বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

সংকট থেকে উত্তরণে সরকার পরিবর্তনের বিকল্প নেই

স্টাফ রিপোর্টার : দেশকে চলমান ভয়াবহ সংকট থেকে উত্তরণে অবিলম্বে সরকার পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, এই সরকারকে সরাতে হবে। তাদেরকে সরাতে হলে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে। দলমত নির্বিশেষে সকলকে এক করে এই যে দানবের মতো বসে আমাদের সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে, তাকে সরাতে হবে। সেজন্যই আমরা বলেছি যে, এই নির্বাচন করেছে তারা ডাকাতির নির্বাচন, এই নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে দিয়ে অবিলম্বে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় একটি নতুন নির্বাচন হবে, জনগণের সরকার হবে, জনগনের পার্লামেন্ট হবে। গতকাল শনিবার দুপুরে এক সেমিনারে বিএনপি মহাসচিব এই সব মন্তব্য করেন।
হোটেল পূর্বানীতে অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (এ্যাব) এর উদ্যোগে ‘জলসা ঘর’ মিলনায়তনে ‘ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার চুক্তি : বাংলাদেশের সম্ভাব্য বিপর্যয়’ শীর্ষক এই সেমিনার হয়। এতে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট)পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেন তথ্যচিত্রের মাধ্যমে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এ্যাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম রিজুর সভাপতিত্বে সেমিনারে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক এজেডএম ডা. জাহিদ হোসেন, পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃতিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জি কে মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব এম আবদুল্লাহ, এগ্রিচালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের শামীমুর রহমান শামীম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী, এ্যাবের আবদুস সালাম, আশরাফ উদ্দিন বকুল, গোলাম মাওলা, একেএম জহিরুল ইসলাম, সাহাদাত হোসেন বিপ্লব প্রমুখ রবক্তব্য রাখেন। সেমিনারে ঢাকা অ্যাসোসিয়েশনের অব্ ইঞ্জিনিয়ার্স (এ্যাব) সাধারণ সম্পাদক হাছিন আহমেদ, জাতীয়তাবাদী সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলামসহ প্রকৌশলীরা নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দর-কষাকষির সক্ষমতা নেই বলেই সরকার ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান আনতে পারছে না বলে মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলতে তো কখনো বলি না, ভারতের সঙ্গে আমাদের তো বিরোধ নেই। সমস্যাটা হচ্ছে যে, আজকে এমন একটা সরকার, যে আমার সমস্যাগুলো নিয়ে ভারতের সঙ্গে কথা বলতে পারে না। সেই শক্তি তার নেই, সেই বার্গেনিং ক্যাপাবিলিটি তার নেই। কারণ সে তাদের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। এটা হচ্ছে মূল কথা, এটা বাস্তবতা। এই বিষয়গুলো যদি আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, সরকার যতদিন থাকবে ততই বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণœ হবে, একে একে নষ্ট হবে এবং বাংলাদেশ নিঃস্ব হয়ে যাবে।
অমীমাংসিত সমস্যাগুলো তুলে ধরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ফেনী নদীর পানি-এটা বাংলাদেশের নদী, এটা অভিন্ন নদী নয়। সেই ফেনী নদীর পানি নিয়ে যাচ্ছে অথচ আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলছেন যে, খাওয়ার পানি চাইলে পানি দেবো না? ভালো কথা পানি দেবেন। তা আমার যে লক্ষ লক্ষ মানুষ তিস্তার অববাহিকতাতে তারা যে আজকে পুরোপুরিভাবে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে, তাদের ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, জীবন-জীবিকা ধবংস হয়ে যাচ্ছে- সে বিষয়ে আপনি (প্রধানমন্ত্রী) একটি কথাও বলবেন না।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, আজকে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে তিস্তার পানি দিচ্ছে না। অন্যান্য নদীর পানির কোনো হিস্যা হচ্ছে না। আমি পানি পাবো না কেনো? সীমান্তে আমার লোকদের গুলি করে মেরে ফেলে দিচ্ছে-আপনারা বলছেন যে, এটা কমে এসেছে। আমরা তো কমতে দেখছি না। বর্তমান সরকার সংসদে  কোনো  চুক্তিই উপস্থাপন করছে না অভিযোগ করে তিনি বলেন, এটা এমন একটা সংসদ যে, চুক্তিগুলো নিয়েও একটা আলোচনা হয়নি। আমাদের সংবিধানে বলা আছে, যেকোনো চুক্তি সংসদে উপস্থাপন করতে হবে। সেখানে আলোচনা করতে হবে এবং সেটাকে রেটিফাই করতে হবে সংসদে। সেটা কখনোই করা হয় না।
গত ৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে দুইদেশের মধ্যে ৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর মধ্যে ফেনী নদী থেকে এক দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার চুক্তি রয়েছে। এই চুক্তির আওতায় ভারত ফেনী নদী থেকে এক দশমিক ৮২ কিউসেক পানি ত্রিপুরা স্বারুম শহরে বিশুদ্ধ পানি সরবারহ প্রকল্পে ব্যবহার করবে।
বিদেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের প্রসঙ্গে মির্জা ফখুরল বলেন, এই যে সৌদিআরব থেকে আমাদের মহিলা ও নারী শ্রমিকরা যারা ফিরে আসছেন তার মধ্যে ৫৩ জন নিহত হয়েছে, অনেকে ফিরে এসেছে। সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে যে, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেছেন যে, এটা স্বাভাবিক ব্যাপার, সংখ্যা কম। তার আগেও ভারতের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে উনি (পররাষ্ট্র মন্ত্রী) বলেছেন যে, আমাদের সম্পর্ক এমন সুন্দর জায়গায় গেছে আমি সেটা বলতে চাই না।
 দেশের অর্থনীতি ফোকলা হয়ে গেছে মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, দেশের অর্থনীতির অবস্থা একদম ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। খুব বড়াই করে তারা (সরকার) বলছে যে, বাংলাদেশ রোল মডেল, সেই রোল মডেল এমন একটা হয়েছে যে, শুধুমাত্র ঋণের ওপরে তাদেরকে টিকে থাকতে হচ্ছে। সমস্ত ব্যাংকগুলো ফোকলা হয়ে গেছে। ব্যাংকগুলো থেকে এমনভাবে ঋণ নিয়েছে যে কিভাবে শোধ করবে এটা আমরা জানি না।অর্থনীতিবিদরা অনেকে বলেই ফেলছেন যে, অর্থনীতির ভবিষ্যত কিন্তু খারাপ। আজকের পত্রিকাতে দেখবেন, গার্মেন্টসের রপ্তানি বহু কমে গেছে। বহু গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ভিয়েতনাম এগিয়ে যাচ্ছে। ম্যানুফ্যাকচারড ইন্ডাষ্ট্রিজ আজকে বাংলাদেশে হচ্ছে না।কৃষকরা ধানের দাম পায় না, ধান করা বাদই দিয়ে দিয়েছে প্রায়। তাহলে স্বয়ংসম্পূর্ণতা থাকবে কি করে?
কারাবন্দী দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করে বিএনপি মহাসচিব বলেণ, আসুন আমরা আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার যিনি গণতন্ত্রের প্রতীক তার মুক্তি এবং অবিলম্বে নতুন নির্বাচন দিয়ে জনগনের সরকার প্রতিষ্ঠা করার দাবি করছি। তিনি বলেণ, এভাবে তারা বেগম জিয়াকে মুক্তি দিবেনা। তার জন্য আমাদের রাজপথে আন্দোলন করতে হবে। সেটি হতে হবে শক্ত আন্দোলন। তাহলেই দেশনেত্রী মুক্তি পাবে।
খালেদা জিয়াকে কেন আটক করে রাখা হয়েছে তার ব্যাখ্যা দিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, তাকে আটক করে রাখার কোনো বৈধতা নেই। আইনগতভাবে তিনি আটক থাকতে পারেন না। একটা মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে তাকে আটক করে রাখা হয়েছে। তাকে আটক রাখা হয়েছে এজন্য যে তিনি হলেন স্বাধীনতা স্বার্বভৌমত্বের প্রতীক। যখন টিপাইমুখ বাঁধ করার জন্য তোড়জোড় চলছিল তখন খালেদা জিয়া সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন। তিনি প্রেস কনফারেন্স করেছেন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছিলেন। গণতন্ত্রের জন্য তিনি সারা জীবন লড়াই করেছেন। সেজন্যই আজকে তাকে আটক করে রাখা হয়েছে।
ফেনী নদীর পানি চুক্তির বিষয়ে সংসদে কোনো আলোচনা হয়নি উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, এটা এমন একটা সংসদ যেখানে এই চুক্তিগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আমাদের সংবিধানে বলা আছে যেকোনো চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা হতে হবে। অথচ তারা এ বিষয়ে কোনো আলোচনা করেনি। ফেনী নদী বাংলাদেশের নদী জানিয়ে ফখরুল বলেন, এটি অভিন্ন নদী নয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলছেন খাবার পানি চাইলে কি পানি দেব না? ভালো কথা পানি দেবেন। কিন্তু আমাদের যে লক্ষ লক্ষ মানুষ তিস্তার অববাহিকায় নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। তাদের ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, জীবন-জীবিকা নষ্ট হচ্ছে। সে বিষয় নিয়ে আপনারা কথা বলবেন না? ১২ বছরেও তিস্তার এক ফোটা পানি আনতে পারলেন না!
আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে দেশের মানুষের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিচ্ছে, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করে সর্বোপরি গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দিয়ে তারা একটি পুতুল সরকারে পরিণত হয়েছে বলেও দাবি করেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, এই সরকার আসার পর গত ১২ বছর থেকে শুনছি তিস্তা চুক্তি এই হয়ে যাচ্ছে, এই হয়ে যাবে। আমাদের সঙ্গে (ভারতের) সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে। অথচ তিস্তা থেকে আমরা এক ফোঁটা পানিও পাইনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ