সোমবার ০১ মার্চ ২০২১
Online Edition

পাথর

হেলাল আরিফীন : ভাইজান, শুনলাম, আপনার স্ত্রী নাকি আপনারে মারে ?

ছি! ছি! এইটা কী বলেন? আমার স্ত্রী আমারে মারব ক্যান? সে তো আমারে খুব ভালবাসে। আমারে খুব আদর যতœ করে। 

জমির উদ্দিন নিজাম সাহেবের কাঁধে হাত রেখে বল্লেন, ভাইজান, মিথ্যা বলেন ক্যান? আপনার বউ যে আপনারে পিটায় তা এই মহল্লার সবাই জানে। রাতের বেলায় আপনার বউ যখন আপনারে পিটায় তখন আপনার অসহায় আর্তনাদে এই মহল্লার বাতাস ভারি হয়। মানুষ এত নিষ্ঠুর হয় ক্যাম্নে! আপনারে অসহায় পাইয়া আপনার উপরে এইভাবে নির্যাতন চালায়! আজ আমরা এর একটা বিহিত করবার চাই। কী বলিস তোরা? এর একটা বিহিত করার দরকার আছে না? 

পাশে বসে থাকা সুমন ও জাহিদ সমস্বরে বলল, হা, অবশ্যই দরকার আছে। 

জাহিদ জোর গলায় বলল, দরকার আছে বইলাই তো আমরা আসছি। ভাবী আজ অফিস থেকে ফিরুক, তারপর কথা আছে তার সাথে।

নিজাম সাহেব অসহায় গলায় বল্লেন, আপনারা যান। এ বিষয়ে আমার স্ত্রীর সাথে আপনাদের কথা বলতে হবে না। এটা আমার একদম পছন্দ না। আশা করি, বুঝতে পেরেছেন। 

জমির উদ্দিন রাগি গলায় বলল, হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি। যেঁচে আপনার উপকার করতে আসা আমাদের ঠিক হয়নি। 

কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর জমির উদ্দিন ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, এই, তোরা চল। এইখানে থাকার আর দরকার নাই। 

জমির উদ্দিন চলে যাওয়ার পর নিজাম সাহেব হুইল চেয়ারে ঝিম মেরে বসে রইলেন। ওভাবে বসে থাকা ছাড়া তার আর কোন উপায়ও নেই। তার বামপাশটা পুরোপুরিভাবেই প্যারালাইসড। নিজে থেকে কোন কাজই করতে পারেন না তিনি। শরীরটাকে এখন তার কাছে জগদ্দল পাথরের মতো মনে হয়। এই পাথর শরীর নিয়ে তিনি যে কীভাবে বেঁচে থাকবেন? অবশ্য আর বাঁচতেও ইচ্ছে করে না তার। এইভাবে পাথর হয়ে বেঁচে থেকে কী লাভ !অথচ এই শরীর নিয়ে তিনি সারা জীবন কত কী-ই না করেছেন। সাত মাইল দূরে সাইকেল চালিয়ে মেয়েকে সকালে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে এসে তিনি তার হোমিওপ্যাথিক  চেম্বারে বসেছেন। ডাক্তারি শেষ করে ফেরার সময় মেয়েকে আবার স্কুল থেকে নিয়ে এসেছেন। ছেলে মেয়ের জন্য সারা জীবন অনেক পরিশ্রম করেছেন তিনি। সেই পরিশ্রমের অবশ্য মূল্যও পেয়েছেন তিনি। মেয়েটা এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে পড়ছে। ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ভালো চাকরি করছে। কয়েকমাস আগে বিয়েও করিয়েছেন ছেলেকে। ওরা ঢাকায় থাকে। 

রাহেলা হঠাৎ কোত্থেকে এসে বলল, খালুজান কি রুমে যাইবেন? রুমে নিয়া গিয়া আপনারে বিছানায়  শোয়াইয়া রাইখা যাই? 

নিজাম সাহেব গোঁগোঁ করার মতো একটা শব্দ করে বল্লেন, তুই আবার কই যাবি? 

 রাহেলা ঝটপট বলল, বাড়ি যাইতে হইব। বাপজানে খুবই অসুস্থ। বাঁচব কিনা জানি না। বাড়ি থিকা করিম চাচা ফোন করছিল। নিজাম সাহেবের মুখের বামপাশ দিয়ে লালা গড়াতে শুরু করল। অন্য সময় হলে রাহেলা যতেœ মুছে দিত, কিন্তু এখন ওর সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। তিনি গোঁগোঁ শব্দ করে শংকিত গলায় বললেন, তুই বাড়ি গেলে আমি এখানে থাকব কীভাবে? তোর খালাম্মা তো সারাদিন অফিসে থাকে। তুই না থাকলে সে আমারে ঘরে তালা লাগাইয়া রাইখা যাইব। এরপর ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন তিনি। রাহেলা তার ক্রন্দনরত বিকৃত মুখায়বয়বের দিকে তাকিয়ে বিরক্তির গলায় বলল, আজিব মানুষ তো আপনে ! কান্তাছেন ক্যান? আমার বাপজান মরণাপন্ন হইছে আমি বাড়িত যামু না?

বিকেলে শায়লা অফিস থেকে ফিরে ভ্যানিটি ব্যাগটা সোফার এক পাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে রাগি গলায় বল্ল, এই অবেলায় শুইয়া রইছ ক্যান? শুইয়া থাকতে থাকতে তো শরীরটার মধ্যে ঘা বানাইয়া ফেলবা। রাহেলা কই গ্যাছে?

নিজাম সাহেব কোন কথা বলছেন না দেখে শায়লা রেগে বলল, মুখটা কি একবারে গ্যাছে? কথা বলতেছ না ক্যান?

নিজাম সাহেব একটা কিছু বলতে নিয়ে শুধু গোঁগোঁ শব্দ করতে শুরু করলেন। শায়লা ক্ষিপ্রভাবে এসে নিজাম সাহেবের গালে কষে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে রাগি গলায় বললেন, হাঁটাচলা বন্ধ হইছে। আমারে ছয়মাস হইল জ্বালাইয়া মারতাছস। এখন আবার তোর মুখখানও অবশ হইয়া গেল? মরস না ক্যান? এইভাবে পইড়া থাকস ক্যান? আল্লায় এত মানুষ দেখে, তরে চোখে দেখে না? জগদ্দল পাথর কোথাকার !

শায়লা নিজাম সাহেবের শরীরটাকে অপ্রয়োজনেই দুইবার ঠেলে দিয়ে থপ থপ করে পা ফেলে পাশের রুমে চলে গেল। নিজাম সাহেবের দু’চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে শুরু করল। এই স্ত্রীকে তিনি কতই না ভালবাসতেন? অভাবের দিনগুলোতে নিজে কষ্ট করেছেন কিন্তু স্ত্রীকে কোন কষ্ট পেতে দেননি তিনি। ডাক্তারির পাশাপাশি তিনি টিউশনি করেছেন সংসারের চাহিদা মেটাতে। প্রাইভেট টিউটর না রেখে ছেলেমেয়ে দুটিকে নিজে পড়িয়েছেন তিনি। শায়লা কিছু বলার আগেই সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাজার থেকে এনে দিতেন তিনি। সেই তিনি আজ প্যারালাইসড হয়ে বিছানায় পড়ে রয়েছেন,তাকে মন থেকে কোনকিছু এগিয়ে দেয়ারও কেউ নেই ।

শায়লা রাতের খাবারের প্লেট হাতে নিজাম সাহেবের রুমে ঢুকল। পা দিয়ে একটি চেয়ার ঠেলে বিছানার পাশে নিয়ে এসে খাবারের প্লেটটা রাখতে রাখতে বিরক্তির গলায় বলল, ইস, এই পাথরটাকে যে এখন আমি কীভাবে উঠাব? আমারে এই যন্ত্রণার মধ্যে রাইখ্যা ওই ছেরি আবার বাড়ি যায় কীভাবে?

শায়লা অথর্ব নিজাম সাহেবকে ধরে উঠিয়ে বসানোর চেষ্টা করল। একদিকে ধরে উঠানোর চেষ্টা করতেই তিনি বিছানার অন্যপাশে গড়িয়ে পড়লেন। তার হাতের সাথে খাবারের প্লেটটা লেগে মেঝেতে পড়ে গেলে শায়লা অগ্নি দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন। শায়লার অগ্নিশর্মা মূর্তি দেখে নিজাম সাহেব ভয় পেয়ে জড় পদার্থের মতো একপাশে নিঃশব্দে পড়ে রইলেন। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ