মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

কপালপোড়াদের দলভুক্ত হতে চাই না

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : গত ৩১ অক্টোবর দিনটি ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের জন্য ঐতিহাসিক এবং বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু দিনটির কথা কারুর মনে আছে বলে মনে হয় না। এ দিনটি একজন রাসুলপ্রেমিক তরুণ মুজাহিদের শাহাদতবরণের দিন। ১৯২৯ সালের এ দিন ব্রিটিশ ভারতে ফাঁসি দেয়া হয় ২১ বছর বয়সী এক তরুণকে। চেনেন কে এ তরুণ? এ মুজাহিদদের নাম ইলমুদ্দীন। তিনি ছিলেন অবিভক্ত ভারতের একজন মুসলিম মুজাহিদ। তাঁর বাবা ছিলেন পেশায় একজন সামান্য কাঠমিস্ত্রী। এ ইলমুদ্দীনই কুখ্যাত ‘রঙ্গিলা রসুল’ নামক বইয়ের প্রকাশক রাজপালকে হত্যা করেন। এ বইয়ে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স) সম্পর্কে কুৎসা রটনা করা হয়েছিল। মুসলিমরা এটিকে তাদের ঈমানের ওপর আক্রমণ হিসেবে দেখেন। সেসময় ভারতীয় মুসলিমরা বইটি নিষিদ্ধের দাবি জানান। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার মুসলিমদের দাবির কোনও গুরুত্ব দেয়নি। তাই অসীম দুঃসাহসী ইলমুদ্দীন বইয়ের প্রকাশক রাজপালকে হত্যার সংকল্প করেন।
বাজার থেকে এক রুপি দিয়ে একটি ছুরি কেনেন ইলমুদ্দীন। ছুরিটি প্যান্টের ভেতর নিয়ে তিনি রাজপালের দোকানে গিয়ে সোজা তার বুকে ঢুকিয়ে দেন। স্পটেই নিহত হয় রাজপাল। পুলিশ ইলমুদ্দীনকে গ্রেফতার করে। বিচার চলাকালে ইলমুদ্দীনের আইনজীবী তাঁকে বলেছিলেন, “তুমি বল যে, তোমার মানসিক অবস্থা ভালো ছিল না। তুমি অবচেতন মনে রাজপালকে হত্যা করেছো। তাহলে হয়তো তোমাকে ফাঁসি থেকে বাঁচানো যাবে।”
ইলমুদ্দীন এ কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিলেন, “আমি আমার কাজের জন্য গর্বিত। আমি মিথ্যে বলতে যাবো কেন?” দ-বিধি অনুসারে তাঁর মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়।
উল্লেখ্য, ১৯২৯ সালের ৩১ অক্টোবর তাঁর ফাঁসি হয়। তাঁর লাশ জানাযা ছাড়াই কারাগারে দাফন করা হলে কবি ড. আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল, মিয়া আমিরুদ্দিন এবং আবদুল আজিজের মতো মুসলিম নেতাদের হস্তক্ষেপে লাশ কবর থেকে তোলা হয়। ইলমুদ্দীনের পিতা আল্লামা ইকবালকে জানাযার সালাতে ইমামতির জন্য অনুরোধ করেন। ড. ইকবাল উত্তর দেন এ বলে, “এ মহান মুজাহিদের জানাযা পড়ানোর যোগ্য আমি নই। আমি একজন পাপী মানুষ”। তিনি তখন লাহোরের হিযবুল আহনাফের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ দিদার আলী শাহকে জানাযা পড়ানোর প্রস্তাব করেন। ইলমুদ্দীনের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে কায়দে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সাহেবও ছিলেন। তিনি আদালতকে বলেছিলেন, “ইলমুদ্দীন বয়সে তরুণ। আবেগতাড়িতভাবে সে রাজপালকে হত্যা করেছে। তার মৃত্যুদ- রহিত করে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হোক।” ব্রিটিশ আদালত জিন্নাহ সাহেবের যুক্তি অগ্রাহ্য করে।
ইলমুদ্দীনের জানাজায় কয়েক লাখ মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন। মাওলানা জাফর আলী খান লাশের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন,“হায়! আমি যদি তাঁর মতো উচ্চ মর্যাদা অর্জন করতে পারতাম!”
কবি আল্লামা ইকবাল ইলমুদ্দীনের লাশ কবরে রাখতে রাখতে বলেন, “এ নিরক্ষর তরুণ ছেলেটি আমাদের শিক্ষিতদের চেয়েও এগিয়ে গিয়েছে।” তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য মিয়ানওয়ালি কারাগারে গাজি ইলমুদ্দীন শহীদ মসজিদ নামে একটি মসজিদ তৈরি করা হয়।
পাক-বাংলা-ভারত উপমহাদেশের মুসলিম ইতিহাসে শহিদ ইলমুদ্দীন অমর হয়ে আছেন। ইলমুদ্দীন বাহ্যত নিরক্ষর হলেও তাঁর হৃদয়ে রাসুলুল্লাহ (স) এর প্রতি যে ভালোবাসা জন্মেছিল তা তুলনাহীন। তাঁর এমন রাসুলপ্রেমের প্রতি কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবাল শ্রদ্ধায় অবনত হয়েছিলেন। সালাম জানিয়েছিলেন। ইলমুদ্দীনের পিতার অনুরোধেও জানাযায় ইমামতি না করে এ গুরুদায়িত্ব মাওলানা জাফর আলী খানের ওপর ন্যস্ত করেন মহাকবি আল্লামা ড. মুহাম্মদ ইকবাল।
একশ্রেণির হিং¯্র মানুষ সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির লক্ষ্যে আল্লাহবিশ্বাসী ও রাসুলুল্লাহ (স) এর ভক্তদের অন্তরে আঘাত দিয়ে কুৎসা রটনা করে যুগে যুগে। এইতো কয়েকদিন আগে ভোলার বোরহানুদ্দীনে উদ্দেশ্যমূলকভাবে রাসুলুল্লাহ (স) সম্পর্কে বদনাম ছড়ানো হয়। এতে স্থানীয় দীনদার মুসলিমরা ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদের আয়োজন করলে পুলিশ গুলি চালায়। এতে শাহাদাতবরণ করেন কয়েকজন। আহত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। স্থানীয় হাজার হাজার প্রতিবাদী মানুষের বিরুদ্ধে মামলাও রুজু করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো প্রায় ৯০ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত এ দেশেও একশ্রেণির বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন মানুষ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স) সম্পর্কে কুৎসা রটিয়ে তাঁর অনুসারীদের ঈমানের পরীক্ষা নিতে চায়। কিন্তু দীনদার মুসলিমরা রাসুলুল্লাহ (স) এর প্রতি ভালোবাসার পরীক্ষা দিতে গিয়ে বারবার বাংলার রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন। এখনও এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতেও থাকবে ইনশা আল্লাহ।
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স) সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ, অশোভন ও অসত্য বক্তব্যের জন্য সালমান রুশদির বিচার হয়নি। সত্যার্থপ্রকাশের লেখক দয়ানন্দ সরস্বতীর বিচার হয়নি। শাস্তি হয়নি দাউদ হায়দারের। ফলে হতভাগাদের দুঃসাহস যেমন দিনদিন বেড়ে চলেছে, তেমনই রাজপালরাও বুক ফুলিয়ে ‘রঙিলা রসুল’ এর মতো ঘৃণিত পুস্তক-পুস্তিকা প্রকাশ করে দীনদার মুসলিমদের ঈমানের পরীক্ষা নেবার সাহস দেখাতে পারছে। তবে ফাঁসি হলেও আশেকে রাসুলদের জন্মগ্রহণ থেমে যায়নি। আজও বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশে ইলমুদ্দীনরা জন্মগ্রহণ করছেন। রাজপাল আর দয়ানন্দ সরস্বতীদের হৃদকম্প সৃষ্টি করছেন। আমরা মনে করি, ভোলার শহিদরা ইসকনের হঠকারী সদস্যদের অন্তরে ইলমুদ্দীনের দুঃসাহসের অগ্নিঝলক সৃষ্টি করেছে।
শালীনভাবে, ভদ্রোচিত ভাষায় এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে কারুর সমালোচনা করা যেতেই পারে। ইউরোপ-আমেরিকাসহ পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষ আল্লাহ ও তাঁর পয়গম্বর হযরত মুহাম্মদ (স) এর অনেক কঠোর সমালোচক কুরআনের ভুল ধরতে এসে অবাক ও হতবিহ্বল হয়ে পবিত্র কালেমা পড়ে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে নিজেদের জীবন ধন্য করছেন। প্রতিদিন বিশেষত জুমাবারে পশ্চিমা দেশগুলোতে কালেমা পড়ে মুসলিম হবার জন্য লম্বা লাইন পড়ছে। অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশটিসহ এদেশে একশ্রেণির কা-জ্ঞানহীন মানুষ অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করে আল্লাহর কুরআন ও রাসুলুল্লাহ (স) সম্পর্কে অশালীন বক্তব্য দিচ্ছে। বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এসবের ফলে যদি কোনও দীনদার ব্যক্তি কুৎসা রটনাকারীদের ওপর চড়াও হয়ে অঘটন ঘটিয়ে বসেন তাহলে বিস্মিত হবার কিছু নেই। কারণ দয়ানন্দ সরস্বতী, সালমান রুশদী ও রাজপালদের অপকর্মের প্রতিবাদ করতে ইলমুদ্দীনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবার জন্য অনেক রাসুলপ্রেমিক আছেন। তাই পবিত্র কুরআন অথবা আল্লাহর রাসুল (স) সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণকারীদের কেউ যাতে মুখ ফসকেও সীমালঙ্ঘন না করে বসেন।
আল্লাহর রাসুল (স) বিশ্বমানবতার রহমত। তিনি কেবল মুসলিমদের নবী নন। সমগ্র মানবজাতির সার্বিক কল্যাণে অবতীর্ণ হয়েছেন। মানবজাতিকে মুক্তির দিশা বাতলে দিয়েছেন। শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িতজনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিদায়হজের খুতবায় সর্বশ্রেণির মানুষের কাছে যে চিরকল্যাণের জয়গান তাঁর কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে তা আর কোনও নেতার মুখে শোনা যায়নি। তিনি সর্বকালের ও সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ নবী বা পয়গম্বর। তাঁরপর আর কোনও নবী নেই। পথপ্রদর্শক নেই। শান্তির বাণীবাহক নেই। যারা এ মহামানবের বিরুদ্ধে মিথ্যে কুৎসা রটনা করে, অপপ্রচার চালায় তারা নিজেদেরই ছোটো করে, খাটো করে।
বলতে দ্বিধা নেই, বিশ্বের প্রায় সব চিন্তাশীল মানুষ, গুণীজন, বুদ্ধিজীবী, মহাজন সকলেই মহামানব হযরত মুহাম্মদ (স) এর জয়গান গেয়েছেন। এমনকি ভারতীয় ঋষি-মনীষীরাও এ তালিকা থেকে বাদ যাননি। কাজেই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স) কেবল মুসলিমদের নন, আরবদের নন। তিনি সকলের এবং সর্বযুগের মানুষের শুভপ্রত্যাশী। যারা তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যে কুৎসা রটনা করে তারা নিজেরাই নিজেদের দুর্ভাগ্য ডেকে আনে। যারা এ দুর্ভাগাদের পক্ষ নেয় তারা আরও দুর্ভাগা এবং কপালপোড়া। আমরা কেউ কি চাই কপালপোড়াদের দলভুক্ত হতে? নিশ্চয়ই না। আমরা শহিদ ইলমুদ্দীনের মতো রাসুলপ্রেমিক হয়তো হতে পারবো না। তবে রাসুলবিদ্বেষী কোনও হতভাগ্য কপালপোড়া হতে চাই না।
আরেকটা বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি রাখা খুব জরুরি। সেটি হচ্ছে, পবিত্র কুরআন ও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স) সম্পর্কে কেউ তার অজ্ঞতা অথবা বিদ্বেষ বশত কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করলেই আইন নিজহাতে তুলে নিয়ে হত্যার মতো অমানবিক ঘটনা ঘটাতে হবে এমন কিন্তু নয়। আইন অনুসারে তার বিচার হতে হবে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের দ্বারা। কাউকে ধরেই মেরে ফেলতে হবে এমন কোনও কার্যক্রম কখনও গ্রহণযোগ্য নয়। হত্যাকা- ঘটিয়ে রাসুলপ্রেম দেখাবার দরকার নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ