সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

মহাকবি ইকবাল-এর সাহিত্য ও দর্শন

আবুল খায়ের : পাঞ্জাবের একটি শিল্প প্রধান নগর শিয়ালকোট। হিমালয়ের পাদদেশ থেকে প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে অবস্থিত। ১৮৭৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি (২৪ জিলহজ্জ্ব ১২৮৯ হিঃ) তারিখে মহাকবি ইকবাল জন্ম (মতান্তরে: ১৮৭৭ সালের ৯ নভেম্বর) লাভ করেন পশ্চিম পাকিস্তানের শিয়ালকোটে। স্যার মুহাম্মদ ইকবাল, আল্লামা ইকবাল নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তৎকালীন ভারতবর্ষের মুসলিম কবি, দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও ব্যারিস্টার ছিলেন। তাঁর ফার্সি ও উর্দু কবিতা বেশ সুপরিচিত। আধুনিক যুগের ফার্সি ও  উর্দু সাহিত্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর নাম মুহাম্মদ ইকবাল হলেও তিনি আল্লামা ইকবাল হিসেবেই অধিক পরিচিত। আল্লামা শব্দের অর্থ হচ্ছে শিক্ষাবিদ। তাঁর ফার্সি সৃজনশীলতার জন্য ইরানেও তিনি ছিলেন সমধিক প্রসিদ্ধ; তিনি ইরানে ইকবাল-ই-লাহোরী নামে পরিচিত। অগ্রণী কবি হিসাবে তিনি ভারতীয়, পাকিস্তানী, ইরানী ও আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক এবং কবিদের দ্বারা ব্যাপক সমাদিত।

আল্লামা ইকবালের দাদা শেখ রফিক কাশ্মীর হতে শিয়ালকোটে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। শেখ রফিক কাশ্মিরী শাল তৈরি এবং ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। তাঁর দুই পুত্র ছিলেন-শেখ গোলাম কাদির এবং শেখ নুর মোহাম্মদ। শেখ নুর মোহাম্মদ ছিলেন ইকবালের গর্বিত পিতা। তিনি নামকরা দর্জি ছিলেন। তাঁর স্ত্রী মোহাম্মদ ইকবালের মা ইমাম বিবিও ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক মহিলা। পাঞ্জাবের বৃটিশ আর্মির কাছে শিখদের পরাজয়ের পর খ্রিষ্টান মিশনারিরা শিয়ালকোটে শিক্ষা প্রচারের উপর গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। এই সময়েই শিয়ালকোটে স্কটিশ মিশন স্থাপিত হয়। ১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজ লিবারেল আর্টস-এর কোর্সসমূহের অনেকগুলোতেই আরবি ও ফার্সি ভাষা মাধ্যমে শিক্ষাদান করা হতো। যদিও এই সময় বেশির ভাগ স্কুলেই ফার্সি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। এই স্কটিশ মিশন কলেজেই ইকবাল সর্বপ্রথম আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ কাজে লাগান। 

আল্লামা ইকবাল তাঁর কাব্য প্রতিভার স্বীকৃতি পান তাঁর শিক্ষক সাইয়িদ মীর হাসানের কাছে থেকে। ১৮৯২ সালে ইকবাল স্কটিশ মিশন কলেজ হতে তাঁর পড়াশোনা শেষ করেন। একই বৎসরে গুজরাটি চিকিৎসকের মেয়ে করিম বিবির সাথে তাঁর বিয়ে হয়। অবশ্য তাঁদের বিয়ে বিচ্ছেদ হয় ১৯১৬ সালে। ওই সংসারে তাঁর তিনটি সন্তান ছিল। ১৮৮৫ সালে স্কটিশ মিশন কলেজের পড়াশোনা শেষ করেই ইকবাল লাহোরের সরকারি কলেছে ভর্তি হন। দর্শন, ইংরেজি ও আরবি সাহিত্য নিয়ে তিনি পড়াশোনা করেন এখান থেকে তিনি স্বর্ণপদক নিয়ে ¯œাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৯৯ সালে যখন তিনি মাষ্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন ততোদিনে তিনি সাহিত্য অঙ্গনে বেশ পরিচিত মুখ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়াস পান। ইকবাল মাস্টার্স ডিগ্রিতে পড়বার সময় স্যার টমাস আর্নল্ড-এর সংস্পর্শে আসেন। এই শিক্ষাবিদ ইসলাম ও আধুনিক দর্শনে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। ইকবালের কাছে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেছিলেন। স্যার টমাস আর্নল্ডই ইকবালকে ইউরোপে উচ্চ শিক্ষা অর্জনে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। আল্লামা ইকবাল ১৯০৫ সাল হতে লন্ডনে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। তিন বছরের আইন ডিগ্রি লাভ করেন কেমব্রিজ বিশ^বিদ্যালয় হতে। পরবর্তীতে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন জার্মানির মিউনিখ বিশ^বিদ্যালয় হতে।

ইকবাল বৃটেনে থাকতেই সর্বপ্রথম রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন। ১৯০৬ সালে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হবার পরপরই তিনি তাতে যোগ দেন। দলের বৃটিশ চ্যাপ্টারের এক্সিকিউটিভ কমিটিতে নির্বাচিত হন ইকবাল। সৈয়দ হাসান বিলগামী এবং সৈয়দ আমির আলির সাথে তিনি সাব-কমিটির সদস্য হিসেবে মুসলিম লীগের খসড়া সংবিধান প্রস্তুত করেন। এরপর ১৯২৬ সালে তিনি লাহোরে মুসলিম লীগের পদে প্রতিযোগিতা করে নির্বাচিত হন।

ইকবাল ১৯০৮ সালে ইউরোপ হতে ফিরে এসে লাহোরের সরকারি কলেজে যোগদান করেন। একই সাথে তিনি আইন ব্যবসা, শিক্ষাদান ও সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। মূলত অর্থনৈতিক কারণেই তিনি ১৯০৯ সালে সার্বক্ষণিক আইন পেশায় নিয়োজিত হন। কিন্তু আয় রোজগারের ক্ষেত্রে এখানেও তিনি তেমন ভালো করতে পারেন নি। তার কারণ তাঁর সাহিত্য প্রীতি এবং সময় ব্যয় করা। তিনি তাঁর পিতাকে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে কবিতার বিনিময়ে কোনো অর্থ তিনি গ্রহণ করবেন না। অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে তিনি সে প্রতিজ্ঞা রাখতে পারেন নি। ইতোমধ্যেই বৃটিশ সরকার বিখ্যাত কবি ইকবালকে তাঁর ‘আসরার-ই-খোদায়ী’ পুস্তকের জন্য নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন।  

আল্লামা ইকবাল অমর হয়ে আছেন তাঁর কয়েকটি কবিতা ও রচনার জন্য। তার মধ্যে ‘আসরার-ই-খোদায়ী, দ্যা রিকনস্ট্রাকশন অব রিলিজিয়াস থট ইন ইসলাম ইত্যাদি অত্যন্ত গভীর দার্শনিক ভাব সমৃদ্ধ রচনা। আল্লামা ইকবালের লেখনিতে যে ইসলামী পুনর্জাগরণের আওয়াজ উঠেছিল তা সমসাময়িক অনেক ব্যক্তি ও আন্দোলনকে সাংঘাতিকভাবে প্রভাবিত করেছে। তাঁর দর্শনে প্রভাবিত হয়েছিলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, যিনি পাকিস্তানের কায়েদে আজম। আল্লামা ইকবাল শিয়া চিন্তানায়কদেরকেও প্রভাবিত করেছিলেন। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের চিন্তানায়ক ড. আলি শরিয়তিও আল্লামা ইকবাল দ্বারা সাংঘাতিক প্রভাবিত ছিলেন।

তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থসমূহ হলো ‘ইলম আল ইক্তিউদ’, ‘আসরার-ই-খোদায়ী’, রুমিজ ই বেখুদি, পয়গাম ই মাশরিক, বাং ই দারা, জুবুর ই আজাম, জাভেদ নামা, বাল ই জিবরাইল, মুসাফির, জারব ই কালিম, আরমাঘান ই হিজাজ ইত্যাদি। মুসলমান ঘুমন্ত সমাজকে কালঘুম পরিত্যাগ করে মানবতার দাবিকে পরিস্ফুট করার জন্য তাই তিনি পুনর্জাগরণের পথে আহ্বান করেনঃ জেগে ওঠে, অন্ধকার ছড়িয়ে মজলিসকে আলোকিত করি/আমাদের অগ্নিময় বাণী দিয়ে! ছিনিয়ে নিয়ে যাই আত্মার প্রয়োজনকে/চীনের প্যাগোডা থেকে/মুক্ত করি প্রতি মানুষকে/খু’আদা ও সুলায়মার মুখ দেখিয়ে/চেয়ে দেখো/ পরিচিত করি আমরা কায়েসকে/নতুন আকাংখার সাথে।

এই মহা-মনীষী দার্শনিক ১৯৩৭ সালের ২১ এপ্রিল ভোর ৫.১৫ মিনিটে সাহিত্যকে অন্ধকারে রেখে ইহজগত থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন এক ভিন্ন জগতে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ