শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বা সিপাহী বিদ্রোহ

ওমর খালেদ রুমী : ১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন পলাশীর প্রান্তরে বিলুপ্ত হওয়া স্বাধীনতার সূর্য মুসলমানরা প্রায় ১০০ বছর ধরে খুঁজে ফিরছিলো। এই দীর্ঘ সময়ে অজস্র প্রতিবাদ, বিপ্লব, বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এগুলোর প্রায় সবই সংঘটিত হয়েছিলো মুসলমানদের দ্বারা। হিন্দুরা তখন ইংরেজদের সুবিধাভোগী শ্রেণী। সিপাহী বিদ্রোহ আয়তন ও বিস্তৃতিতে যতোটা ব্যাপক ছিলো ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে আর কোন প্রতিরোধ সংগ্রাম এতোটা তীব্র আকার ধারণ করেনি। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই বিদ্রোহকে এতোটা হালকভাবে দেখানো হয়েছে যে মনে হয় ঐ সময় তেমন কিছু ঘটেনি। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে যে, বিদ্রোহের ভয়াবহতা আর তীব্রতা এতো বেশী ছিলো যে, এটা উপমহাদেশে কোম্পানীর শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলো। এই বিদ্রোহের পরপরই ভারতে ব্রিটিশ সম্রাটের সরাসরি শাসন কায়েম হয়। ইংরেজরা এটাও বুঝাতে পারে যে, ভারতীয়দের কেবল দমন পীড়ন করলে চলবে না। তাদেরকে অধিকারও দিতে হবে। আর এরই ফলশ্রুতিতে ১৮৫৯ সালে প্রথম ভারত শাসন আইন প্রণয়ন হয় যেখানে কিছুটা হলেও ভারতীয়দের অধিকার আর অংশগ্রহণের স্বীকৃতি ছিলো।
এভাবেই পরবর্তীতে ১৮৮৫ সালে কংগ্রেসের জন্ম হয়েছিলো। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। ১৯০৯, ১৯১৯ এবং ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের যে ধারাবাহিকতা এবং এর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় ভারতীয়দের অধিকতর অংশগ্রহণের যে সুযোগ তার পরিণতিতে ১৯৪৭ সালের ভারতীয় স্বাধীনতা আইনের মাধ্যমে ভারতের মুক্তির মুখ দেখা সম্ভব হয়েছিলো। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, সিপাহী বিদ্রোহই ভারতীয় উপমহাদেশে দীর্ঘ একশ বছর ধরে চলমান কোম্পানীর জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রথম ফলপ্রসূ পদক্ষেপ যার ফলশ্রুতিতে অন্ততঃ ভারতীয়দের কথা বলার অধিকারের স্বীকৃতি লাভ হয়েছিলো। প্রায় ১০০ বছর ধরে উপমহাদেশে বিরাজমান অন্ধকার কিছুটা হলেও আলোর মুখ দেখেছিলো। সিপাহী বিদ্রোহ এবং তার পরবর্তী সময়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণে প্রায় আট লক্ষ মানুষের প্রাণহানি হয়েছিলো। স্বাধীনতার জন্য অকাতরে এতো প্রাণের বলিদান খুব কমই দেখা যায়। শুধুমাত্র একটা কারণেই এটা আজ এতাটা অনুল্লেখিত যে এটা ছিলো মুসলমানদের রক্ত। হিন্দু অধ্যুষিত উপমহাদেশে মুসলমানরা স্বাধীনতার জন্যে যতোটা বলিদান দিয়েছে আনুপাতিক হারে হিন্দুরা তার ধারে কাছেও নেই। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার কারণে তাদের পক্ষ থেকেই বেশী ত্যাগ স্বীকারের কথা ছিলো।
যদিও ১৮৫৭ সালের ১০ই মে দিল্লী থেকে ৪০ মাইল দূরে মিরাটে কোম্পানীর অধীনস্ত ভারতীয় সৈন্যদের প্রতিবাদের সূত্র ধরেই এই বিদ্রোহ শুরু হয়েছিলো কিন্তু পরবর্তীতে আস্তে আস্তে তা উত্তর ভারত এবং মধ্য ভারতের বিস্তৃত এলাকায় বিদ্যুতের গতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
বিদ্রোহের প্রাথমিক সূত্র হিসেবে ২৯ শে মার্চ ১৮৫৭ সালে বারাকপুরে “বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্যানট্রি”র সৈন্য মঙ্গল পান্ডের প্রতিবাদ এবং পরবর্তীতে গ্রেফতার ও তার ফাঁসিতে ঝুলানোর ঘটনার উল্লেখ করা হয়। কিন্তু মঙ্গল পান্ডের এই প্রতিবাদ পরিকল্পিত না স্বপ্রণোদিত তা নিয়ে আজও ধোঁয়াশা আছে। ৮ই এপ্রিল ১৯৫৭ সাল মঙ্গল পান্ডের ফাঁসি হয় যদিও কোর্ট মার্শালে তিনি জানিয়েছিলেন প্রতিবাদের সময় তিনি ভাং এর নেশাগ্রস্ত ছিলেন। পরবর্তীতে ২১শে এপ্রিল ১৮৫৭ তারিখে তাকে গ্রেফতার করতে অস্বীকারকারী ঈশ্বরী প্রাসাদেরও ফাঁসি হয়। তার প্রতিবাদের ভাষা ছিলো রাইফেলের কার্তুজে যে চর্বি লাগানো আছে যা গুলি করার আগ মুহূর্তে দাঁত দিয়ে কাটতে হয় তাতে গরু ও শুকরের চর্বি যুক্ত আছে আর এটা করা হয়েছে হিন্দু মুসলমান উভয়ের ধর্ম নষ্ট করার জন্য।
এ ঘটনার পর থেকে নানা ধরনের অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এই অস্থিরতাকে আরো বাড়িয়ে দেয় দীর্ঘ একশো বছরের কোম্পানীর শাসনামলের যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, বঞ্চনা আর অত্যাচারের বিভৎস স্মৃতি। সৈন্যদের পাশাপাশি সাধারণ জনগণ প্রতিবাদী হতে শুরু করে। ঘটনা চরম আকার ধারণ করে যখন ৯ই মে মিরাটে অবস্থিত বেঙ্গল আর্মির হেড কোয়ার্টারে থার্ড বেঙ্গল লাইট ক্যাভালরির ৯০ জন সৈন্যকে প্যারেডে অংশগ্রহণ করতে বলা হয় এবং এনফিল্ড পি-৫৩ রাইফেলের সেই বিতর্কিত কার্তুজ সংগ্রহ করতে বলা হয়। মাত্র ৫ জন বাদে বাকি ৮৫ জনই এটা অস্বীকার করে। এদেরকে তৎক্ষণাত বন্দী করা হয় এবং কোর্ট মার্শাল শেষে বেশীর ভাগই দশ বছর এবং মাত্র কয়েক জন তরুণ সৈন্যকে ৫ বছরের জন্য সশ্রম কারাদন্ডের শাস্তি দিয়ে জেলে পুরে দেওয়া হয়।
পরদিন গুজব রটে যায় অন্যান্য সৈন্যরা জেলের ভিতরে তাদের সতীর্থদের উদ্ধারের জন্য সশস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু ইংরেজরা এতে কান দেয়নি। হঠাৎ করেই ইংরেজ সৈন্যরা দেশীয় সৈন্যদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। মিরাট শহরে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। কিছু ইংরেজ সৈন্যের পাশাপাশি কিছু ইংরেজ নাগরিক যার মধ্যে নারী ও শিশুরাও অন্তর্ভূক্ত নিহত হয়। এভাবেই মিরাটেই প্রথম বিদ্রোহের সূত্রপাত হয় যা পরবর্তীতে খুবই দ্রুত দিল্লীতেও ছড়িয়ে পড়ে।
১১ই মে সৈন্যদের অনুরোধে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর দীর্ঘকাল পর সিংহাসনে বসে রাজকার্য পরিচালনা করেন। সভাসদ বলতে বেশীর ভাগই ছিলেন বিদ্রোহী সৈন্যরা। ইংরেজরা অবাক হয়ে যায় যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বলতে গেলে ক্ষমতাহীন সম্রাটের ডাকে সাধারণ জনগন দলে দলে বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করতে দেখে। বাহাদুর শাহ জাফরের পুত্র মির্জা মোগল প্রধান সেনাপতি হন যদিও তার কোন সামরিক জ্ঞান ছিল না। পরবর্তীতে বখত খান তার স্থলাভিষিক্ত হন। অনেকেই আন্তরিকতার সাথে বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করে যদিও অনেকেই আবার নিজস্ব স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত হয়ে উঠে।
স্থানীয় অনেক গণ্যমাণ্য ব্যক্তিত্ব, আঞ্চলিক প্রধান, রাজ্য প্রধান, জমিদার সম্রাটের অধীনে বিদ্রোহে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে শপখ গ্রহণ করে। মিরাট এবং দিল্লীর মধ্যবর্তী অঞ্চলের গ্রামগুলোর অধিবাসী যারা মূলতঃ গুর্জর নামে পরিচিত বিদ্রোহে যোগদান করে।
সিপাহী বিদ্রোহ সিপাহীরা শুরু করলেও আস্তে আস্তে এই বিদ্রোহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। এর সূত্রপাত হয়েছিলো বারাকপুরে মঙ্গল পান্ডের প্রতিবাদের মাধ্যমে। ধীরে ধীরে এটা দিল্লী, লাখনৌ, কানপুর, ঝাঁসি, বিহারের জগদীশপুর, এলাহাবাদ, বেনারস, ফাইজাবাদ, ফররুখাবাদ, বিজনুর, মুরাদাবাদ, বরেলি, মন্দসর, গোয়ালিয়র, আসাম, উড়িষ্যা, কুল্লু, রাজস্থান, গোরাখপুর, মথুরা সহ আরও অনেক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। দিল্লীতে বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং বাহাদুর শাহ জাফর এবং তার সেনাপতি বখত খান। তাদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিলেন তারই উপদেষ্টা হাকিম আহসানুল্লাহ খান। লাখনৌতে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলো বেগম হযরত মহলের নেতৃত্বে। সাথে ছিল তারই পুত্র বিরজিস কদর এবং তাদের প্রাক্তন উপদেষ্টা আহমদুল্লাহ ও ফজলে হক খয়রাবাদি। কানপুরে নানা সাহেব এবং তার ভাইয়ের ছেলে রাও সাহেব। তাঁদের সাথে ছিলেন তাদেরই উপদেষ্টা আজিমুল্লাহ খান। ঝাঁসিতে লক্ষ্মী বাই। বিহারে কুনওয়ার সিং এবং অমর সিং। এলাহাবাদ এবং বোনারসে মৌলভি লিয়াকত আলি। ফাইজাবাদে মৌলভি আহমদুল্লাহ শাহ ফাইজাবাদি। ফররুখাবাদে তুফজাল হাসান খান। বিজনুরে নঙওয়াব মাহমুদ খান। মুরাদাবাদে আব্দুল আলি খান। বেরেলিতে খান বাহাদুর খান। মন্দসর-এ ফিরোজ শাহ, গোয়ালিয়র এ তাঁতিয়া টোপি, আসামে কান্দাপরেশ্বর এবং মনিরাম, উড়িষ্যায় সুরেন্দ্র শাহি ও উজ্জল শাহি, কুল্লুতে রাজা প্রতাপ সিং, রাজস্থানে জয়দয়াল সিং এবং হরদয়াল সিং, গোরাখপুরে গজধর সিং আর মথুরায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেভি সিং ও কদম সিং। এছাড়াও আরও অনেক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
২০শে সেপ্টেম্বর ১৮৫৭ সালে দিল্লীর পতন হয় এবং বাহাদুর শাহ জাফর গ্রেফতার হন। তার গ্রেফতারের পর দিল্লীর আশেপাশে এবং আরও কিছু এলাকায় ১৮৫৮ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। যদিও ইংরেজরা ১৮৫৯ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখেন এবং বিদ্রোহের প্রতিশোধ হিসেবে প্রায় ৮,০০,০০০ লোকের প্রাণহানি ঘটান।
টীকা :
বাহাদুর শাহ জাফর (১৭৭৫-১৮৬২)
বাহাদুর শাহ জাফর যিনি ইতিহাসে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ নামে পরিচিত সর্বশেষ মোগল সম্রাট ছিলেন। ১৮৫৭ সালের ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধে বিদ্রোহী সৈন্যরা তাকে বিদ্রোহের নেতৃত্ব নিতে অনুরোধ করলে তিনি তাদের প্রত্যাখান করতে পারেননি। ১৮৫৭ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে দিল্লীর পতন হলে ইংরেজরা তাকে গ্রেপ্তার করে এবং তার দুই পুত্র মির্জা মোগল এবং মির্জা খিজির সুলতানের মস্তকদ্বয় একটি থালায় করে তার সামনে উপঢৌকন হিসেবে প্রেরণ করে। সম্রাটের জন্য এর চেয়ে হৃদয় বিদারক আর কিছুই ছিলো না। পরবর্তীতে ইংরেজরা তাকে রেঙ্গুনে নির্বাসন দেয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেখানেই নির্বাসনে ছিলেন। তার সমাধিত্ত সেখানেই। একজন সিদ্ধহস্ত কবি বাহাদুর শাহ জাফর গজল রচনায় উৎকর্ষতা অর্জন করেছিলেন। তিনি একজন ভালো ক্যালিওগ্রাফারও ছিলেন। তার ৪ জন স্ত্রী ও ২২ জন পুত্র ছিলো।
১৮তম মোগল বাদশাহ দ্বিতীয় আকবর এর পুত্র বাহাদুর শাহ ১৮৩৭ সালের ২রা সেপ্টেম্বর দিল্লীর লালকেল্লায় শপথ গ্রহণের মাধ্যমে বাদশাহী গ্রহণ করেন। তার জন্ম হয়েছিলো ১৭৭৫ সালের ২৪শে অক্টোবর। ৭ই নভেম্বর ১৮৬২ সালে ৮৭ বছর বয়সে বার্মার রেঙ্গুনে নির্বাসনে থাকা অবস্থায় তিনি মারা যান।
বখত খান (১৭৯৭-১৮৫৯)
১৭৯৭ সালে রোহিলাখন্ডের বিজনুরে জন্মগ্রহণ করেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সুবেদার ছিলেন। তিনি ছিলেন পশতুন জাতির লোক এবং রোহিলাখন্ডের শাসক নজিব উদ দৌলার আত্মীয়। অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন লোক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন এবং ইংরেজদেরও অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন।
সিপাহী বিদ্রোহে দিল্লী এবং তার পাশ্ববর্তী এলাকার সেনাপতি বখত খানকে তার অনেক প্রিয় ইংরেজ সামরিক কর্মকর্তার বিরূদ্ধেই লড়তে হয়েছিল। বেঙ্গল হর্স আর্টিলারিতে ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা ছিলো তার। মিরাটে বিদ্রোহের খবর পেয়ে বখত খান দিল্লীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন এবং ১লা জুলাই সেখানে পৌঁছেন। তার সাথে প্রচুর সংখ্যক রোহিলা সৈন্য ছিলো। যদিও শহরটি আগে ভাগেই বিদ্রোহিরা দখলে নিয়েছিলো। মোগল যুবরাজ মির্জা মোগলের সামরিক অনভিজ্ঞতা এবং দিল্লীতে ছড়িয়ে পড়া বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অভিজ্ঞ বখত খানের সাফল্য তাকে কার্যত প্রধান সামরিক কমান্ডার এ পরিণত করে। ব্রিটিশরা দিল্লীতে হামলা চালানো শুরু করেছিলো ৮ই জুন এবং ১৪ই সেপ্টেম্বর তারা সাফল্যের সাথে কাশ্মীরি গেটে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। ২০শে সেপ্টেম্বর বাহাদুর শাহ বখত খানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হুমায়ুনের সমাধিতে আশ্রয় নেন।
বখত খান দিল্লী ত্যাগ করেন এবং লাখনৌ ও শাহজাহানপুর এর বিদ্রোহে যোগদান করেন।
১৩ই মে ১৮৫৯ সালে তিনি শত্রুর আক্রমনে মারাত্মক আহত হয়ে মারা যান। তাকে খাইবার পাখতুনওয়া জেলায় দাফন করা হয় যা বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত।
হাকিম আহসান উল্লাহ খান (১৭৯৭-১৮৬২)
হাকিম আহসান উল্লাহ খান ১৭৯৭ সালে জন্মেছিলেন। তিনি মূলতঃ সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ এর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং প্রধান পরামর্শক ছিলেন। তার পূর্ব পুরুষরা হেরাত থেকে কাশ্মীরের ডাল লেকে স্থানান্তরিত হয়েছিলো এবং পরবর্তীতে তারা দিল্লীতে বসবাস করতে শুরু করে। তিনি আরবী, উর্দু এবং ফারসিতে সুপন্ডিত ছিলেন। ইউনানী চিকিৎসায় তার দখল ছিলো অসাধারণ। এছাড়াও মেটাফিজিক্স, এ্যাস্ট্রোনমি, গণিতবিদ্যা, দর্শনশাস্ত্র এবং সর্বোপরি কবিতার উপর তার অগাধ পান্ডিত্য তাকে গালিব, মমিন এবং জউক প্রভৃতি পন্ডিতদের প্রিয় পাত্রে পরিণত করেছিলো। তিনি গালিবের “দেওয়ান” এবং জউকের “ইনশা এ মমিন” প্রকাশ করেছিলেন। তার স্বরচিত গ্রন্থ “আহসান আল কারাবদিন” এর প্রথম কপিটি তিনি তার প্রিয় স¤্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে উপহার দিয়েছিলেন এবং বেশ কিছু কপি তিনি জয়পুর এবং রামপুরের নবাবদের পাঠিয়েছিলেন। বইটি বর্তমানে মহামূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হয়।
সিপাহী বিদ্রোহ চলাকালে তার বিরুদ্ধে ইংরেজদের সাথে যোগ সাজশের অভিযোগে ওঠে এবং তার প্রিয় হাভেলিতেও সৈন্যরা লুটতরাজ চালায়। তবে এর কারণ হিসেবে অবশ্য ধারণা করা হয় যে তিনি সৈন্যদের লুটতরাজের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন এবং তাদের বহিষ্কারের জন্য সম্রাটকে সুপারিশ করার জন্য লাল কেল্লায় গিয়েছিলেন। অবশ্য সম্রাটের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়নি কারণ সম্রাট তখন তার খোয়াব গাহ-তে বেগম জিনাত মহলের সাথে বিশ্রামরত ছিলেন।
বিদ্রোহ ব্যর্থ হয় এবং সম্রাট বরেলি থেকে রামপুর হয়ে মক্কায় পলায়ন করার চিন্তা করেছিলেন। এতে তার সেনাপতি বখত খানের সহযোগিতা করার কথা ছিলো। কিন্তু হাকিমের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি এই পরিকল্পনা ত্যাগ করেন এবং হুমায়ুনের সমাধিতে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি ইংরেজদের কাছে এই শর্তে আত্মসমর্পণ করেছিলেন যে তার পুরো পরিবারকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে। কিন্তু ইংরেজরা সেই কথা রাখেনি এবং সম্রাটের দুই পুত্র এবং পৌত্রকে হত্যা করা হয়। সম্রাটের বিচার করা হয় যা ১৮৫৮ সাল থেকে ১৮৬২ সাল  পর্যন্ত চলছিল। এ সময় সম্রাট রেঙ্গুনে নির্বাসিত ছিলেন। ১৮৬২ সালে তার মৃত্যু হলে বিচার কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায়।
বৃদ্ধ হাকিম বরোদায় চলে যান এবং ১৮৭৩ সালে ৭৬ বছর বয়সে সেখানে মারা যান। তার উত্তরসূরীরা বর্তমানে পাকিস্তানে বসবাস করছেন।
আজিমুল্লাহ খান ইউসুফ জাই (১৮৩০-১৮৫৯)
১৮৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৫৯ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে তিনি মারা যান। প্রথমে তিনি দ্বিতীয় পেশবা বাজী রাও এর পালক পুত্র নানা সাহেব-এর সেক্রেটারী এবং পরবর্তীতে উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
১৮৩৭-৩৮ এর দুর্ভিক্ষের সময় একটি ৭ বছরের ক্ষুধার্ত বালক হিসেবে তাকে কানপুরের একটি মিশনে তার মায়ের সাথে উদ্ধার করা হয়। খুব শীঘ্রই তিনি ইংরেজী ও ফরাসী ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন যা তৎকালীন সময়ে ছিলো অনেক বড় অর্জন এবং বেশ কয়েকজন ইংরেজ কর্মকর্তার সহকারী হিসেবে কাজ করেন। তাকে “ক্রান্তিদূত” উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিলো।
নানা সাহেবের হয়ে তিনি বৃটেন ভ্রমণ করেছিলেন। তার প্রাপ্ত বৃত্তির ব্যাপারে একটা ফয়সালা করতে। কিন্তু সেখানে তিনি ব্যর্থ হন। অতঃপর ফেরার পথে কনস্ট্যান্টিনোপলে অটোমান স¤্রাটের সাথে দেখা করেন। তার সাথে তুর্কী ও রাশিয়ান গুপ্তচরদের সাথেও যোগাযোগ হয়।
ইংল্যান্ড থেকে ব্যর্থ হয়ে তিনি অত্যন্ত আঘাত পান এবং ফেরার পর নানা সাহেবকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত হতে পরামর্শ দেন। তার কৌশলে ইংরেজরা কানপুর থেকে সরে যেতে বাধ্য হয় এবং তিনি চুক্তি করেন যে গ্যারিসনে অবস্থানরত ইংরেজ সৈন্যদেরকে নৌকাযোগে এলাহাবাদে যেতে তিনি সাহায্য করেন। পরের দিন তার নেতৃত্বেই প্রায় সমস্ত ইংরেজদেরকে হত্যা করা হয়। সম্ভবত ১৮৫৯ সালে আজিমুল্লাহ খান জ্বর কিংবা গুটিবসন্ত এ রকম কোন রোগে নেপাল বা অন্য কোন সীমান্তবর্তী এলাকায় পলায়নকালে মৃত্যুবরণ করেন। কানপুরে তার নামেই “আজিম উল্লাহ এভিনিউ” নামে একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে।
মৌলভি আহমদুল্লাহ শাহ ফৈজাবাদি (১৭৮৭-১৮৫৮)
১৭৮৭ সালে দক্ষিণ ভারতের তৎকালীন আরকোট ষ্টেটে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের সময় নাম ছিলো সিকান্দার শাহ। ফৈজাবাদের মাটি আর মানুষের সাথে মিশে থাকা সবচেয়ে অমর নামটি হলো মৌলভি আহমদুল্লাহ শাহ ফৈজাবাদি বা মৌলভি অব ফৈজাবাদ। বিদ্রোহের সময় নানা সাহেব কিংবা খান বাহাদুর খানের মতো রাজপুরুষরা তার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। তিনি ছিলেন ব্রিটিশদের সবচেয়ে শক্ত প্রতিপক্ষ। ব্রিটিশ লেখক টমাস সিটন লিখেছেন, “A man of great abilities, of undaunted courage, of stern determination, and by far the best soldier among the rebels.” ইংরেজরা তাকে ধরতে মরিয়া ছিলো। তার মাথার দাম ধার্য করা হয়েছিল ৫০,০০০ হাজার রৌপ্যমুদ্রা। পোয়ায়েন এর রাজা জগন্নাথ সিং বিশ্বাসঘাতকাতার মাধ্যমে তাকে হত্যা করে এবং পুরস্কারের আশায় ইংরেজদের কাছে উপস্থাপন করে। G. B. Malleson তার সম্পর্কে লিখেছেন, “The Maulvi was a remarkable person. His name was Ahmed Ullah and his native place was Faizabad in Oudh. In person, he was tall, lean and muscular, with large deep eyes, beetle brows, a high aquiline nose, and lantern jaws.” তার পিতা হায়দার আলির সেনাবাহিনীতে উচ্চ পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি স্বচ্ছল পরিবার থেকে এসেছিলেন এবং তার পূর্বপুরুষরাও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। মৌলভি ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজিতে দক্ষ ছিলেন। তিনি ইংল্যান্ড, রাশিয়া, ইরাক, ইরানসহ মক্কা মদিনা ভ্রমন করেছিলেন এবং হজ্জ পালন করেছিলেন।
বিদ্রোহের আগেই তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদে নেমেছিলেন। এই সময় তিনি “ফতেহ ইসলাম” নামে পোষ্টার ছাপান এবং জনগনকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে দিল্লী, মিরাট, পাটনা, কলকাতা ভ্রমণ করেন। তিনি এবং বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী ফজলে হক খয়রাবাদী একসাথে সংগ্রামে নেমেছিলেন। G. B. Malleson স্বীকার করেছেন যে বিদ্রোহের পেছনে তার মেধা এবং চেষ্টা কাজ করেছিলো। ভ্রমণের সময় রুটি বিতরণের মতো আইডিয়া যা “চাপাতি মুভমেন্ট” নামে পরিচিত তা ছিলো তারই মস্তিষ্ক প্রসূত।
মৌলভিকে বিদ্রোহ শুরুর আগেই পাটনায় গ্রেফতার করা হয়েছিলো। ১০ই মে বিদ্রোহ শুরু হলে ৭ই জুন বিদ্রোহী সৈন্যরা পাটনায় পৌঁছে এবং জেল ভেঙ্গে মৌলভিকে মুক্ত করে। এখান থেকে তিনি আওয়াধ এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। আওয়াধে তিনি বরকত আহমদকে সাথে নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ লড়াইয়ে লিপ্ত হন এবং জয়ী হন। এ রকম বহু যুদ্ধে তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে জয়ী হন।
১৮৫৮ সালের ৫ই জুন বিশ্বাসঘাতকদের হাতে তার মৃত্যু হয়। G. B. Malleson লিখেছেন, “Thus died the Moulvee Ahmad Oolah Shah of Faizabad. If a patriot is a man who plots and fights for independence, wrongfully destroted, for his native country, the most certainly, the Moulvee was a true patriot.”
ফজলে হক খয়রাবাদি (১৭৯৭-১৮৬১)
১৭৯৭ সালে তৎকালীন আওয়াধ এর খয়রাবাদে জন্মগ্রহণ করেণ। ১৮৬১ সালের ২০শে আগস্ট আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপের জেলখানায় মৃত্যুবরণ করেন।
একজন দার্শনিক, লেখক, কবি এবং ইসলামিক পন্ডিত খয়রবাদি সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে আছেন তার ১৮৫৭ সালে দেওয়া ফতওয়ার জন্যে যেখানে তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ ঘোষণা করেণ। ১৮৫৯ সালের ৩০শে জানুয়ারি বিদ্রোহে মদদ দেওয়ার উদ্দেশে ব্রিটিশরা তাকে গ্রেফতার করে। বিচার প্রক্রিয়ার পর ৮ই অক্টোবর ১৮৫৯ সালে তাকে কালাপানি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি মাত্র চার মাসে কোরআন শরীফ হেফজ করেছিলেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি আরবী, ফারসী এবং ইসলামিক কারিকুলাম শেষ করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ