বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

আলিয়া মাদরাসা শিক্ষাদিবসের ডাক

অধ্যাপক আবদুছ ছবুর মাতুব্বর : ১লা অক্টোবর ছিল আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার ২৪০ তম দিবস। ১৭৮০ সনে কোলকাতা শহরের বৈঠকখানা রোডের একটি ভাড়া বাড়ীতে যে শিক্ষা শুরু হয় উক্ত শিক্ষাই আজকের আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা। এ  শিক্ষা চালুর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ছিল তৎকালীন সময়ের ইসলামের শত্রু বৃটিশদের হাত থেকে ইসলামের ন্যূনতম শিক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য মুসলমানদের সর্বশেষ প্রচেষ্টা। প্রায় আড়াইশত বছর ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে শাসনদ-ের বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, হিংসা-প্রতিহিংসা ও ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা আজও টিকে আছে। এজন্য মহান আল্লাহ তায়লার দরবারে  শুকরিয়া আদায় করছি। আলহামদুলিল্লাহ। দুনিয়া যতদিন টিকে থাকবে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও আঘাত ততদিন চলবে। অতীতে ইসলামের পতাকাবাহীরা এ সকল ইসলাম বিরোধীদের মোকাবিলা যেমন করেছেন আগামি দিনেও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ইসলামের শত্রুদের মোকাবিলা তেমনিভাবে করতে হবে।  এটা ইসলামের অমোঘ বিধান। আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার ২৪০ তম দিবসে এসে এ শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি উদাত্ত আহ্বান আসুন আমরা আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার ইতিহাসকে ভালো করে জানি এবং তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে প্রমান করি আলিয়া মাদরাসা শিক্ষাই যুগের চাহিদার আলোকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য শিক্ষা।
আলিয়া মাদরাসার প্রকৃতি এবং পরিচয় সর্বমহলে উন্মুক্ত ও সার্বজনীন। এ শিক্ষা সরকার কর্তৃক স্বীকৃত ও আর্থিকভাবে আনুকূল্য প্রাপ্ত। এ শিক্ষার সিলেবাস-কারিকুলামকে জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠনের মাধ্যমে সময়ে সময়ে যুগোপযোগী করা হয়। এখানে রয়েছে ওহীর জ্ঞান ও মানুষের জ্ঞানের মধ্যে সামঞ্জস্যতা বিধানের অপূর্ব ব্যবস্থা। মানুষের মধ্যে উদ্ভূত ও লালিত অনৈতিকতাকে নৈতিকতায় আনয়ন, দেশ ও জাতীকে সৎ, যোগ্য ও নৈকিতকতার ভিত্তিতে গড়ে তুলতেই এ শিক্ষার সৃষ্টি। আলিয়া মাদরাসার সিলেবাস-কারিকুলাম যেমন সরকার নির্ধারণ করে থাকেন তেমনি এর অবকাঠামো তৈরী করাও সরকারের দায়িত্ব।  ১৭৮০ সনে মুসলিমদের কৌশলগত অনুরোধের প্রেক্ষিতে বৃটিশ সরকার আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করে। প্রায় দুইশত বছর বৃটিশ সরকারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এ শিক্ষা চলতে থাকে। অতঃপর ভারত ভাগ হলে কোলকাতা আলিয়া মাদরাসা যেমন তৎকালীন ভারত সরকার পরিচালনা করেছে তেমনি পূর্ব পাকিস্তানের আলিয়া মাদরাসা তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের দিক নির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা পরিচালনা করছে। এজন্য পৃথক শিক্ষা বোর্ড রয়েছে এবং অধিদপ্তর রয়েছে।
মাদরাসা শিক্ষার প্রকৃতি ও পরিচয় এ কথাই প্রমাণ করে পাক-ভারত উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ইতিহাস যতদিনের মাদরাসা শিক্ষার ইতিহাসও ততদিনের। ইসলামের আগমনকালে নওমুসলিমরা যে শিক্ষা পেয়েছিল  আলিয়া মাদরাসা উক্ত শিক্ষারই একটি যুগোপযোগী সংস্কারমাত্র। এ অঞ্চলে ইসলামের আগমন হয় ৩ ভাবে। ১. দায়ী বা মুবাল্লিগদের দ্বারা। ২. মুসলিম বনিকদের দ্বারা। ৩. এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে। কেউ কেউ বলেন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর জীবদ্দশাতেই ইসলামের দায়ী বণিকদের এদেশে আগমন ঘটে এবং তারা ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেন। আবার কেউ কেউ বলেন খোলাফায়ে রাশেদীনদের শাসনামলে এদেশে ইসলামের আগমন ঘটে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের আগমন ঘটে ৭০৬ খৃস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে। আর গোটা ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন এবং ইসলামী শিক্ষার পূর্ণাঙ্গতা পায় প্রায় পাঁচশত বছর পরে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী কর্তৃক বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে। মুসলিম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত এ অঞ্চলে মুসলিমদের শিক্ষার জন্য যে শিক্ষা চালু ছিল তা ছিল ইসলামের দায়ী ও মুবাল্লিগদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত। যে শিক্ষাকে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা বলা যায়। ৭০৫ খৃস্টাব্দ থেকে ১২০৩ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ সাড়ে সাতশত বছর রাষ্ট্রীয়ভাবে তথা মুসলিম শাসন সময়ে এ অঞ্চলে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল। যে  শিক্ষার মূল ভিত্তি ছিল ইসলাম।
আজকের আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা যখন চালু হয় তখন বাংলা অঞ্চল ছাড়া ভারতের সর্বত্র মুসলিম শাসন চলছিল। কিন্তু বাংলা অঞ্চলের কর্তৃত্ব নামে-বেনামে ইংরেজদের হাতে ছিল। মীর জাফর ও মীর কাসেম ছিল ইংজেদের হাতের পুতুলমাত্র। অল্প সময়ের ব্যবধানে ইংরেজরা বাংলা অঞ্চলের ইজারা সরাসরি নিজ হাতে গ্রহণ করে। মুসলমানদের দুর্বলতা ও আত্মকলহের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ১৭৫৭ সনের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজরা বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত করে। তখনই বাংলায় মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। তারই ধারাবাহিকতায় আস্তে আস্তে মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার ভুলুন্ঠিত হতে থাকে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দুরাবস্থায় পড়ে, সামাজিক অবক্ষয় প্রকট আকার ধারণ করে এবং মুসলিম শিক্ষা-সংস্কৃতি বিলুপ্ত হতে থাকে। বিশেষ করে মুসলমানদের ভবিষ্যত প্রজন্ম শিশুরা ইসলামী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে থকে। এমনি এক প্রেক্ষাপটে কোলকাতা শহরের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি এগিয়ে আসেন। সম্মিলিত পরামর্শের মাধ্যমে মুসলিম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এ মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, আমাদের আগামি দিনের শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করনে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা জরুরী। এ বিষয়ে আরও সিদ্ধান্ত হয় যে, যথাশীঘ্র একটি মুসলিম প্রতিনিধি দল বৃটিশ লর্ড হেস্টিংস এর সাথে দেখা করে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাবনা উত্থাপন করবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি মুসলিম প্রতিনিধিবর্গ বড় লর্ড এর সাথে ১৭৮০ সনের ২৭ আগষ্ট দেখা করেন এবং স্মারকলিপি প্রদান করেন। মুসলিমদের এই দাীির প্রেক্ষিতে ১৭৮০ সনের ১ অক্টোবর মোল্লা মজদুদ্দীন সাহেবকে প্রতিষ্ঠানের প্রধান করে এবং দরসে নিজামিয়া শিক্ষা ধারার সিলেবাস-কারিকুলাম অনুসরন করে মাদরাসাটি চালু করা হয়। মাদরাসার  নামকরণ করা হয় “কোলকাতা সরকারি আলিয়া মাদরাসা”।
ইসলামী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত কোলকাতা অঞ্চলের মানুষ বৃটিশদের অধীনে ইতোমধ্যে ২৩ টি বছর (১৭৫৭ থেকে ১৭৮০ সন) অতিক্রম করেছে। তখনও ভারত বর্ষে কেন্দ্রীয়ভাবে মুসলিম শাসন চলছে। কিন্তু বাংলা অঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কেন্দ্রীয় শাসন কোন কথা বলেনি হয়তোবা তাদের বলার কিছুই ছিল না। বাধ্য হয়ে কোলকাতার মুসলিমরা ইংরেজদের শরণাপন্ন হয় এবং প্রতিষ্ঠা করে কোলকাতা সরকারি আলিয়া মাদরাসা। ইতিহাস সাক্ষী কোলকাতার মুসলিমদের ইসলাম শিক্ষা অর্জনের শেষ অবলম্বন এই মাদরাসা নিয়েও চলতে থাকে গভীর ষড়যন্ত্র। বিশেষ করে ইসলামের চিরশত্রু হিন্দুরা ও নাস্তিকরা কারণে-অকারণে মাদরাসার সিলেবাস-কারিকুলামে অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে থাকে। এ সকল ষড়যন্ত্রকারীরা বৃটিশ শাসনকে ঢাল স্বরূপ সামনে রেখে কখনো ইংরেজি ভাষা শিখাকে বাধ্যতামূলক করে, কখনো ফারসী ভাষাকে বিলুপ্ত করে আবার কখনো পূর্ব থেকে চলে আসা আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে। পাকিস্তান শাসনামলে আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার একটি উইং ছিল নিউ স্কীম মাদরাসা শিক্ষা নামে। যে উইংটি সৃষ্টি করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে শিক্ষার্থী সরবরাহের রিক্রুটিং সেন্টার হিসেবে। এ উদ্যোগটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। কারণ এ শিক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা সরকারি-বেসরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে চাকুরী করার সুযোগ লাভ করে। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা এ শিক্ষার প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে ১৯৫৮ সনে বিলুপ্ত ঘোষনা করে।
স্বাধীন বাংলাদেশে আলিয়া মাদরাসা শিক্ষাকে বারবার বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করতে হয়েছে। অবশ্য একথা স্বীকার করতে হবে কখনো কখনো কোনো কোনো শাসক তার শাসন অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে অথবা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে সে ইসলাম প্রিয় শাসক তা প্রমাণে আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নে কম-বেশি ভূমিকা রেখেছেন।
ফলে এ শিক্ষা আজ হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে পূর্ণাঙ্গ মান পেয়েছে। আজও গোপনে বা প্রকাশ্যে এ শিক্ষাকে ষড়যন্ত্রের থাবা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।  কিন্তু ষড়যন্ত্রের এ জালকে ছিন্ন করার জন্য মিঃ নাথ, আল্লামা কশগরী (রাহ), মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, মাওলানা এম এ মান্নান, তৎকালীন ছাত্রনেতা আবুল আহসান মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, মাওলানা কে এম আবদুস সোবহানের মত কোন সাহসী এবং কৌশলী নেতৃত্বের আগমন হবে কি! হে আল্লাহ তোমার নিকট বিনীত প্রার্থনা, তুমি নিজ হাতে এই শিক্ষাকে বাচাঁও এবং এমন এক নেতৃত্ব প্রদান করো যিনি সকল ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে এ শিক্ষার স্বকীয়তা রক্ষা করবে এবং এ শিক্ষাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। কারণ আজ সেই ঐতিহ্যবাহী আলিয়া মাদরসা শিক্ষা তার ঐতিহ্য এবং স্বকীয়তা হারাতে বসেছে। পঙ্গুত্ব বরণ করেছে অনেক আগেই।   (অসমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ