শনিবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতিতে নির্বাচনের নামে ভয়াবহ জালিয়াতির অভিযোগ

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল: ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতিতে নির্বাচনের নামে ভয়াবহ জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনে কোনো ধরনের সিডিউল বা ভোটার তালিকা হালনাগাদ ছাড়াই সম্প্রতি  ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি লি: (রেজি: নং-২৩৭, সংশোধ-১৭/০৫ ইং, ২৯/১৪) এর সদ্যবিদায়ী কমিটির একটি অংশ ১২ সদস্যের একটি কমিটি রমনা থানা সমবায় কার্যালয়ে জমা দিয়েছে। যাকে সভাপতি দেখানো হয়েছে, যিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন, যিনি মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন আহবায়ক ছিলেন, যার দফতরে (সমবায় অফিস) কমিটি জমা দেয়া হয়েছে-তাদের কেউই জানেন না কবে নির্বাচন হয়েছে। এছাড়া ভোটের বিষয়ে জানেন না আড়াই হাজারের অধিক কোনো ভোটার। একইসাথে ভোটের বিষয়ে কিছুই জানেন প্রতিষ্ঠানটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিজেও। সবাই এটাকে একটি তুঘলকি কান্ড হিসেবেই দেখেছে। কমিটির নাম ঘোষণার পরপরই এ নিয়ে রীতিমত বিস্ময় প্রকাশ করেন খোদ যিনি সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি নিজেই। একইসাথে কোনো নির্বাচন হয়নি বলে জানান রমনা থানা সমবায় কর্মকর্তাও। এছাড়া কমিটির নাম জমা দেয়া স্লিপে সাক্ষর জাল করারও অভিযোগ করেছেন একজন নির্বাচন কমিশনার। এভাবে কমিটি গঠন নিয়ে ঢাকা ওয়াসায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ভোটাররা এ ধরণের কমিটি বাতিলের পাশাপাশি একইসাথে যারা সবাইকে অন্ধকারে রেখে এমন একটি কমিটি সমবায় কার্যালয়ে জমা দিয়েছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরও দাবি জানান।
নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে রমনা থানা সমবায় অফিসার আবদুস সালাম দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, আমার জানা মতে ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতির কোনো নির্বাচন হয়নি। কিভাবে এবং কাদের মাধ্যমে এতো বড় জালিয়াতি হয়েছে সেটি আমরা যাচাই বাছাই করবো। তিনি বলেন, এরই মধ্যে বিষয়টি জেলা সমবায় কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমরা বিষয়টি তদন্তে খুব শীঘ্রই একটি কমিটি করবো। তখনই সব বিষয় জানতে পারবেন। নির্বাচন না হলে ঘোষিত কমিটিকে নিষিদ্ধ করছেন না কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব কিছুই আইনী প্রক্রিয়ায় হয়ে থাকে। এখানেও হবে।
সরেজমিনে ঢাকা ওয়াসায় গিয়ে দেখা গেছে, কমিটি দেয়া হলেও সমবায় কার্যালয় বন্ধ। ভোটররা বলছেন, এই ধরণের জালিয়াতির নির্বাচন আমরা কখনোই মেনে নেবনা। তারা বলেন, এই ভোটার তালিকায় অসংখ্য মৃত ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে হোসনে আরা, এম এ মজিদ, এস এম বিল্লাল হোসেন, বদিউল আলম, মোসলেহ উদ্দিন, সৈয়দ শাহনেওয়াজসহ অনেকের নাম তারা তুলে ধরে বলেন, অবিলম্বে এই ফলাফল বাতিল করে হালনাগাদ ভোটার তালিকা করে নতুন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হবে। রাতের অন্ধকারে দেয়া এই কমিটিকে ওয়াসায় মেনে নেয়া হবেনা। 
সূত্র মতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি লি: এর বর্তমান কমিটির কার্যকাল শেষ হয়। এরপর একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আব্দুল হাকিমকে আহবায়ক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি এবং একটি উৎসবমুখর নির্বাচন আয়োজনে মো: আশরাফ উদ্দিনকে সভাপতি করে একটি নির্বাচন কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে মো: কামরুজ্জমান ও বাবুল হোসেনকে সদস্য করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির মূল কাজ ছিল ১২০ দিনের মধ্যে ভোটার তালিকা প্রনয়ন, হালনাগাদকরণ, নির্বাচনী শিডিউল ঘোষণা এবং একটি নতুন কমিটি উপহার দেয়া। কিন্তু এই কমিটি ভোটার তালিকা হালনাগাদ না করে এবং নতুন ভোটারদের অন্তভূক্ত না করে ১২ বছরের পুরনো তালিকা সমবায় দফতরে প্রেরণ করে। এটি জানাজানি হলে সাধারণ ভোটাররা তালিকা হালনাগাদ করতে সমবায় ও ওয়াসা প্রশাসনে আবেদন জানায়।
জানা গেছে, কমিটি গঠনের পর যাদেরকে সমিতির সদস্য থেকে বাদ দেয়া হয়েছে তারা গত ২ অক্টোবর সমিতিতে অন্তর্ভূক্তির জন্য রমনা থানা সমবায় অফিসারের মাধ্যমে আবেদন জানায়। যার স্মারক নং-৪৭.৬১.২৬.০০০.৩৩.৬১৫/৭৩-৪১৮২ (৩)। এছাড়া এর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর হালনাগাদ ভোটার তালিকা প্রকাশের দাবি জানায় ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। যার আদেশ নং-৪৭.৬১.২৬.০০০.৩৩-৬১৫/৭৩-৩৬০৪। আবেদনে তারা জানান, সমবায় আইন ২০০১ ও বিধিমালা-২০০৪ অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনা বিধি না মেনেই অনেক পুরনো একটি ভোটার তালিকাকে খসড়া ভোটার তালিকা হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। এখানে আইনের কোনো বিধান মানা হয়নি। বার আগের আগের এই ভোটার তালিকায় এমন অনেকেই আছেন যারা মারা গেছেন। একইসাথে এক হাজারের অধিক সদস্যকে ভোটার করা হয়নি। আবেদনে মৃত সদস্যদের বাদ দিয়ে এবং যারা ভোটার হবার যোগ্য তাদের অন্তভূক্ত করে হালনাগাদ ভোটার লিস্ট করার দাবি জানানো হয়। 
অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটি সদ্য বিদায়ী কমিটির সাথে আঁতাত করে বার বছর আগের একটি ভোটার তালিকা হালনাগাদ না করেই প্রকাশ করে। একইসাথে চলতি বছরের ৭ অক্টোবর নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। বিষয়টি জানাজানি হলে গত ২ অক্টোবর ঢাকা ওয়াসার সচিব (অ:দা:) প্রকৌশলী শারমিন হক আমীর অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আব্দুল হাকিমকে সমবায় সমিতির ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে নির্বাচনী তফসিল পুন: নির্ধারণের নির্দেশ দেন। যার স্মারক নং-৪৬.১১৩.২১২.০০০.২০১৯/৭৬৬। ওয়াসার পক্ষ থেকে এই নির্দেশনার পর সমবায় সমিতির নির্বাচন প্রসঙ্গ অনেটকা থেমে যায়। আলোচনা হয় নতুন ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে নতুন নির্বাচনের সিডিউল ঘোষণার।
জানা গেছে, ওয়াসা ও সমবায় কার্যালয়ের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হঠাৎ করে গত ২৬ অক্টোবর রমনা থানা সমবায় কার্যালয়ে বার সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি জমা দেয়া হয়েছে। যেখানে নির্বাচিত সকলকে বিনা প্রতিদ্ধন্ধিতায় নির্বাচিত বলে দেখানো হয়েছে। জমা দেয়া কমিটির নির্বাচনের তারিখ দেখানো হয়েছে  গত ৭ অক্টোবর। সমবায় কার্যালয়ে জমা দেয়া নির্বাচন কমিটির চূড়ান্ত ফলাফলের এই আবেদনে বলা হয়, নির্বাচনে এই ১২ জন ছাড়া আর কেউ মনোনয়নপত্র নেননি। তাই তাদেরকে গত ১৯ সেপ্টম্বর বিনাপ্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হলো। ঘোষিত এই ফলাফলে সভাপতি হয়েছেন চেয়ার প্রতীকে মো: আক্তারুজ্জমান, সহ সভাপতি মো: শামসুজ্জমান, সম্পাদক হয়েছেন মোগ প্রতীক নিয়ে সদ্য বিদায়ী কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো: জাকির হোসেন। এছাড়া ৯জন সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন যথাক্রমে-মো: আরমান ভূইয়া, বদিউল আলম, আশরাফুল আলম, রমিজ ুইদ্দন ভূইয়া, সিদ্দিকুর রহমান, কামাল হোসেন, আব্দুল হাকিম, সিরাজুল ইসলাম ও বাবুল আলী।
ওয়াসার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো: আক্তারুজ্জামানকে নির্বাচনে সভাপতি হিসেবে দেখানো হয়েছে অথচ তিনি নিজেই সেটি অস্বীকার করছেন। নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলেই তার সরল স্বীকারোক্তি, ভাই আমি এই বিষয়ে কিছুই জানিনা। বিভিন্ন মাধ্যমে শুনেছি, আমি নাকি সমবায় সমিতির সভাপতি হয়েছি। এখন কিভাবে হলাম সেটি জানিনা। তিনি বলেন, সবাই যদি আমাকে চায় তাহলে আমি সেখানে যাবো। আমি শুনেছি-সব কিছু নাকি সমঝোতার মাধ্যমেই হয়েছে।
নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির আহবায়ক আবদুল হাকিম সংগ্রামকে বলেন, নির্বাচনের বিষয়ে কিছুই জানিনা। নতুন করে ভোটার লিস্ট করার কাজ চলছিল। কিন্তু কিভাবে কি হলো সেটি জানিনা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা ভাই খুবই নগণ্য মানুষ। আমরা হচ্ছি ‘বলির পাঠা’। আমাকে দিয়ে কিছু কিছু জায়গায় সাক্ষর করানো হয়েছে। বুঝেন তো, আমাদের অনেক সময় কিছুই করার থাকেনা। ছোট চাকরী করি, অনেক কিছু অন্যায় হলেও মেনে নিতে হয়।
নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা প্রধান নির্বাচন কমিশনার মো: আশরাফ উদ্দিন বলেন, ঢাকা ওয়াসায় আমরা ‘ননীর পুতুল’। আমাকে সাক্ষর করতে বলেছে, আমি করেছি। তিনি বলেন, আমাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জাস্ট বানিয়েছে। সত্য-মিথ্যা যাচাই করার ক্ষমতা দেয়া হয়নি।
অপর নির্বাচন কমিশনার বাবুল ইসলাম ঘোষিত ফলাফল লিস্টে দেয়া সাক্ষর তার কি-না সেটা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে বলেন, কবে-কখন নির্বাচন হলো কিছুই জানিনা। তিনি বলেন, আমাকে নির্বাচন কমিশনে রাখা হয়েছে শুধু এতটুকুই জানি। তিনি বলেন, শুনেছি নির্বাচন হতে কিছুদিন সময় লাগবে। এখন কি হলো কিছুই বলতে পারবো না। 
ভোট বিহীন নির্বাচনে গঠিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, নির্বাচনের বিষয়ে সব কিছু চিঠিতে উল্লেখ আছে। এর বাইরে আমার কিছুই বলার নেই। কারো অভিযোগ থাকলে সেটি আইনীভাবে মোকাবেলা করা হবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ শেষেই সমবায় সমিতির নির্বাচন হবার কথা। আমরা সেভাবে নির্দেশনাও দিয়েছি। কিন্তু শুনলাম নির্বাচন নাকি হয়েছে। সমবায় অফিসে কমি,টিও জমা দেয়া হয়েছে। কিন্তু কখন নির্বাচন হলো কিছুই জানিনা। তিনি বলেন, এরকম জালিয়াতির নির্বাচনের খবর আমি কখনো শুনিনি। তিনি এই ঘটনা তদন্ত করবেন বলে জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ