবন্ধী

মুখবুঁজে পড়ে আছে অবচেতন মনের নীল সীমারেখায় বেঁধে নিয়ে। 

অভিমানের সুরের ধ্বনি শোনা গেলেও তাতে প্রেমের সবুজাভ কোমলতাকে মিশিয়ে দিয়েছেন দক্ষতার সাথেÑ 

আলতো পরশে ছুঁয়ে দেখো তোমার বিরহে সাজিয়ে রাখা ক্ষণ

হৃদয়ের যত গহীনে যাবে দেখবে যতনে তুলে রাখা ভালোবাসা

পাশেই দেখবে অবহেলার নোনাজল গড়িয়ে যাওয়া নদী

চাইলেই তুমি সেই নদীতে জলকেলি খেলতে পারো।

এতোকিছুর পরেও নিরাশার কোন ছাপ নেই চোখেমুখে। নিঃস্বার্থ প্রেমের জয়গান গেয়ে তিনি নিজেকে বিলিয়ে দিতে চান প্রিয় মানুষের হৃদয়ের সাথে। আশাবাদী এ কবির সাহসী উচ্চারণÑ ‘একদিন কষ্টের নোনাজলে বয়ে চলা/ নদীতে ভেসে ভেসে পৌঁছে যাবো তোমার/ বৈতরণীর দেশে, সেখানেই হবে আমাদের বাসর/ একদিন ঠিক পৌঁছে যাবো দেখে নিও..।’ তবে সেই পৌঁছে যাওয়ার পরিসীমা কতদূর তা খানিকটা প্রচ্ছন্ন থাকলেও তিনি দুধেলা ভোরের প্রথম কবিতাতেই সরাসরি বলে ফেলেছেনÑ ‘তোমার সমাধির মাটি হবো/ জীবদ্দশায় কখনও তুমি আমার কাছে এল না তাই।’ পাবনার মহীয়সী কর্তৃক প্রকাশিত ঝকঝকে ছাপার নান্দনিক প্রচ্ছদের এ গ্রন্থটিতে কিছু দূর্বল কবিতারও আশ্রয় মিলেছে। তদুপরি একটি গ্রন্থের দুচারটি কবিতা পাঠককে টানতে পারলেই লেখকের সার্থকতা। মঞ্জিলা শরীফ সে ধরনের সার্থকতার দাবী করতেই পারেন। সাধনার প্রয়াস অবিরাম হলে তিনি নিজেকে কবিতার মসনদে অধিকার নিয়েই বসতে সক্ষম হবেনÑ একথা বলাই যায়। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ