সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

হারিয়ে যেন খুঁজি ফিরি

* আমার বাবা মরহুম হেলাল হুমায়ুনের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ
আব্দুল্লাহ গালিব আল হিলালী : বাবার প্রজন্ম-সময়ের অভিজ্ঞান ছিল সাদামাঠা। সাদা পপলিনের হাওয়াই বা নানা রঙের হাফ শার্ট ও পাঞ্জাবী ছিল তার প্রিয় পোশাক। পোশাকই বলতো মনের কথা। ভবিষ্যতকে অতীতের পাটিগণিতে বের করে আনার জ্ঞান তো সাধারণ বলে বিবেচিত, কিন্তু ওইসব আসাধারণ ও বিরল মানুষদেরই আছে। কোন ছল-চাতরি ছিল না। পৃথিবী নামক বদ্ধজলায় একে অপরকে ফাঁকি দিয়ে গিলে খেয়ে বাড়তে চাওয়া ব্যাঙাচিদের টিকে থাকবার লড়াইয়ের মতই মানুষের জীবন। ভোগ-লালসার লড়াকু ঝাপটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে। জীবনকে জীবনের জন্য গড়ছেন, জীবিকার জন্য বা ‘করে খেতে খাবার’ জন্য নয়। তাই তো তার প্রজ্ঞা ছিল সীমাছুট। এখানেই আমার বাবা সাংবাদিক হেলাল হুমায়ুনের মতো মানুষরা ভাস্কর। বাবা সাংবাদিকতাতেও ওই মানসিক সাধনায় নিয়েজিত ছিলেন আগাগোড়া। এই প্রথম কলম হাতে নিলাম আব্বুকে নিয়ে কিছু লিখবো ভেবে। মনে হচ্ছে আমার শব্দের ভান্ডারে ভাটা পড়ে গেছে। বারবার আমি আমার স্মৃতির ক্যানভাস এ হারিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ মনে আসলো লিখতে বসেছি, ঠিক তখন খেয়াল করলাম দু’চোখে পানি ঢলঢল করে ঝরে পড়ছে। চোখ মুছতে মুছতে ভাবলাম সব সন্তানেরই বোধ হয় এমনটা হয় যখন সে তার প্রয়াত পিতা-মাতার জন্য কিছু লিখতে চায়। আমার জন্মের পর থেকে শুরু করে বাবার ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত সব স্মৃতিগুলো লিখে শেষ করা প্রকৃতপক্ষে অসম্ভব, তবুও এই আবেগাপ্লুত মন নিয়ে সামান্য এই প্রচেষ্টা। বাবা শব্দটার মাঝেই একটা ভরসা পাওয়া যায়। মাথার উপর ছায়া যেমন আব্বু মানুষটাও হয় ঠিক তেমনই। কিন্তু আমার বাবা ছিলেন কিছুটা ভিন্ন, কারণ তিনি শুধু আমাদের সন্তানদের জন্য ভরসা ছিলেন না, ছিলেন আরো অনেকেরই ভরসাস্থল। সকল মতাদর্শের মানুষকে কাছে টানার প্রকট শক্তি ছিলো তার মাঝে। ব্যক্তিস্বার্থ কিংবা বৈষিক লালসার সংকীর্ণতা কখনো কলুষিত করতে পারেনি বলেই তিনি ছিলেন সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য, ছিলেন পরোপকারী সজ্জন ব্যক্তি। জনপ্রতিনিধিত্ব না করেও যে অন্যের উপকার করার জন্য কেও আন্তরিক ও নিঃস্বার্থবান হতে পারে, আমার বাবা ছিলেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সারাজীবন তিনি চেনা-অচেনা মানুষকে বিপদ থেকে বাঁচানোর আর্তি ফেরি করেছেন। অদ্ভুত তাঁর ব্যক্তিত্ব, সম্ভ্রম জাগায় ক্ষণে ক্ষণে। মান যোগ হুঁশ নিয়ে যে মানুষ, আমার বাবা সে স্তরেরই। তাঁর মাঝে ছিল পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক অনুশাসন, ধর্মপ্রাণতা আর বাংলাদেশের মাটি উৎসারিত হৃদয়বৃত্তির সমবায়ে। পারিবারিক জীবনে বাবা ছিলেন আমরা তিন ভাই-বোনের বন্ধুর মতো। তিনি তার ব্যস্তময় জীবনের ফাঁকে সময় বের করে আমাদের আদর-ভালবাসা, মমত্ববোধ এবং যত্ন নিতেন। একইভাবে আমার মায়ের কাছে তিনি ছিলেন আদর্শ স্বামী। সংসারের খুঁটিনাটি সব কিছু তিনি খেয়াল করতেন। আমাদের পরিবারের কখনো অর্থ বৈত্তের কোন অভাব ছিল না, কিন্তু তিনি আদর্শের ব্যাপারে কোন অপোষ করতেন না। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে তিনি পছন্দ করতেন। অবসর সময়ে বাবা আমাদের নিয়ে গল্প করে কাটাতেন। বাবা ছিলেন একজন আলোময় মানুষ। শিক্ষাই যে একজন মানুষকে আদর্শবান হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, এটাতেই তিনি বিশ্বাস করতেন। তার নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার আল হেলাল আদর্শ ডিগ্রী কলেজ, তালগাঁও আল হেলাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং আল হেলাল মহিলা মাদ্রাসা এর জ্বলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত। নাড়ির টান তার মধ্যে এতটাই প্রকটভাবে কাজ করতো যে নিজের বিপুল পরিমাণ সম্পদ, অক্লান্ত পরিশ্রম, সময়, মেধা উজাড় করে দিয়েছেন গ্রামের মানুষদের ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো কিংবা আবকাঠমিক উন্নয়ন তাদের দোড় গোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য, যা এলাকার অনেক বিত্তশালী লোকই করেননি। বলাবাহুল্য যে, তিনি তাঁর গ্রাম এবং গ্রামের মানুষদের কতটা ভালোবাসতেন। ৪০ বছর তিনি সাংবাদিকতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। ছাত্র জীবন থেকে তাঁর সাংবাদিকতা জীবন শুরু। বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান, সাংবাদিক সংগঠন ও সমাজকল্যাণমূলক সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। এ কে খান, বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী, মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ আমিনসহ অনেক প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বদের জীবনীগ্রন্থের তিনি সম্পাদক ছিলেন। সাহিত্য-সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অনন্য অবদানের জন্য তিনি একাধিক স্বর্ণপদক ভূষিত হন। মরহুম হেলাল হুমায়ুনের মতো একজন আলোময় ব্যক্তিত্বের সন্তান হওয়াটা যেমন সৌভাগ্যের, ঠিক তেমনই দায়িত্বও এসে যায় তার সাথে। দোয়ার দরখাস্ত থাকবে বাবার মাগফিরাতের জন্য, তার দেখানো পথ অনুসরণ করে আমরা সন্তানেরা যেন দেশ, জাতি, সমাজ ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হতে পারি তার জন্য। বাবা আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন আজ তার তিন বছর পূর্ণ হলো। সরাসরি খুব কম বারই বলেছি ‘আব্বু, ভালোবাসি’। দীর্ঘশ্বাসগুলো অনেক পোড়ায় যখন উঁকি দেয় তার স্মৃতিগুলো আমার মনের গহীনে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ