সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

গোশত আমদানি প্রসঙ্গে

আমদানির তালিকায় এবার বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে যুক্ত হতে চলেছে গরুর গোশত। গতকাল একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, ভারত, সৌদি আরব এবং দক্ষিণ কোরিয়ার পর ব্রাজিল থেকে হিমায়িত গরুর গোশত আমদানির কার্যক্রম এরই মধ্যে শুরু করা এবং এগিয়ে নেয়া হয়েছে। এখন চলছে ব্রাজিলের সঙ্গে আমদানি-রফতানির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পালা। রিপোর্টে এর কারণেরও উল্লেখ রয়েছে। রফতানির প্রস্তাব এসেছে ব্রাজিলের পক্ষ থেকে। দেশটি চাচ্ছে, বাংলাদেশ সেখানে তৈরি পোশাক রফতানি করে তার বিনিময়ে সমমূল্যের গরুর গোশত আমদানি করুক। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা তৈরি পোশাকের জন্য ব্রাজিল নগদ অর্থে মূল্য পরিশোধ করবে না। দেশটি বরং পণ্যের বিনিময়ে পণ্য- বাণিজ্যের প্রাচীন এই নীতি অনুসরণ করতে চাচ্ছে। এ ব্যাপারে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি বিজিএমইএ। সংস্থাটি ব্রাজিলের প্রস্তাব গ্রহণ করার সুপারিশসহ সরকারের কাছে একটি ধারণাপত্র পেশ করেছে। এর ভিত্তিতেই শুরু হয়েছে তৎপরতা। অন্যদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ খোদ সরকারেরই কিছু অংশের নীতিনির্ধারকরা ব্রাজিলের প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছেন। আপত্তির কারণ জানাতে গিয়ে নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গোশতে কোনো ধরনের রোগ জীবাণু থাকবে কি না তা পরীক্ষা করার মতো কোনো ল্যাবরেটরি বাংলাদেশে নেই। এমন অবস্থায় পরীক্ষা ছাড়া আমদানি করা হলে এবং সেসব গোশতে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ও বিপদজনক কোনো রোগ জীবাণু থাকলে তা সারাদেশেই ছড়িয়ে পড়বে এবং বিপন্ন হবে মানুষের জীবন। মূলত এই আশংকার কারণেই মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ব্রাজিলের গরুর গোশত আমদানির ব্যাপারে আপত্তি জানানো হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্রাজিল এবং বিজিএমইএর প্রস্তাব অনুযায়ী আমদানির লক্ষ্যে তৎপরতা চালাতে শুরু করেছে।
এ ক্ষেত্রেও যুক্তি ও পাল্টা যুক্তির অভাব নেই। প্রধান একটি যুক্তি হিসেবে ভারত, সৌদি আরব ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে একই গরুর গোশত আমদানির তথ্য-পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বলা হচ্ছে, কোনো ল্যাবরেটরি না থাকলেও পরীক্ষা ছাড়াই গত ছয় মাসে এসব দেশ থেকে ২০ লাখ ৪৩ হাজার কেজি হাড্ডিবিহীন গোশত আমদানি করা হয়েছে। সেসব গোশত দেশের বাজারে বিক্রিও করা হচ্ছে। অর্থাৎ রোগ জীবাণু আছে কি না তা না জেনেই সরকারের উদ্যোগে একদিকে গোশত যেমন বিক্রি করা হচ্ছে অন্যদিকে সাধারণ মানুষও তেমনি সে গোশত কিনে খাচ্ছে। সুতরাং রোগ জীবাণু সম্পর্কে জানা বা না জানা বাজিলের গোশত আমদানি না করার কোনো যুক্তি হতে পারে না। তথ্যাভিজ্ঞদের আশংকা, এভাবে যুক্তি ও পাল্টা যুক্তির আড়াল নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে যে কোনো সময় ব্রাজিল থেকে গরুর গোশত আমদানির কার্যক্রম শুরু হয়ে যেতে পারে। আমরা এ ধরনের যে কোনো উদ্যোগ ও কার্যক্রমকে সমর্থনযোগ্য মনে করি না বরং কঠোরভাবে বিরোধিতা করি। এর কারণ শুধু ল্যাবরিটরিতে পরীক্ষা করতে না পারা কিংবা রোগ জীবাণু সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া বা না হওয়া নয়। রোগ জীবাণু একটি বড় কারণ হলেও আমরা মনে করি, ৯২ শতাংশ মুসলিমের এই দেশে আমদানি করা গোশত শতভাগ হালাল কি না সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত হওয়াটাই প্রধান বিষয়। ব্রাজিল কিংবা ভারত বা সৌদি আরবসহ যে দেশ থেকেই আমদানি কর হোক না কেন, সবার আগে দেখা দরকার, প্রাণিগুলো সত্যি গরু ও মহিষ কি না, নাকি গরু-মহিষের আড়ালে এমন কোনো প্রাণির গোশত ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে- মুসলিমদের জন্য যা হারাম।
দ্বিতীয় পর্যায়ে নিশ্চিত হওয়া দরকার, প্রাণিগুলোকে ইসলামী বিধান অনুযায়ী আল্লাহর নামসহ জবেহ করা হয়েছে কি না নাকি মেশিনে উঠিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গোশতের সঙ্গে হাড্ডি না থাকার প্রকৃত কারণ নিয়েও প্রশ্ন ও সংশয় রয়েছে। কেননা, ব্রাজিল, জাপান ও কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে এমন অনেক পশুর গোশতও খাওয়া হয়- যেগুলো মুসলিমদের জন্য হারাম। এসব পশুর নামও মুসলিমরা সাধারণত উচ্চারণ করেন না। বলা বাহুল্য, ভারতেও মুসলিমদের জন্য হারাম এ ধরনের অনেক পশুর গোশত খাওয়া হয়। রফতানির সময় সেসব পশুর গোশতই বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে বা হচ্ছে কি না সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি থাকা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের আপত্তির অন্য একটি বড় কারণ হলো, গরু-মহিষ, ভেড়া-ছাগল ও খাসিসহ প্রাণি সম্পদের দিক থেকে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। চলতি বছরের জুন মাসে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, দেশ শুধু সম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়নি, দেশে উদ্বৃত্ত গোশতের পরিমাণও এত বেশি যে, চাইলে বাংলাদেশই গোশত রফতানি করতে পারে। এসব কারণেই আমরা ব্রাজিল বা অন্য কোনো দেশ থেকে বিশেষ করে গরু-মহিষের গোশত আমদানির বিরোধিতা করি। প্রাণি সম্পদের চিকিৎসা ও বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনও এরই মধ্যে গোশত আমদানির বিরোধিতা করে বিবৃতি দিয়েছে। তাই স্বার্থান্বেষী কোনো মহলের যুক্তিতে বিভ্রান্ত বা প্রভাবিত হয়ে আমদানি করার পরিবর্তে দেশের ভেতরে প্রাণি সম্পদ বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারের উপযুক্ত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ