শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর শেষ দিনগুলি

নূরুল আনাম (মিঠু) : কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর জীবনের শেষ পর্যায়ের টার্নিং পয়েন্ট ধরা হয় ১৯৪৮ এর এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে। ঐ মাসের ১৫ তারিখ থেকে তিনি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে অনেকগুলো সংবর্ধনা ও বক্তৃতার শেষে যখন তিনি করাচী ফিরে আসেন তখন তিনি অত্যন্ত পীড়িত হয়ে পড়েছিলেন আর বেশিক্ষণ কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তার সেক্রেটারীর ভাষায় : ‘তখন তিনি অধিকাংশ সময় উপরতলায় নিজের কামরায় থাকতেন ও সোফায় শুয়ে পত্রিকা পড়তেন। পাঞ্জাবের তৎকালীন গভর্নর সজর ফ্রান্সিস মোদীর মতে, তিনি পাঞ্জাবের মন্ত্রীদের সঙ্গে অনেক ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করতেন।
মে মাসে জিন্নাহ নতুন একজন নেভাল এডিসি নিয়োগ করলেন। তার নাম ছিল লে: মাজহার আহমদ, যিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার সাথে ছিলেন। জুন মাসে ডাক্তারদের পরামর্শে তাকে বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটার ৭০ মাইল দূরে জিয়ারত নামক স্বাস্থ্য নিবাসে নেয়া হলো। জিন্নাহ যখন জিয়ারতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন সে সময় করাচীতে গভর্নর জেনারেলের বাড়ির পাশে পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকের নতুন ভবন স্থাপিত হয়। এই ব্যাংকের ভিতর দিয়ে মূর্ত হয়ে উঠল জিন্নাহর আজীবনের স্বাধীন পাকিস্তানের স্বপ্ন। তার স্বাধীন অর্থনীতি ও মুদ্রাব্যবস্থা। এই দুর্বল অসুস্থ শরীর নিয়েও সবার নিষেধ সত্ত্বেও তিনি স্টেট ব্যাংক উদ্বোধন করতে জিয়ারত থেকে প্লেনে করাচী এসে পৌঁছলেন। শারীরক দুর্বলতার কারণে তার কণ্ঠস্বরে তেমন জোর ছিল না। কিন্তু তারপরও যে উদ্বোধনী ভাষণ দিলেন তা যেমন সুস্পষ্ট তেমনি আকর্ষণীয়। সুস্পষ্টভাবেই তিনি পশ্চিমা অর্থনীতির ত্রুটি-বিচ্যুতির নিন্দা করলেন। এ থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে, শুধু আইন ও রাজনীতিই নয়, অর্থনীতিতেও তার জ্ঞান ছিল গভীর। যদিও পরবর্তীতে অনেকে তাকে পুঁজিবাদী বলে বিদ্রুপ করেছেন, তা যে স্রেফ প্রোপাগান্ডা মাত্র এর প্রমাণস্বরূপ বলা যায়, তিনি ইসলামী সাম্য ও ভাবধারার ভিত্তিতে একটা নতুন সামাজিক কল্যাণকর অর্থনৈতিক নিয়ম প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। স্টেট ব্যাংক উদ্বোধনের তেইশ দিন পর আবার জিয়ারতের বাংলাতে ফিরে এলেন। নতুন একজন ডাক্তারের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে তাকে রাখা হলো। এই ডাক্তার হলো বিলাতের গাদ হাসপাতালের লে: কর্নেল এলাহী বক্স। জুলাই মাসের চার তারিখে ভোরবেলা পরীক্ষা করে তিনি দেখলেন, জিন্নাহ দুঃখজনকভাবে দুর্বল ও শীর্ণ হয়ে গেছেন। তার গায়ের রং অনেকটা মলিন হয়ে গেছে। জিন্নাহ তখন বললেন, তার শরীরে মারাত্মক কোন রোগ হয়নি।
গত চব্বিশ বছর ধরে দিনে ১৪ ঘণ্টা করে ক্রমাগত পরিশ্রমের ফলে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছেন। গত কয়েক বছর ধরে বছরে একবার তার জ¦র ও কাশি হচ্ছিল। ড. বকস তার কথাকে বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না। অন্যান্য ডাক্তাদের মতামত নেয়া হলো এবং সবাই একমত হলেন যে, তিনি ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করতে যাচ্ছেন। তার সেবার জন্য জনহাম নামে একজন নার্সকে নিয়োগ করা হলো। প্রথমে আপত্তি থাকলেও পরে তিনি এতে সম্মতি দিলেন। আগস্টের ৯ তারিখে ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তাকে জিয়ারতের বিপদজনক উচ্চতা থেকে কোয়েটায় স্থানান্তরিত করতে হবে। সে অনুসারে তারই ইচ্ছানুযায়ী তাকে ভাল কাপড় পরিয়ে বহু কষ্টে স্ট্রেচারে তুলে কোয়েটায় আনা হলো। তখন তার ওজন ছিল মাত্র ৭০ পাউন্ড। ১৬ই আগস্ট তিনি খানিকটা সুস্থ হলেন এবং দিনে এক ঘণ্টা করে সরকারি কগজপত্র দেখতে লাগলেন। এই সময় তৎকালীন  পশ্চিম পাকিস্তানের মুখ্য সচিব চৌধুরী মোহাম্মদ আলী এসে তাকে দেখলেন এবং তার মনে হলো মানসিক দিক থেকে তিনি আগের মতই সচেতন ও আত্মনির্ভরশীল রয়েছেন। এর কয়েকদিন পর তিনি উঠে দাঁড়িয়ে খানিকটা হাঁটাচলা করতে সক্ষম হলেন। তিনি টমেটো, বিচফল, আঙ্গুর খেতে লাগলেন এবং করাচী ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন, ‘আমি হেঁটে যেতে চাই এবং আমার কামরা থেকে আমাকে স্ট্রেচারে বহন করা হোক এটা আমি চাই না। ড. মাজহারের মতে, এটাই ছিল তার জীবনী শক্তির শেষ প্রকাশ। ২ শে আগস্টে তিনি ড. এলাহী বকসকে বললেন, ‘শোন, তুমি যখন প্রথম জিয়ারতে এসেছিলে তখন আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন বাঁচি কি মরি তাতে কিছু যায় আসে না।’ ড. বকস তার ডাইরীতে বিস্মিত হয়ে লিখেছেন, ‘জীবনের প্রতি এই বিতৃষ্ণার কারণ আমি বুঝতে পারলাম না। তিনি যুক্তি দেখালেন, তার কর্তব্য সম্পন্ন হয়ে গেছে, এটা আমার বিশ্বাস হলো না। পাঁচ সপ্তাহ আগে তার কাজ কি অসম্পূর্ণ ছিল। এর মধ্যে তিনি এমন কি কাজ করেছেন, যার ফলে তার মনে হলো তার সকল প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। আমার মনে হলো এর মধ্যে এমন কিছু ঘটেছে, যার ফলে তার বেঁচে থাকার আগ্রহ নষ্ট হয়ে গেছে।’ সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখে জিন্নাহ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলেন এবং তিনদিন পর্যন্ত তিনি ক্রমবর্ধমান শারীরিক উত্তাপ ও অস্থিরতার মধ্যে কাটালেন এবং অচেতন অবস্থায় মনের কথাগুলো বেরিয়ে আসতে লাগল। এগুলোর বেশির ভাগই কাশ্মীর সংক্রান্ত। সে সময় একবার উচ্চকণ্ঠে, ‘আজকে কাশ্মীর কমিশনের সঙ্গে আমার একটা এ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। তারা কি এসেছে, তারা এখন কোথায়? ১০ই সেপ্টেম্বর ড. বক্স মিস জিন্নাহকে বললেন, তার ভাইয়ের আর দুই দিনের বেশি বাঁচার সম্ভাবনা নেই। পরদিন ভোরে করাচী থেকে তিনটা বিমান এসে কোয়েটায় নামল এবং কায়েদে আজমকে স্ট্রেচারে করে তার বিমানে তোলা হলো। বিমানের বৃটিশ পাইলট এবং তার সহকর্মীরা লাইন বেঁধে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানালেন। জিন্নাহ ধীরে ধীরে তার দুর্বল হাত একটু উঁচু করে তার জবাব দিলেন। পরদিন ১১ই সেপ্টেম্বর ৪:১৫ মিনিটে বিমানটা করাচীর মৌরীপুর বিমানবন্দরে অবতরণ করল। যেহেতু বিষয়টা গোপন ছিল, তাই বিমানবন্দরে তেমন মানুষ ছিল না। তখন আকাশে রোদ ছিল। তাই তিনি হাত উঁচু করে সূর্যের আলো থেকে চোখকে আড়াল করতে চেষ্টা করলেন। একটা সামরিক অ্যাম্বুলেন্সে স্ট্রেচারটা তোলা হলো।
মিস জিন্নাহ ও সিস্টার জনহাম এ্যাম্বুলেন্সে ওঠার পর যাত্রা শুরু হলো। ছোট্ট এই শোভাযাত্রাটা শহরের বাইরে একটা উদ্বাস্তু শিবিরের কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সটা অচল হয়ে পড়ল। প্রায় এক ঘন্টা চেষ্টায়ও অ্যাম্বুলেন্স সচল হলো না। এর মধ্যে করাচী থেকে আর একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে হাজির হলো। সিস্টার জনহাম এই এক ঘণ্টার অভিজ্ঞতার মর্মস্পর্শী বিবরণ দিয়েছেন। ‘আমরা তখনও রিফিউজি ক্যাম্পের পাশে কাদা আবর্জনা ও শত শত মাছির মধ্যে অপেক্ষা করছিলাম। আমি কোন রকমে একটা কাগজের টুকরা সংগ্রহ করে মি. জিন্নাহর মুখে বাতাস করে মাছিগুলো তাড়াতে লাগলাম। আমি তার সঙ্গে কয়েক মিনিট সম্পূর্ণ একা ছিলাম এবং তিনি আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যা আমি কখনও ভুলতে পারব না। তিনি তার চাদরের নিচ থেকে হাতটা মুক্ত করলেন এবং হাতটা আমার বাহুর উপর ন্যস্ত করলেন। তিনি কোন কথা বললেন না। কিন্তু তার দুই চোখে কৃতজ্ঞতার ভাব ফুটে উঠল। তার জন্য এ যাবত আমি যা করেছি ঐ দৃষ্টিতেই আমি তার সম্পূর্ণ পুরস্কার পেয়ে গেলাম। তার সমস্ত হৃদয় ঐ মুহূর্তে তার দুচোখে এসে অবস্থান নিয়েছিল। ৬:১০ মিনিটের সময় অ্যাম্বুলেন্স গভর্নমেন্ট হাউজের সামনে এসে দাঁড়াল এবং কায়েদকে তার কামরায় নিয়ে যাওয়া হলো। এ সময় তাকে একটা হার্ট টনিক দেয়া হলো। এ সময় ডাক্তাররা তার বিছানার প্রান্ত উপর দিকে উঠিয়ে তার শারীরে রক্ত সঞ্চালনের চেষ্টা করলেন। রাত ৯:৫০ মিনিটে ড. বক্স জিন্নাহকে কানে কানে বললেন, ‘স্যার আমরা আপনাকে একটা ইনজেকশন দিয়েছি যা আপনাকে সতেজ করে তুলবে।
আল্লাহ চাহে তো আপনি বেঁচে উঠবেন।’ জিন্নাহ মাথা নাড়লেন এবং শেষবারের মত কথা বললেন। তিনি খুব অস্পষ্ট স্বরে বললেন, ‘না, আমি জানি তা হবে না।’ এর আধা ঘণ্টা পরই তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। সারা রাত ধরে পুরো বাজার মহল্লায় জিন্নাহর মৃত্যুর খবর প্রচারিত হয়ে গেল। হাজার হাজার মানুষ গভর্নমেন্ট হাউজের সুউচ্চ কালো দেয়ালের পাশে এসে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ পর একজন লোক কাফন হাতে একটা ছোট শিশি নিয়ে এগিয়ে এলো। কাফনে জমজমের পানি ছিল এবং শিশির আতর নবীর কবরে ছিটানো হয়েছিল। কায়েদে আজমকে এই কাফন পরিয়ে আতর ছিটিয়ে করাচীর মধ্যখান যেখান থেকে ৭২ বছর আগে শূন্য হাতে একজন বালক হিসাবে উঠে এসেছিলেন তারই কেন্দ্রস্থলে একজন যুগস্রষ্টারূপে পাক-ভারত উপমহাদেশের তিন-চতুর্থাংশ মুসলমানের মুক্তিদাতা হিসাবে শেষশয্যা গ্রহণ করলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ