সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র ও আইনের শাসন

ইবনে নূরুল হুদা : সাম্প্রতিক বিশ্বে সবেচেয়ে জনপ্রিয় অথচ দুর্বোধ্য শব্দ হচ্ছে ‘গণতন্ত্র’। বক্তৃতা, বিবৃতি, সংবাদপত্রসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিদিনই গণতন্ত্র বিষয়ক আলোচনা হয়। বিষয়টি নিয়ে আলোচকদের মধ্যে মতবিরোধও হয় বিস্তর। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা নিয়ে আলোচকরা সবসময়ই জাঁ জাক রুশো, আব্রাহাম লিংকন বা উইড্রো উইলসনের উদ্ধৃতি দিয়ে থাকনে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে তারা ঐক্যমতে পৌঁছতে পারেন না। আর এমনকি গলিপথেই আধুনিক গণতন্ত্রের পথচলা।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ শব্দ দু’টি বেশ জোরালো মাত্রা পেয়েছিল। বিশ শতকের মধ্যভাগে ‘সমাজতন্ত্রের’ জনপ্রিয়তার গ্রাফ ছিল রীতিমত ঊর্ধ্বমুখী। বলা হতো, সমাজতন্ত্র হচ্ছে গণতন্ত্রের উচ্চতর রূপ। সঙ্গত কারণেই কোনো কোনো দেশ তার নামের সঙ্গে বাহারি সব শব্দ জুড়ে দিত, যাতে নামেই বোঝা যায় দেশে কোন ধরনের ‘তন্ত্রমন্ত্র’ চালু আছে। এক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার কথা উল্লেখ করা যায়। দেশটির কাগুজে-কলমে নাম হলো ‘ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়া’। কিন্তু সে দেশে গণতন্ত্র বলতে যা বোঝায় তার সার্থক উপস্থিতি কিন্তু নেই। প্রসঙ্গত, আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় নামও হচ্ছে ‘পিপলস রিপাবালিক অব বাংলাদেশ’। কিন্তু আমাদের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা সে মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়। বস্তুত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান গণতন্ত্রের মূলকথা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের দেশে যে ধরনের গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে তাতে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই বরং দেশের গণতন্ত্রের বড় ধরনের বিচ্যুতি ঘটেছে বলেই জনমনে ধারণা বদ্ধমূল।
মূলত আমাদের দেশে গণতন্ত্র ‘অপহৃত’ হওয়ার জোরালো অভিযোগ উঠেছে বেশ আগেই। ফলে রাষ্ট্রের সকল সেক্টরেই এর নেতিবাচক প্রভাবটাও রীতিমত স্পষ্ট। কারণ, আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধই সভ্য সমাজের চালিকা শক্তি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতাটা খুই স্পষ্ট। সঙ্গত কারণেই আমাদের রাষ্ট্রাচারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে স্থান করে নিয়েছে দুর্নীতি, অনিয়ম ও লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতা। সুস্থধারার রাজনীতির চর্চার পরিবর্তে দুর্বৃত্তায়ন স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। আইন ও সাংবিধানিক শাসনের পরিবর্তে অবৈধ পেশীশক্তি, অনাচার সর্বপরি সীমালঙ্ঘন সে স্থান দখল কর নিয়েছে। রাজনীতি চলে গেছে লাঠিয়াল বাহিনী ও বাজীকরদের নিয়ন্ত্রণে।
রাজনীতিতে মেধা ও মননের চর্চার পরিবর্তে ‘নির্মূল’, ‘প্রতিরোধ’, ‘প্রতিহত করণ’ ও ‘চামড়া তোলা’র রাজনীতি শুরু হয়েছে। ফলে সকল ক্ষেত্রে অবক্ষয় ও জনজীবনে অস্থিরতা আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়েছে। বিগত ৩ দশকে আমাদের দেশের ছাত্র রাজনীতিও একটা অশুভ বৃত্তে আটকা পড়েছে। ছাত্ররাজনীতি এখন লেজুরবৃত্তি, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য নির্ভর ও পিটিয়ে মানুষ হত্যার অনুসঙ্গ। ফলে দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার স্ষ্ঠুু পরিবেশ নেই বরং হল দখল, সিট দখল, চাঁদাবাজি, নৈরাজ্য ও আধিপত্য বিস্তারের অশুভ বৃত্তেই  আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সঙ্গত কারণেই সংহতির পরিবর্তে দেশে বিভক্তি ও ঘৃণার রাজনীতি এখন আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতীয় ঐক্যের পরিবর্তে হীনস্বার্থে জাতিকে করা হয়েছে বহুধাবিভক্ত। ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য, চিন্তা-চেতনায় বৈপরীত্য ও বোধ-বিশ্বাসের ভিন্নতার কারণেই প্রতিপক্ষের ওপর জুলুম-নির্যাতন, হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য এমনকি নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যারকাণ্ডের ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত। সম্প্রতি বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ সেই নেতিবাচক ছাত্ররাজনীতির নির্মম বলি হয়েছেন। শুধু তাই নয় বরং সঙ্কীর্ণ ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থেও এসব চলছে সমান্তরালে। ফলে প্রতিনিয়ত মানুষ খুনের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু তার কোনো বিচার পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘদিনেও সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যাসহ চাঞ্চল্যকর অনেক মামলারই বিচার হয়নি। ফলে কোনোভাবেই থামছে না লাশের মিছিল। বিশ্বজিৎ, তনু, মিতু, রেণু ও রিফাতদের প্রতিনিয়ত প্রাণ বিসর্জন দিতে হচ্ছে। মূলত বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই এ ধরনের হত্যাকা- ক্রমেই বাড়ছে বৈ কমছে না। সঙ্গত কারণেই রাষ্ট্রের কার্যকারিতা, সংবিধানের ক্রিয়াশীলতা, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই গুরুতর প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। দেশে গণতন্ত্রের নামে ফ্যাসিবাদী শাসন চলছে কি-না সে প্রশ্নও এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। কিন্তু কারো কাছেই এর কোনো সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না বরং সকল ক্ষেত্রে উদাসীনতা, নির্লিপ্ততা ও দায়সারা ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিলতর করে তুলেছে।
আধুনিক বিশ্ব গণতান্ত্রিক বিশ্ব। তাই শাসনকাজের সকল ক্ষেত্রেই গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকায় কাঙ্খিত। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন খুবই যৎসামান্য। আসলে দেশে গণতন্ত্রের নামে অপশাসন ও মানুষ হত্যার মহোৎসব চলছে। রাষ্ট্রযন্ত্র এর কোন প্রতিকার করতে পারছে না। অথচ গণতন্ত্রে ভিন্নমতের কারণে মানুষ হত্যা তো দূরের কথা অশ্রদ্ধা দেখানোরও কোন সুযোগ নেই।
গণতন্ত্রের সংজ্ঞা নিয়ে বিভিন্ন জন বিভিন্ন ব্যাখ্যা করলেও এর কোন অভিন্ন সংজ্ঞা এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। তবে গণতন্ত্রের সংজ্ঞায়  রবার্ট ডাল তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘পলিয়ার্কি : পার্টিসিপেশন অ্যান্ড অপজিশন’-এ একটি অতি প্রাণবন্ত বর্ণনা দিয়েছেন। রবার্ট ডালের মতে, গণতন্ত্র বা বহুজনের শাসনব্যবস্থার কতগুলো মৌলিক উপাদান রয়েছে। সেগুলো হলো, সরকারে সাংবিধানিকভাবে নির্বাচিত কর্মকর্তা থাকা; নিয়মিত, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন; সব পূর্ণবয়স্কের ভোটাধিকার এবং নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকার; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা; সরকার বা কোনো একক গোষ্ঠীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এমন উৎসের বিকল্প থেকে তথ্য পাওয়ার সুযোগ এবং সংগঠনের স্বাধীনতা। ডালের এই সংজ্ঞা বা বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও এখন পর্যন্ত গণতন্ত্রের সংজ্ঞা ও গুণাগুণ বিচারে এগুলোই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড। কিন্তু আমাদের দেশে যে ধরনের গণতন্ত্র চালু আছে তা ডালের সংজ্ঞার সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাই আমাদের স্বাধীনতাও পুরোপুরি অর্থবহ হয়ে ওঠেনি; আর সুফলগুলোও আমাদের নাগালের বাইরে।
বলছিলাম বুয়েটিয়ান আবরার হত্যার প্রসঙ্গ নিয়ে। শহীদ আবরারের অপরাধ হলো তিনি একটি বিষয় নিয়ে তার উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। এটি তার সাংবিধানিক অধিকার। হয়তো তার উপলব্ধিটা কারো কারো কাছে পছন্দ হয়নি। কারো অভিব্যক্তি অপছন্দ করাও ব্যক্তির নাগরিক অধিকার। কোন অভিব্যক্তির প্রতি অভিব্যক্তি প্রকাশের অধিকার সকলের রয়েছে। কিন্তু সে অভিব্যক্তিতে যদি পিটিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়, তাহলে তা আর অভিব্যক্তি থাকে না বরং তা দানবীয় ও পাশবিক কর্ম হিসেবেই বিবেচ্য হয়। আইন ও সংবিধান এভাবে মানুষ হত্যার লাইসেন্স কাউকে দেয়নি। যদিও এই অশুভ প্রবণতা খুব একটা অভিনব নয় বরং বেশ আগেই থেকেই প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষ পিটিয়ে হত্যার রাজনীতি আমাদের দেশে শুরু হয়েছে। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার হচ্ছে না বরং ক্ষেত্রবিশেষে এসব হন্তারকরা পুরস্কৃতই হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও বেশ জোরালো। ফলে আমাদের দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছে। কাক্সিক্ষত সুশাসনও থেকেও আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। আমাদের দেশ সাংবিধানিকভাবেই গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আর গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই ও প্রাণশক্তিই হচ্ছে বাকস্বাধীনতা। আমাদের সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘Freedom of thought and conscience is guaranteed.’ অর্থাৎ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল। ৩৯(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘The right of every citizen to freedom of speech and expression are guaranteed.’ অর্থাৎ ‘প্রত্যেক নাগরিকের বাক ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের নিশ্চয়তা দান করা হইল’। তাই ব্যক্তির যেকোন বিষয়ে নিজস্ব মতামত প্রকাশ তার সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার। কারণ, আমাদের সংবিধান সকল শ্রেণির নাগরিকের জন্য সমঅধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। মূলত বাকস্বাধীনতা হচ্ছে ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের নির্ভয়ে, কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ছাড়াই, অনুমোদন গ্রহণের বাধ্যতা ব্যতিরেকে নিজেদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার স্বীকৃত মুলনীতি। ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ (freedom of expression) শব্দপুঞ্জটিকেও কখনও কখনও বাকস্বাধীনতার স্থলে ব্যবহার করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ি অভিব্যক্তির স্বাধীন প্রকাশকে শনাক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ‘প্রত্যেকের অধিকার আছে নিজের মতামত এবং অভিব্যক্তি প্রকাশ করার। এই অধিকারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে নিজের স্বাধীনচেতায় কোনো বাধা ব্যতীত অটল থাকা; বিশ্বের যে কোনো মাধ্যম থেকে যে কোনো তথ্য অর্জন করা বা অন্য কোথাও সে তথ্য বা চিন্তা মৌখিক, লিখিত, চিত্রকলা অথবা অন্য কোনো মাধ্যম দ্বারা জ্ঞাপন করার অধিকার’।
ভিন্নমত গণতন্ত্রের অন্যতম অনুসঙ্গ। আমাদের দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও ভিন্নমত পোষণ সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হলেও  শুধু ভিন্নমত প্রকাশের কারণেই আবরার ফাহাদের মত একজন অতি সম্ভবনাময় শিক্ষার্থীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। মূলত আমাদের দেশে রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং সমাজের সব ক্ষেত্রেই পরমত সহিষ্ণুতার অভাবেই ভিন্নমত প্রকাশ বা সরকার বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোন মতামত প্রকাশকে ইতিবাচক মনে করা হয় না। আসলে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার অভাব, সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজের কার্যকর শক্তি হয়ে ওঠার ব্যর্থতা এবং নাগরিক সমাজের নিষ্ক্রিয়তা ও পলায়নপর মনোভাব এবং রাজনীতির প্রান্তিকতায় এজন্য প্রধানত দায়ী। কিন্তু রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই এই অশুভ বৃত্ত থেকে আমরা কোনভাবেই বেরিয়ে আসতে পারছি না বরং দিন যতই যাচ্ছে অবস্থার আরও অবনতিই হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিষয়টি আরও প্রান্তিকতায় নেমে এসেছে। ভিন্নমতের প্রতি ন্যূনতম সম্মান তো দেখানো হচ্ছেই না বরং যেকোন মূল্যে তা প্রতিহত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে। এমনকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা না করে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণার অস্ত্রও ব্যবহার করা হচ্ছে। অনৈতিকভাবে বলপ্রয়োগের ঘটনাও ঘটছে অনেক ক্ষেত্রেই। আর এসবের সাথে ক্ষমতাসীনদেরই অধিক সম্পৃক্ততা মিলছে। গত বছর নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকারীদের ওপর যারা হামলা চালিয়েছিল, তাদের পরিচয় নিয়ে অভিযোগের তীর ছিল সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ কর্মীদের দিকেই।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিন্নমত প্রকাশের কারণে মামলা ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। এধরনের হাজার হাজার মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এখন পরিস্থিতি এতই অবনতি হয়েছে যে, ভিন্নমত প্রকাশ কেবল বিপজ্জনক নয়, তা ইতোমধ্যেই বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। সরকারের সমালোচনা করলেই আক্রান্ত হতে হবে এমন একটি আতঙ্ক রয়েছে অনেকের মধ্যে। এমনকি নিজের জীবন দিয়ে হলেও এর প্রায়শ্চিত্ত করতে হতে পারে। মূলত আমাদের দেশ গণতান্ত্রিক পরিবেশের অনুপস্থিতি, বিশেষ করে একটি কার্যকর বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির শূন্যতার কারণে ভিন্নমত প্রতি সহনশীলতার পরিবেশ গড়ে উঠেতে পারেনি। যা একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য মোটেই ইতিবাচক নয় বরং আত্মঘাতি।
মূলত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি সহনশীলতার সংস্কৃতি। এখানে কোন সঙ্কীর্ণতার স্থান নেই। গণতান্ত্রিক পরিবেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, সহনশীলতা থাকবে এবং ভিন্নমত থাকবে। ইদানীং লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কেউ সরকারের কোন কাজ বা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলে বা সরকার প্রধান নিয়ে কিছু বললে তাদেরকে যেকোন ভাবেই হোক হেনস্তা করা হচ্ছে। অথচ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আবেগ-অনুভূতি, বোধ-বিশ্বাস ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে কথা বলাকে বাকস্বাধীনতা বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এসব বিষয়ে প্রতিক্রিয়াকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে বিবেচনা করা হচ্ছে না বরং ক্ষেত্র বিশেষে কঠোর হস্তে দমন করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ভোলার বোরহানউদ্দীনে আল্লাহ ও রাসূল (সা.) কে নিন্দা করে স্ট্যাটাস দেয়ার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর গুলী চালিয়ে কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছে। অথচ এসব ঘৃণ্য অপরাধের সাথে যারা জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে তা দৃশ্যমান হচ্ছে না। অথচ এর আগে সরকার বিরোধী স্ট্যাটাস দেয়ার কথিত অপরাধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যায়ের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আলোকচিত্রী শহীদুল আলমকে কারাভোগ করতে হয়েছে। এমনকি তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা সারাক্ষণই সামাজিক মাধ্যমে মনিটর করছে এবং যারা লেখালেখি করেন সবাই একটা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। ফলে অনেকেই হয়রানি ও মামলা আতঙ্কে লেখালেখি ছেড়েও দিয়েছেন। এ ধরণের একটি ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টির পেছনে রাজনৈতিক সহনশীলতার অভাব, সুশীল সমাজের নিষ্ক্রিয়তা এবং সাধারণ মানুষ আত্মসচেতনতাকে দায়ি করা হচ্ছে। যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
সম্প্রতি বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার হত্যার ঘটনা শুধু দেশে নয় বরং বহির্বিশ্বেও আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। শুধুমাত্র ভিন্নমত বা রাজনৈতিক মত পার্থক্যের কারণে এ ধরনের পিটিয়ে হত্যা ঘটনাকে সকলেই ধিক্কার জানিয়েছে। এমনকি জাতিসংঘ সহ বিভিন্ন দূতাবাস থেকেও এই নির্মম ঘটনার নিন্দা জানানো হয়েছে। অথচ সরকার বরাবরই দাবি করে আসছে যে, আমরা সারা বিশ্বে নিজেদের উন্নয়নের রোল মডেল হয়ে গেছি। কিন্তু এসব অর্জনের সাথে আমাদের দেশের বাস্তবতার তেমন কোন মিল আছে বলে মনে হচ্ছে না বরং সরকারের অভ্যন্তরের সুবিধাবাদীরা এসব অর্জনকে বিসর্জন দেয়ার জন্য আদাজল খেয়ে লেগেছে। নিজেদের আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যই রাজনীতিতে একেবারে প্রান্তিকতায় ঠেলে দেয়া হয়েছে। ভিন্নমতের প্রতি পরিকল্পিতভাবে ঘৃণা ছড়ানোর কারণে আমাদের দেশের রাজনীতি এতটা প্রান্তিকতায় নেমে এসেছে। এসেছে বহুধাবিভক্তি। ভিন্ন মতালম্বীদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মনে না করে একেবারে জানপ্রাণের শত্রু মনে করা হচ্ছে। ফলে পিটিয়ে মানুষ হত্যার মত ঘটনা ঘটছে মাঝে মধ্যেই। যা কোন মানদণ্ডেই গ্রহণযোগ্য নয়। মূলত পরমত সহনশীলতা গণতন্ত্রের মূল উপাদান। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের কতিপয় অধিকার সংরক্ষণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র কোন অর্জহাতেই এই দায়িত্ব উপেক্ষা করতে পারে না। প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক ৩ ধরনের অধিকার ভোগ করবে। সেসবের নিশ্চয়তা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ১. সামাজিক অধিকার, ২. রাজনৈতিক অধিকার এবং ৩. অর্থনৈতিক অধিকার।
সামাজিক অধিকার : জীবন ধারণের অধিকার. ২. ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার, ৩. মতপ্রকাশের অধিকার, ৪ সভা-সমাবেশ করার অধিকার, ৫. সম্পত্তি ভোগের অধিকার, ৬. ধর্মীয় অধিকার, ৭. আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার, ৮. চুক্তির অধিকার, ৯. ভাষার অধিকার, ১০. পরিবার গঠনের অধিকার ও ১১. শিক্ষা লাভের অধিকার।
রাজনৈতিক অধিকার : ভোটাধিকার, ২. প্রার্থী হওয়ার অধিকার, ৩. অভিযোগ পেশ করার অধিকার, ৪. সমালোচনার করার অধিকার, ৫. চাকুরী লাভের অধিকার ও ৬. বসবাসের অধিকার।
অর্থনৈতিক অধিকার : কাজের অধিকার, ২ উপযুক্ত পারিশ্রমিক লাভের অধিকার, ৩. অবকাশ যাপনের অধিকার, ৪. সংঘ গঠনের অধিকার ও ৫. রাষ্ট্র প্রদত্ত প্রতিপালনের অধিকার ইত্যাদি। গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র জনগণের শাসন, শাসক গোষ্ঠীর জবাবদিহিতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন গণমাধ্যমকে সরকার মোটেই গুরুত্ব না দিয়ে তাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্যই গণতান্ত্রিক সকল রীতিনীতি উপেক্ষা করছে। যা আমাদের জন্য রীতিমতো অশনি সংকেত। তাই সার্বিক দিক বিবেচনায় দেশ ফ্যাসিবাদী শাসনের দিকে ধাবিত হচ্ছে কি না সে প্রশ্নের কোন সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। মূলত পুঁজিবাদ, সম্রাজ্যবাদী একচেটিয়া মহাজনী মূলধনের চরম জাতীয়তাবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল ও সন্ত্রাসমূলক প্রকাশই হচ্ছে ফ্যাসিবাদ। ফ্যাসিবাদ চরম জাতীয়তাবাদী, অযৌক্তিক ধর্ম ও বর্ণ বিদ্বেষ এবং উদ্দেশ্য সাধনে চরম বর্বরতার আদর্শ প্রচার করে। ফ্যাসিবাদ পুঁজিবাদের চরম সঙ্কটের পরিচয় বাহক। সম্রাজ্যবাদী যুগ হচ্ছে পুঁজিবাদের চরম যুগ। জাতীয় ক্ষেত্রে পুঁজিবাদের বিকাশ যখন নিঃশেষিত, তখন পুঁজিবাদ নিজের শোষণমূলক ব্যবস্থা কায়েম রাখার জন্য সম্রাজ্যবাদী চরিত্র গ্রহণ করে।
ফ্যাসিবাদের মূলনীতি : ক. প্রথমত, ফ্যাসিবাদ গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল নয়। মূলত ফ্যাসিবাদ ছোট, মধ্যম, বড় এবং সর্বোচ্চ নেতা যা আদেশ করবেন, তাই রাষ্ট্রের আদেশ বলে নির্বিবাদে মেনে নিতে হবে।
খ. ফ্যাসিবাদ সমাজতন্ত্রেও অবিশ্বাস করে না।
গ. ফ্যাসিবাদে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বতন্ত্র স্বীকৃত হয় না। ফ্যাসিবাদের মূলমন্ত্র হলো সবকিছুই রাষ্ট্রের আওতাভূক্ত, কোনো কিছুই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয় বরং কোনো কিছুই রাষ্ট্রের বাইরে নয়।
ঘ. ফ্যাসিবাদ শান্তি কামনা করে না বরং নিয়ত সংগ্রামে লিপ্ত থাকার অনুপ্রেরণা যোগায়। মুসোলিনির মতে, মহিলাদের নিকট যেমন মাতৃত্ব, পুরুষদের নিকট তেমন যুদ্ধ-বিগ্রহ।
ঙ. ফ্যাসিবাদে একদলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় এবং দলীয় নেতা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে আসীন হন। একদল ও একনেতা সরকারের এবং সমাজের সকল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন।
চ. ফ্যাসিবাদে এলিট শ্রেণির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্বাস করা হয় যে, পৃথিবীতে কিছু ব্যক্তি শাসন করতে এবং শাসিত হওয়ার জন্য জন্মগ্রহণ করে।
আমাদের সংবিধানে বহুদলীয় গণতন্ত্র স্বীকৃত হলেও সাম্প্রতিক সংঘঠিত ঘটনাবলী তার সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে না। বিশেষ করে ভিন্নমতের অজুহাতে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনা সেদিকেই অঙুলী নির্দেশ করে। ভিন্নমত গণতন্ত্রেরই সৌন্দর্য। কিন্তু রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই সে সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি বরং আমাদের দেশের গণতন্ত্র এখন প্রান্তিকতায় নেমে এসেছে। দেশে আইনের শাসন না থাকায় নুসরাত জাহান রাফির মত নির্মম হত্যাকান্ডের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। সন্দেহের অজুহাতে মানুষ পিটিয়ে হত্যার প্রবণতাও বেড়েছে আমাদের দেশে। যা দেশে আইনের শাসনের অনুপস্থিতিই প্রমাণ করে। যা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্রের সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সম্প্রতি কথিত ছেলে ধরা সন্দেহে রেণু নামীয়া মহিলাসহ কয়েকজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু তদন্তে প্রমাণ হয়েছে তারা প্রত্যেকেই নির্দোষ ছিলেন। তারপরও এসব হত্যাকান্ডের বিচার প্রায় ক্ষেত্রেই হয় না। কোন কোন ক্ষেত্রে হলেও দন্ড কার্যকর হতে দেখা যায় না। ক্ষেত্র বিশেষে এসব ঘৃণ্য অপরাধীদের ক্ষমাও করে দেয়ার ঘটনাও ঘটে। যা গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য নয় বরং ফ্যাসিবাদ ও নৈরাজ্যবাদেরই অনুসঙ্গ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ