সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

বাংলার মুসলিম জাগরণে শিল্পী আব্বাসউদ্দীন

মোঃ জোবায়ের আলী জুয়েল : আব্বাস উদ্দীন বাংলার লোক সঙ্গীতের এক প্রবাদ পুরুষের নাম। গায়ক আব্বাস উদ্দীন আহমদের জন্ম কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার অর্ন্তগত বলরামপুর গ্রামে। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯০১ সালের ২৭ অক্টোবর। বাবার নাম মোহাম্মদ জাফর আলী। কোচবিহার জেলার একজন স্বনামধন্য আইনজীবী ও জোতদার ছিলেন। মা’ হিরামন নেসা।
আব্বাস উদ্দীন আহমদ শৈশব কাল থেকেই তীক্ষè বুদ্ধি ও মেধা সম্পন্ন ছিলেন। লেখাপড়ায় তিনি খুবই ভাল ছাত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন শিক্ষকদের খুব আদরের। মাটির পৃথিবীর চিরন্তন ঐকতান তার কন্ঠে বাসা বেধেছে শৈশব কাল থেকেই। তিনি একজন ভাল শিল্পী ছিলেন শিশুকাল থেকেই। কিন্তু শৈশবে তিনি কোন ওস্তাদের কাছে গান শেখার সুযোগ পাননি। তিনি গান শিখেছেন গ্রাম্য গায়ক এবং ক্ষেতে কর্মরত কৃষকের মুখের গান শুনে শুনে। বাড়ীর সামনে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠে কৃষকের উদাত্ত কন্ঠের ভাওয়াইয়া গান তার শিশুমনে আলোড়ন তুলতো। তাকে ভাওয়াইয়া শিখতে বিশেষ ভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল তারই গ্রামের শিল্পী পাগারু এবং নায়েব আলী টেপুর ভাওয়াইয়া গান ও দোতারার ডাং। স্কুলে যাবার সময় এবং স্কুল থেকে ফেরার পথে তিনি গলা ছেড়ে গাইতেন ভাওয়াইয়া।
কোচবিহারের বলরামপুর প্রাইমারি স্কুলে তাঁর লেখাপড়ার হাতে খড়ি। পঞ্চম শ্রেণীতে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। তুফান গঞ্জে অধ্যয়ন কালে স্কুলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি প্রথম পুরস্কার পেয়েছিলেন।
আব্বাস উদ্দীন আহমদ ১৯২০ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন তুফান গঞ্জ হাই স্কুল থেকে। ম্যাট্রিক পাশ করার পর তিনি ভর্তি হয়েছিলেন কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজে। কৃতিত্বের সাথে আই,এ পাশ করার পর তিনি বি, এ পড়তে আসেন রংপুর কারমাইকেল কলেজে এবং পরবর্তীতে রাজশাহী কলেজেও ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিকুল আবহাওয়ার কারণে তিনি এ দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেশি দিন লেখাপড়ার সুযোগ পাননাই। এরপর তিনি বি, এ ভর্তি হন কোচবিহার কলেজে। কিন্তু এখানে বি, এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন নাই।
কলকাতা মহানগরীতে বিশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করেন সংগ্রামী শিল্পী জীবন। বাংলাদেশের মুসলমানের হৃদয়ে পৌঁছানোর ছিল সে সময় দুটি পথ। তার একটি তাদের মনের কথা এ দেশের লোকগীতি, অপরটি তাদের প্রাণের কথা ইসলামী গান। আব্বাস উদ্দীন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে এবং সুকৌশলে বেছে নিয়েছিলেন এই দুটি পথ। বাংলা গানের ইতিহাসে নজরুল ও আব্বাসউদ্দীন এ দুটি নাম যেদিন যুক্ত হলো সেদিন থেকে সঙ্গীতে অনুপস্থিত বাঙ্গালি মুসলমানের দীনতা ঘুচলো।
হিন্দু সমাজে যখন মুসলমান শিল্পীরা ছিলেন অস্পৃশ্য তখন বাংলার সঙ্গীত জগতে এক নতুন দিগন্তের সৃষ্টি হলো। এ নব দিগন্তের স্রষ্ট্রা হলেন অমর কন্ঠ শিল্পী আব্বাস উদ্দীন আহমদ। নজরুল এলেন সঙ্গীতের জগতে ধুমকেতুর মতো কাল বৈশাখী ঝড় তুলে, আব্বাস উদ্দীন এলেন সুরের রঙ্গ মশাল নিয়ে।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট এর  পর তিনি তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে গান গাওয়া শুরু করেছিলেন। চাকরী নিয়েছিলেন পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টে।
কোচবিহারের এক অনুষ্ঠানে আব্বাস উদ্দীনের গান শুনে কাজী নজরুল ইসলাম বিমোহিত হয়েছিলেন। তাকে তিনি কলকাতায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
আব্বাস উদ্দীন আহমদ মাত্র ২৩ বছর বয়সে কলকাতায় গ্রামোফোন কোম্পানীতে দুটি আধুনিক গান রেকর্ড করেছিলেন বিমল দাশ গুপ্তের সহায়তায়। গান দুটি ছিল “কোন বিরহীর নয়ন জলে বাদল ঝরে গো” এবং “স্মরণ পারের ওগো প্রিয়”। গান দুটি সে সময় যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল ।
এরপর আব্বাস উদ্দীন আহমদ কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এ সময় কাজী নজরুল ইসলামের গভীর সান্নিধ্যে আসেন আব্বাস উদ্দীন। কাজী নজরুল ইসলামের অনুপ্রেরণা এবং সহযোগীতায় আব্বাস উদ্দীনের কন্ঠে ইসলামী গানের পাশাপাশি একাধিক ভাওয়াইয়া গানের রেকর্ড হয়েছিল। বলা বাহুল্য এই গানগুলি সে সময় যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। পরবর্তীতে রেকর্ডে আব্বাস উদ্দীনের কী গান বাজারে আসছে সেই গান শোনার জন্য অধীর আগ্রহ অপেক্ষা করতেন গ্রামোফন কোম্পানীর লাখো লাখো শ্রোতা।
নজরুল গান লিখছেন, সূর দিয়েছেন। আব্বাস উদ্দীনের বলিষ্ঠ দরদী কন্ঠে সে গান রেকর্ড, জনসভা ও মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে বাংলা দেশের ঘরে ঘরে পৌছে দিয়েছে। ভাওয়াইয়া গানে বাংলা দেশের মানুষের অন্তর আবহমান কাল হতে হয়েছে সমৃদ্ধ। শিল্পী আব্বাস উদ্দীন ভাওয়াইয়া গান কে জনপ্রিয় করে তোলেন। তিনি ভাওয়াইয়া গানকে  প্রত্যন্ত অঞ্চলের অশিক্ষিত ও অর্ধ শিক্ষিত মানুষের মুখ থেকে তুলে এনে শহরের শিক্ষিত মানুষের ড্রইংরুমে জায়গা করে দিয়েছিলেন। ভাওয়াইয়া গানকে যারা গ্রামের অভব্য শ্রেণীর গান বলে ঘৃণা করতেন তারাও গোপনে তাদের ড্রইং রুমে বসে বিমূগ্ধ হয়ে শুনতেন আব্বাস উদ্দীন আহমদের মধূঝরা কন্ঠের ভাওয়াইয়া।
আব্বাস উদ্দীন আহমদের কন্ঠে গীত গ্রামোফন কোম্পানীতে তাঁর বহুগানের রেকর্ড এর সন্ধান পাওয়া গেছে  এর মধ্যে ৮৪টি ইসলামী গান, পল্লীগীতি ৫৮টি, ভাওয়াইয়া ৩৭টি, কাব্যগীতি ৩১টি এবং তাঁর আধুনিক গানের সংখ্যাও অজস্র। এমনকি ইসলামী গানকে তিনি কন্ঠে ধারণ করেছিলেন বলেই তৎকালীন মুসলিম রেঁনেসার সূত্রপাত হয়েছিল। যে মুসলমানরা গানকে হারাম বলে কানে আঙ্গুল দিতেন, তারাই পরবর্তীতে আব্বাস উদ্দীনের কন্ঠে অবাক বিস্ময়ে শুনতেন ‘মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ ‘ত্রি ভূবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলোরে দুনিয়ায়’ প্রভৃতি বিখ্যাত ইসলামী গান। পরবর্তীতে নজরুলের লেখা ও সূর করা রোজা, নামাজ, হজ্ব, যাকাত, শবেবরাত, ঈদ, ফাতেহা, নাতে রসূল, ইসলামী গজল প্রভৃতি অনেক কন্ঠ দিয়েছিলেন আব্বাস উদ্দীন।
বাংলার মুসলিম সমাজে যেখান থেকে আসতো আহ্বান, তা’ উপেক্ষা না’করে আব্বাস উদ্দীন শত কষ্ট জেনে ও ছুটে যেতেন তাদের আহ্বানে। ছাত্রদের মিলাদের সভায়, স্কুল কলেজের চ্যারিটি শো, দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপনের জন্য বিচিত্রানুষ্ঠানে। এছাড়াও হাজার রকমের জন সমাবেশে সারা দেশের সভায় সভা গায়কের সম্মান পেয়েছিলেন তিনি। ভাওয়াইয়া ও ইসলামী গানের পাশাপাশি তিনি গেয়েছেন অসংখ্য পল্লীগীতি, মুর্শিদী, মর্শিয়া, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, হামদ, নাত, পালাগান ইত্যাদি।
শুধু গান গেয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি। গায়কের পাশাপাশি একজন শক্তিশালী অভিনেতা ও ছিলেন। তিনি সেকালের বিষ্ণুপ্রিয়, মহানিশা, একটি কথা এবং ঠিকাদার ছবিতে ও অভিনয় করেছিলেন।
শুধু দেশ নয়, শিকাগো, নিউ ইয়র্ক, লল্ডন, প্যারিস, টোকিও, মেলবোর্ণ সহ পৃথিবীর বহুদেশে তিনি ইসলামী গান, ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি পরিবেশন করে বিশ্বসভায় আমাদের বাংলা গানকে তিনি সম্মানের আসনে অলংকৃত করে গেছেন। ১৯৫৫ সালে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় দক্ষিণ এশিয়া সঙ্গীত  সম্মেলনে এবং ১৯৫৬ সালে জার্মানী আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত সম্মেলন সহ আরও নানা সম্মেলন ও উৎসবে অংশ নিয়ে তিনি এ দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছিলেন।
আব্বাস উদ্দীন আহমদ যখন গায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন তখন মুসলমানদের গান গাওয়া ছিল হারাম। কিন্তু আব্বাস উদ্দীন আহমদ মুসলমান নাম নিয়েই গান গেয়েছেন এবং তাঁর বিশেষ গায়কি ঢং ও সূরেলা কন্ঠ জয় করেছিল সে যুগের প্রতিকুল অবস্থাকে। এটি ছিল আব্বাস উদ্দীন আহমদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব।
পল্লীগীতি, ইসলামী গান ও ভাওয়াইয়া গানের জনক আব্বাস উদ্দীন আহমদ দীর্ঘদিন পক্ষাঘাত-গ্রস্থ রোগ ভোগের পর ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৭-৩০ মিনিটে ঢাকায় মৃত্যু বরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৮ বছর (১৯০১-১৯৫৯ খ্রি:) তাঁকে ঢাকার আজিমপুর কবর স্থানে সমাহিত করা হয়।
বহু জাতি, বহু ভাষা-ভাষী, বহু মতাবলম্বী বাংলার মুসলমানকে তাঁর কৃষ্টি, ধর্ম ও তার স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে বেঁচে থাকবার জন্য আব্বাস উদ্দীন তাঁর গানের মাধ্যমে এই মুসলমান সমাজ কে সজাগ করে দিয়েছিলেন। তাই আব্বাস উদ্দীন আমাদের মুসলমান সমাজে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ