সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

সোজা হিসাব  

মোহাম্মদ লিয়াকত আলী :  যাইয়া লাভ নাই। মুয়াজ্জিন লাডি লইয়া মসজিদের গেডে খাড়ায়া রইছে । পোলাপানগো ডুকবার দেয় না। 

- আমরা পোলাপান নাকি? আমরা ছাত্র।  আমরা সিনেমা দেখবো নাতো, শুধু বুড়ারা দেখবেন নাকি?

  ছেলেপেলেদের কথার মাথামুন্ড কিছুই বুঝতে পারে না ফিরোজ মিয়া। সামনে যেয়ে দাঁড়ায় পথ আগলে। 

- কি সব আবলতাবল কতা কইতাছো তোমরা। মসজিদে সিনামা দেহায়?

- গত শুক্কুরবার একটুহানি দেহাইছে। আজকা অনেক দেহাইবো।

- হায় আল্লাহ, পোলাপানে এইসব কয় কি?

   নাজিম উদ্দিন সাহেব সেজে গুজে যাচ্ছিলেন পাশ দিয়ে। ডাক দেয় ফিরোজ মিয়া।

- স্যুট কোট পিন্দা কই যাইতাছেন ? আইজ শুক্কুরবার না ? ভুইলা গেছেন নাকি? নামাজ পড়তেন না ?

- নামাজ পড়নের জন্যইতো মসজিদে যাইতাছি। আগে বাগে না গেলে ভালা কইরা দেখতে পারমুনা। 

- হায় আল্লাহ, এইডা কি কন? হাছাই নাকি ? মসজিদে সিনামা দেহায় ?

- আরে বোদাই, এইডা সিনামা না। ইমাম সাব শুধু খুৎবা হোনায় না। টেলিভিশনের মতন দেহায়া দেয়। মিম্বরে যন্ত্রপাতি ফিট কইরা লইছে।

- সারা জীবন দেখলাম, ময়লা লুঙ্গি আর ছিড়া টুফি পাঞ্জাবী, আইজকা এক্কেবারে স্যুট-কোট পিন্দা লইছেন? ব্যফারডা কি? 

- আল্লায় নাকি কইছে, ভালা ভালা পোশাক পিন্দা মসজিদে যাইতে। 

- এতদিন হুনছি, ছিড়া টুফি-পাঞ্জাবীতে ছোয়াব বেশি। কোরান হাদিছ কি উল্ডায়া যাইতাছে নাকি ? 

- এতো প্যাছাল না পাইরা দেখবার চাইলে তাড়াতাড়ি রেডি অইয়া আইও। 

- আমি রেডিই আছি। চল দেহি, মসজিদে এইসব কি অইতাছে ?

মসজিদের ইমামের সামনের বর্ধিত অংশের নাম মেহরাব। তা সকলেই জানে এবং মনে করে ইমামের দাঁড়ানোর জায়গা। গত জুম্মায় খতিব সাহেব তার মানে বুঝিয়েছেন। হারব্ মানে যুদ্ধ। মেহরাব মানে যুদ্ধের অ¯্রাগার। নামাজরত অবস্থায় কোন দুশমন হামলা করলে ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মসজিদে নববীতে অ¯্রশ¯্র রাখার এই মেহরাব তৈরী হয়েছিল। এখন চলছে তথ্য প্রযুক্তির যুদ্ধ। শোনে শোনে কোরান হাদিছ বুঝার যুগ শেষ। এখন চাক্ষুষ দেখার যুগ।

কেরামান কাতেবিন দুই কান্দে বসে কিভাবে আমলনামা লিখেন, কিভাবে কেয়ামতের মাঠে যার যার হাতে দিবেন, এসব কি শুনে বুঝা যায়?  অডিও ভিজুয়াল রেকর্ডিং সিস্টেম আল্লাহই মানুষকে শিখিয়েছেন। 

গত জুম্মায় “মারাজাল বাহ্রাইনি ইয়াল তাকিইয়ান ওয়া বাইনাহুমা বারযাখ” দেখিয়েছেন ভিডিও প্রজেক্টারের মাধ্যমে। অবাক হয়ে মুসুল্লীরা দেখেছিল দুইসাগরের পানির দুই রং এবং মাঝখানের অদৃশ্য দেয়াল।

দিনের পর দিন বই পড়ে-মুখস্থ করে যে ছাত্ররা পলাশির যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল বুঝতে পারেনি, দুই ঘন্টা নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা দেখেই তা বুঝে গেছে। মাসের পর মাস ইতিহাস পড়ে যা শিখতে পারেনি, মুঘলে আজম, আকবর দি গ্রেট, সোর্ড অব টিপু সুলতান দেখে তা সহজেই জানতে পেরেছে। কিন্তু কমার্শিয়াল চলচিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা অভিনেত্রীর মাধ্যমে তৈরী দি ম্যাসেজ, ডন অব ইসলাম, টেন কমান্ডার অব মুসা ঘরে বসে টিভির পর্দায় দেখতে কোন বাধা না থাকলেও মসজিদে ঢুকানো যাবে না। 

খতিব সাহেব খুবই বুদ্ধিমত্তার সাথে রাতদিন পরিশ্রম করে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের সহযোগিতায় অডিও ভিজুয়াল খুৎবা তৈরী করেন, কিছু মুসুল্লী প্রথম দিন আপত্তি জানালেও এখন ভাবছে ঃ 

- দেখাই যাক, কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়?

প্রজেক্টার চালু করার আগে খতিব সাহেব দুটি হাদিস শোনালেন কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না। সেদিন পাঁচ শ্রেণীর মানুষ আল্লাহর আরশের নিচে জায়গা পাবে। পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দেয়া পর্যন্ত কিয়ামতের ময়দানে কাউকে নড়তে দেয়া হবে না। 

আরশের নিচে ছায়া পাবে সেই যুবক, যে তার যৌবনকাল আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়েছে। একটি প্রশ্ন হবে, যৌবনের শক্তি ও সামর্থ সে কোন কাজে ব্যয় করেছে। 

হাদিস দুটি বলেই যুবকদেরকে সম্মোধন করে খতিব সাহেব প্রশ্ন করলেন ঃ

- আরশের নিচে জায়গা পাও বা না পাও, জবাব কিন্তু দিতেই হবে। কি জবাব দিবে তখন? বলবে সিনেমা, নাটক, ফ্যাশন শো, ব্যান্ড শো, স্টার জলসা ও জি বাংলার মেগা সিরিয়াল দেখেই বেশীর ভাগ সময় কেটেছে ? 

মিথ্যা কথা বলারতো উপায় নেই। 

মসজিদে সমবেত যুবকরা একটু নড়েচড়ে বসে। সিনেমা দেখতে এসে কোন সিনেমা দেখছে ? খতিব সাহেব বুঝতে পারে যুবকদের চেহারায় আঁকা ছবি। বুদ্ধিমত্তার সাথে বললেন ঃ

- মসজিদেতো ফিল্ম স্টার হিরো হিরোইনদের অভিনয় করা সিনেমা দেখানো যাবে না। তবে মধ্যপ্রাচ্যের একটি ওয়াজ মাহফিলের ভিডিও ক্যালেফ্ট্ দেখাচ্ছি। কিয়ামতের ময়দানে কিভাবে হিসাব নেয়া হবে ও দেয়া হবে তার একটা নমুনা দেখতে পাবেন। আপনাদের কোন আপত্তি নাইতো দেখতে ?

- দেহনের লাইগাইতো আইছি। হুইনা মজা পাইতাছি না, তাড়াতাড়ি দেহান।

মাত্র আধা ঘন্টার একটি অডিও ভিজুয়াল রেকর্ডিং। কাতারের রাজধানীর একটি কনভেনশন সেন্টার থেকে ধারণ করা। ক্যাপিটেল সিটির সম্মানিত মেয়র জুমআর দিন সকল নগরবাসীকে দাওয়াত করেছেন শহরের সর্ববৃহৎ কনভেনশন সেন্টারে। টেবিলে সাজিয়ে রাখা হয়েছে সারি সারি ডিশ। যে যার পছন্দমত খাবার খেতে পারবেন বুফে সিস্টেমে। নগরবাসীদের আগেই সার্কুলারের মাধ্যমে দাওয়াত করা হয়েছে। দুপুরের লাঞ্চের দাওয়াত। পেটুক ও লোভীরা সকাল থেকেই ভিড় জমিয়েছে। বেশী খাওয়ার লোভে আগের রাত থেকেই ক্ষুধা জমিয়ে রেখেছিল অনেকে। গোগ্রাসে গিলতে থাকে মুখরোচক খাবার। খাওয়ার শেষ পর্যায়ে মাইকে ঘোষণা দেন সম্মানিত মেয়র ঃ

- দাওয়াত কবুলের জন্য নগরবাসীকে মোবারকবাদ। আপনাদের শুধু খাওয়ার জন্য ডাকা হয়নি। আপনারা কে কি কি খেয়েছেন এখন তার হিসেব দিতে হবে। পুরো সেন্টারটি সি সি ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মিথ্যে বললেই ধরা পড়ে যাবেন।

ঘোষণা শুনে সকলের আক্কেল গুড়–ম। এসব জানলে কি দাওয়াত খেতে আসতো? 

- মাগনা পাইয়া জম্মের খাওয়া খাইছি? নাম বলবো কেমনে? 

- ভয়ের কিছু নেই। ডিশের গায়ে খাবারের নাম লেখা আছে। পনের মিনিট সময় দেয়া হলো। ব্রেন খাটিয়ে মুখস্থ করতে থাকেন।

সেন্টারের অতিথিরা সব ভয়ে গলদঘর্ম হলেও মসজিদের মুসুল্লীরা বেশ মজা পাচ্ছে। একজন ছাত্র এখান থেকেই উপদেশ দিচ্ছে ঃ 

- মুখস্থ করতে থাক, দাদখানি চাল, মশুরের ডাল, চিনিপাতা দই, ডিম ভরা কৈ, দুটি পাকা বেল, সরিষার তেল। 

মেয়র সাহেব আবার দিলেন আরো কঠিন ঘোষণা। 

- কিয়ামতের ময়দানে সারা জীবন নেয়ামত খাওয়ার হিসেব দিতে হবে। আধাবেলার হিসেব দিতেই এতা ভয়? কিয়ামতের দিন তামার জমিন হবে। সুর্য্য নিকটে চলে আসবে। এখানে তো সে ব্যবস্থা করা যাবে না। এখানে বিকল্প সিস্টেম করা হয়েছে। এখানে একটি কড়াইয়ে তেল ফুটানো হচ্ছে। তেলে আঙ্গুল ডুবিয়ে কে কি খেয়েছেন, বলতে হবে। যে বেশি খেয়েছেন, তার বেশি কষ্ট হবে। 

মসজিদে পিন পতন নীরবতা। মুসুিল্লরা যেন সত্যিকারের হাশরের ময়দান দেখছে। মেয়র সাহেব আবার বললেন ঃ

- এবার একজন একজন করে আসুন, গরম তেলে আঙ্গুল রেখে খাবারের নাম বলুন। কেউ স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসলে ভালো। নইলে আমি পুলিশ দিয়ে ধরে আনবো। 

কেউ যাচ্ছে না। সকলেই মনে মনে বলছে ঃ

- যারা কম খাইছস, তারা আগে যাক। আমি আরো রিয়ার্সাল দিয়া লই। 

ভিড়ের ভিতর থেকে একজন হাত উঁচু করে বললো ঃ

- আমি আইতাছি হুজুর।

বলেই লোকটি কড়াই এর সামনে যেয়ে ত্বরিত গতিতে আঙ্গুল চুবিয়ে উঠিয়ে ফেললো। মুখে উচ্চারণ করলো 

- গোস্ত-রুটি। 

- তাই নাকি? তুমি শুধু গোস্ত ও রুটি খেয়েছো ?

- বিশ^াস না অইলে ফুটেজ দেখেন। মাগনা পাইলে মানুষ নাকি আলকাতরা খায়। আমি ঐ পদের মানুষ না। আমি হিসাব কইরা চলি, হিসাব কইরা খাই। আমি জানি কিয়ামতের মাঠে সারা জীবনের হিসাব দেওন লাগবো। দিন মজুরের কাম করি। যা পাই, বউ পোলাপান লইয়া খাই। কোন ব্যাংক ব্যালেন্স নাই। খাইয়া পইড়া ভালাই আছি। কোন আফসোস নাই। বদ অজমের ডর নাই। আমার সোজা হিসাব।  আমাগো নবী (সা:) দোয়া শিখায়া গেছেন, আল্লাহুম্মা হাসিবনি হিসাবাই ইয়াসিরা। আল্লাহ, আমার হিসাব যেন সোজা হয়। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ