রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

শেখ রাসেল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে

 

অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান: রূপ-বৈচিত্র্যে ভরপুর আমাদের এ বাংলাদেশ। বিস্তৃত এ সোনার বাংলার সার্বভৌম মানচিত্রের প্রায় মধ্যভূমিতে অবস্থিত মেঘনা, শীতলক্ষা, ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ, গঙ্গাজলি ও ইতিহাসের গর্ভে বিলুপ্ত নদী-শাখা নদীর পলিবিধৌত অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলায়ত দ্বীপমালার খণ্ডিত মনোরম মনোহর সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যে অবস্থিত, ছায়াঘেরা, পাখি ডাকা, মায়াময়, নয়নাভিরাম মনোমুগ্ধকর চিরসবুজের ছায়ানীড় ঐতিহাসিক জেলা নরসিংদী। বাংলাদেশের ইতিহাসে নরসিংদী একটি ঐতিহ্যবাহী ও গৌরবদীপ্ত এলাকার নাম। ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত, সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিল্প, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অসামান্য অবদানকারী জেলা হিসেবে নরসিংদী বরাবরই নন্দিত। প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল উয়ারী-বটেশ্বর আজ শুধু নরসিংদী জেলা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, এ এলাকার নাম আজ বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত।

উপজেলা ৬টি নরসিংদী সদর, রায়পুরা, শিবপুর, পলাশ, মনোহরদী ও বেলাব। আয়তন: ১,১১৪.২০ বর্গ কি.মি.। লোকসংখ্যা ১৭,০৯,৯৯২ জন (প্রায়) এবং জেলার উত্তরে কিশোরগঞ্জ জেলা, দক্ষিণে নারায়ণগঞ্জ জেলা, পূর্বে মেঘনা নদী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা এবং পশ্চিমে গাজীপুর জেলা নিয়ে নরসিংদীর অবস্থান। ৪টি জেলায় লোকসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি -যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৫ ভাগের ১ ভাগ। এ জেলায় অনেক খ্যাতিমান কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, চিত্রশিল্পী, চলচ্চিত্রকারের জন্ম হয়েছে। তাদের কর্মে ও মননে বিভিন্নভাবে লালিত হয়েছে এদেশ এবং ধন্য হয়েছে নরসিংদীর মাটি। নরসিংদী অঞ্চলের যে কজন মহাপুরুষ দেশ পেরিয়ে বিশ্বনন্দিত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে ভাষাসৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট কবি, নন্দিত চলচ্চিত্রকার, দর্শক নন্দিত টিভি ব্যক্তিত্ব নরসিংদীকে চিরভাস্বর করেছে। প্রয়াত ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন (পবিত্র কোরআন শরিফের বাংলায় প্রথম অনুবাদকারী)। মরহুম কবি বেনজির আহমদ, কবি শামসুর রাহমান, মোহাম্মদ হানিফ পাঠান (প্রতœ সংগ্রাহক) ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ (অধ্যাপক, কবি ও সাহিত্যিক) ড. এম. আসাদুজ্জামান (সাবেক চেয়ারম্যান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন), প্রফেসর জসীম উদ্দীন আহম্মদ (সাবেক ভি.সি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), অধ্যাপক হামিদা বানু (পদার্থবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম নির্বাচিত নারী সভানেত্রী), অধ্যাপক কলিম উদ্দীন ভুঁইয়া (বনবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়), অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক (ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), স্বপন কুমার সাহা (সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেসক্লাব), আহমেদুল কবির মনু মিয়া (সম্পাদক, দৈনিক সংবাদ), মতিউর রহমান (সম্পাদক, দৈনিক প্রথম আলো), ফণি মজুমদার (কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম প্রধান বিচারপতি), অভিনয় শিল্পী মো. খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া, মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া (মন্ত্রি পরিষদ সচিব), মতিউর রহমান বীরশ্রেষ্ঠ এম.এ.এন. নুরুজ্জামান (বীরউত্তম), লে. আব্দুর রউফ (বীরবিক্রম, পি.এস.সি), সুবেদার খন্দকার মতিউর রহমান (বীরবিক্রম), শহীদ মো. শাহাবুদ্দিন (বীরবিক্রম), লে. কর্ণেল মো. নজরুল ইসলাম হিরু (বীরপ্রতীক), শহীদ সুবেদার মো. আবুল বাশার (বীরপ্রতীক), হাবিলদার মো. মোবারক হোসেন (বীরপ্রতীক), মোজাম্মেল হক (বীরপ্রতীক), স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম শহীদ ফারুক ইকবাল (মনোহরদী), ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের মহানয়ক শহীদ আসাদ অহংকার নরসিংদীর।

প্রাচীনকাল হতে নরসিংদী কৃষিতে সমৃদ্ধ। এখানে মোট ফসলী জমির পরিমাণ ১,৭৩,৫৪২ হেক্টর প্রায়। নরসিংদীর মাটি উর্বর বিধায় চাষাবাদের জন্য উপযোগী। অধিকাংশ জমি দো-ফসলী। কিছু জমিতে বছরে ৩টি ফসলও ফলে থাকে। তিন ফসলের অধিক উৎপাদনক্ষম জমিও আছে। জেলায় ফসলের নিবিড়তা ১৯৮% প্রায়। নরসিংদী জেলার বিভিন্ন উপজেলা বিভিন্ন ধরনের ফল  ও ফসল উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ। শিবপুর ও মনোহরদী উপজেলা অমৃত সাগর কলা উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। এই অঞ্চলে রয়েছে আড়াই হাজার বছরের পুরনো বস্ত্রশিল্পের সোনালী ইতিহাস। ইহা সমগ্র পৃথিবীতে সভ্যতার ইতিহাস আজও কিংবদন্তী হয়ে আছে। তাঁত কাপড়ের জন্য এ জেলা বিখ্যাত ছিল। আর তাঁত কাপড় বাজারজাত করার জন্য এ জেলায় বাবুরহাটকে দেশের ম্যানচেষ্টার নামে অভিহিত করা হতো। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের তাঁত বস্ত্রের ৪৫% বাবুরহাট থেকেই সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া জেলায় সাধারণ শিল্প রয়েছে ৫২৪টি, কুটির শিল্প ১৯ হাজার ৫১২টি, ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং ১০০টি (প্রায়), জুট মিলস, ৯টি, সুতাকল ১টি, সুগার মিল ১টি, সার কারখানা ২টি, তাপ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ২টি, মৃৎশিল্প কারখানা ৫০টি, বিসিক শিল্প নগরী ১টি, ভারী শিল্প ২৮টি। নরসিংদী ঐতিহ্য যাতায়াতে সড়কপথ, নৌ-পথ, রেলপথ ও বিমান পথের ব্যবস্থা মহিমান্বিত করেছে।

নরসিংদী জেলা বাংলাদেশের মধ্যখানে অবস্থিত। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট রেল, স্থলপথ নির্মাণ করা হয়েছে নরসিংদীর উঁচু-নিচু পাহাড় কেটে। ঢাকা শাহজালাল বিমান বন্দর মাত্র ৮ মাইল দূরত্বে অবস্থিত। গ্রীণহাউজ মুক্ত এলাকা বলে খ্যাত। 

মেঘনা-শীতলক্ষা ব্রহ্মপুত্রের সুকোমল জলধারার ঐতিহ্যবাহী নরসিংদী। মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষা নদ-নদী দিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সহজে চলাচল করা যায়। নরসিংদী থেকে সংবাদপত্রের মধ্যে: নরসিংদীর খবর, আমার নরসিংদী, দৈনিক উত্তাপ, সাপ্তাহিক আরশিতে মুখ, সাপ্তাহিক খোরাক, সাপ্তাহিক অতিক্রম, সাপ্তাহিক আজের চেতনা, দৈনিক গণজাগরণ, সাপ্তাহিক দেশ সন্দেশ, সাপ্তাহিক প্রেক্ষাপট, সাপ্তাহিক অনুণিমা, সাপ্তাহিক মুক্তচিন্তা, সাপ্তাহিক সময়, সাপ্তাহিক মাটির পুতুল ইত্যাদি। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে এ জেলার ঈর্ষণীয় সাফল্য রয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে ২৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল, আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ করছে। এছাড়া জেলায় জেনারেল হাসপাতাল ১টি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৬টি, স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র ১৭টি, লায়ন্স চক্ষু হাসপাতাল ১টি, ডায়াবেটিক হাসপাতাল ১টি, বেসরকারি ক্লিনিক ৮টি। শিক্ষা ব্যবস্থায়ও রয়েছে ঐতিহ্য। জেলায় শিক্ষিতের হার ৪১%, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৬৯টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৫৭টি, প্রাইমারি ট্রেনিং সেন্টার (PTI) ১টি, কারিগরি বিদ্যালয় ১৬টি, সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ১টি, বেসরকারি ৮টি, তাঁত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ১টি। নরসিংদী আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ এইচ এস সি পরীক্ষায় ২০১২ এবং ২০১৩ সালে পর পর দু-বার দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

নরসিংদীতে একটি মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাবে অনেক মেধা অকালে ঝড়ে যাচ্ছে। ২০০৬ সাল থেকে ‘নরসিংদী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন পরিষদ’ নরসিংদী জেলায় একটি আন্তর্জাতিকমানের শেখ রাসেল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে যাচ্ছে। 

নরসিংদী জেলার মৌলিক তথ্যাবলী বিবেচনা করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের নামে ৯৯ অনুষদ বিশিষ্ট  একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

লেখক : ডিন, কলা অনুষদ (সাবেক) চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ