রবিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

ক্যাসিনোর মতো শেয়ারবাজারে শুদ্ধি অভিযান চায় বিনিয়োগকারীরা

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে বিভিন্ন দাবিতে সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয় -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: পুঁজিবাজারে মানুষের আস্থা ফেরাতে ক্যাসিনোর মতো সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), আইসিবি ও বিভিন্ন ইস্যু ম্যানেজারদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চায় বাংলাদেশ বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ। একইসাথে ডিএসইর আইপিও রিভিউ টিমকে ধান্দার নতুন পথ হিসাবে আখ্যায়িত করেছে সংগঠনটি। বাজারকে বিনিয়োগকারী বান্ধব করতে তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলন নেতৃবৃন্দ এ দাবি জানান। পুঁজিবাজারে অব্যাহত দরপতন ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও কামনা করেন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত ৯ বছর ধরে বাজার পতনে পুঁজি হারানো বিনিয়োগকারীদের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে নিয়মতান্ত্রিকভাবে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।
সংগঠনের সভাপতি মিজান উর রশিদ বলেন, গত ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে বাজারের সার্বিক প্রেক্ষাপট, সমস্যা ও সমাধান নিয়ে একটি স্মারকলিপি পেশ করেছে সংগঠনটি। কিন্তু পুঁজিবাজারে স্থায়ী স্থিতিশীলতা আজও ফিরে আসেনি।
সংগঠনটি জানায়, পুঁজিবাজারে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা থেকে শুরু করে অধিকাংশ স্টোক হস্তান্তরের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা, ডিএসই ও সিএসই, আইসিবি, বিএসইসির অসাধু কয়েকজন কর্মকর্তার সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট পুঁজিবাজার ধসের মূল কারণ। সেকেন্ডারি মার্কেটের আদলে বা সমান্তরালে অনৈতিক প্লেসমেন্ট বাণিজ্য ও দুর্বল কোম্পানির আইপিওতে তালিকাভুক্ত করে বিনিয়োগকারীদের সর্বস্বান্ত করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারের সঙ্গে যুক্ত দুর্নীতিবাজ ও অসাধু ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে মেধাবী ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
সাংবাদিক সম্মেলনে পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিএসইসি চেয়ারম্যান খায়রুল হোসেনসহ সব কমিশনারদের অপসারণের দাবিসহ ২১ দফা দাবি তুলে ধরেন সংগঠনের সভাপতি।
দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, বাইব্যাক আইন পাস, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ইস্যু মূল্যের নিচে অবস্থান করা শেয়ারগুলো নিজ নিজ কোম্পানিকে ইস্যু মূল্যে বাইব্যাক করতে হবে, পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে আগামী ৩ বছর পর্যন্ত সব ধরনের আইপিও, রাইট শেয়ার ইস্যু বন্ধ রাখতে হবে, প্লেসমেন্ট শেয়ারের অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে, বুক বিল্ডিং পদ্ধতি, ডাইরেক্ট লিস্টিং পদ্ধতি বাতিল করতে হবে, সিসি আইনের বাস্তবায়ন করতে যেসব কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ব্যক্তিগতভাবে ২%, সম্মিলিতভাবে ৩০% শেয়ার নেই, সেসব উদ্যোক্তা পরিচালক ও কোম্পানিগুলোকে শেয়ার ধারণ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর মূলস্তম্ভ ব্যাংকিং তথা আর্থিক খাত এবং পুঁজিবাজার চরমভাবে হতাশার মধ্য দিয়ে চলছে মন্তব্য করে বাংলাদেশ বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ সভাপতি মিজান-উর-রশীদ চৌধুরী বলেন, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং পুঁজিবাজারকে নাজুক অবস্থায় রেখে দেশকে আমরা কোন উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে যাচ্ছি? কীভাবে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়ন হবে? জাতির কাছে আজ এটি এক বিরাট প্রশ্ন।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে ২০১০ সালে ভয়াবহতম পতনের পর বাজারকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বিএসইসিতে যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়, তারা বাজার স্বাভাবিক করার পরিবর্তে উল্টো বাজারকে আরও বেশি অস্বাভাবিক করে তোলেন। স্মরণকালের মহাধসের পর পুঁজি ও জীবনরক্ষার জন্য দিশেহারা, পুঁজিহারা বিনিয়োগকারীরা লাগাতার আন্দোলন করে যাচ্ছিলেন। এরই মধ্যে পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে রনি জামান, রনি সাহা, লে. কর্নেল ডা. মাহবুবুর রহমান, মিল্লাত হোসেন, হাবিবুর রহমান, রতন চৌধুরী, লিয়াকত আলী যুবরাজ, দিলদার হোসেনসহ অসংখ্য নাম না জানা বিনিয়োগকারী আত্মহত্যা ও হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা থেকে শুরু করে অধিকাংশ স্টক হস্তান্তরের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা, ঢাকা-চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, আইসিবি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের বেশকিছু অসাধু কর্মকর্তার সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট পুঁজিবাজার ধসের মূল কারণ। এছাড়া সেকেন্ডারি মার্কেটের আদলে বা সমান্তরালে অনৈতিক প্লেসমেন্ট বাণিজ্য ও দুর্বল কোম্পানি আইপিও-তে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সর্বস্বান্ত করা হয়েছে।
বর্তমান কমিশন ২০১১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট ৯০টি কোম্পানি অনুমোদন দিয়েছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশ কোম্পানি ফেসভেলু ও ইস্যু মূল্যের নিচে অবস্থান করছে। সিএনএ টেক্সটাইল, ফ্যামিলি টেক্স, টুংহাই নিটিং, কাট্টলি টেক্সটাইল, অ্যাপোলো ইস্পাত, খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, এমারেল্ড ওয়েলসহ অনেক কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এই কোম্পানিগুলো অনৈতিকভাবে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয়া হয়েছিল’ বলেন মিজান।
তিনি বলেন, এই কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে প্লেসমেন্টের অবৈধ বাণিজ্য, আইপিও বাণিজ্য, ঘুষ ও দুর্নীতি করে হাজার হাজার কোটি টাকা মানি লন্ডারিং করে বিদেশে পাচার করে দেশের পুঁজিবাজারের মেরুদ- ভেঙে দেয়া হয়েছে।
বিএসইসি পুনর্গঠনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণ করতে আপনি যাদের দায়িত্ব দিয়েছেন সেই বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ একচেঞ্জ কমিশন বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষগ্রহণের বিনিময়ে অবৈধভাবে দুর্বল কোম্পানিগুলোকে আইপিও অনুমোদন, প্লেসমেন্ট বাণিজ্য ও রাইট শেয়ার অনুমোদনের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে আপনার সরকারকে বিব্রত অবস্থায় ফেলেছে। আমরা সেই বিএসইসি চেয়ারম্যান খাইরুল হোসেন ও কমিশনার হেলাল উদ্দিন নিজামীসহ সকল কমিশনারের অপসারণ চাই এবং মেধাবী ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের দিয়ে কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানাচ্ছি। পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য ক্যাসিনো মার্কেটের মতো বিএসইসি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, আইসিবি ও বিভিন্ন ইস্যু ম্যানেজারদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
এদিকে স্বচ্ছ ও ভালো কোম্পানি’ পুঁজিবাজারে আনার লক্ষ্যে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) গঠন করা ‘আইপিও রিভিউ টিম’কে ধান্দার নতুন পথ হিসেবে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক।
তিনি বলেন, ডিএসই যে টিম গঠন করেছে তাতে একজন বিচারপতি ও একজন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা রাখা হয়েছে। এই দুজনের স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু তাদের সামনে রেখে ডিএসইর অসাধুরা ধান্দার নতুন ফাঁদ পাতবেন। আমরা মনে করি, এই টিম দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা হবে না। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ডিএসইর অসাধু কর্মকর্তারা যোগসজশ করে বাজারে দুর্বল কোম্পানি আনছে। আজ বাজারের যে দুরবস্থা তার জন্য সব থেকে বেশি দায়ী বিএসইসি। আমাদের সন্দেহ এই টিম গঠন করে ডিএসইর পরিচালকদের একটি অংশ প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বাণিজ্যে মেতে উঠবে। সেই সঙ্গে অবৈধ প্লেসমেন্ট সুবিধা নেবে। ডিএসইর টিমের ওপর আমাদের কোনো আস্থা নেই।
উল্লেখ্য, পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড কএক্সচেঞ্জ কমিশনের পরামর্শে গত সোমবার ৬ সদস্যের ‘আইপিও রিভিউ টিম’ গঠন করে ডিএসই। ডিএসইর দাবি এই টিম গঠনের ফলে আইপিওতে স্বচ্ছ ও ভালো কোম্পানি আসবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ