সোমবার ০১ মার্চ ২০২১
Online Edition

আহমদ রাকীবের ছয়টি কাব্যগ্রন্থ

নাসির হেলাল : আশির দশকের একজন নিভৃতচারী, অথচ অন্যতম কবি আহমদ রাকীব। ঝিনাইদহ জেলার নৃসিংহপুর গ্রামে তার বসবাস। কিন্তু হলে কি হবে, তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় কাব্যকুসুম রচনা করে থাকেন। মাটি ও মানুষের কবি আহমদ রাকীবের কবিতা যেকোনো পাঠককে মুগ্ধ করবে বলে আমার বিশ্বাস। তিনি ১৩৬৫ বঙ্গাব্দের ২২ ভাদ্র ঝিনাইদহ জেলার সদর উপজেলার নৃসিংহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মরহুম আজিবর রহমান এবং মা জোবেদা খাতুন। তিনি কুষ্টিয়া চিকিৎসা বিদ্যালয় থেকে ডিপ্লোমা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞানে মাস্টার্স করেন।

আহমদ রাকীবের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পাথরের মতো পড়ে আছি’ ঢাকার সুহৃদ প্রকাশন থেকে ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় এবং পাঠকনন্দিত হয়। এরপর সুনসান নীরবতা। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘বৃষ্টি শুধু বৃষ্টি নয়’ কাব্যগ্রন্থটি (এরপর পর্যায়ক্রমে ‘ঝরাপাতার উৎসবে’ (২০১৬), ‘মুখোশ খোলার সময় এখন’ ২০১৭), ‘বিধ্বস্ত পাখির ডানা’ (২০১৭), ‘উদ্বিগ্ন সময় রক্তাক্ত চুম্বনে’ (২০১৮), ‘শিমুল দগ্ধ বসন্ত’ (২০১৮) ‘কোথাও যাবো না আর’ (২০১৮), ‘সূর্যের কুসুম’ (২০১৮), কাব্যগ্রন্থগুলো প্রকাশিত হয়। এবার অর্থাৎ ২০১৯ সালের বইমেলায় নন্দিতা প্রকাশ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার ছয়টি কাব্যগ্রন্থ। কাব্যগ্রন্থগুলো Ñ ০১. চিন্তার খোলস; ০২ শ্রাবণের মেঘ; ০৩. বনে নিষিদ্ধ জোনাকি; ০৪. একফালি রোদ; ০৫. ভালোবাসা হোক সমুদ্রের ঢেউ; ০৬. অভিমানী দিনগুলো। এক ডালি কাব্যগ্রন্থ নিয়ে তিনি এবার পাঠকের সামনে হাজির হয়েছেন। গ্রন্থগুলোর প্রচ্ছদ অঙ্কন করেছেন রাজিব রায়। উল্লেখ্য, এ কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘এক ফালি রোদ’ নামক কাব্যগ্রন্থটি তিনি কবি আল মাহমুদকে উৎসর্গ করেছেন। উৎসর্গ পত্রে লিখেছেন, ‘আল মাহমুদÑ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান কবি ও কথা সাহিত্যিক।’ 

আহমদ রাকীব কর্মজীবনে সরকারি হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। তবে চাকরি জীবনেও তিনি একান্ত সফলভাবেই কাটিয়েছেনÑ ঝিনাইদহ জেলায় বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা হাসপাতালে তার কর্মজীবন অতিবাহিত হয়েছে। যে কারণে রাজধানীার কবিদের কাছে তিনি খুব একটা পরিচিত মুখ হয়ে উঠতে পারেননি। আহমদ রাকীব অত্যন্ত সাদা-সিধে, রাজনীতি বিমুখ অনাড়ম্বর জীবন-যাপনকারী একজন মানুষ। কিন্তু তার কবিতা পড়লেই বুঝা যায়, এ সহজ-সরল কবি মানুষটির মধ্যে কী ধরনের আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে আছে, কী ধরনের দ্রোহ বুকে নিয়ে তিনি চলাফেরা করেন। তিনি লিখেছেনÑ/ ‘সামনে পেছনে হত্যা গুম ভয়াবহ/এইভাবে খুব ঝুঁকি নিয়ে আছি বেঁচে/নীরব বধির হয়ে দেখি অহরহ।/কার আছে সাহস তুলবে তার স্কেচে? (ভালোবাসা হোক সমুদ্রের ঢেউ, পৃষ্ঠা ৩০)।

অন্য কবিতায় লিখেছেনÑ ‘রাত জেগে বসে থাকি সময়ের কবিদের করিডোর ভেঙে। মাঝ গাঙে ভেঙে। মাঝ গাঙে ভেঙে পড়ে নৌকার গলুই সমবেত যাত্রীরা চিৎকার তোলে মাঝি তুমি কোথায়?

পত পত শব্দে ছেঁড়াপাল চলে গেছে বহুদূর ক্লাদাক্ত জীবন নিয়ে হাপিত্যেশ করছে নদী। জীবনটা একটা ময়ূরপঙ্খী নাও। আমি তার বিধ্বস্ত গলুই’ (ওই, পৃষ্ঠা ১৬)। বর্তমান সময়কে কবি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তিনি মনে করেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ হওয়া উচিত। আর অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারলেই কেবল শান্তি ফিরে আসা সম্ভব। তিনি লিখেছেনÑ ‘কি হবে এমন বেঁচে থেকে/শামুকের মতো নিজেকে গুটিয়ে রেখে/তার চেয়ে/নিজেকে দু’দ- মেলে ধরি/পৃথিবীর সবুজ ভালোবাসার ক্ষেত্রে ফিরে আসুক প্রজাপতিময়/পাখি জীবন। কি হবে এমন ভয়ভীতি/আর দ্বিধা সঙ্কটের রঙিন পোশাক গায়ে।’ (চিন্তার খোলস, পৃষ্ঠা ২৭)। মানুষ যে দিনে দিনে আধুনিকতার নামে, প্রগতির নামে সভ্য না হয়ে অসভ্য হয়ে উঠছে কবি সে দিকে ইঙ্গিত করে লিখেছেনÑ ‘ঘাতক এইডসের দীর্ঘশ্বাসে ফেঁপে উঠে প্রাচীন আবাস/ পৃথিবীর সমস্ত জরায়ু আজ/ অরক্ষিত দুর্গ। মদ ও বিকৃত যৌনতার সাম্পান’ (ওই, পৃষ্ঠা ৩৫)। দেশ আর্থিকভাবে এগিয়ে গেলেও মানুষের মনে যে শান্তি নেই, মানুষ নানা কারণে বেদনাহত, আতঙ্কিত, ক্রুদ্ধ তা তিনি নান্দনিক ভাষায়, কাব্যিক ভাষায় তুলে ধরেছেনÑ ‘ তোমার হাতে আছে গ্রেনেড/তোমার হাতে আছে রাইফেল/ তোমার হাতে আছে মর্টার কামানের গোলা/তোমার হাতে আছে বোমারু বিমান/ তোমার হাতে আছে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র/ তাই ভয়ে তোমাকে সালাম করি। নইলে তোমাকে...।’ (অভিমানী দিনগুলো, পৃষ্ঠা ১৬)

অন্যত্র লিখেছেন Ñ

‘চারিদিক হাহাকার শূন্যতা বজ্র বিদ্যুৎ ভরা মেঘ/ উপায় নেই নিঃসম্বল কি হবে এখন/ এইভাবে পাড়ি দিই দুঃখের অনল’ (ওই, পৃষ্ঠা ২২)। তিনি আরো অগ্রসর হয়ে লিখেছেনÑ ‘আমাদের স্বপ্ন নেই/ ঘর নেই দোর নেই/ জীবিকা নেই। কেবল ঘরের দুয়ারে/ পড়ে আছে একটা চিতা’ (ওই, পৃষ্ঠা ১৯)। বঞ্চিত হতে হতে এক সময় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে জীবজন্তু, মানুষ এমন কি মেঘ-বৃষ্টি, নদীও ফুসে উঠে। কবি লিখেছেনÑ ‘কিছু কিছু মেঘ নদী পায় না/ কিছু কিছু নদী কিছু কিছু জল তৃষ্ণা মেটাতে পারেনা। হাহাকার করে উঠে মরুর হৃদয়। কিছ ুকিছু মেঘ হিংস্র সাপের মতো। ফণা তুলে ফুঁসে উঠে। কিছু কিছু মেঘ বজ্র নিনাদে ককিয়ে উঠে। কিছু কিছু মেঘ হিংস্র শাপদের মতো/ দন্ত ও নখের আঁচড়ে/ ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়। মাটি নি¤œ নাভিমূল। আষাঢ়ের কাদা মাটি জল (ওই, পৃ. ১৩)। চারিদিকে শুধু হা হুতাশ, নিন্দা মিথ্যাচার, গুম, খুন, ধর্ষণ, ক্রস ফায়ার। কাহাতক আর পারা যায়। কবি তো তার কলমের আচড়ে কিছু বলা ছাড়া কিছুই করতে পারেন না। কবি লিখেছেনÑ ‘বারুদের মতো ফুঁসে উঠে নিন্দা মিথ্যাচার/ কি করে ধরে রাখি ধৈর্যের পারদ?’ (শ্রাবণের মেঘ, পৃষ্ঠা ১০)।

আরো লিখেছেনÑ

এঁকে যাই খুন গুম ধর্ষণ ক্রসফায়ার।’ (ওই, পৃষ্ঠা ১২)। অন্যত্র লিখেছেনÑ ‘আমি এক উন্মাদ স্বদেশের চিতা ভষ্ম/তাই নিয়ে কাটিয়ে দিলাম দগ্ধ জীবন।’ (ওই, পৃষ্ঠা ৯)। অশান্তির দাবানল জ্বলছে সর্বত্র। কোথাও শান্তির লেখাটুকু পর্যন্ত কবি দেখতে পাচ্ছেন না। যে যার মতো। কেউ যেন কারো নয়। চারিদিকে মৃত্যু ভয়, সন্ত্রাস গ্রাস করে ফেলেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপায় কী হবে এমন প্রশ্ন করি। তিনি লিখেছেনÑ ‘কি হবে উপায়/ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের/ আমরা আজ দগ্ধ কাঠ’ (বনে নিষিদ্ধ জোনাকি, পৃষ্ঠা ৯)। ‘চারিদিকে শুধু ভয়/হত্যা ও গুমের মিছিল/চারিদিকে আতঙ্ক/ কার ঘাড়ে নামবে মৃত্যুর খড়গ’ (ওই, পৃষ্ঠা ১২)। কবির কলম অন্যায় দেখে দেখে এবার ফুঁসে উঠেছেÑ আর কতকাল শুনবো/হত্যা ও গুমের আদিম বর্বরতা/ আর কতকাল শুনবো/বন্দুক যুদ্ধের উপখ্যানের গরল/আর কতকাল শুনবো/ধর্ষণ বিদ্যার আদিম ভাষা/আর কতকাল বয়ে (বেড়াবো)/ পিতা হয়ে পুত্রে গোর খোড়ার ধাতব কোদাল (ওই, পৃষ্ঠা ২২)। কবি এবার নিজেই নিজের হাত ও কলমের কথা বলছেনÑ বিপ্লবী ভাষায়Ñ এই হাত মিছিলের সারিতে/মিছিলের কণ্ঠ হতে জানে/মিছিলের পতাকা হতে জানে।/এই হাত নরম হয়ে কলম ধরে/শব্দ ছেলে ছেলে কবিতা বানাতে জানে।

বর্তমান সময়ে সৃষ্টিজগতের অন্যান্য সৃষ্টি সুখে থাকলেও সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবন মানুষ বড় অসহায়ভাবে জীবন যাপন করছে। তার মাথার ওপর কোনো নিরাপত্তার ছাদ নেই। সে সব সময় বজ্রপাত, ঝড়, বৃষ্টির আঘাতে জর্জরিত ও শঙ্কিত। কবির ভাষায়Ñ পাখিদের আছে সুনীল আকাশ/মাছেদের আছে জল/ হিংস্র শাপদের আছে জঙ্গল/ইঁদুরের আছে একটা গর্ত/ আমার তাও নেই (এক ফালি রোদ, পৃষ্ঠা ৯)। কবির বিশ্বাস ক্ষমতা ও রাজনীতি হচ্ছে সমস্ত নষ্টের মূল। ক্ষমতার জন্যই মানুষ আর মানুষ থাকে নাÑ সে অমানুষে পরিণত হয়। কবির ভাষায়Ñ নখ ও দাঁত বের করে হেসে যাচ্ছে/ নর পিশাচ ক্ষমতা (ওই, পৃষ্ঠা ১৬)। রাজনীতি সম্বন্ধে বলেছেনÑ রাজনীতি যেন বুলেটের মতো মেধা শক্তির বারুদ, হিংস্র শাপদের নখ ও থাবা’ (অভিমানী দিনগুলো, পৃষ্ঠা ৪৮)। ক্ষমতাধরেরা ও রাজনীতিকরা নিজেদের স্বার্থে, ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সন্ত্রাস জিইয়ে রাখে, সন্ত্রাসীদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়। এর ফলে দেশ দিন দিন নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছে, একসময় হয়তো পুরো দেশটা তাদের করতলগত হয়ে যেতে পারে। কবির ভাষায়Ñ ‘ওদের এত স্পর্ধা দিলে/এত সাহস দিলে/ বাঘের মতো অন্যের রক্ত মাংস গিলার’ (ওই, পৃষ্ঠা ২৪)। 

কবি আহমদ রাকীব অত্যন্ত সফলভাবে কাব্যগ্রন্থগুলোতে কিছু আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করেছেনÑ নেতে খেতে (একফালি রোদ, পৃষ্ঠা ৩৮)। পালান (বনে নিষিদ্ধ জোনাকি, পৃষ্ঠা ৪৮), চষা শ্রাবণের মেঘ, পৃষ্ঠা ৩৯), কোলসি (অভিমানী দিনগুলো, পৃষ্ঠা ১৩), বলক, কুষ্টা (ভালোবাসা হোক সমুদ্রের ঢেউ পৃষ্ঠা ১৪, ৩০)। কবি কাব্যগ্রন্থগুলোতে যেমন সন্ত্রাস, গুম, খুন, ক্ষমতা, রাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার, তেমনি তিনি চরিত্রহীন, অনৈতিক মানুষদের বিরুদ্ধেও ফুঁসে উঠেছেন। তিনি লিখেছেনÑ ‘অন্ধকারে কেউ কাউকে দেখতে পাই না/চিনতে পারে না/ তা হলে উলঙ্গ হতে দোষ কি? উলঙ্গ হয়ে থাক দেহ/ উলঙ্গ হয়ে যাক সমাজ রাষ্ট্র/ উলঙ্গ হয়ে যাক দেহ/ উলঙ্গ হয়ে যাক সমাজ রাষ্ট্র/ উলঙ্গ হয়ে যাক জগৎ সংসার/ মুখ নয় মুখোমুখিই যখন মুখ’ (ভালোবাসা হোক সমুদ্রের ঢেউ, পৃষ্ঠা ১৫)

কবি আহমদ রাকীবের কাব্যকর্মে জীবনানন্দ ও ফররুখ আহমদের প্রভাব লক্ষ্য করা গেলেও তিনি তার নিজস্ব একটি কাব্যভাষা নির্মাণ করতে পেরেছেন তা বলা যায়। এক সাথে ছয়টি কাব্যগন্থ বের করতে গিয়ে কবি হয়তো একটু হিমশিম খেয়েছেন। সে জন্য ধীরে সুস্থে সময় নিয়ে যদি গ্রন্থ বের করা যায়, তা হলে প্রকাশের ক্ষেত্রে আরো যতœবান হওয়া যায়। তারপরও বলব, কবি আহমদ রাকীবের প্রকাশিত ছয়টি কাব্যগ্রন্থই প্রচ্ছদ বাঁধাই, দুই রঙে অফসেট পেপারে ছাপা সুন্দর, শিল্পিত এবং দৃষ্টিনন্দন। গ্রন্থগুলোর অন্তর্ভুক্ত বেশির ভাগ কবিতায় সমাজ বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কবিতাগুলো পাঠযোগ্য, চমৎকার। জয় হোক কবিতার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ