বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

নবীন শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা

আখতার হামিদ খান : বাংলাদেশ বর্তমানে যে এক ভয়াবহ নৈতিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সেকথা কারো অজানা নেই। দুর্নীতির নানাবিধ খবর দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা এবং রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রকাশিত হচ্ছে। চারিদিকে সন্ত্রাস, ছিনতাই ও চাঁদাবাজি, খুন ও রাহাজানি, ধর্ষণ ও এসিড নিক্ষেপ, ব্যাপক মাদকাসক্তি প্রভৃতি নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহুদিন ধরে অবস্থা মন্দ হতে হতে বর্তমানে যেন শেষ মন্দ অবস্থায় পৌঁছেছে। এদেশের নাগরিকরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও হতাশার মধ্যে বাস করছে। কোন আশার আলোও দেখতে পাচ্ছে না।
এমন অবস্থা অবশ্য হঠাৎ করেই তৈরি হয়নি। জন্মলগ্ন থেকে বিগত তিন দশকের কুশাসনের ফলে আজ বাংলাদেশ এই অবস্থায় পৌঁছেছে। দেশের শাসনব্যবস্থায় নেই কোন জবাবদিহিতা, নেই কোন দূরদর্শিতা। ফলে কর্তব্যে অবহেলা, স্বার্থসিদ্ধির প্রতি মনোযোগ প্রভৃতি জনগণের স্বার্থবিরোধী প্রবণতা সর্বত্রই প্রসার লাভ করেছে। এমন কি শিক্ষকরা পর্যন্ত মনোনিবেশ সহকারে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষা না-দিয়ে প্রাইভেট পড়াচ্ছেন অথবা কোচিং সেন্টারে শিক্ষাদান করছেন। এভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের কোচিং সেন্টারে যেতে বা শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করছেন। একই দেশে তিন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকায় শ্রেণী-বৈষম্য জ্যামিতিকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে; শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও দুর্ব্যবস্থা এক নৈরাশ্যজনক ও নৈরাজ্যকর অবস্থা সৃষ্টি করেছে। এমন নৈতিক অবক্ষয় থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করা কি উপায়ে সম্ভব সেটা ভাবনার বিষয়ই বটে।
দেশে তিন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। এই তিন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা হলো : বাংলা মাধ্যমে শিক্ষা, ইংরেজী মাধ্যমে শিক্ষা (O লেভেল ও ‘A’ লেভেল) এবং মাদরাসা শিক্ষা (যে-ব্যবস্থায় প্রধানত : আরবি ভাষায় ইসলাম ধর্মসংক্রান্ত বিষয়াদি পাঠক্রমে থাকে, সামান্য ইংরেজি ও বাংলা পড়ানো হয়)। শ্রেণী বৈষম্যের কারণে এই তিন মাধ্যমে পাঠের ছাত্র-ছাত্রীর অভাবও হচ্ছে না। সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মধ্যবিত্তরা বাংলা মাধ্যমে শিক্ষার জন্যই তাদের। সন্তানদের পাঠাচ্ছেন। উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তরা সন্তানদের ভবিষ্যতের চিন্তায় আকুল হয়ে এবং নিজেদের সামাজিক অবস্থানকে অর্থ ও প্রতিপত্তির দিক দিয়ে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশে ইংরেজি মাধ্যমের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। আর সাধারণ দরিদ্র জনগণ বিনা বেতনে এবং প্রায়-ক্ষেত্রেই বিনা খরচে সন্তানদের আবাসিক অনাবাসিক মাদরাসা শিক্ষার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তারা মনে করছেন যে একেবারে অশিক্ষিত থাকার চেয়ে মাদরাসায় শিক্ষিত হওয়া বরং মন্দের ভালো। এইভাবে তিনটি ব্যবস্থায় তিনটি শ্রেণীর ভবিষ্যত নাগরিক গড়ে উঠছে।
এতে করে কিশোরকাল থেকেই ভবিষ্যতের নাগরিকেরা তাদের নিজ নিজ শ্রেণী সম্বন্ধে সচেতন হয়ে পড়ছে। এমন অবস্থা একটি রাষ্ট্রের জন্য যে মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না তা বলাই বাহুল্য। দৈনন্দিন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকা-ের মধ্যেও বিষয়টি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই তিনটি শিক্ষাব্যবস্থা যে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন মূল্যবোধের সৃষ্টি করছে এবং আমাদের সমাজে নৈতিক সংকটের একটি প্রধান কারণ যে এই মূল্যবোধের ভিন্নতা, সেই বিষয়টি বুঝতে খুব বেশি চিন্তাভাবনার আবশ্যক হয় না। এখানে উল্লেখ্য যে, এই তিন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে কেবলমাত্র মাদরাসা শিক্ষায় নৈতিক শিক্ষা দেয়া হয়, যা বলাই বাহুল্য, ইসলাম ধর্মীয় নৈতিক শিক্ষা। অন্য ব্যবস্থাগুলোতে নৈতিক শিক্ষা পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত নয়।
সে যাই হোক, এই প্রবন্ধের মূল বিষয় হলো প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ে। নৈতিক শিক্ষা। এইখানে অতীতে এই সমাজে কিভাবে নৈতিক শিক্ষা দেয়া হতো সে সম্বন্ধে কিছু উল্লেখ করা যেতে পারে। আমরা যখন ছোট ছিলাম, অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ে লেখাপড়া শুরু করেছি, আজ থেকে সে প্রায় ষাট বছর আগের কথা, তখন আমাদের পরিবারের ভেতরেও নৈতিক শিক্ষা দেয়া হতো। আর স্কুলে আমাদের যে আদর্শলিপি দেখে হাতের লেখা অভ্যেস করতে হতো তাতে শুধু একের পর এক নীতিকথা লেখা ছিল। আমার এখনো মনে আছে, আদর্শলিপিতে থাকতো সর্বদা সত্য কথা বলিবে’, ‘চুরি করা মহাপাপ’, ‘গুরুজনে সম্মান করিবে’, ‘অহঙ্কারই পতনের মূল’, ‘সর্বজনে দয়া কর, সময়ানুবর্তিতা সৌভাগ্যের সােপান ইত্যাদি। আমরা নীতিকথাগুলোর মানে প্রায়ই বুঝতাম। তখন পরিবারের গুরুজনকে এবং শিক্ষককে জিজ্ঞাসা করতাম। তারা আমাদেরকে নীতিকথাগুলো উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিতেন। একই সাথে আমাদেরকে বলতেন কেন নীতিকথাগুলো মেনে চলতে হয়। আমাদের মনে ঐ সকল নীতিকথা এমন শক্ত হয়ে গেঁথে গিয়েছিল যে পরবর্তী জীবনে আমরা সেগুলো মেনে চলতে চেষ্টা করেছি। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বৎসর আগে গ্রীসের সুবর্ণ যুগে দার্শনিক প্লেটো ও এরিস্টটল তাদের দর্শন চিন্তায় সত্যিকারের সৎ ও নিষ্ঠাবান নাগরিক তৈরি করতে নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজন আছে বলেছেন। প্লেটো তার রিপাবলিক গ্রন্থে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থার কথাও লিখে গেছেন। সেই শিক্ষাব্যবস্থায় জন্মের পর থেকে বিশ বৎসর বয়সের ছেলে মেয়েদের অন্তর্ভুক্ত করা হতো। সেটাকে তিনি প্রাথমিক স্তর বলেছেন। বলা যায়, আমাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরগুলো প্লেটোর শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক স্তরের সমতুল্য। (এখানে আরো বলা প্রয়োজন যে, একটি অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থাই আদর্শ রাষ্ট্রে প্রবর্তন করার কথা প্লেটো বলেছেন। আমাদের দেশের মতো সমান্তরালভাবে প্রচলিত একাধিক শিক্ষাব্যবস্থার কথা তিনি ভাবেন নি। ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থায় যে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যবোধের সৃষ্টি হয়ে থাকে সে-বিষয়টি দার্শনিক প্লেটো অবশ্যই জানতেন)। প্লেটোর এই শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয় দার্শনিক রাজাদের দ্বারা। এবং ছাত্র ও ছাত্রীদেরকে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের ভেতর রেখে তাদের শরীর ও মনকে সুগঠিত ও সুস্বাস্থ্যবান করে তোলা হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা লেখাপড়া শিখবে শুধু জ্ঞান অর্জন করার জন্যই নয়, লেখাপড়া শিখে তারা ভালো মানুষও হয়ে উঠবে। আর কেবলমাত্র ভালো মানুষেরাই ভালো নাগরিক হতে পারে। প্লেটোর রিপাবলিক-এ বলা হয়েছে আদর্শ রাষ্ট্রে নাগরিকরা এইভাবে শিক্ষিত হয়েই ভালো নাগরিক হয়ে উঠবে। এরিস্টটলও তাঁর নিকোমেকীয়ান ইথিক্স গ্রন্থে নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি শুধুমাত্র নৈতিক শিক্ষাদানের কথা বলেই ক্ষান্ত হননি, আচরণকে নৈতিক করার ব্যাপারেও বাধ্যবাধকতা প্রয়োগ করতে বলেছেন। বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে নৈতিক আচরণের অনুশীলন করতে করতেই মানুষ স্বভাবগতভাবেই নৈতিক হয়ে ওঠে বলেই তিনি মনে করেন। অভ্যাসগত নৈতিকতাই পরবর্তীতে স্বভাবগত নৈতিকতায় পরিণত হয়। নৈতিক শিক্ষাপ্রাপ্তি এই স্বভাবগতভাবে নৈতিক হওয়ার পথে সহায়ক হয়ে থাকে। নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব এইখানেই।
বৃহত্তর বাংলায় ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিক শিক্ষার উপর সর্ব প্রথম যিনি গুরুত্ব প্রদান করেন তিনি হলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। উনিশ শতকের মাঝামাঝি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নৈতিক শিক্ষাকে পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন। তিনি নিজেই নৈতিক শিক্ষার উপাদান অন্তর্ভুক্ত করে পাঠ্যবই রচনা ও কয়েকটি বিদেশী বই অনুবাদ করেন। প্রথমে তিনি শিশুদের জন্য রচনা করেন বোধােদয় ও বর্ণপরিচয় ১ম ও ২য় ভাগ। প্রাথমিক স্তরের উচ্চতর শ্রেণী ও মাধ্যমিক স্তরের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য তিনি ইংরেজী বইয়ের অনুবাদ করেন। তাঁর অনূদিত বই কথামালা Aesop’s Fables-এর এবং জীবনচরিত Chamber’s Biographies-এর অনুবাদ। তার লিখিত ও অনূদিত বইগুলোকে পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থাও বিদ্যাসাগর নিজেই করেছিলেন। বিদ্যাসাগরের এই শিশু ও কিশোরদের জন্য বইগুলোতে নৈতিক শিক্ষার দিকেই প্রধানত দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। বোধোদয় ও বর্ণপরিচয় বইগুলো পাঠ করে শিশুরা যেমন বাংলা ভাষা পড়তে ও লিখতে শেখে তেমনই একই সাথে নৈতিক বাধ্যবাধকতার ধারণার সাথে পরিচিত হয়ে ওেঠ। এই বইগুলোতে নানা নীতিকথা এবং নৈতিক আচরণ সম্বন্ধে উক্তি রয়েছে।
কথামালা বইটি ঈশপের গল্পের অনুবাদ। এখানে প্রতিটি গল্পের শেষে গল্পটিতে শিক্ষণীয় কি তা উল্লেখ করে দেয়া আছে নীতিকথা। আর জীবনচরিত-এ রয়েছে মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী, যে সব মহৎ ব্যক্তিদের কাহিনী পড়েও জেনে শিশু কিশোরদের মনেও স্বপ্ন দানা বাঁধবে, নিজেরাও মহৎ মানুষ হয়ে উঠবার। এই মহৎ ব্যক্তিরা হলেন শিশু কিশোরদের জন্য আদর্শ চরিত্র। আমাদের দেশে বিদ্যাসাগরই প্রথমে অনুভব করেছিলেন যে শিক্ষার্থীদের পাঠক্রমে নৈতিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করে তাদের নৈতিক করে তোলা যায়, তাদেরকে নৈতিক হয়ে উঠতে সাহায্য করা যায়। মানুষের মধ্যে যে-নীতিবোধ ঘুমন্ত অবস্থায় আছে তাকে সক্রিয় করে তোলার এটা একটি অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি। নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এই জন্যেই। আসা যাক বর্তমানে। এখানে আবারো উল্লেখ করতে হয় বাংলাদেশে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার কথা। এই তিনটি শিক্ষাব্যবস্থা থাকার কারণে নৈতিক শিক্ষাদানের বিষয়টি কিছুটা জটিল হয়ে পড়েছে। উপরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার ইসলাম ধর্মীয় নৈতিক শিক্ষা দেয়া হয়। কিন্তু অন্য দুটি ব্যবস্থায় পাঠক্রমে নৈতিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি নেই। এই প্রেক্ষাপটে প্রথমেই বলতে হয় যে, ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিক শিক্ষাদানের জন্য প্রথমেই তিনটি ভিন্ন ব্যবস্থার স্থানে একটি মাত্র ব্যবস্থা প্রবর্তন করা আবশ্যক। আর সেই ব্যবস্থাটিকে যে বাংলা মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা হতে হবে সেটাও বলতে হয়, বিশেষ করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরে। এই অভিন্ন ব্যবস্থায় দরিদ্র জনগণের সন্তানদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানাবিধ সাহায্য, সহযোগিতা ও ভর্তুকী প্রদানের ব্যবস্থাও অবশ্যই থাকতে হবে। এই ধরনের একটি মাত্র শিক্ষাব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই আমাদের এই বাংলাদেশে নৈতিক শিক্ষাদান কি উপায়ে শুরু করা যায়, এই বিষয়ে বলা যেতে পারে। প্রাথমিক শিক্ষার স্তরে নৈতিক শিক্ষাদান করতে উপরে-উল্লিখিত নীতিকথা সম্বলিত আদর্শলিপির পুনঃপ্রচলন করা যেতে পারে। কচি মনে সেইসব কথার প্রভাব পরবর্তী জীবনেও বহু কাল ধরে থেকে যায়। তার উপরে নানা মহাপুরুষদের নিয়ে-বলা কাহিনী গল্পের মতো পড়ে শোনানো দরকার। আর দরকার রূপকথার ‘শিষ্টের উত্থান ও দুষ্টের পতন’ এমন কাহিনী সহজ করে ছাত্র-ছাত্রীদের বলা বা পড়ে শোনানো। যখন তারা নিজে নিজেই পড়তে শিখবে তখনকার জন্য সরল ভাষায় সহজ করে এই সবল কাহিনী ও রূপকথার বই পাঠ্যসূচীর, অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অন্যান্য পাঠের সাথে, যেমন অঙ্ক পাঠের সাথে, এই পাঠকেও গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপিত করা দরকার । ইংরেজী পড়ানোর সময়ও সহজ ইংরেজীতে গল্পগুলো লিখে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়তে দিতে হবে। মাতৃভাষা বাংলাতেও সেই রকম সহজবোধ্য করে গল্পগুলো লিখতে হবে। শিশু-কিশোরদের মনে ছেলেবেলায়-শেখা এই ধরনের কাহিনী চিরদিনের জন্য যেন জাগ্রত থাকে সেই উদ্দেশ্যে গল্পকে প্রাণবন্ত বর্ণনায় উপস্থাপিত করা চাই। প্রাথমিক শিক্ষার উচ্চতর স্তরের শ্রেণীর জন্য পৃথিবীর সেরা সাহিত্যিকদের লেখা শিশু সাহিত্যের সাথে পরিচয় ঘটানো দরকার। যেমন, টলস্টয়ের ‘একজন মানুষের কতটুকু জমির প্রয়োজন’ এই গল্পটি, যাতে নীতিকথাটি হলো ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। এইভাবে শিক্ষাদানে সক্ষম হলে শিশু-কিশোরদের মনে নীতিবোধ জাগ্রত হবে, যা প্রাপ্ত বয়সেও ঘুমিয়ে পড়বে না। এখানে মনে রাখা দরকার যে, ছাত্রছাত্রীদের জন্য নৈতিক শিক্ষা ব্যবহারিকভাবেও দেয়া চাই। অর্থাৎ কেবল পাঠদানে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এদের মধ্যে এই শিক্ষার প্রতিফলন যেন ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখা আবশ্যক। এইভাবে ব্যবহারিক দিকে গুরুত্ব দিলে, এরিস্টটল যেমনটা বলেছেন, ছাত্র-ছাত্রীরা অভ্যাসগতভাবেই নৈতিক হতে শিখবে এবং পরবর্তী জীবনে অনৈতিক ক্রিয়াকলাপ থেকে বিরত থাকবে।
মাধ্যমিক স্তরে এসে নৈতিক শিক্ষা আরো একটু প্রত্যক্ষভাবে দেওয়া চাই। এই স্তরে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য মানব সমাজের উন্নতি ও কল্যাণে ব্রতী ব্যক্তিদের জীবনী পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এখানেও আমি একটি ব্যক্তিগত উদাহরণ দিতে পারি। আমি যখন নবম শ্রেণীতে পড়ি তখন আমাদের ইংরেজী বই ছিল Paths of Peace. এই বইটিতে আমি “Wise Men of Old” প্রবন্ধে সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টটলের কথা পড়েছিলাম। সেই প্রবন্ধে খুবই সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ওই তিনজন দার্শনিকের দর্শনচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যকে তুলে ধরা হয়েছিল। তাদের চিন্তাধারার সাথে এইভাবেই আমি পরিচিত হয়েছিলাম। প্রবন্ধটি পড়েএতোই প্রভাবিত হয়েছিলাম যে, তখনই আমি স্থির করেছিলাম আমি বড় হয়ে ওঁদের সম্বন্ধে আরো গভীরভাবে জানবো। এইভাবে জীবনী পাঠের দ্বারা আমাদের কিশোররাও সৎ ও প্রজ্ঞাবান জীবনযাপন করার বিষয়ে জানার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত হতে পারে। আর সৎ ও মহৎ জীবন সম্বন্ধে জ্ঞান তাদেরকে মহৎ মানুষদের সাথে একাত্মতা বোধের ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করবে। জীবনী পাঠের পাশাপাশি নৈতিক সমস্যা নিয়ে মাধ্যমিক স্তরের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে আলোচনা করা যেতে পারে।
সমস্যাগুলো নিয়ে তারা কি ভাবছে তাও জানা দরকার। সেই সব মতামত জেনে নিয়ে শিক্ষক নানা দিক দিয়ে সমস্যাগুলোর সমাধান সম্বন্ধে এবং সমাধানের নৈতিক মূল্যায়ন কিভাবে করা যেতে পারে সেই বিষয়ে আলোকপাত করতে পারেন। এইভাবে তাত্ত্বিক নৈতিক শিক্ষার সাথে সাথে ব্যবহারিক নৈতিক শিক্ষাও দেয়া আবশ্যক। অর্থাৎ মন্দ জিনিসকে মন্দ বলে যেন তারা পরিত্যাজ্য মনে করে, আর যা ভালো তাকে ভালো বলে যেন গ্রহণ করে সে-শিক্ষাও দেয়া দরকার। আচার ব্যবহারে শিষ্টতাও শেখাতে হবে। এইভাবে অভ্যাসগতভাবে এদেরকেও নৈতিক করে তুলতে হবে। তাহলেই ধীরে ধীরে তারা নিজেই স্বভাবগতভাবে নৈতিক হয়ে উঠবে।
উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ে নৈতিক শিক্ষা দেয়া দরকার তাত্ত্বিকভাবে। ইহজাগতিক নীতিবিদ্যার চর্চা একমাত্র পাশ্চাত্যেই হয়েছে বলে আমরা জানি। তাই আমরা বলবো গ্রীক দর্শনের সূত্রপাতের সময় থেকে আরম্ভ করে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত পাশ্চাত্যের ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিক মতবাদগুলোকে ঐতিহাসিকভাবে কালক্রমানুসারে সাজিয়ে সহজ ভাষায় গ্রন্থ প্রণয়ন করা যেতে পারে। এই গ্রন্থ হবে অতিরিক্ত বিশ্লেষণবর্জিত। এগুলো বর্ণনামূলক হবে আর লিখতে হবে সহজ সরল ভাষায়। এখানে মূল উদ্দেশ্য হবে ছাত্র-ছাত্রীদের নৈতিক তত্ত্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া এবং ওই সকল তত্ত্ব যারা দিয়েছেন সেই দার্শনিকদের সম্বন্ধে জানানো। এইসব দার্শনিকদের ব্যক্তিগত জীবনের নৈতিক দিকগুলোর প্রতিও আলোকপাত করা যায়। তাঁদের অনেকেই যে আদর্শ মানুষ ছিলেন, এবং এই আদর্শ মানুষদের পথ অনুসরণ করে চলা যে নৈতিক পথ চলা সে নিয়েও আলোচনা করা যেতে পারে।
উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের জন্য প্রধান প্রধান নৈতিক মতবাদগুলো এমনভাবে লিখতে হবে যেন ছাত্র-ছাত্রীরা বিভ্রান্ত হয়ে না পড়ে। দর্শনে যেমন তেমনি নীতিদর্শনেও পূর্ববর্তী মতবাদকে খ-ন করেই নতুন মতবাদ আবির্ভূত হয়। এতে করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। উচ্চ মাধ্যমিক ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে এতটা সূক্ষ্ম তর্ক বিতর্কে জড়িয়ে না-পড়াই ভালো। তাই আলোচনার সময় এবং নীতিদর্শনের মতবাদগুলো ওদের জন্য লেখার সময় বিতর্ক ও জটিলতাকে যথা সম্ভব এড়িয়ে যাওয়াটাই ভালো হবে। প্রধান প্রধান মতের ক্রমান্বয় বিকাশের ধারাগুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট কিন্তু সহজ করে লিখতে হবে। সহজ কথা যেমন বলা যায় না সহজে, তেমনি সহজ করে লেখাটাও সহজ নয়। এইজন্যই লেখকের পক্ষে অত্যন্ত যত্নবান হওয়া আবশ্যক হবে।
উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীদেরকেও ব্যবহারিক নৈতিক শিক্ষা একই ভাবে দিতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে নৈতিক শিক্ষা পেয়ে উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে এরা অনেকেই অভ্যাসগতভাবে নৈতিক হয়ে উঠবে। এইবার তত্ত্বজ্ঞান এদের নৈতিকতা ও নীতিবোধকে আরো সচল হয়ে উঠতে প্রণোদিত করবে। ব্যবহারিক দিক দিয়েও শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদেরকে সদাচরণে অনুপ্রাণিত করবেন।
ফিরে আসি বর্তমান বাংলাদেশের ভয়াবহ নৈতিক সংকটের বিষয়টিতে। এই অবস্থায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্র-ছাত্রীদের নৈতিক শিক্ষা দিলেই কি তারা নৈতিক হয়ে উঠবে? এখানে স্পষ্ট করেই বলা যায়, পরিবেশ সহায়ক না হলে কেবলমাত্র নৈতিক শিক্ষা কাউকে নৈতিক করে তুলতে পারে না। মানুষ সামাজিক জীব, সমাজ দ্বারা সে প্রভাবিত হয়। প্রভাবিত হয় সামাজিক বাস্তবতা দ্বারা। এখন বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা হলো নীতিহীনতা, দুর্নীতিপরায়ণতা, স্বার্থসিদ্ধি ও নিপীড়ন। যেখানেই যাই দেখতে পাই বেকার মানুষ। কেবল যুবকই নয়, সব বয়সের মানুষই বেকার। আদমজী পাটকল বন্ধ হওয়ায়, দুই স্ট্রোক অটোরিকশা বন্ধ হওয়ায়, ঢাকা শহরের নানা রাস্তায় রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ হওয়ায় আজ লক্ষ লক্ষ বেকার মানুষ দেশের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর অসহায় হয়ে পড়েছে তাদের উপর নির্ভরশীল আত্মীয় পরিজন। জীবন-ধারণের জন্য তাদের প্রয়োজন অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান। এই অবস্থায় বেঁচে থাকার জন্যই বেকার মানুষ যুক্ত হচ্ছে নানা রকম সমাজবিরোধী কার্যকলাপের সাথে । বেকার যুবকেরা রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থান্বেষী কাজে অংশগ্রহণ করে দু’পয়সা বানিয়ে নিচ্ছে। তারা সরকারের পরিবর্তনের সাথে সাথে দল পরিবর্তন করছে। সরকারি দলে থাকলে তাদের হাতে থাকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা আর সেই ক্ষমতার সাথে যুক্ত হয় আইনরক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা। সরকারী দলের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা নিজেদের স্বার্থে এদের ব্যবহার করেন এবং ব্যবহারকে কার্যকর রাখার জন্য এদেরকে নিরাপত্তা দেন। দেশে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ প্রভৃতি অনৈতিক কার্যকলাপের বিচার কদাচিৎ হচ্ছে। জনগণ এই কারণে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তারপর আছে শাসক শ্রেণীর দেশপ্রেমহীনতা, স্বার্থপরতা ও কুশাসন, যে-কুশাসনের ফলে জনগণ বিপর্যস্ত হচ্ছে পদে পদে।।
এমন অবস্থায় আমাদের এই বাংলাদেশে নৈতিক শিক্ষা প্রদানের সুফল শিগগীরই পাবো না। দেশের ভবিষ্যত নাগরিক ছাত্র-ছাত্রীরা শ্রেণীকক্ষে শিখবে নৈতিক হতে আর বাড়িতে গিয়ে দেখবে অনৈতিক কাজকর্ম চলছে; পিতারা ঘুষ খাচ্ছেন, চোরাকারবার করছেন অথবা অতিরিক্ত লাভের জন্য অনৈতিকভাবে ব্যবসা করছেন; মায়েরা অত্যাচার করছেন বাড়ির কাজের লোকের ওপর অথবা মিথ্যা বলছেন সময়ে অসময়ে; আর যে-শিক্ষকরা তাদের নীতিকথা শেখাচ্ছেন তাঁরাই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে অনৈতিক কাজ করছেন, এরকমটা হলে শিক্ষার্থীরা ঠেকে ঠেকে বুঝতে শিখবে যে, যে-সমাজে নীতিহীনতাই সামাজিক নিয়ম সেই সমাজে নীতিবান মানুষ হয়ে টিকে থাকাটা কত কঠিন। এই কারণেই জর্জ এডওয়ার্ড মুত্তর-এর মতো একজন আশাবাদী এবং সত্য, শুভ ও সুন্দরের প্রতি আস্থাশীল নীতিদার্শনিককেও আমরা বলতে শুনি : কোন সমাজে চৌর্যবৃত্তি যদি সাধারণ নিয়মে পরিগণিত হয়, তবে সে-সমাজে একজন ব্যক্তি চুরি করা থেকে বিরত থাকলে সেই বিরত-থাকার উপযোগিতা সম্বন্ধে সন্দেহের
অবকাশ রয়েছে,... বর্তমানের বাংলাদেশের সমাজে নীতিহীনতাই নিয়ম হিসেবে পালিত হচ্ছে এবং এই নীতিহীনতাই সাধারণ আদর্শে পরিগণিত। এই সমাজে কোনো ব্যক্তি একা একা নীতিবান হয়ে টিকতে পারে না। তাই বলি, কেবলমাত্র নৈতিক শিক্ষা প্রদান ভবিষ্যত নাগরিককে নৈতিক করতে পারবে না। সামাজিক বাস্তবতারও পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন দেশপ্রেমিক সুশাসক। আমাদের দেশে সুশাসক আমরা কখনও পাবো কিনা তা আমার জানা নেই। তবুও পাবো বলে মনে আশা আছে। কে জানে এই আশাকে অনেকেই হয়তো দুরাশা বলবেন।
সহায়ক গ্রন্থ প্লেটো, রিপাবলিক, অনু: সরদার ফজলুল করিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৮২ এরিস্টটল, নিকোমেকীয়ান ইথিক্স, অনু :ডেভিড রস, লন্ডন, ১৯২৫; বাংলা অনুবাদ, হাসনা বেগম, ২০০৬ জর্জ এডওয়ার্ড ম্যুত্তর, প্রিন্সিপিয়া এথিকা (নীতিবিদ্যার মূলনীতি), অনু: হাসনা বেগম, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮৫ জন স্টুয়ার্ট মিল, ইউটিলিটারিয়ানিজম (উপযোগবাদ), অনু: হাসনা বেগম, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮৮, ১৯৯৭। মমতাজউদ্দীন আহমদ, “শিক্ষা সমস্যা” (১৯২৭), শিখা সমগ্র, ঢাকা, ২০০৩।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ