শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

অহংকারী হাতি

মিনহাজ উদ্দীন শরীফ : এক বনে বাস করতো মস্ত বড়ো হাতি। সে ছিল "অহংকারী ও বদমেজাজি"। তার ছিল দুটো বাচ্চা। বড়টার নাম আত্মিক, ছোট্টটার নাম ধাত্মিক। ধাত্মিক একটু ভালো প্রকৃতির। বাবা ও ভাইয়ের থেকে একটু আলাদা! সবার সাথে মিশতে ও খেলা করতে পছন্দ করতো।

কিন্তু বাবা ও ভাই তাকে বারণ করতো। 'ছোট প্রাণীদের সাথে না মিশতে'। "আত্মিক বাবার মতো অহংকারী ও বদমেজাজি"। আত্মিক ও বাবা বনের নিরীহ প্রাণীদের সবসময় তুচ্ছ ও মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে ভয় দেখাতো। তাই ছোট ছোট প্রাণীগুলো তাদের ভয় পেয়ে থাকতো। আত্মিক ও বাবার অত্যাচারে বনের পশুপাখি অশান্তিতে ভুগছিল দীর্ঘকাল।

বনের রাজা সিংহের কাছে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত নালিশ যেতো। সিংহ তখন এই বিষয়টা গুরুত্ব দিতো না। কিন্তু এখন বিষয়টা চরম পর্যায় পৌঁছে গেছে তাই----সিংহ তাদের আড়ালে বনের পশু পাখি নিয়ে মিটিং ডাকলো। সবার মতামতে সিদ্ধান্ত নিলো। তাদের বন থেকে তাড়ানো হবে।

"কিন্তু এই ক্ষমতা কার আছে এবং কে গিয়ে বলবে এই নিয়ে চিন্তিত সিংহ"। 'সবার-ই প্রাণ হারানোর ভয় আছে' এটা ভেবে সিংহ বলল আমি নিজেই গিয়ে বলবো হাতিকে তার বাচ্চাদের নিয়ে যাতে আগামীকাল সূর্য ওঠার পর পর এই বন থেকে চলে যায়। এই বলে সিংহ চলে যায় হাতির কাছে।

গিয়ে দেখে এক কলা বাগান লন্ডভন্ড করে ফেলছে হাতি। 'প্রয়োজনের চেয়ে অপচয় করছে বেশি''। সিংহ কাছে গিয়ে বলে ভাই তুমি এতো কলাগাছ নষ্ট করছো কেন? পরে তো না খেয়ে মারা যাবে। অহংকারী হাতি হুংকার দিয়ে বলে আমার যা খুশি তাই করবো তাতে তোর কি রে? তুই তোর কাজে যা, অন্যের ভালো-মন্দ নিয়ে ভাবতে আসিস না।

সিংহ বুঝেছে একা জব্ধ করা যাবে না। তাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে চলে যায় নিজের আস্তানায়। তারপর 'পাখির রাজা শকুন'কে বলে সবাইকে নিয়ে আসতে। গোপনি মিটিং হবে।

শকুন ডানা মেলে বনের সব পশুপাখিদের বলে এলো, এবং বেশ কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই হাজির হয়ে গেলো। তারপর সিংহ বলল এই অহংকারী হাতিকে একা জব্দ করা যাবে না। হাতিকে জব্দ করতে হলে আমরাদের একত্র হতে হবে। আর সবার সাহায্যও লাগবে।

শিয়াল পন্ডিত হাত উঠিয়ে বলে--- রাজা মশাই আমার একখানা কথা আছে। সিংহ বলে নিঃসন্দেহে বলো শিয়াল পন্ডিত! শিয়াল প্রস্তাব রাখলো আমরা সবাই গিয়ে হাতিকে বলবো হাতি এই বনের রাজা হওয়ার যোগ্য। সিংহ রেগেমেগে বলে আমি থাকতে সিংহ কেন রাজা হতে যাবে?

শিয়াল পন্ডিত বলল রাজা মশাই আমাকে কি পাগলা কুত্তা কামুড় দিছে নাকি? আপনি থাকতে অহংকারী হাতিকে রাজা বানাবো! আসলে রাজা মশাই এটা আমাদের ফাঁদ।

সিংহ হেসে বলে, সেটা আগে বলবে না! শিয়াল পন্ডিত বলল যদি হাতি আমাদের ফাঁদে পা দেয় তাহলে বুঝবে "অহংকার যে পতনের মূল"। আর অনেক সময় নিজের শক্তিও যে বিপদ ডেকে আনে।

সবাই জানতে চাচ্ছে কিভাবে কি করবে! শিয়াল পন্ডিত বললো তাকে রাজা বানিয়ে আমরা বলবো কচ্ছপ ও কুমিরকে ও যাতে পানির নিচে গিয়ে জানিয়ে আসে সে যে আজ থেকে রাজা আমাদের।

পশুপাখিরা বুঝেছে মস্ত বড়ো শরীর নিয়ে পানিতে নামলে যে ডুবে মারা যাবে। তাই সিংহ আর বনের পশুপাখিরা বলে বাহ! সত্যিই শিয়াল পন্ডিতের বুদ্ধির সাথে কারো জুড়ি হয় না।

শিয়াল পন্ডিত বলে রাজা মশাই এখন চলেন হাতির কাছে যাওয়া যাক। সবাই গিয়ে দেখে হাতিটা নদীর জলে, বাচ্চাদের নিয়ে পানি খাচ্ছে। তখন সিংহ বলে হাতি ভাই আমরা বুঝতে পেরেছি তুমি যে এই বনের শক্তিশালী প্রাণী। তাই তুমিই রাজা হওয়ার যোগ্য এই বনের।

হাতি হুংকার দিয়ে বলে! বোকারা এতদিনে তাহলে তোরা বুঝলি? আমি তো তোদের অনেক দিন আগে থেকেই বলে আসছি। আমি শক্তিশালী ও রাজা হওয়ার যোগ্য।

সিংহকে বলে দে আমার মুকুট! শিয়াল পন্ডিত এগিয়ে এসে বলে হুজুর মুকুট তো কচ্ছপের ও কুমিরের অধিনে আছে। আর কচ্ছপ ও কুমিরকে বলা হয়নি আপনি যে বনের রাজা হবেন।

আপনি কচ্ছপ ও কুমিরকে গিয়ে নিয়ে আসেন আর বলবেন মুকুটটা ও যাতে নিয়ে আসে। তারপর আমরা নেচে গেয়ে আনন্দ করে আপনার মাথায় পরিয়ে দেবো। "রাজার মুকুট "।

শিয়ালের মুখে এইসব শুনে হাতি ভুলে গেছে। সে-যে সাঁতার জানে না সেই কথা। খুশি হয়ে সবাইকে বলে আমি রাজি কচ্ছপ ও কুমিরের কাছে যেতে। হাতি বাচ্চাদের কাছে ডেকে বলে, তোমাদের বাবা আজ থেকে বনের রাজা হবে। আর তোমার হবে রাজার বাচ্চা! তোমাদের সবাই খুব সম্মান করবে।

ধাত্মিক বলে বাবা তুমিই তো বলেছিলে বনের রাজা একমাত্র সিংহদের বংশকেই মানায়! তাহলে আজ তুমি কেন রাজা হবে? বাবা ও আত্মিক ধমক দিয়ে বলে। চুপ থাকো বড়দের কথায় ছোটরা কথা বলতে নেই। তাই ধাত্মিক মন খারাপ করে চুপ ছিলো।

হাতি সবার থেকে বিদায় নিয়ে যেই না নদীতে নামলো আর অমনি কামড়ে ধরলো কুমির। তার বিশাল শরীর ধীরে ধীরে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছিল। আর বাঁচাও বাঁচাও করে চিৎকার করতে লাগলো। কিন্তু কেউ সাহায্য করলো না। আত্মিক ও ধাত্মিক দাঁড়িয়ে থেকে দেখলো বাবার মস্তো শরীর কিভাবে পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই অহংকারের পতন ঘটলো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ