সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

দোকান নয় যেন একটি মুদ্রার জাদুঘর

মুহাম্মদ নূরে আলম : সভ্যতার শুরুতে মানুষের মধ্যে বিনিময় প্রথা চালু ছিল। জনসংখ্যা বাড়ার কারণে মানুষের প্রয়োজন ক্রমে জটিল আকার ধারণ করে, ফলে বিনিময় প্রথার নানারকম সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। তখন মানুষ মুদ্রা ব্যবহার করা শুরু করে। শুরুর দিকে পাথর, কড়ি ইত্যাদি মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার হতো। ধীরে ধীরে সোনা, রুপা, লোহা, তামা ইত্যাদি ধাতুর খন্ড মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তারপর এর সুত্র ধরে আসে কয়েন আর কাগজের মুদ্রা। যাই হোক, মুদ্রার ইতিহাস বলা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আজকে আমরা জানব মুদ্রা সংগ্রাহক আজিজুরের মুদ্রার জাদুঘর নিয়ে কিছু ইন্টারেস্টিং তথ্য।
বিনিময় প্রথা মানবসভ্যতার ইতিহাসে অনেক পুরোনো। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে মানুষ এক পণ্যের সঙ্গে আরেক পণ্য বিনিময় করে আসছে। বিনিময়ব্যবস্থার বিভিন্ন অসুবিধা দূর করার জন্য মুদ্রার প্রচলন ঘটে। মুদ্রা হিসেবে ধাতুর ব্যবহার শুরু করে বর্তমান তুরস্কে অবস্থিত আনাতোলীয় সভ্যতার লাইডিয়ার জনগণ আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ হাজার অব্দে। অন্যদিকে বিনিময়মাধ্যম হিসেবে কাগজের বিলের ব্যবহার শুরু করে চীনারা, আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম অব্দে। মুদ্রাসংক্রান্ত বিদ্যাকে বলা হয় নিউমিসম্যাটিক। মুদ্রা, পদক, প্রতীকী উপহার, হুন্ডি এমনকি অর্থবিষয়ক প্রাচীন দলিলের সংরক্ষণ ও গবেষণা এই বিদ্যার অন্তর্ভুক্ত।  বর্তমানে মুদ্রা সংরক্ষণ, মুদ্রার ছবি তোলা, তালিকা তৈরি করাও নিউমিসম্যাটিকসের আওতায় পড়ে। মুদ্রার ব্যবহারে সচেতনতা এবং ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে মুদ্রার গুরুত্ব তুলে ধরার লক্ষ্যে পুরাতন মুদ্রা সঞ্চয় করতে কার না ভালো লাগে। হোক সেটা অর্থ, সম্পদ কিংবা সংগ্রহে রাখার মতো যে কোনো কিছু। আর তা যদি নোট হয়, তাহলে তো কথাই নেই। দৈনন্দিন জীবনে নোটের ব্যবহার নানাভাবে হয়। জমিয়ে খরচ করে আরও কতভাবে। কিন্তু এমনও অনেক মানুষ আছেন যারা নোট সংগ্রহ করেন ঠিকই, কিন্তু তা পরবর্তী সময়ে খরচ কিংবা ধারদেনা শোধের উদ্দেশ্যে নয়। তাহলে? শখ আর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এসে যেন এই মুদ্রার সঙ্গে পরিচিতি হতে পারে শুধু সে উদ্দেশ্যই মুদ্রা বা জমান।
এমনই একজন মোঃ আজিজুর রহমান। তাঁর জন্ম ৩০ জুন ১৯৭৪ সালে, মাগুরা জেলার রামনগর গ্রামে। পাঁচ বোন ও চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ছোটবেলা থেকেই টাকা জমানোর প্রতি তার অন্যরকম দুর্বলতা। ১৯৯৩ সাল থেকে ক্রমাগত তার এ সংগ্রহ অভিযান চলছেই। প্রায় ১৪০ টি দেশের (আনুমানিক ২ হাজার ৫০০) নোট ও মুদ্রা তার সংগ্রহে রয়েছে। তার সংগ্রহে রযেছে প্রাচীন ভারতের নানান রাজ বংশের আমলের মুদ্রা। তার সংগ্রহে এখনো পুরনো টাকার নোট ও মুদ্রা আছে। এগুলো ৬ থেকে ৭ বছর আগের। অসংখ্য নোট ও মুদ্রা আছে যা এখন আর কোনো দেশে চলা তো দূরের কথা খুঁজে পাওয়াও মুশকিল। এছাড়া প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধচলাকালীন প্রচলিত মুদ্রা, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান রাজা এবং সুলতানী আমলের ধাতব মুদ্রা, আমেরিকার বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের ধাতব মুদ্রা, সুলতানী আমল থেকে শুরু পূর্ব পাকিস্তান এবং বর্তমান বাংলাদেশের অনেক বিলুপ্ত মুদ্রা ও হাতের স্পর্শহীন প্রুফ কয়েন রয়েছে তার ভান্ডারে।
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের আগে ও পরের বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত অনেক নোট এবং মুদ্রা আছে তার সংগ্রহে, সেসব টাকার অস্তিত্ব এখন বিলীন। সংগ্রহের আগ্রহটা একান্তই নিজের ইচ্ছা ও শখ থেকে হলেও পরবর্তী সময়ে ভাই, বোন, স্ত্রী সন্তানদের আগ্রহেও এখন আরও বিস্তৃত। তার আগামীর পরিকল্পনা হলো- আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন এসে দেখতে পারে আগের নোট ও মুদ্রাগুলো। পরিচিত হতে পারে আমাদের দেশের এই বিলীন হতে যাওয়া নোট, মুদ্রার সঙ্গে।
সম্ভব হলে পৃথিবীর সব দেশের নোট সংগ্রহে রাখার ইচ্ছা আছে তার। মাগুরা জেলায় জন্ম হলেও বর্তমানে ঢাকার মগবাজারে একটি ফোনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন তিনি। আর তার দোকানের সামনেই ক্যাশ কাউন্টারের ওপর গ্লাসের নিচে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রেখেছেন অনেক দেশের নোট ও মুদ্রা। তার দোকানে যারাই আসেন সবাই তার এই সংগ্রহশালা দেখে অবাক হন। আজিজুর রহমান জানান, মুদ্রা সংগ্রহ করতে গিয়ে মূল অর্থেও যোগান হয়েছে ব্যবসার টাকা থেকে।   কখনো বা নানা অজুহাতে সংসারের খরচের টাকা বাঁচিয়ে এসব মুদ্রা, স্ট্যাম্প সংগ্রহ করেছি। ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, বায়াফ্রা, ফিউম, ইউনিয়ান আইল্যান্ডের কাগুজে এবং ধাতব মুদ্রাও রয়েছে তার কাছে। এক একটি মুদ্রা এক একটি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক। তাই আগামী প্রজন্মের জন্য জ্ঞানের সোপান উন্মুক্ত করতে সম্মলিত প্রচেষ্টায় ভবিষ্যতে একটি মুদ্রার জাদুঘর গড়ে তুলতে চাই, বললেন সৌখিন মুদ্রা সংগ্রাহক আজিজুর রহমান।  তার ইচ্ছা ভবিষ্যতে আরও সহজ ও সুন্দরভাবে এটিকে সমৃদ্ধ করার। তারঁ মুদ্রা সংগ্রহরে দোকানের ঠিকানা: মন্ডল মো: আজিজুর রহমান আজিজ, আজিজ টেলিকম, ১৯৪ ওয়্যারলেস রেলগেট বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ