সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

নজরুলের ‘খেলা শেষ হ’ল,  শেষ হয় নাই বেলা’ ‘পাঠান্তর’ প্রসঙ্গ

শফি চাকলাদার : (গত সংখ্যার পর) নজরুল-এর মক্তব সাহিত্যর কীটদষ্ট অংশে যে অন্য কবির দ্বারা পূর্ণকরা হয়েছে সেই পুস্তকটিও বাতিল করে নতুনভাবে কীটদষ্ট স্থানগুলোতে ডটডট যুক্ত করে প্রকাশ করা একান্তই দরকার। এবং ধীরেন্দ্র চন্দ্র মিত্র এবং জগন্ময় মিত্র’র রের্কডকৃত ‘পাঠান্তর’ গানটির রেকর্ড থাকলে তা বাতিল এবং ভেঙ্গে ফেলে পত্রিকান্তরে ঘোষণা করা দরকার নয় কি? আর অপরের যুক্ত করা নয় অপরের পরিবর্তন করা অংশ তো ‘পাঠান্তর’ নয়। এটা তো গ্রন্থে আসা অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক ‘স্বীকৃতি’ স্বরূপ দাঁড়ান নয়কি? শুধু তাই নয় পুনর্বার উল্লেখ করতে চাই যে নজরুলের গান যেভাবে চুরি হয়ে তাদের নিজেদের নামে প্রকাশ করেছে নজরুলের সুরও এভাবেই চুরি হয়েছে এবং নজরুল অসুস্থতার পর যে সমস্ত গানের সুর নজরুল ছাড়া অন্যকেউর নামে প্রকাশ পেয়েছে সেগুলো অবশ্যই নজরুলের। আলোচকরা কেবল নজরুলের ‘কথা’ চুরি করেছে নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে সুর সম্পর্কে জ্ঞান তাদের কম এবং গবেষণা করে সন্দেহ দূর করার ক্ষমতা নেই বলে বিভিন্ন জনের নামে নজরুলেরই সুর গুলো রেকর্ড লেবেলে অনায়াসে গেঁথে দেয়া হয়েছে কোন প্রতিবাদ ছাড়াই। নজরুলের সুহৃদ কেউ নেই বলে। দুচারটা গান দুচারজনের ক্ষেত্রে হতে পারে নজরুল উদারতায়। কিন্তু অসংখ্য গানের বিষয়টি নতুন করে ভাবনায় আনা অবশ্যই প্রয়োজন। নজরুলের অসুস্থতার সুযোগে তথাকথিত সুহৃদরা সদ্ব্যবহার করেছে। এই যে নজরুল অসুস্থ হলেন ১৯৪২ সালে এবং ১৯৬৫ তে এসে ‘ খেলা শেষ হল’ গানটির বাণী পরিবর্তন করা হল এবং রেকর্ড করা হলোÑ এসব কোন সাহসে করা হল? যিনি করলেন তিনি কমল দাশ গুপ্ত, নজরুলের একান্ত সুহৃদ বলে পরিচিত? “দেখিতে পাবেনা কলঙ্ক কালিমাখা মোর এই দেহ” এমন লাইনটি কি করে নজরুলের গানেই ঢুকিয়ে দিয়ে রেকর্ড হয়ে গেল? নজরুল ইন্সটিটিউটের প্রকাশিত গ্রন্থে তা’‘পাঠান্তর’-এ প্রকাশ পেল? এর থেকে এটাও বুঝতে বাকী থাকে না যে নজরুলের উদারতার সুযোগে নজরুল-জীবিত থাকা কালের থেকে শুরু করে নজরুল অসুস্থতার পরও নজরুলের সুর নিজেদের নামে রের্কডে স্থান করে নিয়েছে। ২/৪টা গান হতে পারে তাই বলে দু-আড়াইশ’ গান? এভাবেই নিজেদের নামে নজরুল-এর বাণীতে বসিয়েছে সুরও নিজেদের নামে বসিয়েছে। যেমন ২০০০ ডিসেম্বরে এই নজরুল-ইন্সটিটিউট থেকে মুহম্মদ নুরুল হুদা সম্পাদিত নজরুলের ‘মক্তব সাহিত্য’তে দেখা যায় কীটদষ্ট স্থানগুলোতে শব্দ বসিয়ে পূর্ণ করা হল যদিও ‘অধোরেখ’ দেয়া হয়েছে। বাংলা একাডেমি থেকে নজরুর রচনাবলী জন্ম শতবার্ষিকী সংস্করণ ষষ্ঠ খ-ে এই মক্তব সাহিত্য রয়েছে সেখানে ডটডট রয়েছে কীটদষ্ট স্থানগুলোতে। দুটো প্রতিষ্ঠানেরই সম্পাদনা পরিষদের সভাপতি একই ব্যক্তি। অর্থাৎ ‘নজরুল’ হাতের পুতুল। আমাদের সাহিত্যাঙ্গনের মানসিকতা কেমন যেন। এই যে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পেলেন সাহিত্যে ১৯১৩তে। কিন্তু তার গ্রন্থটি ছিল সম্পূর্ণ সঙ্গীতের। সঙ্গীত আর সাহিত্য আলাদা ভুবনে বসবাস। সঙ্গীত অর্থাৎ মিউজিক আর সাহিত্য অর্থাৎ লিটারেচার। নোবেল দেয়া হয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে লিটারেচারে। অথচ গর্ব হয়Ñ ভ্রান্তি ভরা। প্রতিবাদ নেই। এমন অঙ্গন আছে বলেই তো কমলদাশগুপ্ত এমন ভাবে নজরুলকে তুলে ধরার সাহস করেছেন। তবে এটা উনি প্রমাণ করেছেন যে তিনি নজরুলকে কি চোখে দেখতেন। সত্যিই নজরুলের পাশে যারা ছিলেন তারা যে নজরুলের সুহৃদ ছিলেন না এটা প্রমাণিত। তবে নজরুল-ইন্সটিটিউটের এই নজরুল সঙ্গীত সমগ্র’র পরবর্তী সংস্করণে এই ‘পাঠান্তর’ গানটিকে অবশ্যই বর্জন করবে এমনটাই আশা রাখি।

দরকারটা কি ছিল যে এমন একটা গানকে গ্রন্থটিতে ইনক্লুড করা যা নজরুলের রচিত নয়। আরো লক্ষ্য করা গেল যে নজরুল লিখলেন ‘খেলা শেষ হলে এসো মোর কাছে’র। এসো’র স্থলে ‘যেয়ো’ করা হল, কিন্তু কেনো? কমল বাবু নিজেকে নজরুল-বাণীর কারেকসনের (?) দায়িত্ব বা পরীক্ষকের দায়িত্ব তাকে কেউ বা নজরুল কি দিয়েছিলেন? এমনতো কোথাও পাওয়া যায়নি? আমাদের সাংস্কৃতি অঙ্গনটাই যেন কেমন? রবীন্দ্রনাথ তার রচিত (ঐ পর্যন্ত) গ্রন্থাবলি পড়ার কেউ কে না পেয়ে অবশেষে ক্ষুব্ধ হয়ে নিলামে বিক্রি করতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ নোবেল প্রাপ্তিতে তাও সঙ্গীতের বই পেল সাহিত্যে নোবেল। অবাক করা বিষয় নয়কি? সেই পড়–য়ারাই রবীন্দ্র গ্রন্থতে মনোনিবেন করল নোবেল প্রাপ্তির পর। এমনে বুঝনেওয়ালা পড়–য়া উভয় বাংলায়। আর নজরুলের অমূল্য রচনা সমূহ অনায়াসে চুরি হয় তারই চারিপাশের্^র সুহৃদ মাধ্যমে। আসলে এরা সুহৃদই ননÑ স্বার্থ হাসিলের দল। আর কমল দাশ গুপ্ত ও যে সুহৃদ ছিলেন না তা একটু দেরি করে প্রকাশ পেল ১৯৬৫ তে নজরুলকে নির্লজ্জ অবমূল্যায়নে। সেই থেকে আজ অবধি আরো পঞ্চান্নটি বছর হতে চললো কমল বাবু নজরুল সুহৃদ নন তার প্রকাশ পেতে। আর তাই তো মনে করিয়ে দেয় “আমরা সত্যিই কি সাংস্কৃতিবান”? এটা অবশ্যই  বলা যায় যে নজরুলের আশে-পাশে যারা ছিলেন কিম্বা নজরুলের সুহৃদ (?) বলে পরিচিতরা নজরুলের যতটা ক্ষতি করেছে কনট্রোভার্সি তৈরি করেছে আর কারো দ্বারা এমনটা হয়নি। কমল বাবু এমন বাণী যুক্ত করে তারই প্রমাণ রাখলেন। নজরুল ইন্সটিটিউট কেন ‘পাঠান্তর’ শিরোনামে কমলবাবু’র লাইনগুলো যুক্ত করতে গেল এটা তো বোধগম্য হচ্ছে না। এটাতো  যুক্তকরণ অর্থাৎ স্বীকৃতি দেয়া, নয়কি। আমরা তো বিশেষণ ভক্ত। বিশেষণ যুক্ত নাম পছন্দ করি। বিশেষ যুক্ত নাম না হলে যেন চেনাও মুশকিল। গড়মিল তো হয়েছেই এই বিশেষণ প্রক্রিয়াতে। আমরা কাজী নজরুল ইসলামের নামের আগে’ ‘বিদ্রোহী’ বিশেষণ যুক্ত করে রেখেছি। ফলে এই দাঁড়িয়েছে যে ঐ ‘বিদ্রোহী’র আড়ালে নজরুলের অসংখ্য হাজারো কাজগুলোকে বিদ্রোহী ছায়াতে ঢেলে রেখে মূল্যায়ন করি, এটা সমগ্র নজরুলের জন্য অবশ্য ক্ষতি হয়ে চলেছে। আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামের সাথে ‘বিশ^কবি’ যুক্ত করে দিয়েছি। এতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাজগুলোয় মাত্রা যুক্ত হয়েছে এই যে তারা সারা জীবনের কাজগুলোতে নি¤œশ্রেণি, খেটে খাওয়া মানুষ, নির্যাতিতদের নিয়ে কিছুই লেখা নাইÑ অর্থাৎ বিশে^র তাবৎ নব্বই ভাগ মানুষের জীবন-চরিত দুঃখ-শোক ব্যথা-বেদনার দৃশ্য তার লেখনীতে নেই। দশভাগের কবি হয়েও ‘বিশ^কবি’ হয়ে রইলেন অপরদিকে নব্বইভাগ মানুষের কবি যেখানে ঐ নি¤œশ্রেণি, থেকে খাওয়া মানুষ, নির্যাতিতদের ব্যথা বেদনা দুখ শোক নিয়ে এমন মানুষগুলো রয়েছে তাদের কথা স্পষ্ট আখরে প্রতি মুহূর্তে তুলে ধরা হয়েছে তাকে ‘বিদ্রোহী’ বিশেষণে সাজিয়ে ঘরের টেবিলে সাজিয়ে  (ফেলে) রাখা হয়েছে। কি দারুণ সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গন আমরা তৈরি করেছি। নজরুল থেকে দুটো উদ্ধৃতি তুলে ধরছিÑ

যাহারা বুদ্ধিজীবী, সৈনিক হবে না তারা কভূ

তারা কল্যাণ আনেনি কখনো, তারা বুদ্ধির প্রভু।

তাহাদের রস দেবার তরে কি লেখনী করিছ ক্ষয়?

শতকরা নিরানব্বই জন তারা তর কেহ নয়?

কারা এমন বিশেষণÑ যুক্ত করেÑ কারা সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে নানান খাতে প্রবাহিত করে। নজরুল কি এদের কথাই বলেন?

সাত কোটি এই বাঙালির সাত জনে শুধু টাকা দিয়ে

দাস করে, এরা হল কোটিপতি বাঙালি রক্ত পিয়ে।

কাগুজে মগুজে ধূর্ত বুদ্ধিজীবীর বুদ্ধি বলে,

ছুরি আর লাঠি ধরাইয়া দিল বাঙালির করতলে।

জানে এরা ভায়ে ভায়ে হেথা যদি নাহি করে লাঠালাঠি,

কেমন করিয়া শাঁস শুষে খাবে, ইহাদের দেয়া আঁটি?

নজরুলের সঙ্গে তাই তুলনা করিনা কারো। কারণ নজরুল বলেন, দৃপ্ত কণ্ঠেÑ

আমি ভিক্ষুক কাঙালের দলে/ কে বলে ওদের নীচ?

ভোগীরা স্বর্গে যাবে, যদি খায়/ ওদের পানের পিচ!

ওরা হাসে, ‘একি কবিতার ভাষা? বস্তিতে থাক বুঝি?

আমি কই, ‘আজো পাইনি পুণ্য/ বস্তির পথ খুঁজি?

দোওয়া করো, যে ঐ গরীবের কর্দমাক্ত পথে

যেতে পারি এই ভোগ-বিলাসীর/ পাপ-নর্দমা হতে।

(সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ