শনিবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

সাকিব সব ধরনের ক্রিকেট থেকে ২ বছরের জন্য নিষিদ্ধ

রফিকুল ইসলাম মিয়া : ভারত সফরকে সামনে রেখে হঠাৎ করেই বাংলাদেশের ক্রিকেট মহাসংকটে। বিশেষ করে সাকিব ইস্যুতে টালমাটাল বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গন। ২ বছরের জন্য বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে নিষিদ্ধ করছে আইসিসি। এই সময়ে তিনি সব ধরনের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ থাকবেন। এর মধ্যে আছে এক বছরের স্থগিত নিষেধাজ্ঞা। আইসিসির দেয়া নিয়মকানুন মেনে তাদের সাহায্য করলে শাস্তি এক বছরে নেমে আসবে সাকিবের। ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়ে সেটাকে প্রত্যাখ্যান করলেও আইসিসি কিংবা বিসিবিকে না জানানোর কারণেই এই শাস্তি আরোপ করা হলো ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থাটির পক্ষ থেকে। তবে, দোষ স্বীকার করার কারণে, ১ বছরের শাস্তি স্থগিত করেছে আইসিসি। ফলে ২০২০ এর ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সব ধরনের ক্রিকেটেই নিষিদ্ধ থাকবেন এই সময়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। আইসিসির পক্ষ থেকেই এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়েছে। আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী কোডের তিনটি আইন লঙ্ঘনের অপরাধ সাকিব মেনে নেয়ার পর এ শাস্তি দিয়েছে আইসিসি। আকসুর কাছে তথ্য না জানানোয় এ শাস্তি পেয়েছেন সাকিব। ভবিষ্যতে একই অপরাধে অপরাধী হলে স্থগিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। ফলে আগামী বছর ২৯ অক্টোবর থেকে ক্রিকেটে ফিরতে পারবেন সাকিব। তবে এরপর পরবর্তী এক বছর আইসিসির নজরদারিতে থাকবেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের বর্তমান টি-টুয়েন্টি ও টেস্ট ক্রিকেটের অধিনায়ক। গতকাল আইসিসি’র ওয়েব সাইটেও এই ঘোষণার কথা জানানো হয়েছে। আইসিসির শাস্তি মাথা পেতে নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। গতকাল রাতে বিসিবি কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে একথা জানান তিনি। নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার জন্যই মূলত বোর্ডে আসেন সাকিব। যেখানে বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের সঙ্গে আলোচনার পর সংবাদ মাধ্যমে কথা বলতে আসেন তিনি। মূলত আইসিসিকে দেয়া বিবৃতিটিই লিখিত বক্তব্য আকারে পড়ে শোনান সাকিব। যেখানে তিনি বলেন, ‘আমি সত্যিই খুব মর্মাহত। যেই খেলাটাকে এতো ভালোবাসি সেখানে নিষিদ্ধ হলাম। তবে ম্যাচ পাতানোর প্রস্তাব আইসিসিতে না জানানোয়, আমি আমার নিষেধাজ্ঞা মেনে নিচ্ছি। আইসিসির অ্যান্টি করাপশন ইউনিট খেলোয়াড়দের দুর্নীতিমুক্ত রাখতে প্রাণপণে লড়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমি আমার অংশটা ঠিকঠাক পালন করতে পারিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের সব খেলোয়াড়ের মতো আমিও চাই ক্রিকেট খেলাটা যেন দুর্নীতিমুক্ত থাকে। সামনের দিনগুলো আইসিসির অ্যান্টি করাপশন ইউনিটের সঙ্গে তাদের দুর্নীতিবিরোধী প্রোগ্রামে কাজ করতে আগ্রহী। আমি এটি নিশ্চিত করতে চাই যে, আমার মতো ভুল যেন কোনো তরুণ খেলোয়াড় ভবিষ্যতে না করে। এসময় সাকিব আরো বলেন, কোনো উদীয়মান খেলোয়াড় যেন আমার মতো ভুল না করে। সাংবাদিক ও সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যেভাবে আপনারা অমাকে সাপোর্ট করেছেন আশাকরি এই সাপোর্টটা অব্যাহত থাকবে।’ বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বলেন,‘ আমাদের সকলের এখন সাকিবের পাশে থাকা উচিত। আমরা সব সময় ওর পাশে থাকব। খুব তারাতারি সাকিব ক্রিকেটে ফিরবে। আমি খুশি. সাকিব সব ধরনের সহযোগিতা করেছে। সাকিব আমাকে প্রথম বলেছে।’ এর আগে, নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে সাকিব আল হাসান আইসিসিকে বলেন, ‘আমার ভালোবাসার এই খেলা থেকে বিরত থাকতে হবে, এটি নিঃসন্দেহে চূড়ান্ত দুঃখজনক। তবে আমাকে যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে আইসিসিকে না জানানোর কারণে আমি সম্পূর্ণভাবে এই নিষেধাজ্ঞা স্বীকার করে নিচ্ছি। ভালোবাসার ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হওয়ায় আমি সত্যিই দুঃখিত। কিন্তু ম্যাচ পাতানোর প্রস্তাব পাওয়ার কথা গোপন করার শাস্তি আমি মেনে নিয়েছি। আইসিসি’র দুর্নীতি তদন্ত কমিশন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে খেলোয়াড়দের ওপরই নির্ভর করে থাকে। এ ক্ষেত্রে আমি আমার দায়িত্বটি পালন করতে পারিনি।' তরুণরা যেন এই পথে আর পা না বাড়ায় সেজন্য কাজ করবেন অলরাউন্ডার সাকিব। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অধিকাংশ খেলোয়াড় ও ভক্তদের মতো আমিও চাই খেলা দুর্নীতিমুক্ত থাকুক এবং আমি আইসিসির এসিইউর সঙ্গে শিক্ষা কর্মসূচিতে কাজ করতে চাই এবং নিশ্চিত করতে চাই যেন আমার মতো কোনও তরুণ খেলোয়াড় ভুল না করে।’ এ ব্যাপারে আইসিসি’র জেনারেল ম্যানেজার (ইন্টেগ্রিটি) অ্যালেক্স মার্শাল বলেন, 'সাকিব আল হাসান একজন অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার। তিনি আইসিসি’র বিভিন্ন সেশনে অংশ নিয়েছেন এবং দুর্নীতিবিরোধী যে কোড রয়েছে, তিনি সেসব দায়িত্ব সম্পর্কেও অবগত। তাকে যেসব প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল (জুয়াড়ির প্রস্তাব), সে সম্পর্কে তার আইসিসিকে জানানো উচিৎ ছিল।' মার্শাল আরও বলেন, 'সাকিব তার ভুল স্বীকার করে নিয়েছেন এবং তদন্তের সময় সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। তরুণ ক্রিকেটাররা যেন তার ভুল থেকে শিখতে পারেন, ভবিষ্যতে সে বিষয়েও তিনি ইন্টেগ্রিটি ইউনিটকে শিক্ষামূলক সেশনগুলোতে সহযোগিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তার এই প্রস্তাবকে আমি স্বাগত জানাই।' দুই বছর আগে একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে একজন জুয়াড়ির কাছ থেকে ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। কিন্তু ওই প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু বিষয়টি খুব বেশি গুরুত্ব দেননি বলে আইসিসি কিংবা বিসিবিকে বিষয়টা জানাননি। এটাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে সাকিব আল হাসানের জন্য। আইসিসির নিয়ম হচ্ছে, এ ধরনের অপরাধের শাস্তি হিসেবে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞার শাস্তি। তবে সাকিব নিজের দোষ স্বীকার করায় শাস্তি কমিয়ে দুই বছর করা হয়েছে। একই সঙ্গে তদন্তকাজে সহযোগিতা করার কারণে শাস্তি বাতিল করা হয়েছে আরও এক বছরের। অর্থাৎ এক বছর শাস্তি ভোগ করবেন তিনি, যা কার্যকর হবে গতকাল থেকেই। আগামী বছরের ২৯ অক্টোবর তিনি নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাবেন। আন্তর্জাতিক একজন জুয়াড়ির কাছ থেকেই প্রস্তাব পেয়েছিলেন সাকিব। জুয়াড়ির প্রস্তাবের বিষয়টি আইসিসি পরে জানতে পারে। আন্তর্জাতিক জুয়াড়িদের কল রেকর্ড ট্র্যাকিং করে এ ব্যাপারে সব তথ্য উদ্ধার করে তারা। জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট ওই জুয়াড়ি আইসিসির কালো তালিকায় থাকাদের একজন। আইসিসি তাদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে সাকিবের বিরুদ্ধে। তিন ম্যাচে সাকিবের কাছে ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল বলে জানতে পেরেছে আইসিসি এবং সে সব বিষয়ে তারা প্রমাণও সংগ্রহ করেছে। আকসুর ধারা ২.৪.৪ আর্টিকেলের মধ্যেই তিনটি অপরাধ করেছিলেন সাকিব। সাকিবের অপরাধগুলো ছিল- ১.২০১৮ সালের জানুয়ারিতে শ্রীলংকা, জিম্বাবুয়েকে নিয়ে বাংলাদেশের যে ত্রিদেশীয় সিরিজ হয়েছিল কিংবা ২০১৮ আইপিএলে প্রথম ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পান সাকিব। কিন্তু এ বিষয়ে তিনি আইসিসির অ্যান্টি করাপশন ইউনিটকে কোনো কিছুই জানাননি। ২. একই ধারার অধীনে অপরাধ : ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ত্রিদেশীয় সিরিজের সময়ই আরো একটি ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন। কিন্তু সে বিষয়েও তিনি আইসিসিকে অবহিত করেননি। ৩. ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল সানরাইজার্স হায়দরাবাদ এবং কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের মধ্যকার ম্যাচেও ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন সাকিব। কিন্তু সে বিষয়েও তিনি আইসিসি কিংবা সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি দমন সংস্থাকে কিছুই জানাননি। সাকিব ইস্যুতে গতকাল আজারবাইজান সফরের বিস্তারিত জানাতে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বিসিবি সব সময় সাকিবের সঙ্গে আছে এবং তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করবে। ক্রিকেট খেলোয়াড়দের সঙ্গে জুয়াড়িরা যোগাযোগ করে। ওর যেটা ভুল হয়েছে, যখন যোগাযোগ করা হয়েছে, তখন বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। সে কথাটি আইসিসিকে জানায়নি। নিয়মটা হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে জানানো উচিত ছিল। সে এটাই ভুল করেছে। আইসিসি যদি অবস্থান নেয়, সে ক্ষেত্রে আমাদের তো খুব বেশি কিছু করণীয় থাকে না। আমাদের দেশের ক্রিকেটার এবং খেলোয়াড় হিসেবে তার একটি অবস্থান আছে। সে ভুল করেছে, এটা ঠিক। সে সেটা বুঝতেও পেরেছে। আর বিসিবি বলেছে, তার পাশে তারা থাকবে। এর চেয়ে খুব বেশি যে করণীয় কিছু আছে, তা কিন্তু না।’ যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল জানান, যদিও আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিট বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করছে বলে এসব ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘এটা অবশ্য আকসুর বিষয়। এখানে আমাদের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। তবে পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখেছি। তবে কোনও কঠোর সিদ্ধান্ত যদি আসে, অবশ্যই আমরা সাকিবের পাশে থাকব। কিভাবে তাকে রক্ষা করা যায়, সে চেষ্টা করব।’ বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন জানিয়েছিলেন, সাকিবের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে এখনও বিসিবিকে কিছু জানায়নি আইসিসি। তবে এ ব্যাপারে এখনই চূড়ান্ত কিছু বলা যাচ্ছে না। আইসিসির বিবৃতির পরই সব স্পষ্ট হবে। বিসিবিও নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না। আর সবার মতো তারাও আছে আইসিসির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছিলেন, তারা এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না। তিনি শুধু বলেছেন, ‘আমরাও অপেক্ষায় আছি। দেখা যাক আইসিসি কী বলে।’ তবে আইসিসির নিষেধাজ্ঞার কারণে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ৭ম আসর মিস করতে যাচ্ছেন এই নন্দিত ক্রিকেটার। আগামী ২০২০ সালের অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ায় বসতে যাচ্ছে টি- টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ৭ম আসর। শুরুটা উইন্ডিজের বিপক্ষে ২০০৭ সালের ঐতিহাসিক সেই ম্যাচ দিয়ে। যে ম্যাচ দিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অভিষেক সাকিবের। উইন্ডিজের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়েই সুচনা করেছিলেন বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার। আর তাকে ছাড়ায় কিনা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলতে হবে বিশ্বকাপ। ২০১০ সালে লাল সবুজের জার্সিতে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন সাকিব আল হাসান। আর এরপর ২০১২ এবং ২০১৪ সালে মুশফিকুর রহিমের অধিনায়কত্বে এবং ২০১৬ ও ২০১৮ সালে মাশরাফি বিন মুর্ত্তজার অধীনে খেলেছেন মোট ছয়টি বিশ্বকাপ। এদিকে ভারত সফরকে সামনে রেখে বাংলাদেশ এখনও তাদের টেস্ট দল ঘোষণা করেনি। টি-টোয়েন্টি স্কোয়াড ঘোষণা করা হয়েছে আগেই। সেখানে সাকিবকে অধিনায়কের দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাকিব আল হাসান অধিনায়ক থাকবেন কি থাকবেন না, সে ব্যাপারটা মোটেও নিশ্চিত নয়। ৩ নভেম্বর থেকে ভারতের বিপক্ষে শুরু হবে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি সিরিজ। সে উদ্দেশ্যে আজ বুধবার বাংলাদেশ দল বিমানে ওঠার কথা। বিকাল তিনটায় ভারতের উদ্দেশ্য ঢাকা ছাড়বে সাকিব। সাকিব আল হাসানের ২ বছরের নিষেধাজ্ঞার কারণে টেস্ট এবং টি-টোয়েন্টি দুই ফরম্যাটেই নতুন অধিনায়ক নির্ধারণ করতে হয়েছে বাংলাদেশ দলকে। ভারত সফরের জন্য টেস্টে নতুন অধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে মুমিনুল হকের নাম। টেস্ট সিরিজের আগে অনুষ্ঠিত হবে ৩ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ। ওই সিরিজের জন্য অধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের নাম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ