শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শন ও ব্রিটিশ-বিরোধী মতপথ : নজরুলের প্রতিক্রিয়া

আখতার হামিদ খান : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
গান্ধীর প্রতি নজরুলের একই অভিব্যক্তি আরো তীব্রতার সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল ধূমকেতু’র পরবর্তী তিনটি ইস্যুতে; ‘মোরা সবাই স্বাধীন সবাই রাজা’ শিরোনামে সম্পাদকীয়তে। এখানে নজরুল ‘স্বরাজের ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করান। স্বরাজ’ বলতে তিনি বোঝেছেন স্ব-রাজাকে। অনেকটা আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে মতো। নজরুল মনে করেন প্রত্যেক ব্যক্তিই ‘সার্বভৌম, তার নিজের ধারণার জগতে। ফলে কেউই অন্যের কর্তৃত্বকে মেনে নিতে নারাজ। আবার কোনো গুরুর প্রতি নিরঙ্কুশ ভক্তি বা আত্মসমর্পণকে নজরুল ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ভারতীয় প্রথাগতসংস্কৃতিতে যে তেত্রিশ কোটি দেবতার জয়গান রয়েছে তা-ই প্রমাণ করে কোনো সবিশেষ দেবসত্তা এখানে অধীশ্বরের জায়গা করে নিতে পারে নি। কিংবা একক অধিসত্তার প্রতি আত্মসমর্পণের দৃষ্টান্তও এখানে নেই। নজরুল যদিও তাঁর প্রবন্ধে সেই ব্যক্তিসত্তা’র নাম উল্লেখ করতে বারণ করেছেন, তবু সেই তিনিটা যে কে তা বুঝতে আমাদের কষ্ট হয় না।
নজরুল গান্ধীর মতো অন্যান্য ভারতীয় রাজনীতিকদেরও সমালোচনা করেছেন। এই ক্ষোভ ও দ্রোহটি ধরা পড়ে তাঁর ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতায়। পরাধীন ভারত যে আজ কসাইখানা’ সে কথা স্পষ্ট ধরা পড়ে তাঁর কবিতার প্রথম ছত্রে। এই বেহাল অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য নজরুল ডাক দিয়েছেন : “রণাঙ্গনে নামবে কে আর তুই না এলে কৃপাণ ধরে?” শান্তি, ম্রিয়মান স্বরাজ, এসবকিছুর স্থলে গোটা ভারতবাসীর যে কৃপাণ হাতে তুলে নেয়া উচিত তারই এখানে দাবী উঠেছে। একই কবিতায় কবি বলছেন:
বিষ্ণু নিজে বন্দী আজি ছয়-বছরী ফন্দী-কারায়,
চক্র তাহার চরকা বুঝি ভণ্ড-হাতে শক্তি হারায়!
গান্ধীকে তিনি তুলনা করেছেন বিষ্ণুর সঙ্গে। বিদেশী শাসক দ্বারা ছয়বছরের জেল ভোগ করছেন তিনি, কিন্তু চরকা তখনও কোনো দীপ্ততায় গণকণ্ঠ মেলে ধরে নি। বরং গান্ধীর বন্দীদশায় হতাশ জাতির মুক্তির বাসনাও বন্দীদশায় পড়ে গিয়েছে। আর ভ-প্রতারকদের হাতে পড়ে চরকার ঘূর্ণনও বন্ধ হয়ে গেছে। তাহলে ব্যক্তিত্ববাদী যেকোনো প্রচেষ্টা এভাবেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। এজন্য নজরুল এই ব্যক্তিপূজার নামে ব্যক্তিসর্বস্ববাদের বিরোধিতা করেছেন। সেই বিরোধিতার অংশ হিসাবেই তার গান্ধীবাদের বিরোধিতা। পাশাপাশি নজরুল দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করেছেন চরকানীতি পরাধীন ভারতের বাস্তবতায় কার্যকরী নয়। চরকানীতি যে ব্যর্থ হয়ে গেছে সে দিকটার প্রতি জোরালো ইঙ্গিত রয়েছে উপযুক্ত লাইন দুটিতে। সেই সময়কালে রাজনৈতিক শূন্যতা, রাজনৈতিক বিচ্যুতির টালমাটাল অবস্থারই একটি প্রতিচিত্র লক্ষ্য করা যায় তাঁর এই কবিতায়। নজরুল আশঙ্কার সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন, গোটা ভারত আজ মাটির ঢেলার মূর্তি-আড়াল’ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে। কবি উল্লেখ করেন রাজনীতিকদের একজন অরবিন্দ নিজেকে নিয়োজিত করেছেন নিষ্ক্রিয় বৈষ্ণব-সাধনায়, চিত্তরঞ্জন জেল থেকে বের হয়ে ক্ষীণ স্বরে শান্তির কথা বলছেন। আর ব্রিটিশ সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগদান করে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি নিজেকে বিকিয়ে দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অতীন্দ্রিয় সাধনায় মগ্ন থেকে ব্রিটিশ শাসন-শোষণের প্রতিবাদ থেকে নিজেকে আড়াল করে রেখেছেন। এ প্রেক্ষাপটে নজরুল ঘৃণার সঙ্গে বলেন,
মাদীগুলোর আদি দোষ ঐ অহিংসা-বোল নাকি-নাকি।
খাঁড়ায় কেটে কর মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি।
হান্ তরবার, আন্ মা সমর, অমর হবার মন্ত্র শেখা।
মাদীগুলোয় কর মা পুরুষ, রক্ত দে মা, রক্ত দেখা।
স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে শান্তির ললিত বাণী’ নয়, কিংবা অহিংসার বোল নয়, কবি তরবারি হানবার শক্তি নিয়ে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির মােকাবেলায় প্রস্তুতির আহ্বান করেছেন।
‘আনন্দময়ীর আগমন’ কবিতায় গান্ধীর অহিংসবাদ থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রচেষ্টাসমূহ যে অকেজো, নিপ্রাণ সেদিকটির প্রতিও তিনি ইঙ্গিত করেছেন। কিন্তু কবিতার শেষ ছত্রসমূহে কবি আমাদের আনন্দময়ীর আগমনের কথা শুনিয়েছেন:
হঠাৎ কখন উঠলো ক্ষেপে বিদ্রোহিনী ঝাঁসি-রানী।
ক্ষ্যাপা মেয়ের অভিমানেও এলি নে তুই মা ভবানী।
এমনি করে ফাঁকি দিয়ে আর কতকাল নিবি পূজা?
পাষাণ বাপের পাষাণ মেয়ে, আয় মা এবার দশভূজা।

তিনি ঝাঁসির রাণীর মাঝে খুঁজে পেয়েছেন বিদ্রোহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। ভীরুতাহীন শক্তি-পূজাকে তুচ্ছ করে এমনি বিদ্রোহী দৃপ্ততায় সত্যিকারের আনন্দময়ীর আগমন প্রতীক্ষায় কবি আশাবাদী। এই আনন্দময়ী আমাদের শান্তির ললিত বাণী শোনাতে আসবেন। না, বরং দ্রোহ-বিদ্রোহের স্ফুরণ নিয়ে ভারতমাতাকে স্বাধীন করার প্রতিশ্রুতিতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ রইবেন। কবিতার মূল বক্তব্য গান্ধীবাদী ভাবধারার বিরুদ্ধে এক দ্রোহ ঘােষণারই সামিল। ভারতমাতার এ দুর্দিনে নজরুল ‘ম্রিয়মান অস্পষ্ট শ্রুতি’ চান না। তিনি প্রত্যাশা করেন দুর্গতিনাশিনী দশভূজার মতো দুর্গাকে যিনি সাম্রাজ্যবাদের অসুর-বধে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। সেই ঝাঁপিয়ে পড়ার কাজে তাই লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, শিব নজরুলের কাছে প্রত্যাশিত নয়। নজরুল প্রত্যাশা করছেন দুর্গাকে। বিদ্রোহিনী ঝাঁসির রাণীর মধ্যে কবি সেই অধুনা-দুর্গার সন্ধান পেয়েছেন।
গান্ধীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে নজরুল তাঁর প্রতি অনুরাগ দেখিয়েছিলেন। ১৯২৪-২৫ এর দিকে গান্ধীবাদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ ঘোষণা করার আগেও কিন্তু কবি শান্তির পথ অপেক্ষা বিপ্লবের পথকে ভারতের স্বাধীনতার জন্য উপযুক্ত মনে করেছেন। ১৯২২ সালে ১৩ অক্টোবর ধূমকেতুর দুর্গাপূজা সংখ্যার সম্পাদকীয়তে সেই অভিব্যক্তি প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের পথে ফেরার আহ্বানটি লক্ষ্য করা যায়। বোঝা যায় ১৯২৪এর আগেও নজরুল গান্ধীবাদী আপসকামী পথ থেকে বের হয়ে আসার উপায় খুঁজছিলেন। ধূমকেতুর পথ’ শিরোনামে সম্পাদকীয়তে তিনি লিখেছেন:
সর্বপ্রথম ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চাই। স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা ও
কথার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক।
পরমাণু অংশ বিদেশের অধীনে থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা-রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোনো বিদেশীর মোগলী।
করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না।
এই দ্ব্যর্থহীন ঘােষণায় শুধু ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই নয়, বিদ্রোহ জাতীয় সংগ্রামে গান্ধীবাদের ম্রিয়মান-স্বরূপের বিরুদ্ধেও।
নজরুলের সঙ্গে গান্ধীর পরোক্ষ পার্থক্য সূচিত হতে থাকে ১৯২১-এর পরে। সংগ্রামের লক্ষ্য ও পথ নিয়ে দু’জনের মধ্যে এ পার্থক্য আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯২২ এর দিকে। এ সময় ধূমকেতু পত্রিকার সম্পাদকীয়তে ‘ধূমকেতুর পথ’ শিরোনামে নজরুল যে বিদ্রোহের শুরু করেছেন তাকে প্রত্যেক ভারতীয়ের মননে স্বাধীনতার পূর্ণ আকাক্সক্ষা প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস বলা যায়। সুতরাং আত্মোপলব্ধি, আত্মবোধ কিংবা অহিংস নীতির। পথে যাবার বাস্তবতা আজ আছে কি-না তা নিয়ে ভারতীয়দের প্রশ্ন করবার প্রেরণা। নজরুলই প্রথম যুগিয়েছিলেন। অনুসন্ধানী তৎপরতার মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার পথকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। সেই পথ ধরে ভারতবাসী তখন নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে পেরেছে গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ কিংবা অরবিন্দের নেতৃত্বে এগিয়ে যাবার প্রয়োজন আছে কি-না।
নজরুলই প্রথম উপলব্ধি করেছেন যে দাসত্বকে, পরাধীনতাকে না-বুঝে কারো। পক্ষেই স্বাধীনতার অধিকার বোঝা সম্ভব নয়। তাঁর ‘অভয়মন্ত্রে উপযুক্ত দাবীর প্রসঙ্গ ধরেই নজরুল বলেন, অধিকাংশ গান্ধীবাদী ‘লোভ ও প্রতারণা’র মধ্যে বসবাস করছেন। তাঁদের কাছে জাতীয় বীর হবার বিষয়টি একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। আর যাঁরা গান্ধীর অহিংস নীতির ভক্ত সেজে বসে আছেন তাদের কাজটা সামাজিক দায়িত্ব থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে নেবারই সামিল। নজরুলের দৃচকণ্ঠ এভাবে প্রকাশিত হয়েছে:
বল, হউক গান্ধী বন্দী, মোদের সত্য বন্দী নয়।
বল, মাভৈঃ মাভৈঃ পুরুষোত্তম ‘জয়।
তুই নির্ভর কর আপনার পর,
আপন পতাকা কাঁধে তুলে ধর।
সত্য এবং গান্ধী মোটেই অভিন্ন নয়। কিন্তু গান্ধী তাঁর প্রচারের ধরনে সত্য এবং নিজেকে অভিন্ন করে ফেলেন। এভাবেই স্বাধীনতার মূল প্রেরণাটি তখন ভারতীয় চেতনা। থেকে বিদূরিত হয়েছিল। কিন্তু কবি মনে প্রাণে চেয়েছেন এই আত্মশ্লাঘা থেকে জনগণকে বের করে আনতে, ব্যক্তির মধ্যে নিহিত শক্তির উদ্বোধন ঘটাতে। এর মাধ্যমেই ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকে তিনি সম্ভব করে তুলতে চেয়েছেন। তিনি বলছেন:

তুই চেয়ে দেখ ভাই আপনার মাঝে,
সেথা জাগ্রত ভগবান রাজে,
নিজ বিধাতারে মান, আকাশ গলিয়া ক্ষরিবে যে বরাভয়।
তোর বিধাতার ধাতা বিধাতা, বিধাতা কারারুদ্ধ কি হয়?
কবির এই অভয়বাণীতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কোনো ব্যক্তি-বিশেষের বন্দিত্ব (গান্ধীর বন্দিত্বকে তিনি বুঝিয়েছেন) ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনের উদ্যমকে আগলে ধরে রাখতে পারবে না। বরং প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে যে জাগ্রত ভগবান রয়েছে সে কখনো কারারুদ্ধ’ হতে পারে না। সেই অপ্রতিরোধ্য দেবতাই ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করবে। এ কথার আরো তীব্র প্রতিধ্বনি আমরা লক্ষ্য করি অভয় মন্ত্র’ কবিতার শেষে:
বল মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়।
বল্ হউক গান্ধী বন্দী, মোদের সত্য বন্দী নয়।
প্রথাগত বিশ্বাস-বোধ-মূল্যবোধের ভেতর দিয়ে গান্ধীর অপরিহার্য হয়ে উঠবার শিখটিকে নজরুল  মোটেই ভালো চোখে দেখেননি। কারণ তার এই অপরিহার্য দেবতুল্য ভাবমূর্তি নির্মোহ ভারতবাসীর মধ্যে নিষ্প্রভতা তৈরী করেছে। এই নিষ্প্রভ মনন আর যাই হােক, দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙ্গার জন্য যথেষ্ট নয়। তিনি গান্ধীর অনুসারীদেরকে এই নিহিতার পথ ছেড়ে সংগ্রামের পথে আসবার আহ্বান জানান। আগেও উল্লেখ করেছি গ) প্রতি তাঁর অনুসারীদের দেবতুল্য ভক্তি ছিল। এই ভক্তিকেই নজরুল যতো সমস্যার। হিসাবে উল্লেখ করেছেন। এই ভক্তি-অনুশাসনের ফলেই ১৯২২ সালে গান্ধীর গী হবার ঘটনাটি তাঁর অনুসারীদেরকে দারুণভাবে মর্মাহত করে, হতাশ করে। নজরুল লক্ষ্য করেছেন বিশেষ ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে যখন জনগণের মনে কোনো আশা-ভরসা জেগে ওঠে তখন তা-ই হতোদ্যমের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং কোনো ব্যক্তিবিশেষ নয়, বরং প্রতিটি ব্যক্তি নিজের অন্তর্নিহিত শক্তিকে যদি পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, শক্তির উদ্বোধন ঘোষণা করতে পারে, তাহলেই সে নিজের মধ্যেই পেয়ে যাবে ‘সত্যগুরুর সন্ধান। ব্যক্তিপূজা নিজের ভেতরের স্বাধীন দেবতাকে স্তিমিত করে রাখে। নিজের ভেতরের শক্তিকে যদি পূজা করা যায় সেই শক্তিই পারে অশুভ, অমঙ্গলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হতে। কিন্তু গান্ধী নিজেকে এমনভাবে তাঁর ভক্তদের সামনে উপস্থাপন করেছেন যাতে ব্যক্তিসর্বস্বতাই প্রাধান্য পেয়েছে। নজরুল এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভাবাদর্শকেও তার ‘অভয়-মন্ত্র’ কবিতায় বর্জন করেছেন।
নজরুল তার অসংখ্য কবিতায় অহিংসা’র স্তবকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ দমননীতি ‘অহিংসার’ পথে বন্ধ করা সম্ভব নয়। এই দমননীতিকে বন্ধ করার জন্য প্রয়োজন সশস্ত্র সংগ্রামের পথ। ১৯২৬ সালে নজরুলের ‘বিদ্রোহীর বাণী’ কবিতায় এই আর্তি আরো জোরালো হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এ কবিতায় নজরুল গান্ধীর স্বরাজ তত্ত্বকে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে অপ্রাসঙ্গিক হিসাবে ঘােষণা করেছেন। গান্ধীর ‘স্বরাজে’র ধারণায় নজরুল খুঁজে পেয়েছেন দ্ব্যর্থকতা। হয়তো গান্ধী নিজেও এর অর্থ ও তাৎপর্য নিয়ে স্পষ্ট ছিলেন না। নজরুল তাঁর কবিতায় বলেন:
বুকের ভিতর ছ-পাই ন-পাই, মুখে বলিস্ স্বরাজ চাই,
স্বরাজ কথার মানে তোদের ক্রমেই হচ্ছে দরাজ তাই।
‘স্বরাজে’র প্রয়োগ নিয়ে নজরুলের আশঙ্কা মূলত মত ও পথের ভ্রান্ত প্রয়োগের কারণে। ভারত যেখানে আক্রান্ত সেখানে স্বরাজ-যার যার তার তার’ এই নীতিকেই প্রতিষ্ঠিত করে, এই নীতির প্রচার করে যারা মহামানব সেজে বসে আছেন নজরুল তাদেরকে নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তিনি বলছেন:
“ভারত হবে ভারতবাসীর” এই কথাটাও বলতে ভয়!
সেই বুড়োদের বলিস্ নেতা তাদের কথায় চলতে হয়!
নজরুল ‘স্বরাজ’ ধারণার মাঝে খুঁজে পেয়েছেন ভীরুতা ও কাপুরুষতার লক্ষণ। একদিকে স্বরাজে’ পৌরুষের অনুপস্থিতি রয়েছে, অন্যদিকে স্বদেশভূমি টিকিয়ে রাখবার। ক্ষিপ্ততাও তাতে নেই। বৃদ্ধ এবং রক্ষণশীল এসব ব্যক্তিদের কথায় ও কাজে ভন্ডামী। অসংলগ্নতাও রয়েছে। তাই নজরুল এসব প্রবীণ  বয়োবৃদ্ধদের প্রত্যাখ্যান করে নবীনদের, ডেকেছেন। এই নবীনরাই নতুই সংগ্রামের পথের পথিক হবার জন্য উদগ্রীব হয়ে বসে আছে। এ প্রসঙ্গে নজরুল আরো উল্লেখ করেন : আমাদের বয়োবৃদ্ধরা তাদের শান্ত স্নিগ্ধ নির্মল ভাবধারা দ্বারা দেশ ও দেশের জনগণকে ক্লীবে পরিণত করেছে, দেশে। স্বাধীনতাকেই গুরুত্বহীন করে তুলেছে, নবীনদের ব্যগ্রতাকে স্তিমিত করে দিচ্ছে।’ নজরুল তাই আরো ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের সম্পর্কে বলেন:
কর্তা হবার সখ সবারই স্বরাজ-ফরাজ ছল কেবল!
ফাঁকা প্রেমের ফুস্-মন্তর, মুখ সরল আর মন গরল।
স্বরাজের অধিকতার মুখে ‘সরল-মন্তর’ থাকলেও অন্যদের মনের ভেতরে যে গরল রয়েছে সে খবরটি নজরুল ঠিকই বুঝতে পেরেছেন। দেশ যখন পরাধীন, দেশের সর্বত্র যেখানে শোষণ-বঞ্চনা ও পরাধীনতার গ্লানি, সেখানে সংগ্রামের পথ পরিহার করে, সৌম্যসাধু পুরুষ সাজার গোটা ব্যাপারটিকে ‘ছল কেবল হিসাবেই নজরুল দেখেছেন। গান্ধী তখন সেই ছলের অধিকর্তা হয়ে ভারতের প্রান্ত থেকে প্রান্তরে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ